
জামায়াতে ইসলামীর এমপি গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচণার মামলায় তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ এনেছিলেন শ্বশুর এস এম মাসুম বিল্লাহ। তিনিই এখন ‘হৃদ্যতাপূর্ণ আত্মীয়তার সম্পর্ক’ বজায় রাখার আগ্রহে গাজী নজরুলের সঙ্গে আপস রফায় এসেছেন।
ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহর আদালতে বুধবার গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের জামিন শুনানিতে আসামিপক্ষে আপসের বিষয়টি জানানো হয়। বলা হয়, গাজী নজরুল ও মাকছুদা জামিন পেলে মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহর কোনো ‘আপত্তি নেই’।
আসামিদের আইনজীবী মাহাবুবুর রহমান জামিন শুনানিতে বলেন, “বাদী ও আসামিরা পূর্ব থেকেই আত্মীয়। দুইপক্ষের একই আত্মীয়-স্বজন হওয়ায় তাদের পরামর্শে এবং ভবিষ্যতে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজার রাখার স্বার্থে বিরোধের বিষয়টি মীমাংসা করে দিয়েছে। ফলে আসামিরা জামিন পেতে হকদার।”
নজরুল ইসলামের ‘স্ট্যাটাস’ (সংসদ সদস্য) তুলে ধরে এবং মাকছুদা নারী হওয়ায় তার বয়স বিবেচনায় আপসের শর্তে তাদের জামিন চান মাহাবুবুর রহমান।
আদালতে উপস্থিত মামলার বাদী মাসুম বিল্লাহ বলেন, আসামিরা জামিন পেলে তার আপত্তি নেই।
বিচারক তার কাছে জানতে চান, ‘চাপে’ আপস করেছেন কি না? মাসুম বিল্লাহ বলেন, “না, কোনো চাপ নেই।”
মাকছুদা ইসলাম নারী ও বয়স্ক হওয়ায় ৫ হাজার টাকা মুচলেকায় তাকে মামলার আগামী ধার্য দিন ২২ অক্টোবর পর্যন্ত জামিন দেন বিচারক। তবে মামলার তদন্ত চলমান হওয়ায় এবং হাজতবাস কম হওয়ায় নজরুল ইসলামের জামিন নামঞ্জুরের করেন তিনি।
আদালতে জমা দেওয়া আপসনামায় তিনটি শর্তের কথা বলা হয়েছে। সেখানে প্রথম পক্ষে আছেন মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ। আর দ্বিতীয় পক্ষে গাজী নজরুলের আত্মীয় আব্দুর হামিদ মোড়ল।
আপসনামায় বলা হয়, মরিয়মের সঙ্গে নজরুল ইসলামের বিয়ে হয়। বিয়ের পর নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামের সঙ্গে মরিয়ম ‘হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে’ একত্রে সংসার করে আসছিলেন।
গত ২০ সেপ্টেম্বর বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৫টার মধ্যে কোনো এক সময় ঢাকার সংসদ সদস্য ভবনে (ন্যাম ভবনে) মরিয়ম আত্মহত্যা করেন। নজরুল ইসলামের ফোন পেয়ে মাসুম বিল্লাহ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার সময় সেখানে উপস্থিত হয়ে মেয়ের আত্মহত্যার বিষয়ে জানতে পারেন।
আপসনামায় বলা হয়, নজরুল ইসলামের বাসায় আত্মহত্যার বিষয়টি সংঘঠিত হয়েছে। ফলে ‘তাৎক্ষণিকভাবে সন্দেহের বশে’ নজরুল ইসলাম, মাকছুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন মাসুম বিল্লাহ।
“মামলা দায়েরের পর মাসুম বিল্লাহ বিভিন্ন মাধ্যমে অবগত হয়েছেন, নজরুল ইসলাম ও মাকছুদা ইসলামের প্ররোচনায় কিংবা তাদের কোনো কার্যকলাপে রাগ বা অভিমানে মরিয়ম আত্মহত্যা করেনি। বাদী এবং আসামিরা আত্মীয় হওয়ায় উভয়পক্ষের আত্মীয়-স্বজন উভয়েরই নিকট আত্মীয়। ফলে নিকট আত্মীয়দের সহায়তায় আলাপ আলোচনা করে উভয়পক্ষের মধ্যে শান্তি বিরাজিত থাকার লক্ষ্যে এবং উভয় পক্ষে আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখার স্বার্থে তিন শর্তে আপোস করেছেন তারা।”
শর্তগুলো হল–
>> নজরুল ইসলাম ও মাকছুদা ইসলাম জামিন পেলে মাসুম বিল্লাহ বা তার পরিবারের কারো কোনো আপত্তি নেই।
>> তারা জামিন পেলে দুই পক্ষ হৃদ্যতাপূর্ণ আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে একান্তভাবে চেষ্টা করবে।
>> বিচারাধীন বিষয়ে উভয়পক্ষ নির্লিপ্ত থেকে বিচার কার্যে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।
গত ২০ জুলাই রাতে ঢাকার মগবাজারের একটি হোটেলে মরিয়মের সঙ্গে এমপি নজরুলের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এ বিষয়ে প্রথমে জামায়াতের নেতাকর্মীরা এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বলে দাবি করেন।
পরে সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম ফেইসবুকে পোস্টে ওই তরুণীকে দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন। সাংগঠনিক তদন্তে তার নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ার কথা জানিয়ে ২২ জুলাই গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় জামায়াতে ইসলামী।
ওই ঘটনার ঠিক দুই মাসের মাথায় গত ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সংসদ ভবনের উল্টোদিকের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। রাতে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে পুলিশ থানায় নিয়ে যায়।
পরে আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ।
এজাহারে তিনি অভিযোগ করেন, গত জুনে তার শ্যালক ওবায়দুর রহমানের ‘প্রত্যক্ষ প্ররোচনায়’ সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের সঙ্গে ১৯ বছর বয়সী মরিয়মের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নজরুল ও মাকছুদা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন বলে মরিয়ম তার পরিবারকে বলে গেছেন।
মামলার এজাহারে মাসুম বিল্লাহ লেখেন, সেদিন লাশ উদ্ধারের সময় মেয়ের বিছানার ওপরে তার লেখা ‘সুইসাইড নোট’ দেখতে পান তিনি।
একটি চিরকুটে লেখা ছিল, “শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই…তা না হলে যতটা সস্তা ভাবছো ততটা সস্তা আমি নই…।”
আরেকটিতে লেখা, “আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সাথে, জিততে পারিনি হেরে গেলাম ময়দানে। জিতবইবা কেমনে, যুদ্ধের শেষ প্রান্তে যেয়ে দেখি তুমিতো ছিলে বিপক্ষের সেনাপতি।
“আমি হেরেছি তুমি জিতেছো, কারণ আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছো। আমি ধ্বংসের শেষ দাঁড়িয়েও মুখে হাসি রেখেছি। ভেবে নাও এই হাসির কারণই হবে তোমার ধ্বংসের কারণ।”
আরেকটি চিরকুটে ছিল দুটি লেখা। একটিতে ছিল, “সে ছিলো অন্য নারীর স্বামী। কাগজে কলমে অধিকার ছিল তার বউ এর…!!! আর আমি ছিলাম বোকা…!!!অন্য কারো স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ…!!!”
আরেক লেখায় ছিল, “কাউকে অর্ধেক পাওয়ার চেয়ে হারিয়ে ফেলা বেশির সম্মানের। কারণ ভালোবাসা কখনোই ভাগ করে নেওয়ার বিষয় নয়…ভালোবাসা হয় সম্পূর্ণ, না হয় অপূর্ণ!”
নজরুলের স্ত্রী মাকছুদা সম্পর্কে মরিয়মের দাদি হন। মরিয়মের আপন দাদি মাছুমা ও মাকছুদা দুই বোন। গাজী নজরুল তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহর আপন খালু।
বাবার খালুর সঙ্গে কী করে মেয়ে সম্পর্কে জড়াল, এমন প্রশ্নে মুদি দোকানি মাসুম বিল্লাহ মামলা করার পর বলেছিলেন, “আমরা প্রথমে বুঝতে পারিনি। অনেক পরে জানতে পারছি। কিন্তু ওর মামার জন্য এভাবে সব শেষ হয়ে গেল।”
২২ সেপ্টেম্বর সকালে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের মর্গে মেয়ের লাশের জন্য অপেক্ষার মধ্যে মাসুম বিল্লাহ বলেছিলেন, “আমি তো চাই সঠিক তদন্ত, আমি যেন ন্যায় বিচারটা পাই; প্রকৃত দোষী যেন শাস্তি পায়।”
এখন কীভাবে মন বদলালো, তা জানতে মাসুম বিল্লাহকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, “মামলার বিষয়ে আমাদের মধ্যে আপস হয়েছে। উনি (নজরুল ইসলাম) আমার আত্মীয়।”
কোনো চাপে আপস করেছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ”কোনো চাপ নেই।” এরপর পরে কথা বলবেন জানিয়ে ফোন কেটে দেন মাসুম বিল্লাহ।
বুধবার আদালতে যা হল, সে বিষয়ে প্রশ্ন করলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ঢাকা মহানগরের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, “এই ধরনের মামলায় বাদীর আদালতে এসে আপসনামা দেওয়ার সুযোগ নেই। মামলা দায়ের হয়েছে, তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্ত শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন দেবেন।
“আদালত কাকে জামিন দেবেন এবং কেন দেবেন, সেটা আদালতের নিজস্ব এখতিয়ার। তবে বাদীর এ ধরনের দরখাস্তের কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।”
এ আইনজীবী বলেন, “তারা বলছেন, তারা নিকট আত্মীয়। কিন্তু আমরা হলফনামার নাম দেখে বুঝতে পেরেছি, কোনো না কোনোভাবে চাপের মুখেই হলফনামাটি তৈরি করা হয়েছে। আত্মীয়তার বিষয়টি দেখিয়ে বলা হচ্ছে, ‘তাদের প্রতি আমাদের কোনো রাগ বা অভিযোগ নেই।’
“এ বিষয়টি কীভাবে করা হয়েছে, তা তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্ত করে দেখবেন। কেন এ ধরনের হলফনামা প্রস্তুত করা হয়েছে, সেটিও তদন্তে বেরিয়ে আসবে।”
আসামিপক্ষের আইনজীবী মাহাবুবুর রহমান বলেন, “মামলা পর্যালোচনায় দেখা যায়, আত্মহত্যায় প্ররোচনার সঙ্গে আসামিদের (নজরুল ইসলাম ও মাকছুদা ইসলাম) কোনো সম্পৃক্ততা নেই। রিমান্ড শেষে যে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে, সেখানেও কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। মামলার বাদীও আপসনামা দাখিল করে বলেছেন, এ মামলায় আসামিদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।”
বাদীপক্ষ প্রথমে ‘না বুঝতে পেরে’ মামলাটি দায়ের করেছে দাবি করে মাহাবুবুর রহমান বলেন, “পরবর্তীতে রাষ্ট্রপক্ষের তদন্তে কোনো সম্পৃক্ততা না থাকায়, সব খোঁজখবর নিয়ে এবং বিশ্লেষণ করে আপসনামা দাখিল করেন।”
এক প্রশ্নের জবাবে এ আইনজীবী বলেন, “মামলা আপসযোগ্য নয়, কিন্তু আদালত চাইলে বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারেন।”
আরও পড়ুন:
আমি বাইরে মুখ দেখাব কীভাবে, বাবাকে বলেছিলেন নজরুলপত্নী মরিয়ম
মামলার এজাহারে এমপি নজরুলের বিরুদ্ধে যা যা অভিযোগ
আত্মহত্যায় প্ররোচনা: হেফাজতে গাজী নজরুল, স্ত্রী মাকসুদা গ্রেপ্তার
দ্বিতীয় স্ত্রীর লাশ উদ্ধার: প্রথম স্ত্রীসহ থানায় নেওয়া হল গাজী নজরুলকে
ন্যাম ভবনে গাজী নজরুলের স্ত্রী মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ
নজরুলকে বহিষ্কারের কথা জানিয়ে স্পিকার ও ইসিকে চিঠি জামায়াতের
নারীর সঙ্গে এমপি নজরুলের ভিডিওর খবরে ‘নজর রাখছে’ জামায়াত
জামায়াত এমপির সঙ্গে নারীর ভিডিও ভাইরাল, দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি করে পোস্ট


