• রবি. সেপ্টে. 27th, 2026

নজরুলের পুরুষকার | প্রথম আলো

Bytrendnews

সেপ্টে. 27, 2026


পাগলি মায়ের দামাল ছেলে। সে নিছক হুকুম তামিলের সুশৃঙ্খল পদাতিক নয়, বরং প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য জান কবুল। পটল্যাচের (potlatch) মতো করে সে নিজের অস্তিত্বের উদ্বৃত্ত প্রাণশক্তি বিলিয়ে দেয়। বুদ্ধদেব বসুর ভাষায়, ‘প্রাণশক্তির এমন অসংবৃত উচ্ছ্বাস, এমন উচ্ছৃঙ্খল অপচয় অন্য কোনো বয়স্ক মানুষের মধ্যে আমি দেখিনি।’ নজরুল নিজে লিখেছেন, ‘তোর জান যায় যাক, পৌরুষ তোর মান যেন নাহি যায়।’ ‘মেদা-মারা’ ছেলের চেয়ে… ‘ডানপিটে’ ছেলে বরং অনেক ভালো। কারণ, পূর্বোক্ত নিরীহ জীবরূপী ছেলেদের ‘জান’ থাকে না; আর যার জান নাই, সে-‘মোর্দা’ দিয়া ‘কোনো কাজই হয় নাই, আর হইবেও না।’পৌরুষের এই বীরত্ব নেহাত ভায়োলেন্সকে ভায়োলিন বাজিয়ে উদ্‌যাপন করার ব্যাপার নয়। উপনিবেশের কাঠামোগত সহিংসতাকে মোকাবিলার শক্তি অর্জনের প্রশ্ন তা, যে উদ্দেশ্যে কিশোর নজরুল বাঙালি পল্টনে যোগ দিয়েছিলেন। উপনিবেশি শক্তির জন্য কালা আদমি বা মুহাজিরিনকে গুলি করা যে কত সহজ, তা নজরুল তাঁর নানা সম্পাদকীয় প্রবন্ধে লিখেছেন। প্রতিরোধী, উপনিবেশবিরোধী লড়াইয়ের প্রেরণা পাওয়ার জন্যই মেদা-মারা হওয়ার বদলে শক্তির সাধনার প্রশ্ন আসে। তাই অগ্নিবীণার কবিতাগুলোতে নজরুল প্রাগাধুনিক হিন্দু কাব্যের যুদ্ধবর্ণনার রণরঙ্গী ও বীভৎস রসের অনুপ্রাস ও ধামাকা জুড়েছেন।

জুলুমের বিরুদ্ধে সংগঠিত নজরুলী পৌরুষের এই বীরত্ব আত্মদানের। ফলে তা লোভী, দখলদার বা সঞ্চয়বাদী পৌরুষ নয়। সে ‘ছন্নছাড়া, কেবলই ঘুরে বেড়ায়, শ্রী নাই, সামঞ্জস্য নাই, ব্যালান্স-জ্ঞান নাই;’ তবু সে ‘সুন্দরের বৈতালিক, বেদনার ঋত্বিক।’

আজকাল বাংলাদেশে পৌরুষকে ঈর্ষাকাতর রক্ষণশীলতা [গায়রাত] বলে চেনানোর চল হয়েছে, আর গায়রাতকে উগ্র-আগ্রাসী অণু-অহং আকারে দেখার প্রচলন হয়েছে। অ্যান্ড্রু টেট, আলফা-সিগমা বা কোটিপতি পুরুষ ধারণার উদ্‌যাপন বাংলাদেশের নব্য মধ্যশ্রেণিতে প্রচলিত হয়েছে। এই নব্য গায়রাতি ভাবাদর্শ অনুসারে নারীকে অন্যের সাপেক্ষে অদৃশ্য করে দেওয়াই পুরুষত্বের পরাকাষ্ঠা। কিন্তু নজরুলের বীরত্বব্যঞ্জক পৌরুষ আগ্রাসী, দখলদার ও অত্যাচারী নয়। প্রেমকে প্রেমাস্পদের ওপর জবরদখল কিংবা জবরদস্তি বলে ভাবেন না তিনি। ‘আমি এত বড়ো ধৈর্যহারা বোকা blunt নই যে, যাকে পেলাম না তাকে আমার এই জন্মেই পেতেই হবে।’ প্রেমাস্পদকে জোর করে ‘মড়া-আগলা’ করে আগলানোর গায়রাতকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।

মোদ্দাকথা, যে পৌরুষ অবুঝ, বাঁধনহারা, বীর ও বিপন্ন, তার মূলে আছে কোরবানি, আত্মদান ও শহীদ হওয়ার ধারণা। নজরুল বলছেন, ‘আমি হোম-শিখা, আমি সাগ্নিক, জমদগ্নি,/ আমি যজ্ঞ, আমি পুরোহিত, আমি অগ্নি!’

উপনিবেশে মানুষের দশা হলো দাসের। দাসের শরা কী রকম হয়? নজরুলের প্রশ্ন হলো, ‘মানুষের দাস তুমি, তোমার আবার ধর্ম কী?’ আর তাঁর জবাব হলো, ‘আমার বাঁচাই আমার ধর্ম।’ কাঠামোগত সহিংসতার মধ্যে জীবনের প্রয়োজন নিজেই এক জরুরি অবস্থা। বাঁচার উত্তুঙ্গতার উপলব্ধি থেকেই নজরুল লিখেছেন—‘মৃত্যুকেই তো আমি চিরদিন খুঁজে বেড়াই।’ (‘স্বাধীনচিত্ততার জাগরণ’) বাঁচার প্রয়োজনেই এই মৃত্যু-সন্ধান। বৈপ্লবিক ও প্রেমিককে জরুরি অবস্থায় বাঁচতে হয়। ‘দেবতার জল-ঝড়কে আমি বাঁধব। প্রকৃতিকে আমি প্রতিঘাত দেব। আচারের বোঝা ঠেলে ফেলে দেব, সমাজকে ধ্বংস করব। সব ছারেখারে দিয়েও আমি বাঁচব।…ওরে আমার তরুণ, ওরে আমার লক্ষ্মীছাড়ার দল, তোরা আয়, তোরা ছুটে আয়—এই ভণ্ডামি থেকে চলে আয়।’

বীর মাত্রই বে-শরা নয়; কিন্তু তার বিধি বা আইন ভাঙার দার্ঢ্য থাকে। এটা বৈপ্লবিক সত্তার অস্তিতত্ত্ব। জীবন, সময়, প্রেম বা লড়াইয়ের প্রয়োজনে সামাজিক ও মাজহাবি রীতিনীতিকে মুলতবি করা যায়। যুদ্ধে যাওয়া নজরুল কলকাতায় ফিরে যে ধূমকেতু পত্রিকা করেছিলেন, তা তেমন বিপ্লবীদের স্বর হয়ে এসেছিল। ‘“ধূমকেতু” তাহাদের বাণী হইয়া আসিয়াছিল—যাহাদের গৃহী আশ্রয় দিতে ভয় পায়, গহন বনে ব্যাঘ্র যাহাদের পথ দেখায়, ফণি তাহার মাথার মণি জ্বালাইয়া যাহাদের পথের দিশারি হয়, পিতামাতার স্নেহ যাহাদের দেখিয়া তুহিন-শীতল হইয়া যায়।’ বিপ্লবীরা উপনিবেশি ক্ষমতাকাঠামোর কাছে নিধনযোগ্য ছিলেন বলেই তাঁরা প্রচলিত নিয়মতন্ত্রের মাকাসিদকে মুলতবি করতে পারতেন।

নিয়মতন্ত্রের ঊর্ধ্বে গিয়ে, বাঁচাকে কেন্দ্রে রেখে নজরুল যে সত্তার গঠন করেছিলেন, সেই সত্তা পরিচয়ের জেওর [অলংকার] ও তাৎপর্যকে পূর্ণ মূল্যে গ্রহণ করতে পেরেছিলেন, কিন্তু পরিচয়বাদের জাতপাতে বাঁধা পড়েননি। জাত উজানো এই নজরুল ইসলামকে তাঁর সমসাময়িক জাতবাদী সমাজ কখনোই ঠিক চিনে সারতে পারে নাই। সমকালীন কলকাতার বিদ্বৎসমাজ তাঁর প্রতি আদর ও অত্যাচার দুই–ই করেছে। উত্তরকালে পূর্ব বাংলা, বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলা তাঁর নানা সীমিত বরণ-উদ্‌যাপন করেছে, কিন্তু তাঁর পরিচয়ের পূর্ণ রফা করে উঠতে পারেনি। সমকালে কেউ তাঁকে কাফের বলেছে, কেউ বলেছে পাত-নেড়ে, কেউ বলেছে অহিংস, কেউ ঠাওরেছে নাস্তিক। রাশি রাশি অভিধা দিয়েও তবু শনাক্ত করে উঠতে পারেনি, তকমায়িত ও বর্গীকৃত করে সারতে পারেনি। সবকিছুর পরেও তাঁর নানা উপরি-পরিচয় [সারপ্লাস আইডেন্টিফিকেশন] থেকে গেছে।



Source link

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।