• রবি. অক্টো. 18th, 2026

জনগণের ব্যাংক হিসেবে ব্র্যান্ডিং করতে চাই: প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান আরিফুর

Bytrendnews

অক্টো. 18, 2026


পরিচালকরা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ না করলে ভিন্ন খাতে ঋণ যাবে না; ঋণের নামে অর্থ তসরুফ হবে না। এতে করে ব্যাংকে সুশাসন ফিরে আসবে বলে মনে করেন প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান ডা. আরিফুর রহমান।

ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা পর্ষদ হস্তক্ষেপ না করলেই সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব বলেও তার পর্যবেক্ষণ।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে ব্যাংকে পরিচালকদের ক্ষমতা কমাতে এক পরিবার থেকে একজন, সর্বোচ্চ দুইজন পরিচালক করার পক্ষে মত দেন তিনি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টফোর ডটকম এর নিয়মিত আয়োজন ‘চিনওয়াগ উইথ দ্য চিফস’ অনুষ্ঠানে ব্যাংক খাত নিয়ে এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন চিকিৎসক থেকে ব্যাংক খাতের উদ্যোক্তার কাতারে নাম লেখানো আরিফুর রহমান।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ইউটিউব চ্যানেল ও ফেইসবুক পেইজে অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করা হয়। এতে ব্যাংক খাতের বর্তমান অবস্থা ও করণীয়, প্রিমিয়ার ব্যাংকের বর্তমান অবস্থা, চিকিৎসক থেকে জনশক্তি রপ্তানি খাতের ব্যবসায় নামা এবং ব্যাংকের উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প বলেন তিনি।

ডা. আরিফুর চিকিৎসা বিদ্যায় পড়ার সময়ে সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন দৈনিক বাংলা ও বিচিত্রায়। চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেছেন লেবানন ও ইরাকের যুদ্ধকালীন সময়ে। তখন ফিলিস্তিনের অবিসংবাদিত নেতা ইয়াসির আরাফাতের ব্যক্তিগত চিকিৎসকও হন। পরে সৌদি আরবে গিয়ে রাজ পরিবারের চিকিৎসক দলেও কাজ করেছেন। ওই সময়ে নাম লেখান জনশক্তি রপ্তানির ব্যবসায়। পরে নব্বইয়ের দশকে যুক্ত হন ব্যাংক খাতে।

যুক্ত ছিলেন চলচ্চিত্র তৈরিতেও; পোশাক খাতের কর্মীদের নিয়ে বানিয়েছেন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। পাবর্ত্য চট্টগ্রামের শিশুদের নিয়ে তৈরি করেছেন ‘রেমাক্রী’ নামের একটি সিনেমা।

চব্বিশের আন্দোলনে সরকার বদলের পর ব্যাংক খাতের বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক তাকে ফিরিয়ে আনে প্রিমিয়ার ব্যাংকে। তার নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রয়াসে এখন স্বাভাবিক লেনদেনে ফিরেছে তৃতীয় প্রজন্মের ব্যাংকটি বলে দাবি আরিফুর রহমানের।


Image

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের চিনওয়াগ উইথ দ্য চিফস অনুষ্ঠানে প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান।

১৯৯৯ সালে বন্ধু এইচবিএম ইকবালের (আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য) প্রস্তাবে সদ্য লাইসেন্স পাওয়া প্রিমিয়ার ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত হন আরিফুর রহমান। বলেন, ‘‘ও (ইকবাল) বলল যে, আমি একটা ব্যাংকের পারমিশন পাইছি। তুমিতো এখন ব্যবসা করতেছো, টাকাও আছে। কিছু টাকা দাও, আমরা ব্যাংকটা বানাই।’’

প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ইকবালের নেতৃত্বাধীন পর্ষদে তিনিও যুক্ত হন। তবে বছর দশেক পরে ব্যাংকে অনিয়ম শুরু হলে ভাইস চেয়ারম্যান পদ ছেড়ে দিয়ে শুধু শেয়ারধারক উদ্যোক্তা হিসেবে রয়ে যান আরিফুর।

২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে দেশের আর্থিক খাতের সংস্কার শুরু করে অর্ন্তবর্তী সরকার। প্রথম ধাপে ১২টি ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দিয়ে স্বতন্ত্র পরিচালকদের দিয়ে নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়। সেই তালিকায় প্রিমিয়ার ব্যাংকও ছিল।

ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংক শেয়ারধারক পরিচালক হিসেবে আরিফুর রহমানকে প্রিমিয়ার ব্যাংকে ফিরিয়ে আনেন। তাকে দেওয়া হয় চেয়ারম্যানের দায়িত্ব। তখনকার অবস্থা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রিমিয়ার ব্যাংকের টাকা অন্যভাবে চলে গেছে, ব্যাংকের টাকা পয়সা নাই।

‘‘যেগুলা ডিভিডেন্ড (লভ্যাংশ) দেওয়া হত, সব উইন্ডো ড্রেসিংয়ের মাধ্যমে দেওয়া হত। ভুয়া অ্যাকাউন্ট দিয়ে করা হত।’’

ব্যাংকের পুরনো নথিতে উদ্যোক্তা হিসেবে খুঁজে পাওয়া যায়নি আরিফুর রহমানের নাম। এসব নথি মুছে দেওয়া হয় দাবি করে তিনি বলেন, পরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের নথিতে নাম খুঁজে পায় বাংলাদেশ ব্যাংক। সেটি পেয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংকের পর্ষদে শেয়ারধারক পরিচালক হিসেবে যুক্ত করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৪ সালে গঠন করা পর্ষদের বাকি পাঁচজন স্বতন্ত্র পরিচালক।

ব্যাংক ব্যাংকের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরতে গিয়ে সেই থেকে প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে আসা আরিফুর বলেন, অনেক ব্যাংক আমানত ফেরত দিতে পারছে না। সেই দিক থেকে প্রিমিয়ার ব্যাংক ভালো আছে। চাহিদা অনুযায়ী লেনদেন করতে পারছেন গ্রাহকরা।

‘‘একটা চেকও বাউন্স হয়নি আমাদের। নট এ সিঙ্গেল ওয়ান। ৬০০ কোটি, ৭০০ কোটি ও ৮০০ কোটির মত চেক বাউন্স হয় নাই।’’

করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রথমে অর্থ তুলে নিলেও পড়ে সেগুলোর ফিরে আসার তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, বড় বড় গ্রুপ টাকা তুলে নিয়েছিল। এখন তারা আবার ফিরে এসেছে। গত দুই বছরে ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকার আমানত এসেছে। এখন আমানতে কোনো সংকট নেই।

প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে ‘অর্থ সরানোর’ দাবি করে তিনি বলেন, তারা দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্তিতি সামাল দিয়েছেন।

‘‘এর টোটাল ডিফেক্টগুলো আমরা ধরে ফেলছি। একটা ব্যাংকের কতখানি, কোথায় কোন ক্ষত আছে, এটা বোঝার জন্যে আমাদের কিছু কিছু কাজ করতে হয়।’’

প্রকৃত মুনাফার চেয়ে মুনাফা বাড়িয়ে দেখিয়ে আগের পর্ষদ অর্থ সরিয়ে নিয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘‘ব্যাংকের উইন্ডো ড্রেসিং মানে হলো যে আমি ফলস অ্যাকাউন্ট দেখাইলাম। দেখাইয়া আমি এত বছর অনেক বেনিফিট নিয়ে নিছি। আসলে বেনিফিট কিন্তু এটা হয়নি।

‘‘আমাদের ব্যাংকে (প্রিমিয়ার) এটা খুব সিরিয়াসলি হইছে।’’

চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পরে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএফআইইউ (বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিলেজেন্স ইউনিট) এর পরামর্শে ‘ফরেনসিক অডিট’ চালানো হয় প্রিমিয়ার ব্যাংকে। তৃতীয় পক্ষের এই নিরীক্ষার কথা তুলে ধরে আরিফুর রহমান বলেন, ‘‘ছয়টা অডিট কোম্পানি বাইরের, এদেরকে দিয়ে আমরা এই ফরেনসিক করলাম। ফরেনসিক প্লাস নরমাল অডিট।


Image

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের চিনওয়াগ উইথ দ্য চিফস অনুষ্ঠানে প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান।

‘‘ব্যাংকের ফরেনসিকের কারণটা হচ্ছে যে, টাকা পয়সা, কোথায় চুরি হয়েছে, কোথায় ইরেগুলারেট হয়েছে। এগুলো বার করতে যেয়ে তো একদম কেঁচো খুঁড়তে যেযে সাপ পাওয়ার মতো অবস্থায়।’’

সেই নিরীক্ষায় কোথায় কী পরিমাণ অর্থ চলে গেছে সেটির চিত্র পাওয়ার দাবি করে তিনি বলেন, ‘‘আমরা ওই ক্ষতগুলাকে এখন ব্যান্ডেজ করে দিছি। ওগুলাকে আমরা আর সামনে আনতেছি না।’’

সেই লোকসান ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় কমিয়ে সমন্বয় করা হচ্ছে বলে তুলে ধরেন তিনি। বলেন, এই ক্ষত সারতে নতুন করে বড় ঋণ দিচ্ছে না প্রিমিয়ার ব্যাংক। শুধু নিজস্ব বড় করপোরেট গ্রাহক ও নিয়মিত পরিশোধকারীদের ঋণ দিয়ে চলছে ব্যাংকটি।

উদ্যোক্তাদের ব্যাংকের মালিক হিসেবে তুলে ধরার পক্ষপাতি নন এই উদ্যোক্তা। তিনি বলেন, ‘‘টাকাটা কার? এটাতো আমার না। আমরা (উদ্যোক্তারা) বলি ব্যাংকের মালিক। আমি কেমনে মালিক হইলাম? টাকা তো আমানতকারীদের। আমানতকারীদের টাকা আপনার কাছে। তারা আমানত রাখছে হাউ ক্যান উই বি মালিক, এটা কোনদিন হয় নাকি?

‘‘আসলেতো আমরা ব্যাংকের গার্ড। আমাদেরতো আর কোনো দায়িত্ব নাই। আমরা আমাদের কাজ হলো আমানতকারীদের টাকা হেফাজত করা।’’

ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী এখন এক পরিবার থেকে তিনজন ব্যাংকের পর্ষদে থাকতে পারে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘আপনি যত বড়ই উদ্যোক্তা হন, একজনের বেশি থাকা উচিত না, সর্বোচ্চ দুইজন।’’

পরিচালকদের মেয়াদও কমিয়ে আনার প্রস্তাব করেন তিনি।

প্রিমিয়ার ব্যাংকের খেলাপি ঋণের প্রসঙ্গে আরিফুর বলেন, ‘‘প্রিমিয়ার ব্যাংকের খেলাপির ঋণ ৬৫ শতাংশে ছিল, সেখান থেকে ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনছি আমরা।’’

আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এ হার ২০ শতাংশে নামিয়ে আনতে কাজ করছেন তারা বলে তুলে ধরেন তিনি।

প্রিমিয়ার ব্যাংককে এখন কোথায় দেখতে চান এমন প্রশ্নে চেয়ারম্যান বলেন, ‘‘এখন মূল ফোকাস হচ্ছে আমানতদারীদের আমানতের হেফাজত, তো সেটা আমরা করছি। মূল ফোকাস হচ্ছে যে দেশের অর্থনীতিতে আরো বড় ভূমিকা রাখা। দেশের অর্থনীতিকে আমাদের চালু করতে হবে।’’

এক সময়ে এটিকে শীর্ষ ব্যাংক হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখা আরিফুর বলেন, ‘‘জনগণের ব্যাংক হিসেবে নিজেদের ব্র্যান্ডিং করতে চাই। একদম রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে নৌকার মাঝি থেকে শুরু করে, টং এর দোকানদার, একদম টপ শিল্পপতি পর্যন্ত, প্লাস গভমেন্টের প্রজেক্টগুলাতে আমরা পার্টিসিপেট করতে চাই।’’

বাংলা কিউআর কোড চালু হওয়ায় রিকশাওয়ালা তার ভাড়া নিতে পারবে। তরকারি কেনার অর্থ সেখানেই দেওয়ার সুবিধা রয়েছে। তাই মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) সেবায় যাবে না প্রিমিয়ার ব্যাংক বলে পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি।

‘ব্যাংক ডুবলে পরিচালকরাই দায়ী’

ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা খুব সহজেই সম্ভব মনে করেন আরিফুর রহমান। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় পরিচালক পর্ষদ হস্তক্ষেপ না করলেই সুশাসন নিশ্চিত সম্ভব মন্তব্য তিনি বলেন, ম্যানেজমেন্ট ঠিকমত চলছে কিনা সেটা দেখার বদলে যদি পরিচালক পর্ষদ বলে, ‘‘ম্যানেজমেন্টকে যদি নির্দেশ দেয়, এই মিয়া ওই লোন, দাও নাই কেনো। এই, ওরে মাফ করে দাও। ওরে এটা ডিসকাউন্ট দাও। আমার বিল্ডিংটা নিয়ে ব্র্যাঞ্চ করো, ভাড়া দাও, তাহলে এই ব্যাংকের সুশাসন শেষ।’’

সুপারিশের ভিত্তিতে ব্যাংকে চাকুরি দেওয়াও প্রিমিয়ার ব্যাংকে বন্ধ করার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘আমরা এটা বন্ধ করেছি।’’

ব্যাংক ডুবে যাওয়াতে পর্ষদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি এমন পুরনো অভিযোগের বিষয়ে আরিফুর রহমান বলেন, ‘‘আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট একমত। সব ব্যাংকের বারোটা বাজাইছে সব পর্ষদ। একটা ম্যানেজার চুরি করলে দুইদিন পরে ধরা পড়বে।’’

কর্মচারীদের আর্থিক অনিয়ম করা খুবই কঠিন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘‘যারা কর্মচারী তাদের জন্য খুব ডিফিকাল্ট, কারণ রেগুলেটরি সিস্টেমগুলি এত বেশি। গন্ডগোল করে, এই আমার মত লোকেরা যখন ইন্টারফেয়ার করে। আমি যদি চুরি করতে চাই, তখন চুরিটা হয়।’’

খেলাপিদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা জেলে না ভরে তাদের সামাজিক সুবিধা বন্ধ করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘কমফোর্ট জোন মেন্টালি এবং ফিজিক্যালি এই দুটো জিনিস বন্ধ করতে হবে।’’



Source link

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।