
দিনের পর দিন আটকে রাখা হত বাথরুমে। নানা অজুহাতে প্রায়ই দেওয়া হত গরম খুন্তির ছ্যাঁকা। মাথা পর্যন্ত শরীরের অনেক জায়গার চামড়া ঝলসান। নির্যাতনে মাথার অধিকাংশ জায়গায় চুল পর্যন্ত নেই। দিনের পর দিন না খেতে পেয়ে বাচ্চা মেয়েটা অনেকটা কঙ্কালসার হয়ে গিয়েছিল।
দীর্ঘ ১০ মাস ধরে রাজধানীর কলাবাগানে ব্যবসায়ী সাইফুদ্দিন রাসেল ও মোর্শেদা আক্তার দম্পতির বাসায় এভাবেই নানা নির্যাতনের শিকার হয়েছিল ১১ বছর বয়সি গৃহকর্মী শিশুটি।
নির্যাতনের কারণে চেহারা অনেকটেই বিকৃত হয়ে গিয়েছিল মেয়েটির। তবে বর্তমানে চিকিৎসায় তার অবস্থা কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। কিন্তু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তোলা তার ছবিগুলো আঁতকে ওঠার মত।
মাসখানেক চিকিৎসা শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ্ ফারজানা হকের আদালতে গত সোমবার ছোট্ট মেয়েটি নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে। আদালত জবানবন্দি গ্রহণ করে শিশুটিকে তার বাবার জিম্মায় থাকার নির্দেশ দিয়েছে।
জবানবন্দিতে মেয়েটি বলেছে, “গৃহকর্ত্রী মোর্শেদা এবং তার মেয়ে তাকে মারধর করত। আমার শরীরে গরম পানি ঢালছে, খুন্তির ছ্যাঁকা দিছে। ঠিকমত খাবার দিত না। আমাকে বাথরুমে আটকে রাখত। আব্বুর সাথে কথা বলতে দিত না।”
নির্যাতনের শিকার মেয়েটির বাড়ি খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায়, বাবা দিনমজুর। তার বাবা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মেয়েকে ১০ মাস আগে প্রতিবেশীর মাধ্যমে ফেনীতে হাফসান্নেসা রোমেনার বাসায় কাজে পাঠান। তবে রোমেনা তার বোন মোর্শেদা আক্তারের বাসায় ঢাকার কলাবাগানে পাঠিয়ে দেন মেয়েকে। সেখানে আসার পর থেকেই তানিয়ার উপর নির্যাতন চলত। নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ভর্তি করা হয় ফেনী সদর হাসপাতালে। পরে সেখানে গিয়ে ১১ সেপ্টেম্বর মেয়েকে পান তিনি।
হাসপাতালেই মেয়েটি বাবাকে নির্যাতনের কথা জানায়। পরে তিনি কলাবাগান থানায় ১৬ সেপ্টেম্বর মোর্শেদা আক্তার ও তার স্বামী সাইফুদ্দিন রাসেলের নামে মামলা করেন। মামলার পর গ্রেপ্তার করা হয় তাদের। বর্তমানে রাসেল ও মোর্শেদা কারাগারে আছেন। রাসেলের মিরপুরে ল্যাপটপের দোকান রয়েছে এবং তার স্ত্রী একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন।
নির্যাতিত শিশুটির বাবা বলেন, “আমার মেয়েটাকে কাজের জন্য না, তার (মোর্শেদা) দুইটা বাচ্চা আছে তাদের দেখাশোনার জন্য নিয়েছিল। বলেছিল ওকে বাংলা, আরবি পড়াবে। কিন্তু তা না করে অমানবিক নির্যাতন করেছে। খুন্তির ছ্যাঁকা দেয়, শরীরে গরম পানি ঢেলে দিয়েছে। খাবার না দিয়ে বাথরুমে আটকে রাখত।”
কেন নির্যাতন করত প্রশ্নে তিনি দাবি করেন, “একদিন ও দুধ গরম দিচ্ছিল। দুধটা পাতিল থেকে পড়ে যাচ্ছিল। ছোট মানুষ তো, সে সেখানে থেকে একটু দুধ খেয়ে ফেলে। এরপর থেকে নির্যাতন আরও বাড়তে থাকে। আমি তাকে (মোর্শেদাকে) ফোন করে বলি মেয়েটার জন্য মায়া লাগছে। তার ভিডিও করে পাঠাতে। পরে দেখি মেয়েটার মাথায় চুল নাই। কেটে দিয়েছে। আমার মেয়ের মাথার চুল কাটার কারণ জানতে চাইলে বলে, মাথায় গোটা, গোটা কি যেন উঠেছিল।
“আমি বলি চুল না কেটে তো শ্যাম্পু ব্যবহার করলে চলে যেত। এটা নিয়ে তার সাথে মনমালিন্য হয়। এরপর থেকে আমার মেয়েটার উপর নির্যাতন বাড়তে থাকে। মেয়েকে বলে, বাবার মুখ আর দেখতে দেবে না। এরপর থেকে ফোন করে মেয়েকে চাইলে বলত, বাথরুমে গেছে। মেয়েটাকে আর দেখতে দিত না।”
মেয়েকে হাসপাতালে কিভাবে নেওয়া হল প্রশ্নে তিনি বলেন, “রোড অ্যাক্সিডেন্ট করেছে জানিয়ে ঢাকা থেকে ফেনী সদর হাসপাতালে মেয়েটাকে ভর্তি করে। আমাকে ফোন করে বলে, মেয়েটা হাসপাতালে ভর্তি আছে। মামলা যেন না করি এ জন্য হুমকি দেয়। হাসপাতালে গিয়ে মেয়েটাকে পাই। আমাদের সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া (খাগড়াছড়ি) মেয়েটার চিকিৎসার দেখভাল করেন। তার তত্ত্বাবধানে ওকে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়। এতিম, অসহায় দেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মেয়ের চিকিৎসার কোনো টাকা নেয়নি।”
ছোট্ট মেয়েটিকে যারা এমন নির্যাতন করেছে তাদের সর্বোচ্চ সাজা দাবি করেন তিনি।
মেয়েটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তার বাবা বলেন, “এখনও স্বাভাবিক হয়নি। ঘটনার পর কয়েকবার ঢাকা নিয়ে গেছে। ঢাকার কথা শুনলে ভয় পায়। কারো সাথে কথা বলতে গেলে কাঁপাকাঁপি শুরু হয়। সে এখন স্কুলে ভর্তি হয়ে লেখাপাড়া করতে চায়। বড় হয়ে শিক্ষক হতে চায়।”
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কলাবাগান থানার এসআই মজিবুর রহমান তপাদার বলেন, “মামলার তদন্ত চলছে। আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শিশুটিও আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে।”
এদিকে ১১ বছর বয়সি ওই গৃহকর্মীকে নির্যাতনের বিষয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবী সোহরাব হোসেন সোহেল বলেন, “যদি এমন ঘটনা ঘটে, তাহলে তা মর্মান্তিক। তবে আসামিদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। তারা বলেছে, এটা করেনি। মোর্শেদা বলেছে, মেয়েটির বাবাকে অনেকবার ফোন করে তাকে নিয়ে যেতে বলেছে। কিন্তু তার বাবা আসেনি। মেয়েটির বাবা আরেক জায়গায় বিয়ে করেছে। মেয়েটার খোঁজ খবরও নিত না।”
তবে আইনজীবীর এ অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেন শিশুটির বাবা।