
ছোটবেলায় স্কুলের পরীক্ষায় অনেক সময় গরু, সোনালি আঁশ, নৌকাভ্রমণ ইত্যাদি নিয়ে রচনা না লিখে ‘আত্মকথা’ লিখতাম৷ সে ‘আত্মকথা’ মানে নিজের কথা নয়, অন্য কারো কথা৷ হ্যাঁ, অন্যের কথাই লিখতে হতো, কিন্তু এমনভাবে লিখতে হতো যাতে পড়ে মনে হয় প্রশ্নপত্রে উল্লেখিত ব্যক্তি, প্রাণী বা বস্তুর মনের কথাগুলোই লিখেছি৷ “প্রাণী বা বস্তুর মনের কথা…” — এইটুকু পড়েই অনেকে ভাবতে পারেন, “প্রাণীর মনের কথা মানুষ লিখবে কেমন করে? আর বস্তুর আবার মন থাকে নাকি?”
এমন মানুষ তখনও ছিল৷ অনেক ছিল৷ আমার সহপাঠীদের মাঝেও ছিল৷ তারা সবসময় ফাউন্টেন পেনে গরু, পাট, ধান বা অন্য কোনো বিষয়ে রচনা লিখে বেশি নম্বর নিশ্চিত করতে চাইতো৷ হাতে কলম থাকতেও ‘একটি কলমের আত্মকথা’ তারা লিখতে চাইতো না৷ একদিক থেকে সেটাই ছিল ‘বুদ্ধির’ কাজ৷ প্রথমত, ওসব রচনা সবার মোটামুটি মুখস্থই থাকতো৷ ফলে, “গরুর চারটি পা আছে, দুটি চোখ, দুটি কান, একটি লেজ, সেই লেজের অগ্রভাগে একগুচ্ছ চুল আছে…” ইত্যাদি ঝটপট লিখে ফেলা যেতো৷ কিন্তু কলমের আত্মকথা লিখতে হলে তো কলমের গুরুত্ব, আনন্দ, বেদনাও ‘জানা’ থাকতে হবে; না জানলে ভেবে, উপলব্ধি করে লিখতে হবে! তাকে কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে মনে কলম হয়েই লিখতে হবে, ‘একটি কলমের আত্মকথা’৷ সেখানে হয়ত কেউ লিখবে, “জানো, ক্লাস সিক্সের ফার্স্ট বয় যেদিন হাতের লেখার খাতায় ‘সদা সত্য কথা বলিবে’ লিখেছিল, ভারী আনন্দ হয়েছিল আমার৷ মানুষ সবসময় সত্যি কথা বলবে— এটা তো খুব ভালো কথা, ভাবতে খুব ভালো লাগে৷ তাছাড়া ওর লেখা এত সুন্দর হয়েছিল যে, টিচার খুশি হয়ে দশে দশ দিয়েছিল৷ ওর হয়ে আমিই তো লিখেছি, তাই আমার তো আনন্দ হবেই৷ কিন্তু একটু পরে শুনি ছেলেটা দিব্যি মিথ্যে কথা বলছে৷ একটু আগে যে ছেলে ‘সদা সত্য কথা বলিবে’ লিখেছে, একটু পরে সে-ই মিথ্যে বলছে! সকালে ও নিজে বেঞ্চে কত কী লিখলো, কিন্তু টিচার যেই প্রশ্ন করলো, ‘বেঞ্চে এসব কে লিখেছে?’ ক্লাসের ফার্স্ট বয় কিনা সঙ্গে সঙ্গে বলে দিলো, ‘আমি জানি না, স্যার৷’ আমাকে দিয়ে ‘সদা সত্য কথা বলিবে’ লেখানোর পর ওর মুখে এমন মিথ্যে কথা শুনে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম৷” এভাবে একটি কলমের আনন্দ-বেদনার কথা লেখা তো সহজ কথা নয়৷
দ্বিতীয়ত, একটা বিষয় নিয়ে ভেবে, উপলব্ধি করে লিখতে তো সময় বেশি লাগে৷ কলমের আত্মকথায় বাড়তি সময় দিতে গিয়ে যদি অন্য কোনো প্রশ্নোত্তর বাদ পড়ে যায়!
আত্মকথা লিখতে যে সময় বেশি লাগতে পারে, মুখস্থ না লেখায় একটু ভুলচুক যে হতে পারে, তা শিক্ষকরাও জানতেন, বুঝতেন৷ তবু প্রশ্নপত্রে প্রাণী বা বস্তুর আত্মকথার একটা বিকল্প রাখা হতো৷ এখন বুঝি, আসলে সেই বিকল্পে সুপ্ত একটা বার্তা থাকতো৷ কম বয়সেই মানুষকে পরহিতৈষী হতে বলার বার্তা৷ সবসময় নিজের স্বার্থ, ‘নিজেদের’ স্বার্থ দেখতে নেই, অন্যের দিকটাও দেখতে হয়, বুঝতে হয়, সেই ‘অন্য’ শুধু মানুষ নয়, অন্য কোনো প্রাণী, এমনকি বস্তুও হতে পারে—এমন ভাবনা হৃদয়ে নিয়ে জীবনের পথ চলতে উদ্বুদ্ধ করার বার্তা৷
তৌফিক ইমরোজ খালিদী, অর্থাৎ আমাদের তৌফিক ভাইকে নিয়ে লিখতে বসেও ভাবছি তার আত্মকথাই লিখবো৷ জানি, কাজটা খুব কঠিন৷ মানুষ হয়েও পাখি, চেয়ার, টেবিল, নদী, সাগর বা ফুলের আত্মকথা লেখার চেয়েও কঠিন৷
তৌফিক ভাইকে যেমন দেখেছি
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা ২০০৬ সালে৷ আমি তখন স্পোর্টসে কাজ করি৷ মোস্তফা মামুনের নেতৃত্বে আমাদের বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে যোগ দেওয়া মোটামুটি চূড়ান্ত৷ যেদিন সব চূড়ান্ত হবে, তার আগের রাতে মামুন জানালো, আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের যোগদানের বিষয়টি চূড়ান্ত করতে যাওয়ার কথা থাকলেও খুব বড় রকমের ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে ও যেতে পারবে না৷ মামুনের অনুরোধ— আমি যেন তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সঙ্গে কথা বলে পুরো বিষয়টা বুঝি, বুঝে ‘হ্যাঁ’ বলা উচিত মনে হলে বলি, ‘না’ বলা সঙ্গত মনে হলেও যেন সংকোচ না করি৷
সেদিন শুরুতে এমন গুরুদায়িত্ব নিতে মন একেবারেই সায় দেয়নি৷ আমার কথায় তো আরও কিছু প্রিয় মানুষের ভাগ্যও নির্ধারিত হবে— হুট করে সেই গুরুভার কাঁধে নিই কী করে! চেয়েছিলাম একটু কষ্ট হলেও মামুনই যাক৷ কিন্তু ফোনে দীর্ঘক্ষণ কথা বলে বুঝলাম, ওর যেতে না পারার কারণটা অনিবার্য৷ অগত্যা পরের দিন সন্ধ্যায় আমাকেই যেতে হলো ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের বিডিনিউজ কার্যালয়ে৷ রিসিপশন থেকে বার্তা পেয়ে তৌফিক ভাই নিজে এসেই নিয়ে গেলেন ফিচার বিভাগের পেছনের আর অ্যাকাউন্টসের বাঁ পাশের ঘরটায়৷ তৌফিক ভাইয়ের পরনে কী পোশাক ছিল, রিসিপশনের পাশের দরজা খুলে যেতে যেতে আর কারো সঙ্গে দেখা হয়েছিল কিনা, এত বছর পর চেষ্টা করেও মনে করতে পারছি না৷
আমাদের মূল কথা শেষ হয়েছিল চায়ে অন্তিম চুমুকের অনেক আগে৷ ভেবেছিলাম, বেতন-বোনাস, ইনক্রিমেন্ট ইত্যাদি নিয়ে না জানি কত কী বলতে হবে, শুনতে হবে, ফিরে গিয়ে হয়ত অস্বস্তিতে পড়ার কথাও বলতে হবে মামুনকে৷ ভুল ভেঙে গেল তৌফিক ভাইয়ের একটা কথায়৷ ‘মালিকসুলভ’ কোনো ভড়ং না দেখিয়ে তিনি বললেন, “দেখুন, আপনাদের অনেকেই দীর্ঘদিন প্রথম আলোতে কাজ করেছেন৷ বাকি যারা, তারাও অনেক দক্ষ, অভিজ্ঞ৷ আপনাদের নিয়ে আমরা খুব ভালো কিছু করতে চাই৷ কিন্তু নতুন প্রতিষ্ঠান তো, তাই বেশি কিছু দিতে পারবো না, আপনারা এখন যে বেতন পান তার সঙ্গে বেসিকের ফোরটি পার্সেন্ট যোগ করে দিতে পারবো৷”
বিশ্বাস করুন, এমন কথা নিজে তো কখনো শুনিইনি, বাংলাদেশে আর কেউ শুনেছে বলেও শুনিনি৷
বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের অধিকাংশ অর্থলগ্নিকারী এবং সম্পাদকের কাছে সংবাদকর্মী নিয়োগ অনেকটা বাজারে মাছ কেনার মতো৷ মাছের দামের মতো সাংবাদিকের বেতন-বোনাস নিয়েও জোর দর-কষাকষি না করলে যেন তাদের চলেই না৷
তো বিডিনিউজ নতুন প্রতিষ্ঠান হলেও বেতন-বোনাস কম দেবে না জেনে সেদিন আশ্বস্ত হয়েছিলাম৷ তবে মনে বড় একটা সংশয়ও ছিল৷ কী সংশয় তা পরে বলছি৷ তৌফিক ইমরোজ খালিদী সেদিন আর কী বলেছিলেন, তা খুব সংক্ষেপে হলেও একটু বলে রাখা জরুরি৷
সেদিন বিডিনিউজকে নিয়ে তার স্বপ্নের কথা বলেছিলেন তৌফিক ভাই৷ তার সংস্পর্শে যারা গিয়েছেন, বিশেষ করে বিডিনিউজের সূচনালগ্নে বা তার কয়েক বছর পরেও যারা তার সঙ্গে সাংবাদিকতা নিয়ে কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন, তারা সবাই হয়ত বহুবার শুনেছেন কথাগুলো৷ হ্যাঁ, তৌফিক ভাই সেদিনও বলেছিলেন, বিডিনিউজ হবে বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতার পথিকৃৎ৷ খুব আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলেছিলেন, “ধীরে ধীরে দৈনিক পত্রিকার জায়গা নিয়ে নেবে অনলাইন সংবাদমাধ্যম৷”
তো বিডিনিউজের নবযাত্রায় যুক্ত হলাম৷ দৈনিক সংবাদপত্র আর অনলাইন সংবাদমাধ্যমের পার্থক্যটা নগদে টের পেলাম প্রথম সকালেই৷ দৈনিক পত্রিকায় খেলার খবর ছাপা হতো রাতে, পাঠকের হাতে সেই খবর যেতো পরের দিন সকালে৷ অনলাইনে এত দেরির সুযোগ কোথায়! মাঠে খেলা শুরু তো ওয়েবসাইটে আপডেট দেওয়ার লড়াইও শুরু৷ সেই লড়াইয়ে বিডিনিউজের ধারে-কাছে দেশের কেউ ছিল না৷ দেশের ক্রিকেট ম্যাচের লাইভ আপডেটে বিডিনিউজ অদ্বিতীয় ছিল অনেক বছর, দেশের বাইরের ক্রিকেটের বেলায় এগিয়ে থাকতো শুধু ক্রিকইনফো৷
তাই বলে এই ‘এগিয়ে থাকা’ যে ক্রীড়া বিভাগের সবাই খুব চুটিয়ে উপভোগ করতেন, গর্ব করে সবাইকে বলতে পারতেন, তা কিন্তু নয়৷ মাঠ থেকে বা স্টেডিয়াম পাড়া থেকে ফিরে মাঝে মাঝে রিপোর্টাররা দুঃখ করে বলতেন, “বিডিনিউজ কী, অনলাইন সংবাদমাধ্যম কী তা-ই তো সবাই জানে না৷ ইন্টারনেটে দেখা যায়— বললেও অনেকে প্রশ্ন করে: ইন্টারনেট কী?”
একাধিক রিপোর্টারের মুখে এমন কথা আমি নিজে শুনেছি৷ ভুল কিছু কিন্তু বলেননি তারা৷ তখনও মোবাইল ফোন এভাবে সবার হাতে হাতে পৌঁছে যায়নি, অন্তর্জালও সব গ্রাম তো দূরের কথা, সব শহরেও ছড়ায়নি৷ ফলে দেশসেরা ক্রীড়া প্রতিবেদকদের কেউ কেউ যে তখন ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে’ ভুগছিলেন, তাতে দোষের কিছু দেখিনি, এখনও দেখি না৷
‘আত্মপরিচয়ের’ এই সংকট অন্য বিভাগের রিপোর্টারদের মাঝেও দেখেছি৷ এমনকি সেনা সমর্থিত সরকারের আমলে দেশের সবচেয়ে বড় দুটি দলের নেত্রীসহ অনেকে যখন গ্রেপ্তার হলেন, তখনও দেখেছি৷ অথচ তখন মহাব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে বিডিনিউজ৷ যত বড় নেতা গ্রেপ্তার, তত বেশি লাইভ আপডেট দিতে গিয়ে রিপোর্টারদের দিন-রাত, নাওয়া-খাওয়ার ঠিক ছিল না৷ অনেক ক্ষেত্রে লাইভ চলতো শহরের বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে৷ ধানমন্ডি, গুলশান বা রাজধানীর আরও অনেক এলাকার অনেক বাড়ি থেকে শুরু হয়ে সেই আদালত চত্বর পর্যন্ত অনেক মোড়ে থাকতেন বিডিনিউজের রিপোর্টাররা, ফোনে সেখান থেকে তথ্য দিতেন সেন্ট্রাল ডেস্কে, সেই তথ্য ওয়েবসাইটে যেতো, নিউ মিডিয়ার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষের হাতের মোবাইলেও পৌঁছে যেতো কয়েক মুহূর্তে৷ বিডিনিউজের সবাই সংবাদ এত দ্রুত ঘরে ঘরে, হাতে হাতে পৌঁছে দেওয়া খুব উপভোগ করেছেন৷ তবে ‘মূলধারার’ সাংবাদিকতার বাইরে থাকার আক্ষেপ তখনও শুনেছি৷ তখনও মূলধারার সাংবাদিকতা বলতে মূলত প্রিন্ট মিডিয়া আর কয়েকটা বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকেই বোঝাতো৷
২০০৭ বা ২০০৮ সালের একটা ঘটনা বলতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম সেই ঘটনার প্রত্যক্ষ প্রমাণ বিডিনিউজে এখন আর নেই৷ তখন ‘আর্টস’ পাতার সম্পাদক ছিলেন ব্রাত্য রাইসু৷ আমি যে সংগীত যাপনের চেষ্টা করি, তা তিনি জানতেন৷ প্রায়ই বলতেন আমি যেন আর্টসে লিখি৷ একসময় তার অনুরোধে ঠিকই ঢেঁকি গিলতে শুরু করেছিলাম৷ উপমহাদেশের বড় বড় সংগীত শিল্পীদের নিয়ে সুদীর্ঘ কিছু লেখা লিখেছিলাম সেখানে৷ শুরুটা ছিল শচীন দেব বর্মনকে দিয়ে৷ লেখার শিরোনাম দিয়েছিলাম, গানের ‘কত্তা’ শচীন দেব বর্মন৷
তো রাত জেগে লেখা “গানের ‘কত্তা’ শচীন দেব বর্মন” রাইসু রাতেই প্রকাশ করেছিলেন৷ সেই রাতে আমি জানতে পারিনি৷ পরের দিন অফিসে গিয়ে শুনি, লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে এবং সেই লেখা পড়ে তৌফিক ভাই আমাকে বিশাল এক মেইল করেছেন অফিসের অনেককে কপিতে রেখে৷
ইংরেজিতে লেখা মেইলজুড়ে ছিল লেখাটার প্রশংসা আর শেষে ছিল অফিসের সবার প্রতি সুযোগ এবং ইচ্ছা থাকলে প্রতিদিনের ‘গতানুগতিক’ কাজের বাইরে গিয়ে এমন কাজ করার আহ্বান৷
এই ছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী৷ ‘ছিলেন’ বলছি, কারণ, ২০১০ সাল থেকে আমি আর বিডিনিউজে নেই৷ তাছাড়া বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমকে ‘ব্যবসা-সফল’ করতে গেলে যা যা করতে হয়, তার অনেক কিছুই তৌফিক ভাই করতে চাননি, করেননি৷ বিডিনিউজকে তথাকথিত ‘সার্বিক অর্থে সফল’ করতে সব সোজা এবং বাঁকা পথ না মাড়ানোর জন্যও আমি তাকে শ্রদ্ধা করি৷ কিন্তু প্রতিষ্ঠানের আয় পর্যাপ্ত না হলে তার কুপ্রভাব অনেক দিকেই পড়ে৷
তাই যেই তৌফিক ভাইকে শুরুর দিকে প্রায়ই দেখতাম অফিসে, একসময় লক্ষ্য করলাম মাসের প্রথম দিকে তিনি আসছেন না৷ দু-তিন মাসের মধ্যে এর কারণটাও অনুমান করা গেল৷ বোঝা গেল, সবার বেতন না হওয়া পর্যন্ত ইচ্ছে করেই নিজেকে দূরে রাখছেন তৌফিক ভাই৷
কিন্তু দেশের সংবাদমাধ্যমের বাস্তবতা একটা সময় তৌফিক ভাইকেও কিছুটা মেনে নিতে হয়েছে৷ তাই বেতন দেরিতে হওয়া বা অনিয়মিত হওয়ার কারণে অফিসে না আসার ব্যাপারটা একসময় আর ছিল না৷ তবে বেতন দেরিতে হওয়া সত্ত্বেও অফিসে আসতে যে তার খারাপ লাগছে, তা বুঝতে পেরেছিলাম একদিনের একটা কথায়৷ পুরো বিষয়টি নিয়ে মনে হয় এক ধরনের দ্বান্দ্বিক অবস্থায় ছিলেন তৌফিক ভাই৷ তাই নিউ মিডিয়ার এক মিটিংয়ের শুরুতেই সেদিন কাচুমাচু করে বলেছিলেন, “এ মাসে আপনাদের তো এখনো বেতন হয়নি৷ বুঝতে পারছি, সমস্যা হচ্ছে আপনাদের৷ আমরা চেষ্টা করছি…৷ কিন্তু মিডিয়ার কী অবস্থা তা তো জানেন৷ … পত্রিকার সম্পাদক … চৌধুরী ভাই তো তার অফিসে বলে দিয়েছেন, আগামী মাস থেকে সবাইকে পুরো বেতন দিতে পারবেন না, অনেককে নাকি অর্ধেক বেতন দেবেন৷ বলে দিয়েছেন— কারো এই বেতনে কাজ করা সম্ভব না হলে চাকরি খুঁজতে পারেন৷ কষ্ট হলেও আমরা পুরো বেতনই দেবো৷ একটু দেরি হচ্ছে… এই আরকি!”
আমি মনে করি, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের ‘বাড়ুজ্জে’, ‘মুখুজ্জে’, ‘সৈয়দ’, ‘চৌধুরী’রা আদর্শ পরিবেশ সৃষ্টি এবং বজায় রাখার দায়িত্ব ‘সৎভাবে’, সাহস নিয়ে পালন করলে বিডিনিউজের এগিয়ে চলা অনেক বাধাহীন এবং মসৃণ হতো৷
কারো কাজে পারতপক্ষে নাক গলাতেন না তৌফিক ভাই৷ এর প্রধান কারণ অবশ্যই সহকর্মীদের প্রতি আস্থা৷ বেশিরভাগ সময় নিউজরুমে এসে টুকটাক কথা বলে চলে যেতেন৷ তবে চোখ-কান মনে হয় খোলা রাখতেন৷
আরেকদিনের একটা ঘটনা খুব স্মরণীয়৷ তখনও আমি স্পোর্টসে৷ এক সন্ধ্যায় ফোনে কথা বলছি৷ হঠাৎ দেখি তিনি পাশে দাঁড়িয়ে৷ জরুরি কিছু বলবেন ভেবে সংক্ষেপে কথা শেষ করলাম৷ বললেন, “আমার রুমে একটু আসবেন?” গেলাম তার সঙ্গে৷ কাজ ফেলে এসেছি বলে ফেরার তাড়া ছিল৷ কিন্তু তৌফিক ভাই তখন খোশ মেজাজে৷
এ কথা-ও কথার পর জানতে চাইলেন, “আপনি কি কবিতা লেখেন?” “না তো!” “শুনেছি গান গাইতেন?” “হ্যাঁ৷” “আর কী করতেন?” “এক সময় ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিস, এমনকি ভলিবলও খেলতাম৷ মফস্বলে সীমিত পরিসরে যতটুকু খেলা যায় আরকি৷ তখন টুর্নামেন্ট আয়োজন, ধারাভাষ্য, আবৃত্তি, নাটক মঞ্চায়ন, অভিনয়, বিতর্কও করেছি৷ কেন বলুন তো?” “আপনি নিউ মিডিয়ার দায়িত্ব নিন, প্লিজ!”
কোন কথা থেকে হঠাৎ কোন কথায় চলে এলেন!
“হঠাৎ এই কথা কেন? আমি তো কখনো নিউ মিডিয়ায় কাজ করিনি৷ খবর পড়িনি৷”
আমার কথা পাত্তাই পেলো না৷ স্পোর্টসের পাশাপাশি নিউ মিডিয়া সামলাতে বলার কিছু যুক্তি এবং এ কাজে অনভিজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও আমার ওপর আস্থা রাখার কারণ জানিয়ে শুধু বললেন, “আপনি দায়িত্ব নিলে আমি নিশ্চিন্ত হবো৷ প্লিজ, কাল থেকেই নিউ মিডিয়ার দায়িত্বটা নিন৷”
নিয়েছিলাম সেই দায়িত্ব৷ এবং সেখানে এমন চমৎকার সব সহকর্মীকে পেয়েছিলাম, যাদের আন্তরিক শ্রম এবং সহযোগিতায় কাজটাকে কখনো খুব বেশি কঠিন ভাবার সুযোগই পাইনি৷
তাতে একটা সমস্যাও হয়েছিল৷ এত বছর পরে অবশ্য সেটাকে ‘মধুর সমস্যা’ বলাই যুক্তিসজ্ঞত মনে হচ্ছে৷
স্পোর্টসের পাশাপাশি নিউ মিডিয়াও সামলাতে পারছি দেখে একসময় তৌফিক ভাইয়ের মনে হলো জরুরি মুহূর্তে সেন্ট্রাল ডেস্ক বা ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কও একটু সামাল দিতে পারবো৷ সশরীরে হাজির হয়ে বা টেলিফোনে নাছোড়বান্দার ভঙ্গিতে তার “প্লিজ, একটু দেখুন…” অনুরোধ একবারও ফেলতে পারিনি৷ এমনও হয়েছে, দিনের শিফট শেষ হবে, একটু পরে বাসায় ফিরবো, ঠিক তখন এসে বলেছেন, “পার্থ প্রতিম মজুমদার এখন ঢাকায়, জানেন নাকি?” “না তো!” “এলিফ্যান্ট রোডে একটু যাবেন নাকি? ভালো একটা সাক্ষাৎকার হবে৷ ফিচারে সেরকম কেউ নেই এখন৷”
হঠাৎ এ কী আব্দার! বোঝানোর চেষ্টা করি, “অমুক গেলে ভালো হবে৷ তার জন্য সহজও হবে…”
সরল মানুষ৷ সবাইকে নিজের মতো সময়নিষ্ঠ ভেবে তৌফিক ভাই বললেন, “আরে উনি আপনার জন্য অপেক্ষা করবেন৷ গিয়ে আধঘণ্টা কথা বলেই চলে আসতে পারবেন৷ ছোট হলেও শচীন দেব বর্মনের ওই লেখাটার মতো একটা লেখা দরকার৷ একটু যান, প্লিজ!”
গিয়েছিলাম বাংলাদেশের এক ‘স্বাধীন’ চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রশিল্পী এবং লেখকের খালি বাসায়৷ কিন্তু এক টেলিভিশন চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিয়ে বরেণ্য মুকাভিনেতার সেখানে ফিরতে সেদিন প্রায় দুই ঘণ্টা দেরি হয়েছিল৷
এমন একজন মানুষ এবং সহকর্মী হিসেবেই পেয়েছি তৌফিক ভাইকে৷ প্রথম সাক্ষাৎ থেকে সাত বছর আগের শেষ দেখা পর্যন্ত দেশে, জার্মানিতে কত স্মৃতি তার সঙ্গে! সহকর্মী থাকতে অভ্যন্তরীণ কিছু বিষয়ে আমার ভিন্নমত ছিল৷ যখন সুযোগ পেয়েছি, অনেক দেরিতে হলেও কিছু কথা নিঃসঙ্কোচে বলতে পেরেছি তাকে৷
এই লেখার শুরুতে কথা দিয়েছিলাম বিডিনিউজে যোগ দেওয়ার সময় তৌফিক ভাই আমাদের বেতন এবং আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো নিয়ে দর-কষাকষি না করায় আশ্বস্ত হলেও মনে বড় একটা সংশয় কেন ছিল, বলবো৷ আসলে বিডিনিউজে যোগ দেওয়ার আগে যেখানে কাজ করেছি, সেখানেও প্রথিতযশা সম্পাদকের মুখে অনেক বড় লক্ষ্যের কথা শুনেছিলাম৷ কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি কথা হলো, সেই সংবাদপত্র সেই লক্ষ্য নিয়ে তিনি খুব অল্প সময়ই চালাতে পেরেছিলেন৷ শ্রদ্ধেয় সেই সম্পাদকের কথা শুনে মনে হতো, তার পত্রিকা একদিন বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের ‘ডাইনোসর’ হবে৷ সেরকম সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অজানা কারণে সংবাদপত্রটিকে তিনি সেই গতিতে এগোতে দেননি৷ তার স্বপ্নের সেই ‘ডাইনোসর’ অবশ্য এখনো টিকে আছে, তবে টিকে আছে প্রায় ‘টিকটিকি’ হয়ে৷
প্রথম সাক্ষাতে তৌফিক ভাইয়ের মুখে অনলাইন সাংবাদিকতায় বড় কিছু করে দেখানোর স্বপ্নের কথা শুনেও তাই ঘর পোড়া গরুর সিঁদুরে মেঘ দেখার প্রাক-অনুভূতি হয়েছিল৷
কিন্তু তৌফিক ভাই লড়ে গেছেন আমরণ৷ তার জীবনান্তেও বিডিনিউজ সেই লড়াই জারি রাখবে— এ কামনাই করি৷
তার স্বগতোক্তি, কিংবা আত্মকথা
ভেবেছিলাম আজ তৌফিক ভাইয়ের আত্মকথা লিখবো৷ কিন্তু পূর্ণাঙ্গ আত্মকথন লেখা আসলে সম্ভব নয়৷ একসঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করলেই তো কারো সম্পর্কে সবকিছু জানা সম্ভব হয় না৷ সব না জেনে লিখি কী করে? লিখলে তো তৌফিক ভাইয়ের প্রতি অবিচার করা হবে৷ তাই সাংবাদিক এবং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর কল্পিত স্বগতোক্তি দিয়ে শেষ করি৷
ধরা যাক, কতিপয় সমালোচকের কিছু বক্তব্য উল্লেখ করে তৌফিক ভাইয়ের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলো৷
তৌফিক ভাই নিশ্চয়ই বলতেন,
“বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের যাত্রা শুরু ২০ বছর আগে৷ ২০ বছরে সব লক্ষ্য পূরণ হয়েছে, তা নিশ্চয়ই বলবো না৷ তবে বিডিনিউজ তখন অনলাইন সাংবাদিকতায় সেরা ছিল, সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ছিল, এখনো আছে৷ শুনছি নতুন কিছু মানুষও আমার সমালোচনা করছেন৷ আমার নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন৷ আমি নিজেকে বা বিডিনিউজকে কখনো নিরপেক্ষ বলিনি৷ বলেছি, আমরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে৷”
“কিন্তু সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেওয়া দল ক্ষমতায় থাকতে তাদের লোকজন আমার বিপক্ষে বলেছে৷ আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে৷ হয়রানির শিকার হয়েছি৷ সব মোকাবিলা করেছি, আপস করিনি৷”
“সমালোচনা এখনো হচ্ছে৷ এমন লোকজনও সমালোচনা করছেন, যারা সাংবাদিক হয়েও সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছেন৷ সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলে তো তিনি সরকারের প্রতিনিধি বা মুখপাত্র৷ তিনি নিজেই তো আর নিরপেক্ষ থাকেন না৷ সেই দায়িত্ব ছাড়লেও অতীতের কিছু ধারাবাহিকতা অন্তরে, বাহিরে থাকে৷”
“আগামীতে হয়তো সরকারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত বা বিশেষভাবে সুবিধাভোগী কোনো ‘সাবেক সাংবাদিকও’ আমার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন৷ তা তারা তুলতেই পারেন৷ কিন্তু তাদের নিজেরই কি সেই নৈতিক অবস্থান আছে?”
“নতুন একটা ধারাও দৃশ্যমান৷ কোনো কোনো সাংবাদিক নিজে সরকার বা কোনো ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে না জড়ালেও তার স্ত্রী বা স্বামী কিছু ক্ষেত্রে দৃশ্যত সেই সাংবাদিকের পরিচয়েই খুব গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবি পাচ্ছেন৷ তাতেও কিন্তু এক ধরনের ‘স্বার্থের সংঘাত’ তৈরি হয়৷ তারাও কি সত্যিকার অর্থে আমার বা বিডিনিউজের সমালোচনা করার নৈতিক অবস্থান রাখেন? বরং অন্যের সমালোচনা করার আগে তাদের তো নিজের এবং নিজের প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতার বিষয়েই খুব সজাগ এবং সতর্ক থাকা উচিত৷”
স্যালুট, তৌফিক ভাই! ওপারে ভালো থাকবেন!
আশীষ চক্রবর্ত্তী: সাংবাদিক, ডয়চে ভেলে, জার্মানি।