• রবি. অক্টো. 11th, 2026

তৌফিক ইমরোজ খালিদী ও মুক্ত সংবাদমাধ্যমের অসমাপ্ত লড়াই

Bytrendnews

অক্টো. 11, 2026


“সংবাদপত্রহীন সরকার আর সরকারহীন সংবাদপত্রের মধ্যে একটি বেছে নিতে হলে আমি এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে দ্বিতীয়টিই বেছে নিতাম।” — টমাস জেফারসন, ১৭৮৭

“অনেক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা গেছি। শেষ পর্যন্ত মাথা নত করিনি।” — তৌফিক ইমরোজ খালিদী, ২০২৪

গত ২ অক্টোবর লন্ডনে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যুর পর অনেক শোকবার্তায় তাকে দেশের অনলাইন সাংবাদিকতার পথিকৃৎ বলে স্মরণ করা হয়েছে। পরিচয়টি সত্য, তবে অসম্পূর্ণ। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক হিসেবে তিনি বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের একটি নতুন ধারা (genre) গড়েছিলেন, এবং সে কাজ করতে হয়েছিল এমন এক দেশে, যেখানে সংবাদমাধ্যম কখনোই পূর্ণ স্বাধীনতা পায়নি। তার মূল্যায়ন করতে হলে তাই আগে বুঝতে হবে সেই পরিবেশকে, যার ভেতরে থেকে তাকে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

ডেইলি স্টার, ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ও বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে প্রায় দেড় দশক কাজ করার পর ২০০৬ সালে খালিদী বিডিনিউজের হাল ধরেন। সে বছরের ২৩ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটি নতুন রূপে যাত্রা শুরু করে: দেশের প্রথম ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদপত্র, চব্বিশ ঘণ্টা সচল প্রথম বার্তাকক্ষ। খালিদীর ভাষায়, শুরুর দিনগুলোতে দেশে একমাত্র তাদের বার্তাকক্ষই কখনো ঘুমাত না। মুঠোফোনে তাৎক্ষণিক খবর পাঠানো কিংবা শিশুদের জন্য বাংলা ওয়েবসাইটের মতো আরও কিছু উদ্যোগেও প্রতিষ্ঠানটি ছিল প্রথম। প্রতিষ্ঠানের ঘোষিত মন্ত্র ছিল ‘সবার আগে নির্ভুল খবর’। তবে খালিদীর অবদানকে শুধু প্রযুক্তির মাপে দেখলে ভুল হবে। ছাপাখানা ছাড়া খবর পরিবেশনের পথ পরে অন্যরাও ধরেছে। তার নিজস্ব অবদান পেশাগত রীতিতে। সূত্রের নাম উল্লেখ না করে সংবাদ লেখা চলবে না— এ নিয়ম তিনি বার্তাকক্ষে কঠোরভাবে চালু করেছিলেন। গুজব আর অনুমানের ওপর ভর করে প্রতিবেদন লেখার যে চল দেশের সাংবাদিকতায় ছিল, এ নিয়ম তার বিপরীতে একটি মানদণ্ড দাঁড় করায়। তাকে যারা কাছ থেকে দেখেছেন, তাদের ভাষ্যে, খবর কিছুটা দেরিতে গেলেও যাচাই ছাড়া যেত না। নতুন মাধ্যম, দ্রুত গতি আর কঠোর যাচাই— এই তিনের সমন্বয়কেই একটি স্বতন্ত্র ধারা বলা যায়।

এ ধারা কেন জরুরি, তার একটি উত্তর অমর্ত্য সেনের কাছে পাওয়া যায়। ‘ডেভেলপমেন্ট অ্যাজ ফ্রিডম’ (১৯৯৯) গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন, কার্যকর গণতন্ত্র ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যম আছে এমন কোনো দেশে বড় দুর্ভিক্ষ ঘটেনি। তার দৃষ্টান্তগুলোর একটি তেতাল্লিশের মন্বন্তর, যা ঘটেছিল ঔপনিবেশিক শাসনে, যখন শাসককে জনগণের কাছে জবাব দিতে হতো না। খবর চাপা না পড়লে শাসকের ওপর জবাবদিহির চাপ তৈরি হয়, বিপদের সংকেতও আগে পৌঁছায়। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে তাই সাংবাদিকদের পেশাগত সুবিধা ভাবলে চলে না; তা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার শর্ত। খবর যাচাইয়ের রীতি এ কারণেই জরুরি: ভুল খবর ছড়ালে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমও সে সুরক্ষা দিতে পারে না।

পাকিস্তান আমলে বাঙালির ক্ষোভের একটি বড় উৎস ছিল মতপ্রকাশের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ। ষাটের দশকের গোড়ায় আইয়ুব খানের প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অধ্যাদেশ সংবাদপত্রকে সরকারের মুঠোয় নিয়ে আসে। ছয় দফার পক্ষে দাঁড়ানোয় ১৯৬৬ সালের ১৬ জুন ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া গ্রেপ্তার হন; পরদিন তার ছাপাখানা বাজেয়াপ্ত হয়, পত্রিকার প্রকাশনাও বন্ধ হয়ে যায়। হাইকোর্ট সে নিষেধাজ্ঞাকে অবৈধ বললে সরকার আইন সংশোধন করে ছাপাখানাটি আবার দখলে নেয়। ইত্তেফাক ফেরে ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে, গণ-অভ্যুত্থানের মুখে। একাত্তরের মার্চে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে সংবাদপত্র কার্যালয়ও ছিল; এক সপ্তাহের মধ্যে দ্য পিপল, ইত্তেফাক ও সংবাদের কার্যালয় পুড়িয়ে দেওয়া হয়। স্বাধীনতার সংগ্রাম তাই লিবারেল, গণতান্ত্রিক ও সেকুলার রাষ্ট্রের পাশাপাশি মুক্ত সংবাদমাধ্যমের প্রতিশ্রুতিও বহন করেছিল।

সে প্রতিশ্রুতি রক্ষিত হয়নি। মানিক মিয়ার গ্রেপ্তারের ঠিক ৯ বছর পর, ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন, স্বাধীন দেশের সরকারই চারটি রেখে বাকি সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়। সাংবাদিক সমাজ আজও দিনটিকে কালো দিবস হিসেবে পালন করে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে আস্থা রাখলে ঘটনাটি এড়িয়ে যাওয়া চলে না; ওই আদর্শের মানদণ্ডেই তার বিচার করতে হয়। এরপর দেড় দশক কেটেছে সামরিক ও আধা-সামরিক শাসনে। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর নির্বাচিত সরকার এসেছে, সংবাদপত্র ও সম্প্রচারমাধ্যমের সংখ্যাও বেড়েছে, কিন্তু সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস রাষ্ট্র ছাড়েনি। সময়ের সঙ্গে বদলেছে কেবল কৌশল।

শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনে এ কৌশল সবচেয়ে পরিণত রূপ পায়। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের (আরএসএফ) বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে ২০০৯ সালে বাংলাদেশ ছিল ১২১তম; ২০২৪ সালে নেমে যায় ১৮০ দেশের মধ্যে ১৬৫তম স্থানে। অথচ ওই সময়ে পত্রিকা, টেলিভিশন ও অনলাইন পোর্টালের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টিভেন লেভিটস্কি ও লুকান ওয়ে ‘কম্পিটিটিভ অথরিটারিয়ানিজম: হাইব্রিড রেজিমস আফটার দ্য কোল্ড ওয়ার’ (২০১০) গ্রন্থে এ ধাঁধার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাদের বিশ্লেষণে, এ ধরনের শাসন সংবাদমাধ্যমকে সরাসরি নিষিদ্ধ করে না; মামলা, কর, লাইসেন্স ও বিজ্ঞাপনের নিয়ন্ত্রণ দিয়ে তাকে বশে রাখে। সমালোচনার সুযোগ কাগজে-কলমে থাকে, তবে তার মূল্য এত চড়া হয় যে অনেকে নিজে থেকেই চুপ করে যান। সংবাদমাধ্যম তখন সংখ্যায় বাড়ে, স্বাধীনতায় কমে। বাংলাদেশে এ তালিকায় যুক্ত হয়েছিল তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো হাতিয়ার, যেগুলোর ফলে একটি প্রতিবেদন বা মন্তব্যের জন্যও সাংবাদিককে কারাগারে যেতে হয়েছে।

মালিকানার কাঠামো এ নিয়ন্ত্রণকে সহজ করেছে। আলী রীয়াজ ও মোহাম্মদ সাজ্জাদুর রহমানের গবেষণা ‘হু ওনস দ্য মিডিয়া ইন বাংলাদেশ?’ (সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ, ২০২১) ৩২টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন নির্বাচিত ৪৮টি সংবাদমাধ্যম পর্যালোচনা করেছে। তাতে দেখা যায়, প্রায় সব সংবাদমাধ্যমের মালিক বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, যাদের স্বার্থ ব্যাংক, বিমা, জ্বালানি ও আবাসন খাতে ছড়ানো; অধিকাংশ মালিক আবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত। ড্যানিয়েল হ্যালিন ও পাওলো মানচিনি ‘কম্পেয়ারিং মিডিয়া সিস্টেমস: থ্রি মডেলস অব মিডিয়া অ্যান্ড পলিটিকস’ (২০০৪) গ্রন্থে এ ধরনের অবস্থাকে বলেছেন ‘পলিটিক্যাল প্যারালেলিজম’, অর্থাৎ সংবাদমাধ্যমের বিভাজন যখন দলীয় বিভাজনের ছায়া হয়ে ওঠে। এমন পরিবেশে খালিদীর ঘোষিত নীতি ছিল ‘শুধুই সাংবাদিকতা’।

তার সে দাবি প্রশ্নাতীত ছিল না। নেত্র নিউজের ২০২০ সালের এক বিশ্লেষণে ডেভিড বার্গম্যান লিখেছিলেন, বিডিনিউজ কখনো প্রকাশ্যে দলীয় ছিল না এবং নির্ভরযোগ্য সংবাদ-উৎসই থেকেছে; তবু ২০০৯ সালের পর থেকে অনেকে একে আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থক হিসেবে দেখতে শুরু করেন। লেখক নিজেই যোগ করেছিলেন, খালিদী এ ধারণা মানতেন না। বার্গম্যানের বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৯ সালের অক্টোবরে বিডিনিউজ সরকার-ঘনিষ্ঠ এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠান নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

শেষ প্রতিবেদনের সপ্তাহখানেকের মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন খালিদীকে চিঠি পাঠায়, যদিও ওই ব্যবসায়ী এতে নিজের ভূমিকা অস্বীকার করেছিলেন। চিঠির পর অনুসন্ধান, তারপর মামলা; সব মিলিয়ে বিষয়টি প্রায় পাঁচ বছর গড়ায়, আর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দুদক মামলাটি প্রত্যাহার করে নেয়। ওয়েবসাইটটিও নির্বিঘ্ন থাকেনি: ২০১৮ সালে বিটিআরসির নির্দেশে কয়েক ঘণ্টা বন্ধ থাকে, আর ২০২৩ সালে অচল হয়ে পড়ে পাঁচ সপ্তাহের জন্য। ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানের অষ্টাদশ বার্ষিকীতে খালিদী নিজেই বলেছিলেন, দুর্বৃত্ত ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা ও ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী তাদের পেছনে লেগেছিল; আর্থিক চাপ ও হুমকি দুই-ই এসেছিল। খালিদীকে যে মূল্য দিতে হয়েছে, বার্গম্যানের বর্ণিত ধারণার একটি জোরালো জবাব সেটিই। লেভিটস্কি ও ওয়ে যাকে প্রতিযোগিতামূলক কর্তৃত্ববাদ বলেছেন, তেমন ব্যবস্থায় সুরক্ষা মেলে কেবল নীরবতায়; খালিদী নীরব থাকেননি।

খালিদী সেকুলার মূল্যবোধ ধারণ করতেন, আর মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে তার প্রতিষ্ঠানের অবস্থান ছিল স্পষ্ট। তার সাবেক সহকর্মী কাজী সাজিদুল হক লিখেছেন, খালিদী প্রকাশ্যেই বলতেন, তারা নিরপেক্ষ নন; একাত্তর ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাদের পক্ষপাত আছে। অথচ অন্য সহকর্মীদের স্মৃতিচারণে এসেছে, সংবাদে বস্তুনিষ্ঠতার ওপর তিনি বরাবর জোর দিতেন। প্রশ্ন উঠতে পারে, পক্ষ নেওয়া মাধ্যম বস্তুনিষ্ঠ থাকে কীভাবে।

ড্যানিয়েল হ্যালিন তার আরেক গ্রন্থ ‘দ্য আনসেন্সর্ড ওয়ার: দ্য মিডিয়া অ্যান্ড ভিয়েতনাম’ (১৯৮৬)-এ এর একটি উত্তর দিয়েছেন। তার মতে, প্রতিটি সমাজে একটি ‘ঐকমত্যের পরিসর’ থাকে, যার ভিত্তিমূল্য নিয়ে সাংবাদিক নিরপেক্ষতার ভান করেন না। পাশাপাশি থাকে ‘বৈধ বিতর্কের পরিসর’, যেখানে সব পক্ষকে সমান সুযোগ দেওয়াই পেশার দাবি। এ দুইয়ের বাইরে থাকে তৃতীয় একটি পরিসর, যার মতামতকে মূলধারার সাংবাদিকতা গ্রহণযোগ্য বিতর্কের অংশ বলে গণ্য করে না। গণহত্যা ও স্বাধীনতার প্রশ্ন প্রথম পরিসরের, দলীয় রাজনীতি দ্বিতীয়টির। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকা আর কোনো দলের পক্ষে থাকা তাই এক কথা নয়। পরিসরগুলোর সীমানা অবশ্য স্থির থাকে না, রাজনীতির টানে সরে যায়। খালিদীর সাংবাদিকতা এই ভেদরেখা মেনে চলার চেষ্টা করেছে; সব সময় সফল হয়েছে কি না, সে বিচার পাঠকের।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর সংবাদমাধ্যমের মুক্তির যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ হয়নি। আরএসএফ সূচকে বাংলাদেশ ২০২৫ সালে ১৪৯তম স্থানে উঠে এলেও ২০২৬ সালে আবার পিছিয়ে ১৫২তম হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ২০২৫ সালের অগাস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভ্যুত্থান-পরবর্তী এক বছরে ৪৯৬ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হন; তাদের ২৬৬ জনকে হত্যা মামলার আসামি করা হয়, আর ১৬৭ জনের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল হয়। ওই বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে আগুন দেওয়া হয়। দুটি পত্রিকাকেই ছাপা সংস্করণ স্থগিত রাখতে হয়; ডেইলি স্টারের ৩৫ বছরের ইতিহাসে এমন ঘটনা সেটিই প্রথম। টিআইবি এর কয়েক মাস আগেই সতর্ক করেছিল, বার্তাকক্ষে ভয় ছড়াতে সংগঠিত জনতাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। আগে চাপ আসত প্রধানত রাষ্ট্রের দিক থেকে; এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সংগঠিত জনতার ভয়। যে সাংবাদিকের মত অপছন্দ, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত হলো কি না, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার আসল পরীক্ষা সেখানেই।

এই দীর্ঘ প্রতিকূলতার ভেতরেই খালিদীকে কাজ করতে হয়েছে। যিনি কাজ করেন, তাকে নিয়ে বিতর্ক থাকবেই; বিতর্কহীন থাকেন কেবল তিনি, যিনি কোনো ঝুঁকি নেন না। বিচার্য হলো, তার কাজ শেষ পর্যন্ত কার পক্ষে গেছে। খালিদী নিজে মনে করতেন, চূড়ান্ত হিসাবে জয় তাদেরই হয়েছে। সে দাবির পক্ষে সাক্ষ্য আছে। মামলা, ওয়েবসাইট বন্ধ আর আর্থিক চাপের পরও প্রতিষ্ঠানটি টিকে আছে। গবেষক-সাংবাদিক আফসান চৌধুরীর মতো সাবেক সহকর্মীরা বলছেন, রাজনৈতিক পালাবদলে অনেকে বদলে গেলেও বিডিনিউজের সংবাদ নৈর্ব্যক্তিকতা হারায়নি। একাত্তরের প্রশ্নে অবস্থানও বদলায়নি। শেষ বিচারে খালিদী মুক্ত সংবাদমাধ্যম, মুক্তিযুদ্ধ ও লিবারেল গণতন্ত্রের পক্ষেই ছিলেন; ছিলেন গণমানুষের জানার অধিকারের পক্ষে। তার সার্থকতা এখানেই, আর এ কারণেই তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

তবে উত্তরাধিকারের পরীক্ষা এখনো বাকি। ২০২৪ সালের সেই বার্ষিকীতেই খালিদী তরুণদের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়ার ইচ্ছা জানিয়েছিলেন; সঙ্গে স্বীকার করেছিলেন, সে পরিবেশ তিনি তৈরি করতে পারেননি। একজন মানুষের দৃঢ়তায় যে ধারা দাঁড়িয়েছে, প্রতিষ্ঠানের নিয়মে তা টিকবে কি না, তার উত্তর দেবেন তার সহকর্মীরা। উত্তর দিতে হবে দেশের গোটা সংবাদমাধ্যমকেও, কারণ সূত্র যাচাইয়ের রীতি বা ক্ষমতার সামনে মাথা না নোয়ানোর জেদ কোনো প্রতিষ্ঠানের একক সম্পত্তি হতে পারে না।

জেফারসন সরকারের চেয়ে সংবাদপত্রকে বেছে নিতে চেয়েছিলেন; জবাবদিহিহীন ক্ষমতার বিপদ তিনি জানতেন। বাংলাদেশে সে বিপদ কাটেনি; শাসক বদলেছে, সূচকের অবস্থান ওঠানামা করেছে, কিন্তু সাংবাদিকের ভয় রয়ে গেছে। খালিদীর প্রতি শ্রদ্ধা তাই শোকবার্তায় ফুরিয়ে যায় না; যে লড়াই তিনি অসমাপ্ত রেখে গেছেন, তা এগিয়ে নেওয়াই সে শ্রদ্ধার যথার্থ প্রকাশ।

সাইদ ইফতেখার আহমেদ: শিক্ষক, স্কুল অব সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্লোবাল স্টাডিজ, আমেরিকান পাবলিক ইউনিভার্সিটি সিস্টেম। ই-মেইল: sia112002@yahoo.com



Source link

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।