• শুক্র. অক্টো. 9th, 2026

রবীন্দ্রনাথ ও যুক্তরাষ্ট্র | প্রথম আলো

Bytrendnews

অক্টো. 9, 2026


এ কথা ১৯৩৫ সালের। তারপর প্রায় এক শতক কেটে গেলেও অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। পশ্চিমের চোখে রবিঠাকুর এখনো প্রাচ্যদেশীয় এক চকমকি ছাড়া আর কিছু নন। তবে এ কথা মানতেই হবে, আটলান্টিকের দুই পারে একাধিক যোগ্য ও দায়িত্বশীল অনুবাদকের অধ্যবসায়ের ফলে রবিঠাকুরের কবিতার পুনর্মূল্যায়নের একটি সচেতন প্রয়াস গড়ে উঠেছে। তাঁদের মধ্যে উইলিয়াম রাদিচে, অ্যান্ড্রু রবিনসন ও কেতকী কুশারী ডাইসন উল্লেখযোগ্য।

যুক্তরাষ্ট্রে বাঙালিরাও এই কাজে হাত লাগিয়েছেন। মার্কিন রবীন্দ্র–ভক্তদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাঁরা টেগোর সোসাইটি গড়ে তুলেছেন। তাঁদের উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবাহী ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি হয়েছে। রবীন্দ্রজয়ন্তী ও নাট্যোৎসব তো রয়েছেই। রক্তকরবী রচনার শতবর্ষ উপলক্ষে এই নিউইয়র্কেই নাটকটির নতুন ও আধুনিক ব্যাখ্যাসহ মঞ্চায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রবীন্দ্র-নবায়নের এসব উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আবদুল্লাহ জাহিদের সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থ আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথ। (ভাষাচিত্র, ঢাকা, ২০২৬)। রবীন্দ্রনাথ মোট পাঁচবার যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ করেছিলেন, মূলত শান্তিনিকেতনের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। অপরিসীম যত্ন ও শ্রমে জাহিদ এই দেশের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক সম্পর্কের গ্রন্থিগুলো উন্মোচন করেছেন। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে প্রকাশিত গ্রন্থ ও স্মারক প্রকাশনার অভাব নেই। এমনকি মার্কিন সরকারের উদ্যোগেও কবির জীবনী ও তাঁর যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের বিবরণসংবলিত গ্রন্থ প্রকাশনা রয়েছে। এত সব প্রকাশনার ভিড়ে জাহিদের গ্রন্থটি ব্যতিক্রমী; কারণ, বাংলায় রবীন্দ্রনাথ ও যুক্তরাষ্ট্র-সংক্রান্ত তথ্যের এমন একটি আকরগ্রন্থ এই প্রথম।

মানছি, গভীর বিশ্লেষণ কিংবা নতুন কোনো আবিষ্কারের ওপর আলোকপাত এ গ্রন্থের লক্ষ্য নয়। জাহিদ নিজের কথা এখানে বলেছেন খুব সামান্যই। রবিঠাকুরের নিজের কথা—কখনো চিঠিতে, কখনো স্মৃতিচারণায়, কখনো ভাষণে আবার কখনো সমসাময়িক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে—কালানুক্রমিকভাবে সাজিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কবির তিন দশকের সম্পর্কের প্রায় পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস নির্মাণ করেছেন। সে অর্থে গ্রন্থটির চরিত্র এনসাইক্লোপেডিক বা বিশ্বকোষীয়। ভবিষ্যতের কোনো নবীন গবেষক এই গ্রন্থ হাতে পেলে বাংলার এই কবিকে নিয়ে আরও সহানুভূতিশীল বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হবেন—এমন প্রত্যাশা অবান্তর নয়।

গ্রন্থের প্রাক্‌–ভূমিকায় আবদুল্লাহ জাহিদ রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের তিনটি মাত্রা চিহ্নিত করেছেন। সমগ্র গ্রন্থ তিনি এই ত্রিমাত্রিক সম্পর্ক ও তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব নির্মাণে ও নির্ণয়ে ব্যয় করেছেন।

প্রথমত, গীতাঞ্জলিকে বিশ্বসভায় পরিচিত করতে এসব সফর বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা ছিল মার্কিন কবি এজরা পাউন্ড ও মার্কিন সাময়িকী পোয়েট্রির। জাহিদ বস্তুনিষ্ঠভাবে রবীন্দ্রনাথ ও পাউন্ডের সম্পর্কের বিবর্তনের সব নাটকীয়তা, বৈচিত্র্য, দ্বৈততাসহ তুলে ধরেছেন।

রবীন্দ্রনাথের ব্যাপারে এজরা পাউন্ডের একধরনের মালিকানাবোধ ছিল। কবি নিজেও তাঁর অনুবাদ নিয়ে এজরা পাউন্ডের শিক্ষকতা মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর আত্মবিশ্বাসী রবীন্দ্রনাথ এজরা পাউন্ডের পরামর্শ উপেক্ষা করে নিজেই নিজের কবিতার অনুবাদ প্রকাশে মেতে ওঠেন। যশ ও অর্থপ্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা এবং ব্রিটিশ প্রকাশক ম্যাকমিলানের তাগিদ এর পেছনে কাজ করেছিল, তাতে সন্দেহ নেই। এতে পাউন্ড ভীষণ ক্ষিপ্ত হন। কবির প্রতি তাঁর ক্রোধ ও উপহাস কতটা তীব্র ছিল, তার প্রমাণ হিসেবে জাহিদ পাউন্ডের ব্যঙ্গাত্মক রচনা ‘যদিন্দ্রনাথ মাহোয়ারস অকুপেশন’-এর কথা উল্লেখ করেছেন।



Source link

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।