• শনি. সেপ্টে. 26th, 2026

বাংলাদেশ সুন্দর, তবে পর্যটনশিল্প কেন এগুচ্ছে না?

Bytrendnews

সেপ্টে. 26, 2026


পৃথিবীর অনেক দেশের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস পর্যটন খাত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আশিয়ানভুক্ত দেশ থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ার নাম এক্ষেত্রে উদাহরণের শীর্ষ সারিতে উঠে আসে। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার পরিসংখ্যানে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের পছন্দের শীর্ষ তালিকার সেরা দশে থাইল্যান্ডের নাম যেমন নিয়মিত থাকে, তেমনি মালয়েশিয়াতো অনিবার্যভাবেই স্থান করে নেয়।

একইভাবে সিঙ্গাপুর, দুবাই, টোকিও, লন্ডন কিংবা অস্ট্রেলিয়া প্রতি বছর বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রে কোটি কোটি ভ্রমণপিপাসুকে আকর্ষণ করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে চলেছে। এমনকি আমাদের নিকটবর্তী সার্কভুক্ত অঞ্চলের দিকে তাকালেও দেখা যায়—মালদ্বীপের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিই হলো পর্যটনশিল্প। ভারত, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কাও সারা বছর জুড়ে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ আন্তর্জাতিক পর্যটকের পদচারণায় মুখরিত থাকে।

সাধারণত আন্তর্জাতিক পর্যটকদের অন্য একটি দেশে টেনে আনে প্রধানত দুই ধরনের আকর্ষণ। প্রথমটি হলো প্রকৃতির অপার নৈসর্গিক সৌন্দর্য, আর দ্বিতীয়টি হলো শহরের সৌন্দর্য বর্ধন ও আধুনিকতার পরিচায়ক হিসেবে নির্মিত বৈশ্বিক বিশিষ্টতার সুউচ্চ ও ঐতিহাসিক স্থাপত্য। ভারতের তাজমহল, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অবস্থিত পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার, দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা কিংবা প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের নাম পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের মানুষ এক নামে চেনে।

একইভাবে সুইজারল্যান্ডের লাবণ্যময় প্রকৃতি, টোকিও বা সিডনির মতো উন্নত ও সুশৃঙ্খল শহর, থাইল্যান্ডের বিনোদন ব্যবস্থা কিংবা ইন্দোনেশিয়ার বালির মতো বৈচিত্র্যময় দ্বীপ বিশ্ববাসীকে বারবার টানতে বাধ্য করে।

এখন প্রশ্ন ওঠে, আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের কী আছে? প্রকৃতির দিক থেকে বিচার করলে আমাদের উপহারের অভাব নেই। আমাদের রয়েছে পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক বালুকাময় সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। রয়েছে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃত বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। পাহাড়ি হ্রদ ও সবুজে ঘেরা রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, সিলেটের সবুজ চা-বাগান, কিংবা বগুড়া ও কুমিল্লার ঐতিহাসিক প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।

অথচ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যদি প্রশ্ন করা হয়, কজন বিদেশি পর্যটক এক নামে কক্সবাজার বা সুন্দরবনের কথা বলতে পারবেন? উত্তর হতাশাজনক। শুধু মুখে বললে বা নিজেদের খাতায় বিশ্বরেকর্ড লিখে রাখলে আন্তর্জাতিক পরিচিতি তৈরি হয় না। ‘কাজির গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই’—বাংলা ভাষার এই বহুল প্রচলিত প্রবাদের মতোই দশা আমাদের পর্যটন সম্পদের।

আন্তর্জাতিক পর্যটকরা কেবল ঘুরে দেখতে আসেন না, তারা সঙ্গে নিয়ে আসেন মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা এবং ক্রেডিট কার্ড। রাশির পর রাশি ডলার খরচ করেন স্থানীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, শপিংমল ও বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে। ফলে পর্যটন খাতের উন্নতি হলে একটি দেশের পুরো অর্থনৈতিক গতিপথ বদলে যায়। স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পার করে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নাম লিখিয়েছে। সরকারের লক্ষ্য যদি হয় ২০৪১ সালের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলা, তবে পর্যটনশিল্পের টেকসই ও আধুনিক বিকাশ নিশ্চিত করা ছাড়া তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

পর্যটন খাতের প্রকৃত উন্নয়ন সেদিনই হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যাবে, যেদিন বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে শেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ, অ্যারাবিয়ান, এশিয়ান, ওশেনিয়ানসহ সব বর্ণ ও জাতিগোষ্ঠীর পর্যটকরা দলে দলে বাংলাদেশে ছুটে আসবেন। যেদিন অস্ট্রেলিয়া, জাপান কিংবা ইউরোপের সদ্য বিবাহিত নবদম্পতিদের স্বপ্নের হানিমুন গন্তব্য হবে কক্সবাজার বা সুন্দরবন। পাশের দেশ ভারত থেকে লাখ লাখ মানুষ ছুটি কাটাতে বা অবকাশ যাপনে আসবে বাংলাদেশে। এমনকি বলিউডের মতো বৃহৎ চলচ্চিত্র শিল্পের শুটিং পরিচালনা করা হবে রাঙামাটির সুদৃশ্য কাপ্তাই লেক কিংবা কক্সবাজারের বিশাল বালিয়াড়িতে।

উন্নত দেশের পর্যটকরা যখন কোনো দেশে যান, তখন তারা বিশ্বমানের অবকাঠামো, উন্নত যাতায়াতব্যবস্থা এবং নিরাপদ পরিবেশ প্রত্যাশা করেন। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও আমাদের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামোগত ঘাটতি স্পষ্ট। কুয়ালালামপুর থেকে চট্টগ্রাম বা ঢাকা আসার পথেই বোঝা যায় পার্থক্যের মাত্রা। আমাদের মহাসড়কগুলো এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সুশৃঙ্খল ও গতিশীল হতে পারেনি। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারগামী যাত্রায় হরহামেশা যানজট, অনিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক ও ক্রমাগত হর্নের শব্দের মুখোমুখি হতে হয়।

এমনকি ট্রেনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শান্ত ও সুনসান নীরব পরিবেশের নিশ্চয়তা সব সময় থাকে না। আন্তর্জাতিক পর্যটকরা ভ্রমণকালে বসে আরামদায়ক পরিবেশে একটি বই পড়বেন বা আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে কাজ করবেন—এমন একটি সুশৃঙ্খল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তৈরির ক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি।

পর্যটন শিল্পের এই পিছিয়ে থাকার পেছনে আরেকটি মৌলিক কারণ হলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত বিজ্ঞাপন ও ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব। ‘প্রচারেই প্রসার’—এই নীতি পর্যটন খাতের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য। বিদেশে বসবাস করার সুবাদে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর শহরের বুকজুড়ে বিভিন্ন দেশের পর্যটন খাতের যে বিশাল প্রচার দেখা যায়, তা সত্যিই চোখ মেলে তাকানোর মতো। জালান ইপু, মসজিদ ইন্ডিয়া, লিটল ইন্ডিয়া, সেন্ট্রাল মার্কেট কিংবা কেএল সেন্ট্রালের মতো আন্তর্জাতিক ব্যস্ত এলাকাগুলোতে ভারত, তাইওয়ান, হংকং, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম তাদের দেশের বিভিন্ন পর্যটন স্পটের ছোট-বড় বিলবোর্ড এবং সুবিশাল ডিজিটাল স্ক্রিনে ভিডিও প্রচারণা চালায়।

এছাড়া ট্রেনের ভেতর বা ট্রানজিট স্টেশনগুলোতে দিন-রাত ভেসে ওঠে থাইল্যান্ডের নীল সমুদ্র কিংবা ভিয়েতনামের পাহাড়ের নান্দনিক ভিডিও চিত্র। এমনকি থাইল্যান্ডের মতো পর্যটনশিল্পে বিশ্বসেরা দেশও তাদের প্রচার থেমে রাখে না, তারা পাশের দেশের শহরের মোড়ে মোড়ে কোটি টাকা খরচ করে বিজ্ঞাপন দেয়। অথচ এই আন্তর্জাতিক হাবগুলোতে বাংলাদেশের কোনো বিজ্ঞাপন বা ডিজিটাল প্রচারের ন্যূনতম উপস্থিতি দেখা যায় না। বিশ্বজুড়ে পর্যটন বিপণনে আমাদের এই উদাসীনতা ও অদক্ষতা আন্তর্জাতিক পর্যটক না পাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।

অবকাঠামোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চেইন আতিথেয়তার অভাবও আমাদের একটি বড় সীমাবদ্ধতা। কক্সবাজারে কিছু ফোর-স্টার বা ফাইভ-স্টার মানের স্থানীয় হোটেল তৈরি হলেও আন্তর্জাতিক মানের নামীদামী চেইন হোটেলের সংখ্যা নগণ্য। রাঙামাটি, সুন্দরবন বা পার্বত্য জেলাগুলোতে বিশ্বমানের ফাইভ-স্টার আতিথেয়তা ও ইকো-রিসোর্টের অভাব রয়েছে। হিমছড়ির পাহাড় থেকে সাগরের অপূর্ব দৃশ্য কিংবা রাঙামাটির রিজার্ভ বাজার থেকে হরিণা পর্যন্ত পাহাড় ও লেকের রূপসী মেলবন্ধনকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ সৌন্দর্যের আঁতুড়ঘর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব ছিল। দরকার ছিল সুপরিকল্পিত নীতি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ এবং পরিবেশ ঠিক রেখে টেকসই আধুনিক নির্মাণ প্রযুক্তি।

এছাড়া চট্টগ্রামের নেভাল-টু থেকে কাপ্তাই পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীর তীরভিত্তিক পর্যটন, পতেঙ্গা সি বিচ এবং বঙ্গবন্ধু টানেল পেরিয়ে পারকি সমুদ্রসৈকতকে ঘিরে বিশ্বমানের বিনোদন ক্ষেত্র গড়ে তোলা খুব বেশি কঠিন কাজ নয়।

অনেক সময় প্রশ্ন ওঠে, আন্তর্জাতিক পর্যটক এলে স্থানীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক নিয়মকানুনের সঙ্গে সংঘাত তৈরি হবে কিনা। তবে মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া কিংবা মালদ্বীপের দিকে তাকালে এই সংশয় দূর হয়ে যায়। প্রতিটি দেশই তাদের নিজস্ব ধর্মীয়, সামাজিক ও কৃষ্টিগত ভারসাম্য রক্ষা করে এবং কিছু নির্দিষ্ট সীমানা মেনে চলার নিয়ম রেখেও চমৎকারভাবে কোটি কোটি বিদেশি পর্যটককে সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির পরিপন্থী অসভ্যতার কোনো সুযোগ না দিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের স্বাগত জানানো এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুরোপুরি সম্ভব। এর সুফলে দেশের সাধারণ মানুষ, রেস্তোরাঁর কর্মচারী, ডাব বিক্রেতা বা সিএনজি-টমটম চালক থেকে শুরু করে সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে বহুভাষী হতে শিখবে এবং বৈশ্বিক মানসিকতা নিয়ে গড়ে উঠবে। আন্তর্জাতিক আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে প্রমিত বাংলা ভাষা এবং বিশ্বজনীন ভাষা হিসেবে ইংরেজির সহজ চর্চা সারাদেশে প্রসারিত হবে।

পর্যটন খাতের উন্নয়ন কেবল বিদেশিদের আসার ওপর নির্ভর করে না; আমাদের নিজেদের দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়ছে, জীবনযাত্রার মান এবং বিনোদনের চাহিদাও পরিবর্তিত হচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটকদের জন্যও পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল ও উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। সরকার ও সংশ্লিষ্ট পর্যটন মন্ত্রণালয়কে এখনই দীর্ঘমেয়াদী সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামতে হবে। অবকাঠামোগত সংকট দূর করা, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও ট্রানজিট এলাকাগুলোতে জোরদার ডিজিটাল ব্র্যান্ডিং করা, এবং আন্তর্জাতিক হোটেল চেইনগুলোকে বিনিয়োগে আকর্ষিত করার মাধ্যমেই বাংলাদেশকে একটি আধুনিক পর্যটন গন্তব্যে রূপান্তর করা সম্ভব।



Source link

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।