
মিল্কি ওয়ে ছায়াপথে ঘেটা এক বিরল সুপারনোভা বিস্ফোরণের নিখুঁত ছবি ক্যামেরাবন্দি করার দাবি করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
সাড়ে আটশ বছর আগে পৃথিবী থেকে দৃশ্যমান হওয়া এই মহাজাগতিক ঘটনার কেন্দ্রে থাকা ‘জম্বি তারা’ ও এর অদ্ভুত গঠন নতুন করে অবাক করেছে বিজ্ঞানীদের।
মিল্কি ওয়ে ছায়াপথে এই ধরনের একমাত্র পরিচিত সুপারনোভার অবশিষ্টাংশ হচ্ছে ‘পা ৩০’, যা আসলে একটি তারার বিস্ফোরণের ফলে ছিটকে যাওয়া টুকরা।
এখন আধুনিক টেলিস্কোপ ব্যবহার করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এর নিখুঁত ও বিস্তারিত বিবরণ ধারণ করতে পেরেছেন বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।
নতুন ছবিতে বিস্ফোরণের জটিল ও সুবিন্যস্ত গঠনটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মহাবিশ্বের দিকে ছড়িয়ে পড়া এর সুতার মতো বিভিন্ন অংশ দেখতে অনেকটা আতশবাজি রোশনাইয়ের মতো।
এসব সুতার প্রতিটির প্রস্থ এতটাই বড় যে, এর ভেতর একাধিক সৌরজগত অনায়াসে ধরে যেতে পারে।
এই পুরো আতশবাজি রোশনাইয়ের একদম কেন্দ্রে অবস্থান করছে ‘জম্বি তারা’, যা বিস্ফোরিত তারাটি ধ্বংসের পর টিকে থাকা অবশিষ্টাংশ। তারাটি ঠিক আলোর এই ঝাড়বাতির মাঝখানে বসে আছে।
১১৮১ সালে তারাটির বিস্ফোরণ দেখা গিয়েছিল পৃথিবী থেকে, যা সে সময়ের জাপানি, চীনা ও আরবি সূত্রে আলাদাভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে একজন সৌখিন বিজ্ঞানী প্রথম এই অবশিষ্টাংশ খুঁজে পান।
তবে সাম্প্রতিক এ গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ‘জেমিনাই নর্থ’ টেলিস্কোপ ব্যবহার করে বিস্ফোরণটির আরও নিখুঁত দৃশ্য উন্মোচন করেছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রথম নজরে যেগুলোকে আতশবাজির আলোর রেখা বলে মনে হয়, সেগুলোর প্রতিটি আসলে ছোট ছোট গিঁটের দীর্ঘ শৃঙ্খল, যা দেখতে অনেকটা ‘সুতায় গাঁথা মুক্তার মালার’ মতো।
পৃথিবী থেকে প্রায় সাড়ে সাত হাজার আলোকবর্ষ দূরে ঘটা এ বিস্ফোরণটি মিল্কি ওয়ে ছায়াপথে এ জাতীয় একমাত্র পরিচিত বস্তু।
অন্যান্য ছায়াপথে এর কিছু উদাহরণ দেখা গেলেও এটা তুলনামূলক কাছাকাছি থাকায় এর কেন্দ্রভাগে থাকা বিস্ফোরণের অবশিষ্টাংশ এত স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
সুপারনোভাটি ‘টাইপ আইএএক্স’ ধরনের হওয়ায় পেছনে এই অবশিষ্টাংশ রেখে গেছে। এই ধরনের বিস্ফোরণে তারা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় না।
গবেষকরা বলছেন, দুটি শ্বেত বামন তারার সংঘর্ষের ফলে এ ঘটনা ঘটেছিল। শ্বেত বামন হচ্ছে এমন এক ঘন ও পৃথিবী-সম আকৃতির বস্তু, যা মারা যাওয়া তারার অসম্ভব সংকুচিত রূপ।
এ গবেষণার অন্যতম প্রধান গবেষক ও অস্ট্রিয়ার ‘ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’র ইলারিয়া কাইয়াজ্জো বলেছেন, “পৃথিবীর কাছাকাছি অবস্থানের কারণেই আমরা এত বিস্তারিতভাবে এটা দেখতে পাচ্ছি। এই সান্নিধ্যই পা ৩০’কে গবেষণার জন্য বিশেষভাবে মূল্যবান করে তুলেছে।”
‘পা ৩০’ এই জাতীয় একমাত্র পরিচিত উদাহরণ হলেও আমাদের ছায়াপথে এ হয়ত একা নয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, অন্ধকার মহাবিশ্বে এমন আরও অনেক কিছু লুকিয়ে থাকতে পারে, যা আবিষ্কারের অপেক্ষায় রয়েছে।
এ গবেষণার সহ-নেতৃত্ব দেওয়া ‘ওয়ারউইক ইউনিভার্সিটি’র টিম কানিংহাম বলেছেন, “তারা বিস্ফোরণের নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক রেকর্ড কেবল প্রায় এক হাজার বছর আগের। আমরা যতদূর জানি, মিল্কি ওয়ের অন্ধকারে এখনও এমন অবশিষ্টাংশ লুকিয়ে থাকতে পারে।
“আমরা সৌভাগ্যবান যে, এমন এক আকর্ষণীয় বস্তু নিয়ে গবেষণা করতে পারছি, যা আধুনিক টেলিস্কোপ তৈরির শত শত বছর আগে তিনজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী স্বাধীনভাবে পর্যবেক্ষণ করে তিনটি ঐতিহাসিক রেকর্ড রেখে গিয়েছিলেন।”
‘ডিটেকশন অফ নটস ইন দ্য সুপারনোভা টাইপ আইএএক্স রেমন্যান্ট পা ৩০’ শিরোনামে গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে গবেষণাটি ‘অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল’-এ।