
বিষয়টা আমার কাছে এতটাই সিরিয়াস হয়ে গিয়েছিল যে মনে মনে সত্যিই নিজের জীবন থেকে এক বছর দিয়ে দিয়েছিলাম। শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে। কিন্তু আমি সত্যিই ভয়ে ফাইনালটা দেখিনি। তারপর মেসি জিতে গেলেন। মনে হলো, আমিও জিতে গেলাম। সারা রাত ঢাকা শহর ঘুরেছি। রাস্তায় তখন বিজয় মিছিলের আনন্দ। মেসি যেন সবার হয়ে গেছেন। পরে অবশ্য সেই ফাইনাল খেলা আমি অসংখ্যবার দেখেছি।
আর এবারের ফাইনাল? সেটা শুরু হওয়ার ১৫ মিনিট পর থেকে আর দেখিনি। পরেও দেখিনি। সাহস হয়নি, কেন জানি না। শুধু কি ফাইনাল? আর্জেন্টিনা-মিসরের ম্যাচে বাইরে সবাই চিৎকার করছে গোল! গোল! আর্জেন্টিনার না, মিসরের। আমি তখন টিভি রেখে অন্য রুমে গিয়ে ভয়ে বাইবেল জড়িয়ে জপছি, আর্জেন্টিনাকে তুমি জিতিয়ে দাও! আর্জেন্টিনাকে তুমি জিতিয়ে দাও।
তাতেও ক্ষান্ত হইনি। ডায়েরি বের করে পাতার পর পাতা লিখে গেছি, আর্জেন্টিনা জিতে গেছে। আর্জেন্টিনা জিতে গেছে! তারপর আর্জেন্টিনা জিতে গেল। সে কী আনন্দ!
আমি জানতাম, মেসিকে একদিন থামতে হবে। ঠিক যেমনটা ভেবেছিলাম, স্পেনের সঙ্গে ফাইনালে সেটাই ছিল মেসির শেষ ম্যাচ। কিন্তু শেষ হয়েও কি শেষ হয়? এ তো মেসি। কী অদ্ভুত এক জাদুর বলয়ে আটকে রেখেছেন সব প্রজন্মকে। কিন্তু এবার সত্যিই শেষ হচ্ছে সব। আজ সেই দিন, আর্জেন্টিনার হয়ে শেষবার মাঠে নামলেন মেসি। মেসি আর আর্জেন্টিনার জার্সিতে খেলবেন না—এই সত্যের সঙ্গে মানিয়ে নিতে আমার, আমাদের হয়তো অনেকটা সময় লাগবে।
মাঝেমধ্যে সত্যিই মনে হয়, উচ্চতার শিখরে পৌঁছানোর জন্য যা কিছু করা সম্ভব, মেসি তার সবই অর্জন করেছেন। তবু সবার চেয়ে তিনি আলাদা অন্য একটা কারণে—মানুষ হিসেবে তাঁর বিনয়, তাঁর সংবেদনশীলতা আর শিশুসুলভ আবেগ। তা না হলে কেউ এভাবে ডায়েরির তিনটি পাতায় নিজের অবসরের ঘোষণা দিতে পারেন? অবশ্য মেসি সবই পারেন। তাই এই জীবন্ত কিংবদন্তির বিদায়টাও যেন রাজকীয়।
মেসি হয়তো জানবেন না, আজ পৃথিবীর কত মানুষের মন খারাপ। হয়তো এই খারাপ লাগাটা অনেক দিন থাকবে। হয়তো কারও কারও সঙ্গে সারা জীবন। মেসি হয়তো কোনো দিন জানবেনও না, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে একজন মানুষ তাঁর এই বিদায়ের সঙ্গে নিজেও যেন অবসর নিয়ে ফেলেছেন। ২০০৬ থেকে ২০২৬। কুড়ি বছর। একটা মানুষকে দেখতে দেখতে বড় হয়ে যাওয়ার কুড়ি বছর। একটা ভালোবাসাকে নিজের জীবনের অংশ করে ফেলার কুড়ি বছর।
ভালো থেকো, লিও। আমার ছোটবেলার প্রেমিক।