
বাংলাদেশ বেতারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্রোঞ্জ ম্যুরাল নির্মাণে ৬ কোটি ৬৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা খরচ করে সরকারের আর্থিক ক্ষতির অভিযোগে সাবেক দুই তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ও মোহাম্মদ হাছান মাহমুদসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক।
দুদকের অভিযোগ, ম্যুরাল নির্মাণের নামে ঠিকাদারকে পুরো টাকা পরিশোধ করা হলেও অনুসন্ধানকালে আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ বেতার কেন্দ্রে ম্যুরালটির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
রোববার দুদকের উপসহকারী পরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান বাদী হয়ে সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১-এ মামলাটি করেন।
দুদক সচিব মো. সাইদুর রহমান খান সাংবাদিকদের এ তথ্য দিয়েছেন।
মামলার অন্য ছয় আসামি হলেন-বাংলাদেশ বেতারের সাবেক মহাপরিচালক এ কে এম নেছার উদ্দিন ভূঞা ও নারায়ণ চন্দ্র শীল, উপ-স্টেশন প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুর রহমান, সাবেক সিনিয়র প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেন, প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির তৎকালীন সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. নাসির উদ্দিন আহমেদ এবং প্রকল্প পরিচালক প্রবাল কান্তি দাস।
আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কয়েকটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে হাসানুল হক ইনু বর্তমানে কারাগারে আছেন। আর হাছান মাহমুদকে প্রকাশ্যে দেখা যায় না।
দুদকের মামলায় বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের ২৪ অগাস্ট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীদের পক্ষে কাজী জাকির হাসান ও মলয় কুমার গাঙ্গুলী বাংলাদেশ বেতারের আগারগাঁও কেন্দ্রে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের আবেদন করেন।
ওই আবেদনের পর ২০১৬ সালের ২১ এপ্রিল বাংলাদেশ বেতারের কর্মকর্তারা জাতীয় বেতার ভবনের ভেতরে বঙ্গবন্ধুর একটি ভাস্কর্য কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য প্রশাসনিক অনুমোদন ও নকশা প্রস্তুতের সিদ্ধান্ত নেন।
একই বছরের ১৯ মে বাংলাদেশ বেতারের তৎকালীন মহাপরিচালক এ কে এম নেছার উদ্দিন ভূঞা কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রশাসনিক অনুমোদন চেয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠান।
এরপর ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর তথ্য মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অগ্রগতি পর্যালোচনা সভায় বাংলাদেশ বেতারের শাহবাগ কমপ্লেক্স আগারগাঁওয়ে স্থানান্তর, নির্মাণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের আওতায় বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল স্থাপনের জন্য প্রকল্প সংশোধনের প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়।
২০১৮ সালের ৯ জানুয়ারি প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির তৃতীয় সভায় ম্যুরাল নির্মাণে ৭ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. নাসির উদ্দিন আহমেদ।
পরে ২৪ জানুয়ারি তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রকল্পের আওতায় ম্যুরাল স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়।
ওই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ বেতারের তৎকালীন মহাপরিচালক নারায়ণ চন্দ্র শীল প্রকল্পের ব্যয় ৯৬ কোটি ৭২ লাখ ৮৭ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৩ কোটি ১৪ লাখ ৯৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেন।
এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির চতুর্থ সভায় ম্যুরাল নির্মাণের কাজ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা যুক্তিযুক্ত বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে এর ব্যয় নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
দুদকের এজাহার অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ৭ মে নারায়ণ চন্দ্র শীলের নির্দেশে ব্রোঞ্জ ম্যুরাল নির্মাণে ৫ কোটি ৭৭ লাখ ৬২ হাজার টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়।
পরের বছরের ১৪ জানুয়ারি প্রকল্প পরিচালক প্রবাল কান্তি দাস দরপত্রের মাধ্যমে ৫ কোটি ৭৮ লাখ ৩৪ হাজার টাকায় ম্যুরাল নির্মাণের কার্যাদেশ দেন।
২০২০ সালের ৯ ডিসেম্বর তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ হাছান মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বঙ্গবন্ধুর ব্রোঞ্জ ম্যুরালের নকশা অনুমোদন করা হয়।
এজাহারে বলা হয়, কার্যাদেশ পাওয়া ঠিকাদার নির্মাণকাজ শেষ করে ২০২৪ সালের ১২ জুন পর্যন্ত নয়টি বিলের মাধ্যমে মোট ৬ কোটি ৬৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা গ্রহণ করেন।
তবে দুদকের অনুসন্ধান দল বাংলাদেশ বেতারের আগারগাঁও কেন্দ্র সরেজমিন পরিদর্শন করে সেখানে ম্যুরালটির কোনো অস্তিত্ব পায়নি বলে এজাহারে বলা হয়েছে।
দুদকের অভিযোগ, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, অনুমোদন ও সংশোধনের নীতিমালা অনুযায়ী ম্যুরাল নির্মাণ প্রকল্পের অপরিহার্য অংশ ছিল না। এরপরও আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ‘ক্ষমতার অপব্যবহার করে’ অনিয়মের মাধ্যমে কাজটি প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করেন।
এর ফলে প্রকল্পের ব্যয় ৬ কোটি ৬৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা বাড়িয়ে সরকারের আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে বলে মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান বলেন, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প সংশোধনের নীতিমালা অনুযায়ী কোনো কাজ প্রকল্পের জন্য অপরিহার্য হলেই তা সংশোধিত প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ব্রোঞ্জ ম্যুরাল নির্মাণ প্রকল্পের অপরিহার্য অংশ ছিল না। তারপরও নীতিমালা লঙ্ঘন করে সরকারি অর্থ ব্যয়ে এটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এ কারণে ম্যুরাল নির্মাণে খরচ হওয়া পুরো ৬ কোটি ৬৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকাকে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করছে দুদক।
মামলায় বলা হয়েছে, তদন্তে এ ঘটনায় অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে।