
রাজধানীর যানজট কমাতে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল কাঁচপুরে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। লক্ষ্য, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রাথমিক অবকাঠামো প্রস্তুত করে চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা ও নোয়াখালীসহ ১৬ জেলার বাস সেখানে স্থানান্তর করা। কিন্তু, যে টার্মিনাল চালু করে রাজধানীর যানজট কমানোর পরিকল্পনা, সেটির নির্মাণকাজ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) হিসাবে, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে প্রকল্পের সামগ্রিক অগ্রগতি ছিল মাত্র ৩০ শতাংশ।
কাঁচপুরে বাস সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে যাত্রী ও পরিবহনসংশ্লিষ্টদের মধ্যে রয়েছে নানা উদ্বেগ। তাদের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত সংযোগ পরিবহন ও যাত্রীসুবিধা নিশ্চিত না করে টার্মিনাল স্থানান্তর করা হলে বাড়তি ভাড়া, সময় নষ্ট এবং একাধিক যানবাহন পরিবর্তনের ভোগান্তিতে পড়তে হবে।
পরিবহন মালিকদের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে, নতুন টার্মিনালে বাস রাখার জায়গা, পরিচালনব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত না করে স্থানান্তর করা কঠিন।
এর আগেও, সায়েদাবাদের কাউন্টার বন্ধ বা স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়ে যাত্রীদের ভোগান্তির অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য, একপর্যায়ে কাউন্টার বন্ধ রাখার উদ্যোগ স্থায়ী হয়নি। ফলে এবারো শুধু ঘোষণা দিয়ে বাস স্থানান্তর করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব। তবে, টার্মিনালের নির্মাণকাজ, সংযোগ পরিবহনের পরিকল্পনা, যাত্রীদের নিরাপত্তা এবং পরিবহন মালিকদের প্রস্তুতি সব মিলিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যকরভাবে স্থানান্তর সম্পন্ন করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। প্রশ্ন উঠছে, যে টার্মিনালের কাজ এখনো ৩০ শতাংশ, সেখানে ডিসেম্বরেই বাস সরানোর পরিকল্পনা কতটা বাস্তবসম্মত?
সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে চট্টগ্রামগামী যাত্রী হেদায়েত কবির রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “সায়েদাবাদ থেকে কাঁচপুরে বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের আগে যাত্রীদের যাতায়াতের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু টার্মিনাল সরিয়ে নিলেই হবে না, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে যাত্রীরা কীভাবে সেখানে পৌঁছাবেন, সেই পরিকল্পনাও থাকতে হবে।”
তিন বছরে শেষ হয়নি নির্মাণ, ডিসেম্বরেই চালুর লক্ষ্য
২০২৩ সালের ৯ আগস্ট কাঁচপুর আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়। তখন ছয় মাসের মধ্যে টার্মিনালটি চালুর প্রত্যাশার কথা জানানো হয়েছিল। সে সময় প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৮ কোটি টাকা। তিন বছর পেরিয়ে গেলেও টার্মিনালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা যায়নি।
২০২৬ সালের ২৪ জুন কাঁচপুর আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল পরিদর্শন করে সড়ক পরিবহন ও সেতু প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদ ছয় মাসের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে টার্মিনালটি চালুর লক্ষ্য জানান। এরপর ৮ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি টার্মিনালের শেড, টিকিট কাউন্টার, শৌচাগার ও অফিসকক্ষসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দেয়।
সর্বশেষ ৩০ সেপ্টেম্বর নির্মাণকাজ পরিদর্শন শেষে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রাথমিক কাজ শেষ করে টার্মিনালটি চালুর লক্ষ্য রয়েছে।
ডিএসসিসির তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি প্যাকেজে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ চলছে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে প্রকল্পের সামগ্রিক অগ্রগতি ছিল ৩০ শতাংশ। এর মধ্যে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ ৭৫ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীণ প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজ ২৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।
কাঁচপুর আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের প্রজেক্ট ম্যানেজার আরমান হোসেন সাগর রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “টার্মিনালের ফাউন্ডেশন নির্মাণের কাজ প্রায় ৪০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি কাজও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে আমরা এগোচ্ছি। প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে, যাতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টার্মিনালের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত করা যায়। আশা করছি, পরিকল্পনা অনুযায়ী অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।”
সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল
ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বলেন, “সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল কাঁচপুরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কাজ চলছে। এ লক্ষ্যে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে এবং টার্মিনাল নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টার্মিনালটি চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পের কাজ অনেক দূরে এগিয়েছে এবং এটা হবেই। কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই, কাজ দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে এবং এটা খুব দ্রুতই সম্পন্ন হবে।”
৪০৫ বাসের টার্মিনাল, যাত্রীদের যাতায়াতের ব্যবস্থা কোথায়?
প্রায় ১২ একর জমির ওপর নির্মাণাধীন কাঁচপুর টার্মিনালে ৪০৫টি বাস ধারণক্ষমতার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৩৭৮টি বাস পার্কিং, ২২টি বাস বে এবং পাঁচটি ওয়াশিং বে রাখার কথা রয়েছে। এ ছাড়া, ৪০টি গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা, ৪৮০ আসনের অপেক্ষাগার, ১০৬টি টিকিট কাউন্টার, পুরুষদের জন্য ১০টি এবং নারীদের জন্য ছয়টি শৌচাগার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে, টার্মিনালে পৌঁছানো এবং সেখান থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতের ব্যবস্থা আলাদা বিষয়। এই সংযোগব্যবস্থা কার্যকর না হলে টার্মিনালের ভেতরে সুবিধা থাকলেও যাত্রীদের ভোগান্তি কমবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম জানান, কাঁচপুর থেকে সায়েদাবাদে যাতায়াতকারী যাত্রীদের সুবিধার্থে পরিবহন মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে বিশেষ শাটল বাস সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে, এ সার্ভিসে কতটি বাস চলবে, কতক্ষণ পরপর বাস ছাড়বে, ভাড়া কত নির্ধারণ করা হবে এবং কোন সময় থেকে কোন সময় পর্যন্ত বাস চলবে এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি। রাতের যাত্রীদের যাতায়াত নিশ্চিত করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়েও সুনির্দিষ্ট ঘোষণা আসেনি।
সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে চট্টগ্রামগামী যাত্রী হেদায়েত কবির রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “সায়েদাবাদ থেকে কাঁচপুরে বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের আগে যাত্রীদের যাতায়াতের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু টার্মিনাল সরিয়ে নিলেই হবে না, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে যাত্রীরা কীভাবে সেখানে পৌঁছাবেন, সেই পরিকল্পনাও থাকতে হবে।”
তিনি বলেন, “ভাড়া ১০ থেকে ২০ টাকা বেশি লাগলেও সমস্যা নেই। কিন্তু যাত্রীরা যেন সহজে ও নিরাপদে টার্মিনালে পৌঁছাতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। আগে যাতায়াতের ব্যবস্থা করে, তারপর টার্মিনাল স্থানান্তর করা উচিত।”
সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে সিলেটগামী যাত্রী কায়েকোবাদ সরদার মনে করেন, কাঁচপুরে টার্মিনাল স্থানান্তর করা হলে যাত্রীদের বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় হতে পারে।
তিনি বলেন, “বর্তমানে সায়েদাবাদে এসে সরাসরি দূরপাল্লার বাসে ওঠা যায়। কিন্তু কাঁচপুরে যেতে হলে আগে অন্য যানবাহনে যেতে হবে, এরপর দূরপাল্লার বাস ধরতে হবে। এতে সময় ও খরচ বাড়বে।”
এই যাত্রী বলেন, “পরিবার নিয়ে যাতায়াত করা যাত্রীদের লাগেজ নিয়ে একাধিকবার যানবাহন পরিবর্তন করতে হলে ভোগান্তিতে পড়তে হবে। বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। রাতে দূরপাল্লার বাস থেকে নেমে সংযোগ পরিবহন না পেলে যাত্রীদের বিকল্প যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে হতে হবে। তাই স্থানান্তরের আগে শাটল সার্ভিসের ভাড়া, সময়সূচি, নিরাপত্তা ও ধারণক্ষমতা নির্ধারণ করা জরুরি।”
মামুন এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার মেহেদী হাসান বলেন, “বর্তমানে সায়েদাবাদে পরিবহনগুলোর বাস রাখা ও রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধা রয়েছে। কাঁচপুরে স্থানান্তরের পর একই ধরনের সুবিধা তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। নতুন স্থানে বাস পার্কিং, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করে একসঙ্গে সব বাস সরিয়ে নেওয়া হলে পরিবহন পরিচালনায় সমস্যা হতে পারে।”
সায়েদাবাদ ছাড়তে অনীহা পরিবহন সংশ্লিষ্টদের
যাত্রীদের পাশাপাশি পরিবহনসংশ্লিষ্টদেরও আপত্তি রয়েছে। তাদের বক্তব্য, সায়েদাবাদে বর্তমানে বাস রাখার জায়গা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং যাত্রী সংগ্রহের যে ব্যবস্থা রয়েছে, তা নতুন স্থানে একসঙ্গে নিশ্চিত করা সহজ নয়। কাঁচপুরে প্রয়োজনীয় সুবিধা প্রস্তুত না করে বাস ও কাউন্টার সরিয়ে নিলে পরিবহন পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে ‘হিমাচল এক্সপ্রেস’-এর ম্যানেজার শাহীন উদ্দিন বলেন, “কাউন্টার স্থানান্তরের আগে যাত্রী পাওয়া, বাস ছাড়ার সময় এবং যাত্রীদের অপেক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত যাত্রী না পেলে বাস ছাড়তে দেরি হতে পারে, আবার যাত্রীদেরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে।”
তিনি বলেন, “আগেও কাউন্টার বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তখন ১০ থেকে ১৫ দিন কাউন্টার বন্ধ থাকায় যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েছিলেন। সরকার প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করলে স্থানান্তর সম্ভব হতে পারে। তবে যাত্রীরা যেন সহজে বাসে উঠতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।”
মামুন এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার মেহেদী হাসান বলেন, “বর্তমানে সায়েদাবাদে পরিবহনগুলোর বাস রাখা ও রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধা রয়েছে। কাঁচপুরে স্থানান্তরের পর একই ধরনের সুবিধা তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। নতুন স্থানে বাস পার্কিং, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করে একসঙ্গে সব বাস সরিয়ে নেওয়া হলে পরিবহন পরিচালনায় সমস্যা হতে পারে।”
তিনি বলেন, “ঈদের মতো ব্যস্ত সময়ে দূরপাল্লার বাসের চাপ বেড়ে যায়। এ সময় পরিবহন পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা জরুরি। তাই স্থানান্তরের আগে কাঁচপুরে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”
শ্যামলী পরিবহনের ম্যানেজার মোহাম্মদ হোসেন মন্টু বলেন, “সায়েদাবাদ থেকে দূরপাল্লার বাসের কাউন্টার কাঁচপুরে স্থানান্তর করা হলে যাত্রীদের অতিরিক্ত সময় ও ভাড়া গুনতে হতে পারে। ” তার মতে, কাঁচপুরে প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত না করে স্থানান্তর করা হলে পরিবহন পরিচালনা ও যাত্রীসেবায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
মোহাম্মদ হোসেন মন্টু ডিসেম্বরের মধ্যে টার্মিনাল স্থানান্তর সম্পন্ন হওয়া নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি জানান, টার্মিনালের কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত সায়েদাবাদের কাউন্টার সরানো উচিত হবে না।
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, তারা শুধু স্থান পরিবর্তনের বিরোধিতা করছেন না; নতুন স্থানে বাস পরিচালনা, পার্কিং ও যাত্রীসেবার কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছেন।
সায়েদাবাদের বাস কাঁচপুরে, যানজট কমবে নাকি বাড়বে যাত্রীর খরচ?
কাঁচপুরে টার্মিনাল স্থানান্তরের মূল যুক্তি হলো, দূরপাল্লার বাসকে রাজধানীর ভেতরে প্রবেশ ও অবস্থান কমিয়ে সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী এলাকায় যানজট কমানো। পরিকল্পনাটি কার্যকর হলে টার্মিনালকেন্দ্রিক বাসের চাপ এবং পার্কিংয়ের কারণে সড়কে তৈরি হওয়া কিছু প্রতিবন্ধকতা কমতে পারে। তবে, এর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে বাসের রুট, যাত্রী ওঠানামা এবং সংযোগ পরিবহনের ব্যবস্থাপনার ওপর।
কুমিল্লায় যেতে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে আসা নাজনিন নাহার নামে এক যাত্রী বলেন, “সায়েদাবাদ থেকে বাস কাঁচপুরে সরিয়ে নিলে যানজট কমবে কি না সেটা কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করবে। কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ যাত্রীদের জন্য কাঁচপুরে পৌঁছানো এবং সেখান থেকে গন্তব্যে যাওয়া কতটা সহজ হবে, সেটাও ভাবতে হবে। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে যাতায়াতের সময় এক গাড়ি থেকে নেমে আরেক গাড়িতে উঠতে হলে বাড়তি সময় ও ভাড়া লাগবে। সঙ্গে লাগেজ থাকলে ভোগান্তি আরো বাড়বে।”
তিনি বলেন, “রাতে বাস থেকে নেমে নিরাপদে গন্তব্যে যাওয়ার ব্যবস্থা না থাকলে সমস্যায় পড়তে হবে। তাই বাস সরানোর আগে পর্যাপ্ত সংযোগ পরিবহন, সহনীয় ভাড়া, নিরাপদ অপেক্ষার জায়গা ও নারী যাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু যানজট কমানোর কথা ভাবলে হবে না, যাত্রীদের যাতায়াত যেন আরো ব্যয়বহুল ও কষ্টকর না হয়, সেটিও দেখতে হবে।”
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ও পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “শুধু বাস টার্মিনাল স্থানান্তর করলেই যানজট কমানো বা যাত্রীদের ভোগান্তি দূর করা সম্ভব হবে না। কাঁচপুর থেকে রাজধানীর বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত গণপরিবহন, নারীদের নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা এবং উন্নত সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি টার্মিনাল এলাকায় যাত্রী ওঠানামা, বাসের পার্কিং ও চলাচলের জন্য পৃথক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে যাত্রী তুলতে গিয়ে বাস সড়কে দাঁড়িয়ে যানজট সৃষ্টি করতে না পারে।”
তিনি বলেন, “অন্যান্য দেশের আধুনিক বাস টার্মিনালের আদলে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি। টার্মিনালে আন্তঃনগর বাস, নগর পরিবহন ও ব্যক্তিগত যানবাহনের ওঠানামা এবং পার্কিংয়ের ব্যবস্থা আলাদা করা গেলে যানজট ও যাত্রীদের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে। এ জন্য শুধু স্থান পরিবর্তন নয়, সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং আন্তঃনগর পরিবহনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন। তা না হলে শহর সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে কাঁচপুরও একসময় নগরের ভেতরে চলে আসতে পারে, ফলে আবারো টার্মিনাল স্থানান্তরের প্রয়োজন দেখা দেবে।”
কাঁচপুরে বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের কাজের অগ্রগতি ও নির্ধারিত সময়ে চালুর সম্ভাবনা প্রসঙ্গে ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, “বিষয়টি মূলত সরকারের সদিচ্ছা, দৃঢ়তা ও নিরপেক্ষ সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। সরকার আন্তরিকভাবে উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করতে চাইলে এটি খুব কঠিন কোনো কাজ নয়। তবে, কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দিতে গেলে উদ্যোগটি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সামগ্রিক জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হবে।”
যাত্রীদের বাড়তি ভাড়া ও এক বাস থেকে অন্য বাসে ওঠার ভোগান্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বাসের রুট পুনর্বিন্যাস এবং রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থার পরিকল্পনায় কাঁচপুরকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। বাস সার্ভিসগুলো কাঁচপুর পর্যন্ত চলাচল করতে পারলে যাত্রীদের বারবার বাস পরিবর্তনের প্রয়োজন কমবে। তবে, এসব সুবিধা নিশ্চিত করতে টার্মিনাল স্থানান্তরের পাশাপাশি পরিবহনব্যবস্থার সামগ্রিক সংস্কার ও সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।”
ডিপো আগে, টার্মিনাল পরে— মালিক সমিতির প্রস্তাব
কাঁচপুরে পূর্ণাঙ্গ টার্মিনাল চালুর আগে সেখানে বাস রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে বলে মনে করেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম।
তার মতে, শুধু সরকারি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সায়েদাবাদ থেকে বাস সরিয়ে নিলেই হবে না; নতুন স্থানে যাত্রীদের নির্বিঘ্ন যাতায়াত, নিরাপত্তা ও যোগাযোগের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, “সায়েদাবাদ থেকে দেশের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রীরা যাতায়াত করেন। কাঁচপুরে টার্মিনাল স্থানান্তর করা হলে যাত্রীদের সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সংযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।”
সাইফুল আলম বলেন, “নগর পরিবহনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে শাটল বা ফিডার সার্ভিস চালু করা প্রয়োজন। তা না হলে যাত্রীদের অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হবে, একাধিক যানবাহন পরিবর্তন করতে হবে এবং সময়ও বেশি লাগবে।”
তার মতে, যানজট নিরসন ও ঢাকার পরিবহনব্যবস্থা সচল রাখতে কাঁচপুরে টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ ইতিবাচক হতে পারে। তবে, সেখানে পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সময়সাপেক্ষ। আপাতত কাঁচপুরে বাস রাখার উপযোগী ডিপো বা পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা গেলে সায়েদাবাদে বাসের চাপ কমানো সম্ভব।
তিনি বলেন, “আমাদের বাসগুলো সায়েদাবাদে রাখা হয় এবং সেখানেই প্রয়োজনীয় সার্ভিসিং করা হয়। কাঁচপুরে আপাতত বাস রাখার ব্যবস্থা করা গেলে ডিপোর গাড়িগুলো সেখানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব। পরে পূর্ণাঙ্গ টার্মিনাল ও যাত্রীদের যাতায়াতের প্রয়োজনীয় সুবিধা তৈরি হলে সেখান থেকে বাস পরিচালনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।”
যাত্রীদের বাড়তি ভাড়া ও একাধিকবার যানবাহন পরিবর্তনের আশঙ্কা প্রসঙ্গে সাইফুল আলম বলেন, “জনজীবন সচল রাখা, পরিবহনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা এবং যানজট কমানোর স্বার্থে কিছু পরিবর্তন মেনে নিতে হতে পারে। তবে, সরকারের উদ্দেশ্য জনগণকে ভোগান্তিতে ফেলা নয়; বরং সবার জন্য নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা।”
তিনি জানান, কাঁচপুরে এসি বাসের জন্য আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণের কাজ এগোচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কাজ শেষ হলে বিভিন্ন এসি বাসের কাউন্টার এক জায়গায় আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে, সায়েদাবাদ পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়া হবে, নাকি কাঁচপুরকে প্রাথমিকভাবে ডিপো হিসেবে ব্যবহার করা হবে তা নির্ভর করবে বাস্তব পরিস্থিতি ও সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর।