
ঢলের পানিতে যখন আধা পাকা ধানের শিষ পচে নষ্ট হয়, তখন সেই ক্ষতি নারী কৃষকের জন্য এক দ্বিমুখী নরকযন্ত্রণা নিয়ে আসে। পুরুষটি হয়তো বাজারে গিয়ে হাহাকার করে বা কিস্তির ভয়ে পালিয়ে বেড়ায়, কিন্তু ঘরের ভেতরে সেই নারীকে লড়াই করতে হয় চরম খাদ্যহীনতা, সন্তানের ক্ষুধা আর সামাজিক অপমানের সঙ্গে। ঋণের কিস্তির জন্য যখন লোকজন দরজায় এসে শকুনের মতো হানা দেয়, তখন সেই মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের প্রথম শিকার হয় নারী। অথচ এই নারী কৃষকের নামে কোনো ব্যাংকঋণ বরাদ্দ হয় না, এমনকি সরকারি ত্রাণের তালিকায় তাঁর নাম থাকে সবার শেষে। এই যে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের চরম অন্ধত্ব, তা আসলে নারী কৃষককে উৎপাদনব্যবস্থা থেকে মুছে ফেলার এক গভীর চক্রান্ত। এসি রুমে বসে যাঁরা কৃত্রিম উপগ্রহের ম্যাপ দেখে কৃষির পরিকল্পনা করেন, কখনোই বুঝবেন না তিলে তিলে গড়া স্বপ্নের ফসল চোখের সামনে পচতে দেখার যন্ত্রণা নারী কৃষকের হৃদয়ে কতটা রক্তক্ষরণ ঘটায়।
ভাওয়াল গড়ের বন্য প্রাণী ও প্রাচীন বাস্তুতন্ত্রকে যেভাবে উন্নয়নের জবরদস্তিতে খুন করা হয়েছে, ঠিক একইভাবে এ দেশের নারী। কৃষকদের শ্রমের অধিকারকে ‘সংস্কৃতি’ বা ‘পারিবারিক ঐতিহ্যের’ দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর ধরে জবাই করা হচ্ছে। আমাদের সমাজ মনে করে, নারীর কাজ মানেই ‘ফ্রি সার্ভিস’। ধান সেদ্ধ করা থেকে শুরু করে শুকানো এবং গোলায় তোলা পর্যন্ত যে শ্রম নারীরা দেন, তার কোনো আর্থিক মূল্যায়ন আমাদের তথাকথিত মডার্ন বাজারব্যবস্থায় নেই। এই যে অদৃশ্য শ্রম, এটিই আমাদের জাতীয় অর্থনীতির এক বিশাল অংশ দখল করে আছে, অথচ তার বিনিময়ে নারী পায় কেবল অবজ্ঞা, পারিবারিক সহিংসতা আর মজুরিবৈষম্য। এর সঙ্গে যমদূতের মতো যুক্ত হয়েছে সিন্ডিকেট-নির্ভর বাজারব্যবস্থা, যারা কৃষকের সর্বনাশ ঘটিয়ে কোটি কোটি টাকা মুনাফা লোটে, কিন্তু সেই মুনাফার এক পয়সাও নারী শ্রমিকের ভাগ্যে জোটে না।