একজন রোগী হাসপাতালে আসেন জীবনের সবচেয়ে অসহায় মুহূর্তে। তাঁর প্রত্যাশা—সঠিক চিকিৎসা, সম্মান, প্রয়োজনীয় তথ্য এবং নিরাপত্তা।
একজন চিকিৎসকও হাসপাতালে আসেন একটি দায়িত্ব নিয়ে। তিনি চান রোগীর সর্বোচ্চ উপকার করতে। তাঁরও প্রত্যাশা—নিরাপদ কর্মস্থল, পেশাগত স্বাধীনতা, সম্মান এবং কোনো অভিযোগ উঠলে ন্যায়সঙ্গত বিচার।
দুঃখজনকভাবে, আমরা অনেক সময় এই দুই পক্ষকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিই।
রোগীর অধিকার নিয়ে কথা বললে মনে হয় চিকিৎসকের বিরুদ্ধে বলা হচ্ছে। আবার চিকিৎসকের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বললে মনে হয় রোগীর অভিযোগের অধিকার সীমিত করার চেষ্টা চলছে।
তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে রোগী প্রশ্ন করতে ভয় পাবেন না, চিকিৎসক চিকিৎসা দিতে ভয় পাবেন না; ভুল হলে বিচার হবে, কিন্তু বিচার হবে প্রমাণের ভিত্তিতে; চিকিৎসকের মর্যাদা থাকবে, আবার রোগীর অধিকারও সমানভাবে সুরক্ষিত থাকবে। এটি চিকিৎসকদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার দাবি নয়। এটি একটি নিরাপদ, ন্যায়সঙ্গত এবং বিশ্বাসযোগ্য স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরির দাবি।
আমি মনে করি, এই ধারণাটিই বদলানো প্রয়োজন।
রোগীর অধিকার এবং চিকিৎসকের নিরাপত্তা পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়। বরং একটি ভালো স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুটি অপরিহার্য ভিত্তি।
সমস্যাটি এখন আরও জরুরি
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর সহিংসতার বিষয়টি সম্প্রতি আবার আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনায় এসেছে। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ ওয়ার্ল্ড মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে নিরাপত্তা, দ্রুত তদন্ত এবং সহিংসতার ঘটনা রিপোর্ট ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছে।
অন্যদিকে, রোগীর অধিকার ও চিকিৎসায় জবাবদিহির প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে এ বিষয়ে একেবারেই কোনো ব্যবস্থা নেই—এ কথা বলা ঠিক হবে না।
একটি আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নিয়ন্ত্রক সংস্থা রয়েছে। এটি চিকিৎসকদের নিবন্ধন, চিকিৎসাশিক্ষার মানদণ্ড এবং পেশাগত আচরণ নিয়ে কাজ করে। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের পেশাগত আচরণ, শিষ্টাচার ও নৈতিকতার বিধিমালাও রয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—বর্তমান ব্যবস্থাটি কি রোগী ও চিকিৎসক উভয়ের কাছে যথেষ্ট সহজ, দ্রুত, স্বচ্ছ এবং বিশ্বাসযোগ্য?
অভিযোগ উঠলেই কি চিকিৎসক অপরাধী?
চিকিৎসাবিজ্ঞানে সব খারাপ ফলাফলই অবহেলা নয়।
সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসা দেওয়ার পরও রোগীর জটিলতা হতে পারে। অস্ত্রোপচারে জটিলতা হতে পারে। ওষুধের অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া হতে পারে। গুরুতর রোগে রোগীর মৃত্যু হতে পারে।
আবার এটিও সত্য—চিকিৎসকের ভুল, অবহেলা বা অনৈতিক আচরণ কখনোই অসম্ভব নয়।
এই দুইয়ের মাঝখানে প্রয়োজন ন্যায়সংগত বিচারপ্রক্রিয়া।
ন্যায়সংগত বিচারপ্রক্রিয়া বলতে কী বোঝায়?
ধরা যাক, কোনো রোগীর পরিবার মনে করছে চিকিৎসায় গুরুতর ভুল হয়েছে।
তাঁরা যেন সহজে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় অভিযোগ করতে পারেন। অভিযোগটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গ্রহণ করতে হবে। চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি সংরক্ষণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিশেষায়িত বিভাগের স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দিয়ে চিকিৎসাগত পর্যালোচনা করতে হবে। চিকিৎসককে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
তারপর প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হবে।
ভুল না হলে চিকিৎসককে দ্রুত অভিযোগমুক্ত করা হবে।
পেশাগত অসদাচরণ হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যবস্থা নেবে।
আর ফৌজদারি অবহেলার যথেষ্ট প্রমাণ থাকলে প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া চলবে।
এটাই সভ্য ব্যবস্থা।
কিন্তু বিচার করবে কে?
এই জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একজন হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞের জটিল চিকিৎসা-প্রক্রিয়ার মান বিচার করতে সেই বিষয়ে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ জ্ঞান দরকার। একইভাবে জটিল অস্ত্রোপচার, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রোগীর মৃত্যু বা কঠিন প্রসূতি-জরুরি পরিস্থিতি শুধু আবেগ দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয়।
তাই অভিযোগ তদন্তে প্রয়োজন স্বাধীন বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনা।
এর অর্থ এই নয় যে চিকিৎসকেরা নিজেদের বিচার নিজেরাই করবেন।
রোগীর প্রতিনিধি, আইন বিশেষজ্ঞ এবং নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের ভূমিকা থাকতে পারে। কিন্তু চিকিৎসার গ্রহণযোগ্য মান নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ মতামত অপরিহার্য।
বাংলাদেশে আইন তৈরির আলোচনা চলছে
২০২৫ সালে স্বাস্থ্যকর্মী ও রোগী—দুই পক্ষের সুরক্ষার জন্য দুটি পৃথক অধ্যাদেশের খসড়া নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ হয়েছিল। একটি স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানকে সহিংসতা থেকে রক্ষা করার জন্য, অন্যটি রোগীর সুরক্ষা এবং চিকিৎসাগত অবহেলার অভিযোগের প্রতিকারব্যবস্থা তৈরির জন্য।
কিন্তু ২৯ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত পৃথক স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন তখনও আইনে পরিণত হয়নি।
অর্থাৎ, এখনো আমাদের সামনে একটি সুযোগ আছে—আইনটি যেন শুধু শাস্তির আইন না হয়ে আস্থা তৈরির আইন হয়।
হাসপাতাল কি যুদ্ধক্ষেত্র হতে পারে?
কখনোই নয়।
রোগীর মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। পরিবারের ক্ষোভ, হতাশা এবং প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক।
কিন্তু চিকিৎসক বা নার্সকে মারধর, জরুরি বিভাগ ভাঙচুর অথবা অন্য রোগীর চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়া কোনো সমস্যার সমাধান নয়।
একইভাবে, কোনো হাসপাতাল বা চিকিৎসকও রোগীর যৌক্তিক প্রশ্নকে ‘ঝামেলা’ বলে এড়িয়ে যেতে পারেন না।
রোগীর পরিবারকে সময় দিয়ে বোঝানো, খারাপ সংবাদ জানানোর বিষয়ে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে দ্রুত জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক ও হাসপাতাল প্রশাসনের উপস্থিতি অনেক সংঘাত শুরুতেই কমাতে পারে।
সহিংসতা প্রতিরোধ শুধু পুলিশ দিয়ে হয় না; ভালো যোগাযোগও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
চিকিৎসকদেরও নিজেদের ঘর গোছাতে হবে
শুধু নিরাপত্তার দাবি করলে সমাজের আস্থা পুরোপুরি পাওয়া যাবে না।
চিকিৎসকদেরও বলতে হবে—
আমরা অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা দেব না।
রেফারেলের বিনিময়ে গোপন কমিশন বা অবৈধ সুবিধা গ্রহণযোগ্য মনে করব না।
ওষুধ কোম্পানি বা অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক আর্থিক সম্পর্ক থাকলে স্বচ্ছতা বজায় রাখব।
রোগীকে তাঁর রোগ ও চিকিৎসার বিকল্প সম্পর্কে বোঝাব।
চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করব।
এবং আমাদের বিরুদ্ধে যৌক্তিক অভিযোগ উঠলে স্বাধীন তদন্তে সহযোগিতা করব।
পেশাদারিত্বের শক্তি এখানেই।
রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে একটি জায়গা প্রয়োজন
চিকিৎসকের রাজনৈতিক মত থাকা স্বাভাবিক নাগরিক অধিকার।
কিন্তু চিকিৎসকের নিরাপত্তা, রোগীর নিরাপত্তা, নৈতিকতা, চিকিৎসাশিক্ষা এবং পেশাগত মানের মতো বিষয়ে চিকিৎসকদের একটি দলনিরপেক্ষ জাতীয় পেশাজীবী কণ্ঠ প্রয়োজন।
এমন একটি প্ল্যাটফর্মের নেতৃত্ব পরিবর্তন হতে পারে, মতপার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু কয়েকটি বিষয়ে সবাই একমত থাকবে—
রোগীর স্বার্থ আগে। চিকিৎসকের নিরাপত্তা অপরিহার্য। দুর্নীতি গ্রহণযোগ্য নয়। পেশাগত অসদাচরণের বিচার হবে। আর কোনো চিকিৎসককে প্রমাণের আগে অপরাধী বানানো হবে না।
এখন কী করা যেতে পারে?
বাংলাদেশের জন্য আমি সাতটি বাস্তব প্রস্তাব সামনে রাখতে চাই।
এক. চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর সহিংসতা প্রতিরোধে স্পষ্ট জাতীয় আইন এবং প্রতিটি হাসপাতালে সহিংসতা প্রতিরোধের নীতিমালা তৈরি করা।
দুই. রোগীর অভিযোগের জন্য সহজ একক অভিযোগব্যবস্থা চালু করা—যেখানে অভিযোগ জমা দেওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হবে।
তিন. গুরুতর চিকিৎসাগত অভিযোগের জন্য বিশেষায়িত বিভাগভিত্তিক স্বাধীন চিকিৎসা পর্যালোচনা প্যানেল তৈরি করা।
চার. তদন্ত শেষ হওয়ার আগে চিকিৎসক ও রোগী—উভয়ের গোপনীয়তা এবং ন্যায়সংগত অধিকার রক্ষা করা।
পাঁচ. বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের শৃঙ্খলামূলক প্রক্রিয়া আরও সহজ, সময়সীমাবদ্ধ ও স্বচ্ছ করা এবং যথাযথ আপিলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
ছয়. রেফারেল কমিশন, অবৈধ সুবিধা এবং চিকিৎসক-শিল্পপ্রতিষ্ঠানের স্বার্থের সংঘাত নিয়ে আরও স্পষ্ট জাতীয় স্বচ্ছতা নীতি তৈরি করা।
সাত. রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে চিকিৎসকদের একটি শক্তিশালী জাতীয় পেশাজীবী প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা, যার প্রধান কর্মসূচি হবে রোগীর কল্যাণ, নৈতিকতা, শিক্ষা, চিকিৎসকের নিরাপত্তা এবং পেশাগত মর্যাদা।
শেষ পর্যন্ত চিকিৎসক এবং রোগী দুই পক্ষ নন।
তাঁরা একই পক্ষ।
একজনের প্রয়োজন ভালো চিকিৎসা। অন্যজনের দায়িত্ব সেই চিকিৎসা দেওয়া।
তাঁদের মাঝখানে যদি ভয়, অবিশ্বাস, সহিংসতা ও সন্দেহ ঢুকে পড়ে—ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা।
তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে রোগী প্রশ্ন করতে ভয় পাবেন না, চিকিৎসক চিকিৎসা দিতে ভয় পাবেন না; ভুল হলে বিচার হবে, কিন্তু বিচার হবে প্রমাণের ভিত্তিতে; চিকিৎসকের মর্যাদা থাকবে, আবার রোগীর অধিকারও সমানভাবে সুরক্ষিত থাকবে।
এটি চিকিৎসকদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার দাবি নয়।
এটি একটি নিরাপদ, ন্যায়সঙ্গত এবং বিশ্বাসযোগ্য স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরির দাবি।
লেখক: কনসালট্যান্ট গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট, অরল্যান্ডো হেলথ, ফ্লোরিডা শিক্ষক, গবেষক, লেখক ও স্বাস্থ্যসেবা প্রশাসক।
এইচআর/এএসএম
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।
খবরে দেখছি, কোলে ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশু নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে মানুষ ছুটছেন পাগলের মতো। হাসপাতালে জায়গা নেই, জায়গা পেলেও সাংঘাতিক রকম চাপ।…