
‘একবার ভাত নিলে পানিতে পড়ে, তাই দুবার’—এই জাতীয় প্রচলিত কথার অজুহাত দিতে হলেও বাঙালি কাউকে এক মুঠো ভাত বেশি খাইয়ে শান্তি পায়। আর নিজে এক গ্রাস কম খেতে হলেও সবাই মিলে খাওয়ার মধ্যেই তাদের আনন্দ। এটাই বাঙালির চিরাচরিত স্বভাব এবং বাঙালির আতিথেয়তার সুনামও বিশ্বজুড়ে।
অথচ আগে থাকতে মিলের কথা না বলে ভাত খাওয়ার কারণে খুলনায় মো. আজমুল হোসেনকে ‘ভাত চুরি’র অপবাদ দিয়ে নির্মম নির্যাতন করা হয়; একপর্যায়ে চারতলা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে তার মৃত্যু হয়। এর আগে ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে তোফাজ্জল হোসেনকে মোবাইল চুরির অপবাদ দিয়ে ভাত খাইয়ে বেধড়ক পিটিয়ে হত্যা করা হয়। দুটো হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেই ‘ভাত’ বিষয়টির সংযোগ রয়েছে—একজনকে ভাত খাওয়ার কারণে, অন্যজনকে ভাত খাইয়ে হত্যা করা হলো। তবে কি বাঙালির আবেগ, অনুভূতি ও আতিথেয়তার সুনামে ভাটা পড়েছে? এটা কি ভাতের অভাব, নাকি ভালোবাসা, নৈতিকতা ও সহানুভূতির?
একের পর এক ঘটে চলা বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের খবরে যেন অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি আমরা। পরের ঘটনা আগের ঘটনাকে ভুলিয়ে দিচ্ছে আর অধিক ভয়াবহ রূপে ফিরছে আগামী। তোফাজ্জলকে তো ভুলেছি, ভুলতে চলেছি আজমুলের কথাও। ভালো-মন্দ সবকিছুতেই আমাদের অনুভূতির মেয়াদ খুব স্বল্প। দুষ্কৃতকারীর অত্যাচারের মাত্রা যেমন বাড়ছে, তেমনি ঘাতকের হত্যার কৌশল এবং কায়দায় ফিরছে ভয়ঙ্কর নতুনত্ব। ঘটনা যত বেশি ভয়ঙ্কর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা তত বেশি ভাইরাল। মস্তিষ্কে কোনো বিষয় বেশি সময় ধরে রাখা এবং চিন্তার গভীরে যাওয়ার সময় দিচ্ছে না ফেইসবুকের অ্যালগরিদম। বোধ আর বিবেকের দুয়ার খোলার আগেই ঘটছে আরেক ঘটনা। ভবিষ্যতে এমন অনাচার বন্ধের কোনো স্থায়ী পদ্ধতি নিয়ে আমরা ভাবছি কি?
একের পর এক ঘটে চলা ঘটনা সমাজের প্রতি ক্ষেত্রেই যেন শৃঙ্খলার বেষ্টনী ভাঙছে। ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শামীম মোল্লাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ওই বছরের নভেম্বরে সিলেটের কানাইঘাট উপজেলায় ৫ বছরের শিশু মুনতাহা আক্তার জেরিনকে হত্যা করে পুকুরের পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। ২০২৫-এর মার্চে মাগুরায় ৮ বছরের আসিয়ার ধর্ষণ ও হত্যা—এ ঘটনায় গোটা জাতি শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ আর দ্রুত বিচারের দাবি ওঠে সংবাদমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিটি প্ল্যাটফর্ম থেকে। শোকের ছায়া মুছতে না মুছতে একই বছরের ৯ জুলাই মিটফোর্ডে ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ সোহাগকে একদল ব্যক্তি প্রকাশ্যে পৈশাচিকভাবে লোহার রড আর পাথর দিয়ে থেঁতলে হত্যা করে। ঘটনাস্থলে কোনো প্রতিবাদ হলো না, পুলিশ এলো না। ভিডিও ভাইরাল হলো, ফেইসবুক প্ল্যাটফর্মে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভের ঝড় উঠল, তারপর প্রশাসন জোরেশোরে নড়ে বসল। এ শোকের অশ্রু না শুকাতেই ৭ অগাস্ট ২০২৫ গাজীপুরের সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনকে অপরাধী চক্রের সদস্যদের একটি হামলার দৃশ্য ধারণ করার দায়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সেটা নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মাতল দু-একদিন। ৯ অগাস্ট রাত ৯টায় রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় ভ্যানচোর সন্দেহে রূপলাল দাস ও প্রদীপ দাসকে পিটিয়ে হত্যা করা হলো। তুহিনের কথা চাপা পড়ে গেল।
এটি এখন সহজে মানুষ মারার নতুন কৌশল। কারো সঙ্গে শত্রুতা থাকলে অথবা ফায়দা হাসিলে অন্য কাউকে দিয়ে সন্দেহ করিয়ে কিংবা কোনো অন্যায় অভিযোগ তুলে পিটিয়ে মানুষ মেরে ফেলার চল শুরু হলো, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়াচ্ছে। ঘটনার ধারাবাহিকতা সার্বিক পরিস্থিতিকে আরও পৈশাচিক করে তুলছে। মানুষ দুঃখ প্রকাশ করছে, আবার সয়েও যাচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি দুষ্কৃতকারীদের হাতে তুলে দিচ্ছে হত্যার আরেক কায়দা। নির্মমতার নতুন পদ্ধতি পুরোনো পদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশ ও জাতির সামনে হাজির হচ্ছে। জাতি দু-চার দিন বিষয়টা নিয়ে হৈচৈ করছে, তারপর আবার অন্য কিছুতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে।
বিকৃত হত্যার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোড়ন তোলে কয়েকটা দিন। জনগণ মনে করে এর চেয়ে ভয়ঙ্কর আর কিছু হতে পারে না। বিচার চেয়ে মন্তব্যে ভরে ওঠে ফেইসবুক পোস্টের কমেন্ট বক্স। জাতি আশা করে এ রকম ঘটনা আর ঘটবে না। তারপর? আরও একটি ঘটনা ঘটে—সমাজ ও সংবাদমাধ্যম সেটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এতে অপরাধীরাও সাহস পায় এবং অপরাধে উৎসাহ বাড়ে। রাষ্ট্রও যেন বিষয়টিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে; না হলে মানুষ কেন বিচার চাইতে থানা বা আদালতে না গিয়ে ফেইসবুক লাইভে হাহাকার করবে?
অপরাধের কাতারে রেহাই পায় না মৃত ব্যক্তিও। ২০২৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর নূরাল পাগলের কবর খুঁড়ে মরদেহ বের করে প্রকাশ্যে আগুন দেওয়া হয়। একই বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়ে ময়মনসিংহের দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা করে গাছের সঙ্গে বেঁধে আগুন ধরিয়ে পোড়ানো—বর্বরতার আরেক রূপ। গুজবের ওপর ভর করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা ছড়িয়ে ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করার আরেকটি উদাহরণ ২০২১ সালের ফেইসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে রংপুরের পীরগঞ্জে হিন্দু পল্লীতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ। স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সহিংসতা উসকে দিতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগানোর আরও একটি উদাহরণ একই বছরের কুমিল্লার দুর্গাপূজার ঘটনা ও গুজব; যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে দেশব্যাপী দুর্গাপূজায় সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ২০২২ সালে নড়াইলের দিঘলিয়ায় আকাশ সাহার একটি ফেইসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে ওই এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির, বাড়ি ও প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
২০২৫ সালের জুনে লালমনিরহাটে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে নরসুন্দর পরেশ চন্দ্র শীল ও তার ছেলে বিষ্ণু চন্দ্র শীলকে বেধড়ক মারধর করে একদল লোক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাস্থলে সাধারণ মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। এ ধরনের প্রতিটি ভয়াবহ ঘটনাই প্রমাণ করে—গুজবপুষ্ট, ক্ষোভ-উত্তেজিত আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রসারিত গণপিটুনি আমাদের সামাজিক কাঠামোয় কতটা গভীর ও নৃশংস ক্ষত তৈরি করছে। তাই তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার আর নিয়ন্ত্রণহীন ডিজিটাল স্বাধীনতার এই সময়ে ‘ভুল তথ্য’ এক মারণঘাতী অস্ত্র। ঘটনার পেছনে কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কিনা, সে বিষয়ে ভাবার সময়টুকুও দিচ্ছে না ফেইসবুকের অ্যালগরিদম। ফলে দিন দিন এটি নির্যাতনের একটি সহজ কৌশল হিসেবে ব্যবহারের ট্রেন্ডে পরিণত হচ্ছে। কমছে সহনশীলতা আর একে অপরের প্রতি সহানুভূতি; বাড়ছে সামাজিক অস্থিতিশীলতা, আর বাস্তবায়িত হচ্ছে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য।
অনেকে আবার ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাল খবরকে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক আদর্শের দিক দিয়ে বিচার করে বিষয়কে দলীয়করণ করতে চায়। স্বল্প প্রযুক্তিগত জ্ঞান আর তথাকথিত দলীয় আদর্শ একত্র হয়ে রাজপথে সহিংসতায় রূপ নেয়। যেকোনো বিষয়কে ইস্যু করে ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা আজকাল এমন এক প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে—যেখানে তথ্যের সত্যতা যাচাই কিংবা সম্ভাব্য পরিণতির প্রতি কারো নজর নেই।
এ বছরের মে মাসে ঢাকার মান্ডায় সৌদি প্রবাসী মক্করম মিয়ার মরদেহ খণ্ড-বিখণ্ড অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। একই মাসে কাপাসিয়ায় একই পরিবারের তিন শিশুসহ পাঁচজনকে হত্যা করা হয়। ৭ মে চট্টগ্রামের রাউফাবাদে অপরাধী গোষ্ঠীর গুলিতে হাসান রাজু নিহত হলে সে সময় পথচারী ১১ বছরের রেশমী আক্তার গুলিবিদ্ধ হয়। এসব কিছুকে ছাপিয়ে যায় এ বছরের ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছরের রামিসা হত্যাকাণ্ড। শরীর শিউরে ওঠা এ ঘটনায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়া শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করে মাথা কেটে দেহ থেকে আলাদা করে রাখে ঘাতক। জঘন্য এ হত্যাকাণ্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমগ্র জাতি এ ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা ও দুঃখ প্রকাশ করে। প্রশাসন দ্রুত সরব হয়, বিচার শেষ হয় মাত্র চার কার্যদিবসে।
কটা দিন না যেতেই ২১ অগাস্ট রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় গণপতি চক্রবর্তীর পুরো পরিবারসহ ৪ জনকে হত্যা যেন সকল করুণ অধ্যায়কে হার মানায়। ১৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যা, ২০ সেপ্টেম্বর সংবাদমাধ্যমে বহুল আলোচিত জামায়াত নেতা গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের আত্মহত্যা এবং ২৮ সেপ্টেম্বর বান্দরবানে ফুফুর ঘরের বাক্সে পাওয়া ৩ বছরের ভাতিজি তায়িফা সুলতানার মরদেহ।
তবে সব বড় অপরাধের সংবাদ সমাজে একই প্রতিক্রিয়া তৈরি করে না। কোনো ঘটনা দ্রুত জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে আসে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, সরব হয় রাজনৈতিক ও নাগরিক সংগঠনগুলো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অধিক তৎপর হয় এবং আদালতেও বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে যায়। অন্যদিকে একই সময়ে একই ধরনের আরও অনেক ঘটনা সংবাদপত্রের এক কোণে প্রকাশিত হয়ে কয়েক দিনের মধ্যেই হারিয়ে যায়; অনেক খবর কোথাও প্রকাশিতও হয় না। শত অচেনা ভুক্তভোগীর সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান হয়ে থেকে যায়।
তবে কি ঘটনার নির্মমতা, আবেগীয় অভিঘাত আর দৃশ্যমানতাই একটি ঘটনাকে আলোচনার কেন্দ্রে আনে? কিংবা একই ঘটনায় অপরাধের একাধিক উপাদান যুক্ত হলে মানুষের প্রতিক্রিয়া তীব্র হয়? ভুক্তভোগীর বয়স কি সামাজিক আবেগ তৈরিতে প্রভাব ফেলে? যদি তাই হয়, তাহলে সাবধান! কেননা অপরাধী চক্র হয়তো নতুন করে আরও ভয়াবহ ও বিকৃত কোনো পদ্ধতি নিয়ে সামনে আসার মতলব করছে।
পপি দেবী থাপা: সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী। ই-মেইল: popythapabpc@gmail.com