
একদিকে আমাদের বাংলার প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষা পুরোপুরি পাশ্চাত্যের চাকচিক্যের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে, অন্যদিকে অনেকটা নিভৃতে পশ্চিমেরই প্ররোচনা ও প্রযোজনায় রচিত হচ্ছে বাংলার লোকশিল্প। ১৮৪৬ সালের ২২ আগস্ট হাউস অব লর্ডস লাইব্রেরির ডেপুটি লাইব্রেরিয়ান ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক এবং লেখক উইলিয়াম জন থমস লন্ডনের বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা ‘দ্য অ্যাথেনিয়াম’-এ প্রকাশিত একটি চিঠিতে প্রথম ‘ফোকলোর’ শব্দটি ব্যবহার করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯ শতকের শেষের দিকে এই মূল শব্দ থেকেই ভিজ্যুয়াল বা দৃশ্যমান শিল্পের ক্ষেত্রে ‘ফোক আর্ট’ (লোকশিল্প) শব্দবন্ধটি একটি সুনির্দিষ্ট ক্যাটাগরি হিসেবে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বাংলা অঞ্চলের ওরাল ট্র্যাডিশন বা মৌখিক লোককাহিনি সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রথম পথপ্রদর্শক হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন ১৯ শতকের এক ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক জেলা প্রশাসক জি এইচ ড্যামন্ট। তিনি উত্তরবঙ্গ থেকে গ্রামীণ উপকথাগুলো সংগ্রহ করে বিখ্যাত ‘ইন্ডিয়ান অ্যান্টিকুয়ারি’ পত্রিকায় ১৮৭২ থেকে ১৮৭৯ সালের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেন। এটিই ছিল বাংলার লোককাহিনির প্রথম ইংরেজি নথিবদ্ধকরণ; বাংলার লোককাহিনির পথপ্রদর্শক একজন ইংরেজ জেলা প্রশাসক! ‘ইন্ডিয়ান অ্যান্টিকুয়ারি’ ছিল ১৯ ও ২০ শতকের প্রথমার্ধে প্রকাশিত দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক গবেষণার ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী ও প্রথম সারির একটি আন্তর্জাতিক একাডেমিক জার্নাল। ১৮৭২ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত টানা ৬২ বছর ধরে এই সাময়িকী প্রাচ্যতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব ও লোকসংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে হাজার হাজার প্রবন্ধ প্রকাশের মাধ্যমে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে তুলেছিল। জার্নালটির উপশিরোনামই ছিল, ‘আ জার্নাল অব ওরিয়েন্টাল রিসার্চ ইন আর্কিওলজি, হিস্ট্রি, লিটারেচার, ল্যাঙ্গুয়েজেস, ফিলসফি, রিলিজিয়ন, ফোকলোর, অ্যান্ড সেক্টা’। জার্নালটি প্রকাশের পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু একাডেমিক লক্ষ্য ছিল। এশিয়াটিক সোসাইটি বা বিভিন্ন ছোটখাটো প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্থার কার্যবিবরণীতে যেসব মূল্যবান তথ্য ও লিপি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকত, সেগুলোকে একত্র করে একটি নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে নথিবদ্ধ করা। ১৯ শতকের শেষ ভাগে ও ২০ শতকের প্রথমার্ধে (মূলত ১৯১০ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে) ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিপরীতে নিজেদের ‘সাংস্কৃতিক স্বাজাত্যবোধ’ বা শিকড়ের সন্ধান করতে গিয়েই রেভারেন্ড লালবিহারী দে (১৮২৪-১৮৯৪), দীনেশচন্দ্র সেন (১৮৬৬-১৯৩৯), অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৭১-১৯৫১), গুরুসদয় দত্ত (১৮৮২-১৯৪১), যামিনী রায় (১৮৮৭-১৯৭২), জসীমউদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬), বিনোদ বিহারী মুখোপাধ্যায় (১৯০৪-১৯৮০), অজিত মুখোপাধ্যায় (১৯১৫-১৯৯০) প্রমুখের হাত ধরে বাংলায় লোকশিল্প চর্চার এই একাডেমিক বাঙালি-যাত্রা শুরু হয়েছিল। এর ভিত্তি ধীরে ধীরে, প্রায় শত বছর ধরে অসংখ্য গবেষণাপ্রবন্ধের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে ছিল সুচতুর ‘এশিয়াটিক সোসাইটি’, ‘ইন্ডিয়ান অ্যান্টিকুয়ারি’ এবং বিভিন্ন স্বতন্ত্র কলোনিয়াল গবেষকদের সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টায়। মূল ধারার শিল্পকলাকে নিচু মানের, জ্ঞানবিজ্ঞানের সংযোগহীন, অনুপাত-পরিপ্রেক্ষিতহীন, ফাইন আর্ট হয়ে ওঠার অযোগ্য ইত্যাদি বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত করে, তাকে পরিত্যাজ্য ঘোষণা করার মাধ্যমে দৃষ্টিসীমার বাইরে ছুড়ে ফেলা হয়; এবং পাশাপাশি একটি অত্যন্ত অপ্রশিক্ষিত, অদক্ষ ও অসৃজনশীল ধারাকে ক্রমাগত বন্দনা করার মাধ্যমে সামনে নিয়ে আসা হয়। ঘটনাগুলো খুবই সুদক্ষভাবে সম্পাদিত শত বছরের গবেষণার ছদ্মবেশে উপস্থাপন করা হয়। ফলে আমাদের স্বদেশের শিকড়সন্ধানীরা অবশেষে যা খুঁজে পান, সেটি না পাওয়াই হতে পারত জাতির জন্য অধিক মঙ্গলময়।