শিক্ষা-বাড়ি ভাড়াসহ ভোক্তা আইনের আওতায় আসছে সব ব্যবসা, বাড়ছে শাস্তি
সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য আসছে নতুন আইনের আওতায়/ছবি: জাগো নিউজ গ্রাফিক্স
বর্তমান ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনটি ২০০৯ সালের। এ আইন আরও যুগোপযোগী করে প্রণয়ন হচ্ছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬। শিক্ষা, বাড়ি ভাড়া, লন্ড্রি, ইন্টারনেটসহ সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্যকে নতুন আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। পাশাপাশি বাড়ানো হচ্ছে শাস্তি।
এরই মধ্যে নতুন আইনের একটি খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। সেই খসড়া সূত্রে জানা যায়, গতানুগতিক ব্যবসার পাশাপাশি বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ই-কমার্স খাতের ব্যবসা। কিন্তু এটি আইনের আওতাভুক্ত না হওয়ায় অধিদপ্তরে প্রতারিত বা সেবাবঞ্চিত ভোক্তারা অভিযোগ করলেও তার বিচার করা যাচ্ছিল না। ফলে সংশোধিত আইনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ই-কমার্স ব্যবসায়।
নতুন আইনের পরে নিবন্ধন ছাড়া কেউ ব্যবসা করতে পারবে না। আবার প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা প্রদানে হেরফের হলেই পড়তে হবে শাস্তির মুখে। ই-কমার্স ব্যবসার সংজ্ঞা থেকে শুরু করে শাস্তি, সবই রাখা হচ্ছে আইনে।
আইনের আওতায় আসছে জুয়া-বেটিং সাইট
শুধু ই-কমার্স ব্যবসা নয়, অনলাইন মাধ্যমে জুয়া, বেটিংয়ের সাইটগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে পারবে ভোক্তা অধিদপ্তর। কারণ আইনে এ নিয়ে নতুন একটি ধারা যুক্ত করা হচ্ছে। নতুন যুক্ত করা ৪১ এর ক ধারায় বলা হয়েছে, নিষিদ্ধ কোনো পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রির জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও অনলাইন জুয়া, বেটিংয়ের আয়োজনে দণ্ডে বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিক্রেতা বা মার্কেটপ্লেস আইনিভাবে নিষিদ্ধ কোনো পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রির জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলে বা কোনো অনলাইন জুয়া, বেটিংয়ের আয়োজন করলে অথবা আয়োজনে সহায়তা করলে উক্ত প্রতিষ্ঠানকে দুই বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক তিন লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করতে পারবে ভোক্তা অধিদপ্তর।
ওষুধে তদারকি করতে পারবে অধিদপ্তর
একইসঙ্গে ওষুধ উৎপাদনকারীদের ক্ষেত্রেও অধিদপ্তর গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে আইন সংশোধনের পর। খসড়ায় বলা হয়েছে, ওষুধে ভেজাল মিশ্রণ বা নকল ওষুধ প্রস্তুত করা হচ্ছে কি না তা অনুসন্ধান করতে পারবে অধিদপ্তর। এটি উদঘাটিত হলে মহাপরিচালক বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা বিদ্যমান আইনের অধীন মামলা দায়েরের জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা পুলিশ কমিশনার বা পুলিশ সুপারকে অনুরোধ করতে পারবে। এর আগে এ প্রেক্ষাপটে মামলার কোনো সুযোগ ছিল না।
অধিদপ্তর বলছে, দীর্ঘদিন ধরেই অধিদপ্তর আইনটি যুগপোযোগী করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীদের চাপের কারণে তা ছিল আলোচনা ও মিটিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তবে এখন এটি দ্রুত গতি পাচ্ছে। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আইনের খসড়ার ওপরে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরপর এটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে সবার মতামতের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। মতামত গ্রহণ শেষ হলে তা আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিং এবং কেবিনেটে পাঠানো হবে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য।
আইন প্রয়োগে আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে জরিমানার পরিমাণ বাড়ানো হচ্ছে। একইসঙ্গে সংক্ষুবদ্ধ ব্যক্তি যাতে আপিল করতে পারেন সে ধারাটিও যুক্ত করা হচ্ছে।-ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আইনের আওতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ই-কমার্স বা ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে গড়ে ওঠা ব্যবসার ক্ষেত্রে। কারণ এটি এখন ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত।’
তিনি বলেন, ‘আইন প্রয়োগে আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে জরিমানার পরিমাণ বাড়ানো হচ্ছে। একইসঙ্গে সংক্ষুবদ্ধ ব্যক্তি যাতে আপিল করতে পারেন সে ধারাটিও যুক্ত করা হচ্ছে।’
সব ব্যবসায় থাকবে তদারকি
জানা যায়, আইনটি পাস হলে শিক্ষা, টেইলারিং, সেলুন ও বিউটি কেয়ার, ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, কুরিয়ার সার্ভিস, বাড়ি ভাড়া, লন্ড্রি, ইন্টারনেট, মেরামত, ক্যাটারিং, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, ম্যারেজ মিডিয়া, ইন্টেরিয়র ডিজাইন, রিক্রুটিং এজেন্সি, কনসালটেন্সিসহ নানা সেবার বিষয়গুলোও এই আইনের আওতায় আসছে। ইতোমধ্যে এসব বিষয়ে অধিদপ্তরে অনেক অভিযোগ রয়েছে, যেগুলোর বিচার করতে পারছে না অধিদপ্তর।
একইসঙ্গে বাজারে সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে কোনো পণ্য বা ওষুধ অসাধুভাবে মজুত বা সংরক্ষণের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়গুলোও যুক্ত করা হচ্ছে। অর্থাৎ, ভোক্তা আইনে যে কোনো পণ্যের মজুত ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ পাবে নতুন আইন চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে।
যে কোনো পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রির জন্য অসত্য বিজ্ঞাপন বা ঘোষণা বা তথ্য প্রচার করে ক্রেতাকে প্রতারিত করা হচ্ছে কি না তারও তদারকি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে অধিদপ্তর। পাশাপাশি শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন, পর্যবেক্ষণ ও তদন্ত করতে পারবে সংস্থাটি, যেখানে প্রতিষ্ঠান সহযোগিতা করতে বাধ্য থাকবে
এছাড়া যে কোনো পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রির জন্য অসত্য বিজ্ঞাপন বা ঘোষণা বা তথ্য প্রচার করে ক্রেতাকে প্রতারিত করা হচ্ছে কি না তারও তদারকি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে অধিদপ্তর। পাশাপাশি শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন, পর্যবেক্ষণ ও তদন্ত করতে পারবে সংস্থাটি, যেখানে প্রতিষ্ঠান সহযোগিতা করতে বাধ্য থাকবে।
জানা যায়, ই-কমার্স ব্যবসার নজরদারির জন্য অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা চুক্তিবদ্ধ পেমেন্ট গেটওয়ে প্রতিষ্ঠান বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রোভাইডার বা অপারেটরদের কাছ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করার ক্ষমতা পাবে আইন সংশোধন হওয়ার পর।
এক্ষেত্রে নতুন একটি ধারাও যুক্ত করা হয়েছে। ধারা ২১ক ধারায় ডিজিটাল কমার্স প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন, নিবন্ধন স্থগিত ও বাতিলের বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। এই ধারায় পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রয়কারী ওয়েবসাইট বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক সব ডিজিটাল কমার্স প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসা শুরুর আগে অধিদপ্তরের অধীনে নির্ধারিত শর্তে ও পদ্ধতিতে নিবন্ধিত হতে হবে। নির্ধারিত সময় পর এর নবায়নের শর্তও যুক্ত করা হয়েছে। একইসঙ্গে নির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হলে কোম্পানি কার্যক্রম বন্ধ বা স্থগিতের ক্ষমতা যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির হাতে।
বাড়ছে শাস্তি
জানা যায়, আইনে সর্বোচ্চ জরিমানার পরিমাণ পর্যাপ্ত না হওয়ায় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে শাস্তির উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। তাই জরিমানার পরিমাণ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে খসড়া আইনে। আইনের ৩৭ ধারা অনুযায়ী, এক বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক দুই লাখ টাকা বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। আগে এই ধারায় কারাদণ্ডের পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান ছিল।
একইভাবে ডিজিটাল কমার্স প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা বা সেবার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পারলে এক বছরের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ডের বিধান রাখা হচ্ছে। এছাড়া ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিটি (ডিবিআইডি) প্রদর্শন না করে কেউ ব্যবসা করলেও একই জরিমানা গুনতে হবে।
নতুন একটি ধারা যুক্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া কোনো ডিজিটাল গিফট কার্ড, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্যাশ ভাউচার ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করা হচ্ছে। তবে ৪১ ধারায় নিষিদ্ধ, ভেজাল পণ্য বা ওষুধ বিক্রির কারাদণ্ডের সময়ে তিন বছর থেকে কমিয়ে দুই বছর এবং জরিমানা দুই লাখ থেকে বাড়িয়ে তিন লাখ টাকা করা হয়েছে।
ক্যাবের পক্ষ থেকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে আইনটি সংশোধনের দাবি জানিয়ে আসছি। দেরিতে হলেও এখন আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।-ক্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন
পণ্য মজুত করলে বড় ধরনের শাস্তির বিধান যুক্ত করা হচ্ছে। এজন্য যুক্ত হচ্ছে নতুন ধারা। ৪৩ক ধারা অনুযায়ী বাজারে সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পণ্য বা ওষুধ অবৈধভাবে মজুত বা সংরক্ষণ করলে তিনি অনূর্ধ্ব ২ (দুই) বৎসর কারাদণ্ড, বা অনধিক ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
নতুন আইনের খসড়া নিয়ে ভোক্তা সংগঠন ক্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, ‘২০০৯ সালের আইনে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। ওই সময়ে অনলাইন ব্যবসার এতটা বিস্তার ঘটেনি। কিন্তু বর্তমানে অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। ফলে এ ধরনের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে ২০০৯ সালের আইনটি আর পুরোপুরি যুগোপযোগী ছিল না।’
তিনি বলেন, ‘ক্যাবের পক্ষ থেকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে আইনটি সংশোধনের দাবি জানিয়ে আসছি। দেরিতে হলেও এখন আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।’
এনএইচ/এএসএ
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।
নিরাপত্তা ও সুরক্ষা প্রযুক্তির সর্বশেষ উদ্ভাবন নিয়ে রাজধানীতে আয়োজিত তিনদিনের ‘ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি এক্সপো-২০২৬’ শেষ হয়েছে…