
শামস আল-মাআরিফ অত্যন্ত তীক্ষ্ণ কৌতুকের মাধ্যমে দেখায় কীভাবে ডিজিটাল যুগের তরুণেরা কোনো প্রথাগত বা অনৈতিক পথ না ধরে, নিজেদের সংস্কৃতি ও শালীন পরিবেশের ভেতরে থেকেই ইউটিউব ও নিজস্ব ক্যামেরা দিয়ে গল্প বলতে পারে। এটি প্রমাণ করে যে ক্যামেরা কেবল প্রথাগত পশ্চিমা সংস্কৃতির বাহক নয়; বরং তা সৌদি তরুণদের নিজস্ব সামাজিক বয়ান তৈরির আধুনিক হাতিয়ার।
ক্যামেরা বা ভিজ্যুয়াল প্রযুক্তি বৈধ হলেও অ্যানিমেশন–বিষয়ক প্রশ্নটি ছিল অমীমাংসিত। কেননা অ্যানিমেশনের জন্য ছবি আঁকতে হয়। কট্টরপন্থী আলেমদের মতে, এটা ধর্মসম্মত নয়। ২০২০ সালে মালেক নেজের পরিচালিত অ্যানিমেটেড ফিচার ফিল্ম মাসামির প্রথাগত ফিকহশাস্ত্রের আরেকটি বড় বিতর্ক—সজীব প্রাণীর ছবি বা অ্যানিমেশন তৈরিকে চ্যালেঞ্জ করে। ইসলামি ফিকহর কট্টর ধারায় প্রাণীর অবয়ব বা পুতুল আঁকা নিয়ে যে ঐতিহাসিক আপত্তি ছিল, মাসামির তার কার্টুনিশ স্যাটায়ার ও অবাস্তব অ্যানিমেশনশৈলী ব্যবহার করে সেই বিধিনিষেধের তীব্রতা কমিয়ে আনে। অ্যানিমেশন ও অতিরঞ্জিত দৃশ্যভাষা ব্যবহার করে চলচ্চিত্রটি আধুনিক প্রযুক্তি, সামাজিক কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামিকে হাস্যরসের মধ্য দিয়ে খোঁচা দেয়। এটি প্রমাণ করে যে অ্যানিমেশন বা ইমেজের সৃষ্টিশীলতা সামাজিক সংশোধনের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
মাহমুদ সাব্বাগ পরিচালিত এবং ৮৯তম অস্কারে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনীত বারাকা মিটস বারাকা চলচ্চিত্রটি পাবলিক স্পেসে তরুণ-তরুণীর মুখোমুখি হওয়া, ছবি তোলা ও ইমেজ প্রকাশের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে নির্মিত। চলচ্চিত্রটিতে ইনস্টাগ্রাম ইমেজ বনাম নীতি পুলিশ (মুতাওয়া) ধরা পড়েছে। প্রধান নারী চরিত্র বিবিয়ান একজন ইনস্টাগ্রাম ইনফ্লুয়েন্সার, যার জীবন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ফ্যাশন ইমেজের ওপর দাঁড়িয়ে। অন্যদিকে পুরুষ চরিত্র বারাকা সরকারি পৌরসভার নীতি পুলিশের প্রতিনিধি। পাবলিক স্পেসে ছবি তোলা, ক্যামেরা দিয়ে মুহূর্ত ধরে রাখা এবং একটি ডেটে যাওয়ার জন্য উপযুক্ত স্থান খুঁজে পাওয়ার যে ব্যাকুলতা, তা চলচ্চিত্রে অত্যন্ত সূক্ষ্ম স্যাটায়ারের মাধ্যমে উঠে এসেছে।
‘অনুমতির সীমানা’ ও শালীনতার ব্যাকরণ বোঝার জন্যও চলচ্চিত্রটি জরুরি। এটি সরাসরি সেন্সরশিপকে আক্রমণ না করে ফ্রেমে বিশেষ ভিজ্যুয়াল সেন্সরশিপ আইকন ‘ব্লার ইফেক্ট’ ব্যবহার করে নীতিমালার আইরনি ফুটিয়ে তুলেছে। কোনো প্রকার অশ্লীল দৃশ্য ছাড়াই এটি দেখিয়েছে যে আধুনিক সৌদি যুবসমাজ তাদের ইমান ও সামাজিক শালীনতা বজায় রেখেই ডিজিটাল ভিজ্যুয়াল ওয়ার্ল্ডে নিজেদের প্রকাশ করতে চায়।
সৌদি আরবের সমকালীন চলচ্চিত্র আন্দোলন কেবল বাজারমুখী বিনোদনের গল্প নয়; বরং পশ্চিমের নির্মিত প্রাচ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে নিজেদের ইতিহাস, রাজনীতি ও সামাজিক মনস্তত্ত্বকে স্বায়ত্তশাসিত দৃশ্যভাষায় ফুটিয়ে তোলার এক বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস। বৈশ্বিক যুদ্ধজালের ভেতরে অবস্থান করেও নিজেদের মধ্যে বিদ্যমান দ্বন্দ্বগুলো এড়িয়ে বৃহত্তর খ্যালিজি জাতিসত্তা রক্ষা করে চলছে সৌদি আরব এবং গালফের অন্যান্য দেশের নির্মাতারা। তৌফিক আল-জাইদির নোরা বা মাহমুদ সাব্বাগের বারাকা মিটস বারাকা—প্রতিটি কাজই প্রমাণ করেছে যে ক্যানভাস বা ক্যামেরার লেন্স কোনো ঈশ্বরদ্রোহী স্পর্ধা নয়, বরং তা স্রষ্টার সৃষ্টি অনুধাবনেরই এক আধুনিক প্রতীক। তাদের ‘ইমেজ’ ও ‘ইমান’-এর এই বৈপ্লবিক রূপান্তর আঞ্চলিক গণ্ডির বাইরেও বৈশ্বিক মুসলিম সংস্কৃতির জন্য স্বশাসিত ইসলামি ভিজ্যুয়াল আইডেনটিটি প্রতিষ্ঠার নতুন তাত্ত্বিক ও নান্দনিক দিকনির্দেশনা তৈরি করছে।
১. প্রাথমিক ধর্মীয় ও শাস্ত্রীয় উৎস
• আল-কোরআনুল কারিম। (সুরা আল-মাইদাহ, আয়াত: ৯০; সুরা আল-আনবিয়া, আয়াত: ৫২)।
• আল-বুখারি, এম. আই. (১৯৯৭)। সহিহ আল-বুখারি (হাদিস নম্বর: ২২২৫, ৫৯৫০)। রিয়াদ: দারুস সালাম।
• মুসলিম, আই. এইচ. (২০০০)। সহিহ মুসলিম (হাদিস নম্বর: ২১০৯, ২১১০)। রিয়াদ: দারুস সালাম।
২. ফিকহ ও ফতোয়া সংকলন
• আল-কারজাভি, ওয়াই. (১৯৮৪)। আল-হালাল ওয়াল-হারাম ফিল ইসলাম [ইসলামে হালাল ও হারামের বিধান]। কায়রো: আল-মাকতাব আল-ইসলামি।
• আল-লজনাহ আল-দাইমাহ লিল-বুহুস আল-ইলমিয়্যাহ ওয়াল-ইফতা। (২০০২)। ফাতাওয়া আল-লজনাহ আল-দাইমাহ (ফতোয়া নম্বর: ২১৭২৮)। রিয়াদ: রিয়াসাত আল-ইফতা।
• ইবনে বাজ, এ. এ. (১৯৯৯)। মাজমু’ ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত মুতানাওউইআহ (খণ্ড ৫)। রিয়াদ: রিয়াসাত আল-ইফতা।
৩. একাডেমিক গবেষণা ও গ্রন্থ
• আক্কাচ, এস. (সম্পা.) (২০২১)। নাজার: ভিশন, বিলিফ অ্যান্ড পারসেপশন ইন ইসলামিক কালচারস। ব্রিল। https://doi.org/10.1163/9789004467262
• আল-ঘেইথি, এস. (২০০১)। ইমেজ ইন ইসলাম অ্যান্ড ইসলামিক ভিজ্যুয়াল আর্ট: আ থিওরেটিক্যাল স্টাডি উইথ পার্টিকুলার রেফারেন্স টু রিসেন্ট আর্ট এডুকেশন ইন সৌদি আরাবিয়া (অপ্রকাশিত পিএইচডি অভিসন্দর্ভ)। ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টার, ম্যানচেস্টার, ইউকে।
• আলমেনিয়া, এম. এম. (২০২৫)। মডার্নিস্ট সৌদি সিনেমা: আ স্টাডি অব ফোর ফিল্মস অ্যাজ রিফ্লেকশন্স অব দ্য ইন্ডিভিজুয়াল অ্যান্ড সোসাইটি। কালচুরা, ২২(৮এস), ১৫৭–১৭০।
• কিলিক, এ. (২০২৫)। দ্য পলিটিক্স অব রিপ্রেজেন্টেশন ইন নিউ সৌদি অ্যারাবিয়ান সিনেমা। মিডল ইস্ট জার্নাল অব কালচার অ্যান্ড কমিউনিকেশন, ১৮(১), ৪৫–৬২।
• মোত্তাহেদেহ, এন. (২০০৮)। ডিসপ্লেসড অ্যালিগরিজ: পোস্ট-রেভলিউশনারি ইরানিয়ান সিনেমা। ডিউক ইউনিভার্সিটি প্রেস।
• সাঈদ, ই. ডব্লিউ. (১৯৭৮)। ওরিয়েন্টালিজম। রাউটলেজ অ্যান্ড কেগান পল।
• আল-আয়্যাফ, এ. (পরিচালক)। (২০০৬)। কেফ আল-হাল? [চলচ্চিত্র]। রোটানা স্টুডিওস।
• আল-মানসুর, এইচ. (পরিচালক)। (২০১২)। ওয়াজদা [চলচ্চিত্র]। রেজর ফিল্ম প্রোডুকশন; হাই লুক প্রোডাকশনস।
• আলজাইদি, টি. (পরিচালক)। (২০২৩)। নোরা [চলচ্চিত্র]। ব্ল্যাক লাইট সিনেমা।
• আমিন, এস. (পরিচালক)। (২০১৯)। স্কেলস (সায়িদাত আল-বাহর) [চলচ্চিত্র]। ইমেজ নেশন আবুধাবি।
• গোদুস, এফ. (পরিচালক)। (২০২০)। দ্য বুক অব সান (শামস আল-মাআরিফ) [চলচ্চিত্র]। টেপ প্রোডাকশন।
• নেজের, এম. (পরিচালক)। (২০২০)। মাসামির: দ্য মুভি [চলচ্চিত্র]। মিরকট অ্যানিমেশন স্টুডিও।
• সাব্বাগ, এম. (পরিচালক)। (২০১৬)। বারাকা মিটস বারাকা [চলচ্চিত্র]। এল হোশ প্রোডাকশনস।