
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিস্তার ও সামরিক ব্যবহারের ঝুঁকি এড়াতে পারমাণবিক অস্ত্র সুরক্ষার আদলে কঠোর নিরাপত্তা বলয় বা রেড লাইন তৈরির তাগিদ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
এআইয়ের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কীভাবে দুই পরাশক্তিকে মুহূর্তের মধ্যে বড় সংঘাতে ফেলে দিতে পারে তা নিয়েই এই নতুন প্রস্তাবনা বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
আমেরিকা ও চীনের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো এআই সিস্টেম যদি পারমাণবিক নেটওয়ার্কে হস্তক্ষেপ করে বা কোনো সামরিক সাইবার অভিযান পরিচালনা করে তবে প্রতিপক্ষ সরকার আক্রমণ চালিয়েছে কি না তা নির্ধারণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ওয়াশিংটন বা বেইজিংয়ের হাতে হয়ত কেবল কয়েক মিনিট সময় থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার ‘ট্র্যাক-টু’ সংলাপের অংশ হিসেবে কাজ করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের এ কাজের মূল উদ্দেশ্য, দুই দেশের সরকারে আনুষ্ঠানিক আলোচনাকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করা।
ক্রমাগত শক্তিশালী ও আরও বেশি মাত্রায় স্বয়ংক্রিয় এআই সিস্টেম নিয়ে বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে তারা উভয় সরকারকে এমন সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার জোরালো তাগিদ দিচ্ছেন।
তাদের প্রধান প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে কঠোর সীমারেখা নির্ধারণ করা। বড় ধরনের ও গুরুতর সাইবার আক্রমণের ক্ষেত্রে মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বা ‘হিউম্যান ইন দ্য লুপ’ ধরে রাখা, ও স্বয়ংক্রিয় এআই-সংক্রান্ত কোনো দুর্ঘটনা বা সংকট ঠেকানোর জন্য জরুরি হটলাইন চালু করা।
২৪ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের মধ্যকার প্রত্যাশিত বৈঠকের আগেই এসব সুপারিশ প্রকাশ করা হয়েছিল।
থিংক ট্যাংক ‘ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন’-এর সিনিয়র ফেলো ও এ প্রতিবেদনের অন্যতম লেখক মেলানি সিসন ও ‘ফুদান ইউনিভার্সিটি’র সহযোগী অধ্যাপক তিয়ানজিয়াও জিয়াং মার্কিন-চীন এআই ও জাতীয় নিরাপত্তা সংলাপে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন।
‘ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন’ ও ‘সিংহুয়া ইউনিভার্সিটি’র ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি’ যৌথভাবে ২০১৯ সাল থেকে এ সংলাপের আয়োজন করে আসছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, তাদের এসব প্রস্তাব পরিষ্কার করে দিচ্ছে যে, আমেরিকা ও চীনের মধ্যকার এআই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেবল চিপ ও উন্নত এআই মডেল তৈরির প্রতিযোগিতার গণ্ডি ছাড়িয়ে এখন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের চিরচেনা ও জটিল প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে ভুলবশত কোনো দুর্ঘটনাকে আক্রমণ বলে ধরে নেওয়া থেকে শুরু করে দূরে অবস্থান করে মেশিনের মাধ্যমে সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিভিন্ন ক্ষেত্র কীভাবে সীমিত করা যায় ও প্রযুক্তি বিপজ্জনক আচরণ করলে পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগের নির্দিষ্ট প্রোটোকল কী হবে তা নির্ধারণ করা।
এদিকে, বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে চীনের ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা’ মন্ত্রী চেন ইসিন এ সপ্তাহে সরকারি এক প্রকাশনায় লিখেছেন, এআই ‘মৌলিকভাবে সামরিক সংগ্রামের রূপ বদলে দিচ্ছে’।
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এআই কেবল একটি সহায়ক বা পার্শ্ববর্তী ভূমিকা রাখার পর্যায় পেরিয়ে এখন মুখ্য ও নির্ধারক ভূমিকা গ্রহণ করেছে। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল বনাম ইরানের সংঘাতের প্রসঙ্গ টেনে এআইনির্দেশিত বিভিন্ন হামলার কথাও বলেছেন তিনি।
পরমাণু সিস্টেমে কঠোর সীমারেখা বা রেড লাইন
‘ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন’-এর গবেষক সিসন বলেছেন, প্রতিপক্ষ দেশের পারমাণবিক কমান্ড, নিয়ন্ত্রণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বিরুদ্ধে এআইচালিত সাইবার আক্রমণ চালানোর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ এখতিয়ার একমাত্র মানুষের হাতেই থাকা উচিত।
তার ভাষ্য, একটি স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে ও এর নির্ধারিত নির্দেশাবলীর বাইরে চলে যেতে পারে বা হ্যাকিংয়ের শিকার হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আক্রান্ত দেশটির পক্ষে বোঝা কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে যে, হামলাটি নেহাতই কোনো দুর্ঘটনা নাকি তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশ।
অন্যদিকে, ‘ফুদান ইউনিভার্সিটি’র অধ্যাপক জিয়াং সুনির্দিষ্ট কিছু সীমারেখা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছেন। যার মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এআইয়ের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিষিদ্ধ করা, পরমাণু কমান্ড সিস্টেমে স্বয়ংক্রিয় আক্রমণ ঠেকানো এবং জ্বালানি, অর্থায়ন ও স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া।
তিনি ‘অর্থপূর্ণ মানব নিয়ন্ত্রণ’-এর যৌথ বা অংশীদারিত্বমূলক সংজ্ঞা নির্ধারণের তাগিদ দিয়েছেন। যার উদ্দেশ্য, যেন দুই দেশই একই ভাষা ব্যবহার করে ভিন্ন মাত্রার মেশিন অটোনমি বা স্বয়ংক্রিয়তাকে অযৌক্তিকভাবে বৈধতা দিতে না পারে।
ধারণাটি ২০২৪ সালের নভেম্বরে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের মধ্যে সম্মত হওয়া এক নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যেখানে বলা হয়েছিল, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা উচিত।
ফেব্রুয়ারিতে ‘স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর অ্যাসোসিয়েট সিনিয়র ফেলো লরা সালমান লিখেছিলেন, বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এক মিলের জায়গা। তবে উভয় দেশই পারমাণবিক ও পারমাণবিক-সংযোগ সিস্টেমে আরও গভীরভাবে এআই যোগের লক্ষণ দেখিয়ে যাচ্ছে।
মেশিন যখন মানুষের চেয়ে দ্রুত চলে
এআই সংক্রান্ত যে কোনো দুর্ঘটনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বিশেষ এক সামরিক হটলাইন চালুরও প্রস্তাব দিয়েছেন জিয়াং। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, স্বয়ংক্রিয় সাইবার আদান-প্রদান এত দ্রুত ঘটে যেতে পারে যে মানুষ তাতে হস্তপেক্ষ করার মতো পর্যাপ্ত সময় বা সুযোগই পাবে না।
এক্ষেত্রে একটি দেশের প্রতিরক্ষামূলক এআই হয়ত কোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপের স্বয়ংক্রিয় জবাব দিতে পারে, আর অন্যপক্ষ সেই জবাবকে সরাসরি আক্রমণ বলে ভুল করতে পারে। ফলে প্রকৃত ঘটনা কী ঘটেছে তা বোঝার আগেই তারা পাল্টা আক্রমণ করে বসতে পারে।
এমন এক হটলাইন থাকলে কোনো সরকার অন্য সরকারকে দ্রুত জানাতে পারবে যে, তাদের অস্বাভাবিক কোনো এআই অপারেশন নিছকই দুর্ঘটনাজনিত, অননুমোদিত বা বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন রয়েছে, যাতে এটাকে কোনো ইচ্ছাকৃত রাষ্ট্রীয় আগ্রাসন হিসেবে ধরে নেওয়া না হয়।
তবে ‘জনস হপকিন্স স্কুল অফ অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর কার্লা ফ্রিম্যানসহ অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সামরিক সংকট যোগাযোগ হটলাইনের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘স্পাই বেলুন বা গুপ্তচর বেলুন ঘটনার’ সময় মার্কিন সমকক্ষদের ফোন ধরতে চীনা কর্মকর্তারা অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।
জানুয়ারিতে ‘ওয়ার অন দ্য রকস’ সাময়িকীতে প্রকাশ পাওয়া এক নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, চীনা আমলাতন্ত্রের কঠোর ‘টপ ডাউন’ ক্ষমতা কাঠামোর কারণে মার্কিন সমকক্ষদের সঙ্গে কোনো আলোচনার সময় নিচ বা মাঝারি সারির কর্মকর্তারা কোনো ধরনের নিজস্ব উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন না।
“চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থার শীর্ষ নেতৃত্ব কোনো প্রতিক্রিয়া চূড়ান্ত না করা পর্যন্ত দেশটির কেউ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চান না। আর এই সিদ্ধান্ত নিতে কয়েক দিন বা তার চেয়েও বেশি সময় লেগে যেতে পারে।”
ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের দৃষ্টিভঙ্গি
ব্রুকিংস-সিংহুয়া প্রস্তাবগুলোকে এ মুহূর্তে দুই সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন জানানো হয়নি। তবে চীন ক্রমাগত তাদের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আমলাতন্ত্রের ভেতরেই এআইকে স্থান দিচ্ছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিভাগের আনুষ্ঠানিক পোর্টফোলিও হচ্ছে এআই। বিভাগটি পারমাণবিক অস্ত্র, পরমাণু বিস্তার রোধ, মিসাইল ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখভাল করে থাকে।
জুনে জেনিভায় জাতিসংঘের এক বৈঠকে চীনের নিরস্ত্রীকরণ বিষয়ক রাষ্ট্রদূত শেন জিয়ান বলেছেন, সামরিক ক্ষেত্রে এআইযের ব্যবহার কৌশলগত স্থিতিশীলতাকে ব্যাহত করতে এবং ভুল হিসাব-নিকাশ ও সংঘাত বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
ফলে অস্ত্রশস্ত্র অবশ্যই মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত। পাশাপাশি চীন এও যুক্তি দিয়েছে, এআই নিরাপত্তা যেন প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতা তৈরির কোনো অজুহাত হয়ে না দাঁড়ায়।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটনে এআই নিয়ন্ত্রণের জন্য এমন কোনো একক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিভাগ নেই। এর পরিবর্তে জাতীয় নিরাপত্তা নীতি হোয়াইট হাউসের ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল’, ‘স্টেট ডিপার্টমেন্ট’, পেন্টাগন ও অন্যান্য সংস্থার মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে।
উভয় সরকারই এমন যে কোনো পদক্ষেপের ব্যাপারে সতর্ক রয়েছে, যা তাদের নিজেদের প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে মন্থর করে দিতে পারে।
ডনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন এআই উন্নয়নে ব্যাপক বিধিনিষেধ চীনকে অতিরিক্ত সুবিধা পাইয়ে দিতে পারে।
অন্যদিকে, বেইজিংয়ের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণই আমেরিকান আধিপত্য ধরে রাখার এক সুকৌশলী প্রচেষ্টা।