
আমবাগান হওয়ার ফলে উপজাত বা উপপণ্যের (বাইপ্রোডাক্টস) খড়, তুষ, খুদের অভাবে গবাদিপশু পালনের ‘ইনপুট’ আর নেই। ফলে গ্রামগুলো ক্রমে গৃহপালিত পশুহীন সুনসান গ্রামে পরিণত হচ্ছে। নারীর ক্ষমতা ছিল ঘরের খাবার উৎপাদনে। এটা ছিল ছোট আয়ের উৎস, এগুলোর ওপর ভিত্তি করে তিনি পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন সিদ্ধান্তগুলো নিতে পারতেন।
জোগান দিতে পারতেন স্কুলের টিফিন, কিস্তির খরচ, শিশুর শখের খেলনা, টিউশন ফি, মেলার খরচ, হাঁড়িপাতিলের দাম ইত্যাদি। নারীর এই অবস্থান জিডিপি বা বাজারে দেখা যায় না। কিন্তু বাস্তবে খুব শক্তিশালী ব্যাপক বাণিজ্যিক আম চাষের ফলে নারীর এই অদৃশ্য ক্ষমতা ভেঙে যাচ্ছে, নারী সামান্য সিদ্ধান্তের জন্যও অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছেন।
আমিরজানের ঠিকানা নিয়ে তাঁদের গ্রামে না গেলে, নারী–কিশোর–কিশোরীদের সঙ্গে কথা না বললে পরিস্থিতির ভয়াবহতার সিকি ভাগও বোঝা যাবে না। ধান কাটার পর পরবর্তী ফসল বোনার আগপর্যন্ত মাঠগুলো শিশু–কিশোরদের খেলার মাঠ হয়ে যেত। আমবাগানে সে সুযোগ আর নেই। ডিম, দুধ—সবই এখন ‘পাস্তুরিত’ কিনতে হয় নগদে। আগে ডিম, দুধ, মাঝেমধ্যে মাংস পরিবারে সহজলভ্য ছিল। এখন সবই কিনতে হয়, অনেক পরিবার কিনতে পারে না, ফলে শিশু ও নারীর পুষ্টিঝুঁকি বাড়ছে।
এমন গ্রাম কি আমরা চেয়েছিলাম, যেখানে শিশুদের খেলার জায়গা নেই, খড় নেই, তুষ নেই, খুদ নেই, হাঁস–মুরগি–গরু–ছাগল নেই। শুধু নারীরা যে ‘ফিনিশ’ হচ্ছেন তা–ই নয়, প্রান্তিক ভূমিহীন খেতমজুর, বিশেষ করে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীদের অবস্থাও কাহিল।
পোরশার আমনারায়ণপুর গ্রামের খেতমজুর ইব্রাম ওঁরাও জানালেন, ‘হামাগের তো নিজের জমিন নাই। অন্যের জমিত মজুর করি চলি। জমির মালিকেরা খ্যাত-খামার বাদ দিয়ে আমবাগান করে ফ্যালায় মজুরি দিয়ে কাম করার দিন ফুরায় গেছি।’ আগে যেখানে ধান কাটার কাজ চলত মাস ধরে, এখন ‘য্যাকনা ধান আবাদ হছিল, এক হপ্তার মধ্যেই কাটা হই গিছি’।