
‘ক্যান্সার নিয়ে নীরব নয়, সচেতন হই। লজ্জা নয়, সময়মতো চিকিৎসাই হোক আমাদের শক্তি’ এই স্লোগান নিয়ে ইন্টারন্যাশাল গাইনোকোলজিক্যাল ক্যান্সার সচেতনতা মাস শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) শহীদ ডা. মিলন হলে গাইনোকোলজিক্যাল অনকোলজি বিভাগ ও ভারতের মেডিস্থান হেলথকেয়ার-অলকিউর উদ্যোগে এবং এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সাইন্সেসের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সহায়তায় ‘ওভারিয়ান ক্যান্সার: বিয়ন্ড সার্জারি’ শীর্ষক একটি বৈজ্ঞানিক অধিবেশন ও সিএমই এবং স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী। বিশ্ববিদ্যালয়ের বি ব্লকের সামনে থেকে বেলুন ও কবুতর উড়িয়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা উদ্বোধন করেন তিনি।
এসময় অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, আন্তর্জাতিক গাইনোকোলজিক্যাল ক্যান্সার সচেতনতা মাস এবং ‘ওভারিয়ান ক্যান্সার: বিয়ন্ড সার্জারি’ শীর্ষক বৈজ্ঞানিক অধিবেশন ও সিএমই প্রোগ্রাম এই কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে, এর মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধি পাবে। গাইনোকোলজিক্যাল ক্যান্সার প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প নাই। গাইনোকোলজিক্যাল ক্যান্সার হতে পারে এরকম ছোট ছোট উপসর্গকেও অবহেলা নয়। যদি একটু আগেই গাইনোকোলজিক্যাল ক্যান্সারের উপসর্গগুলো চিহ্নিত করা যায় তবে এই ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব। নারীদের জীবন রক্ষা করা সম্ভব।
বিএমইউ উপাচার্য বলেন, প্রতি বছর বিশ্বে গাইনোকোলজিক্যাল ক্যান্সারে ১৪ লাখ নারী আক্রান্ত হয় এবং বাংলাদেশে আক্রান্ত হয় ৮০ হাজার। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে লজ্জা ভয়কে জয় করে গাইনোকোলজিক্যাল ক্যান্সারের উপসর্গগুলোকে অবহেলা না করে সময় মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে অবশ্যই চিকিৎসাসেবা নিতে হবে।

শোভাযাত্রায় বিএমইউর উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ, উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তফা কামাল, সার্জারি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. মো. ইব্রাহীম সিদ্দিক, প্রক্টর অধ্যাপক ডা. শেখ ফরহাদ, গাইনোকোলজিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস, অধ্যাপক ডা. ফওজিয়া হোসেন, অধ্যাপক ডা. আশরাফুন্নেসা, অধ্যাপক ডা. শিরিন আক্তার বেগম, উপাচার্যের একান্ত সচিব-১ অধ্যাপকা ডা. মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, উপ-রেজিস্ট্রার মো. আলমগীর হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
পরে শহীদ ডা. মিল্টন হলে গাইনোকোলজিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. জান্নাতুল ফেরদৌসের সভাপতিত্বে ‘ওভারিয়ান ক্যান্সার: বিয়ন্ড সার্জারি’ শীর্ষক একটি বৈজ্ঞানিক অধিবেশন ও সিএমই প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের পরিচয় করিয়ে দেন অধ্যাপক ডা. লতিফা আক্তার।
বৈজ্ঞানিক অধিবেশনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএমইউর সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারজানা শারমিন বিথি, ভারতের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সাইন্সেসের ডিরেক্টর ও হেড (গাইনোকোলজি) ডা. প্রীতিলতা চৌধুরী, এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সাইন্সেসের সিনিয়র কনসালটেন্ট ও চেয়ারম্যান (অনকোলজি সার্ভিসেস) ডা. পুনীত গুপ্ত।
অধিবেশনে ধন্যবাদ জানান গাইনোকোলজিক্যাল অনকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মনোয়ারা বেগম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারহানা খাতুন ও ডা. মেহের নিগার মুনমুন। অনুষ্ঠানে মেডিস্থান হেলথকেয়ার-অলকিউরের পরিচালক ডা. মাসকুর আহমেদ উসমানী উন্নত ক্যানসার চিকিৎসা ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করার লক্ষ্যে তাদের চলমান উদ্যোগ তুলে ধরেন।
বিএমইউর গাইনোকোলজিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, সেপ্টেম্বর মাস বিশ্বব্যাপী গাইনোকোলজিক্যাল ক্যান্সার সচেতনতা মাস হিসেবে পালিত হয়। এই মাসের মূল উদ্দেশ্য হলো নারীদের বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতন করা এবং রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে উৎসাহিত করা। জরায়ুমুখ, জরায়ু, ডিম্বাশয়, যোনি ও ভালভার ক্যান্সার নারীদের গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম। অনেক সময় নারীরা শরীরে পরিবর্তন লক্ষ্য করলেও লজ্জা, ভয় বা অবহেলার কারণে চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন। ফলে রোগটি পরে ধরা পড়ে এবং চিকিৎসা আরও কঠিন হয়ে যায়।
ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, অস্বাভাবিক রক্তপাত, মাসিকের ধরনে পরিবর্তন, মেনোপজের পর রক্তপাত, অস্বাভাবিক স্রাব, দীর্ঘদিনের তলপেট ব্যথা, পেট ফুলে থাকা বা অল্প খাবারেই পেট ভরে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে মেনোপজের পর যেকোনো রক্তপাত হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
অন্য বক্তারা বলেন, জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব। জরায়ুমুখের ক্যান্সারের প্রধান কারণ হলো এইচপিভি ভাইরাস। এইচপিভি টিকা এবং নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে এই ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়। তাই নারীদের নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং বয়স ও ঝুঁকি অনুযায়ী নিয়মিত স্ক্রিনিং করা গুরুত্বপূর্ণ। লজ্জা নয়, সচেতনতা প্রয়োজন। নারীর শরীর নিয়ে কথা বলতে আমাদের সমাজে এখনও অনেক সংকোচ রয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, শরীরের কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন নিয়ে কথা বলা লজ্জার বিষয় নয়।
বক্তারা বলেন, সময়মতো চিকিৎসা নিলে অনেক ক্যান্সার সফলভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব। তাই নিজের বা কাছের কোনো নারীর শরীরে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এই সচেতনতা মাসে আমাদের সবার কাছে আহ্বান, নিজের শরীরকে জানুন। লক্ষণকে অবহেলা করবেন না। নিয়মিত স্ক্রিনিং করুন। এইচপিভি টিকা সম্পর্কে জানুন। প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসা নিন। একটি সচেতন পরিবার একজন নারীর জীবন বাঁচাতে পারে।
এসইউজে/এমএমএআর