
বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক এত গভীর যে কৃষিকে বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়নের পূর্ণাঙ্গ চিত্র কল্পনা করা যায় না। স্বাধীনতার পর জনসংখ্যা বেড়েছে, কৃষিজমি কমেছে, নগরায়ণ ও শিল্পায়ন বিস্তৃত হয়েছে। তবু ধান, সবজি, মাছ, ডিম, দুধ ও ফলসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই অগ্রগতির পেছনে রয়েছে লাখ লাখ মানুষের শ্রম, সঞ্চয় ও ঝুঁকি নেওয়ার সাহস। অথচ যারা দেশের মানুষের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করেন, তাঁদের বড় একটি অংশই অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় দিন কাটান। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৫ সালের ক্ষুদ্র খাদ্য উৎপাদনকারীর আয় ও উৎপাদনশীলতা বিষয়ক জরিপ সেই বৈপরীত্য স্পষ্ট করেছে। জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট খাদ্য উৎপাদনকারীর ৫৩ দশমিক ৬৫ শতাংশই ক্ষুদ্র কৃষক। অথচ তাঁদের গড় বার্ষিক আয় মাত্র ৩৩ হাজার ৬৩৯ টাকা। বিপরীতে সব খাদ্য উৎপাদনকারীর গড় আয় ৭৮ হাজার ২৮৬ টাকা এবং বৃহৎ উৎপাদনকারীর ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৫৬ টাকা। অর্থাৎ খাদ্য উৎপাদনে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও ক্ষুদ্র উৎপাদকেরা আয়ের দিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে। এই ব্যবধান শুধু আয়বৈষম্যের নয়, কৃষি উন্নয়নের বর্তমান কাঠামোরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে।
ক্ষুদ্র খাদ্য কৃষক বলতে শুধু শস্যচাষিকে বোঝায় না। জরিপে ফসল, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, বনজ সম্পদ ও স্থায়ী ফসল উৎপাদনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে দেশের খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার বড় অংশই ক্ষুদ্র উৎপাদকদের ওপর নির্ভরশীল। তাঁদের জমি, মূলধন ও প্রযুক্তির সুযোগ সীমিত। অনেকেই পারিবারিক শ্রমের ওপর নির্ভর করে উৎপাদন চালান। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোগবালাই, বাজারদরের ওঠানামা এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকিও তাঁদেরই বেশি বহন করতে হয়। জরিপে দেখা যায়, ক্ষুদ্র উৎপাদকের আয়ের ৮৪ দশমিক ৫ শতাংশ আসে প্রাণিসম্পদ খাত থেকে এবং এ খাত থেকে গড় বার্ষিক আয় ২৮ হাজার ৪২১ টাকা। এরপর রয়েছে মৎস্য, বনজ ও ফসল উৎপাদন। জীবিকা বহুমুখী হলেও আয়ের পরিমাণ এত কম যে তা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা তৈরি করতে পারছে না। বরং সীমিত সম্পদ নিয়ে একাধিক খাতে যুক্ত থাকার বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের আর্থিক দুর্বলতারই প্রতিফলন।
