
শেষ ওভারে আম্পায়ারের একটি সিদ্ধান্তে খানিকটা মেজাজ হারালেন আকসার প্যাটেল। লেগ আম্পায়ারের সঙ্গে কথা বলে সেই মূল আম্পায়ারের সেই সিদ্ধান্ত পাল্টেও ফেললেন শ্রেয়াস আইয়ার। ম্যাচ শেষে সেই আকসারের মুখে চওড়া হাসি। হাসিমুখে প্রতিপক্ষের পিঠ চাপড়ে দিলেন শ্রেয়াসও। ভারতের ক্রিকেটারদের শরীরী ভাষাতেই ফুটে উঠছিল, “বড় বাঁচা বেঁচে গেছি…!’
ক্রিকেট ইতিহাসে কত অঘটনই তো হয়েছে যুগে যুগে। সবগুলিকে ছাড়িয়ে সবচেয়ে বড় অঘটনের সম্ভাবনা জাগিয়েছিল জাপান। বিশ্ব ক্রিকেটের পরাশক্তি, গত দুটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন ভারতের মনে ভয় ধরিয়েও জিততে পারল না তারা একটুর জন্য।
ঐতিহাসিক ম্যাচটিতে জাপানকে ২ রানে হারাল ভারত।
দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর পূর্তি উদযাপনের অংশ এই ম্যাচ। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর চুক্তির ভিত্তিতে ‘স্পোর্ট ৭৫’ উদ্যোগের সূচনা হলো এই ম্যাচ দিয়ে।
যদিও ভেজা মাঠের কারণে ম্যাচ নেমে এসেছিল ৫ ওভারে। তবু জাপান জিততে পারলে হয়তো ক্রিকেট ইতিহাসের স্মরণীয় জয় হতো এটি।
আইসিসি টি-টোয়েন্টি র্যাঙ্কিংয়ে জাপান ৪১তম দল। তবে স্রেফ এইটুকুতেই পুরো চিত্র ফুটে উঠছে না। পূর্ণ সদস্য কোনো দেশের বিপক্ষে এটিই তাদের প্রথম ম্যাচ। সহযোগী সদস্যগুলোর শীর্ষ দলগুলির সঙ্গেও নিয়মিত খেলার সুযোগ তাদের হয় না।
আশেপাশে থাকা দলগুলির বিপক্ষে তাদের পারফরম্যান্স অবশ্য বেশ ভালো। ৬২ ম্যাচের ৪১টিই তারা জিতেছে। তবে ভারতের বিপক্ষে তারা লড়াই করতে পারবে, ক্রিকেট বিশ্বের কারও সুদূরতম কল্পনাতেও হয়তো ছিল না। সে অভাবনীয় ঘটনাই ঘটিয়ে দিয়েছে সূর্যোদয়ের দেশটি।
সানো ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট গ্রাউন্ডের মন্থর ও টার্নিং উইকেটে ভারত তুলতে পারে ৫ ওভারে স্রেফ ৩২ রান। জাপান আটকে যায় ৩০ রানে।
স্পিন সহায়ক উইকেটে দুই দলই শুধু স্পিনার দিয়েই শেষ করে ৫ ওভার। দুই দলই বাউন্ডারি মারতে পারে মাত্র দুটি করে।
২ হাজার দর্শক ধারণ ক্ষমতার মাঠ অনুমিতভাবেই ভরে গিয়েছিল ম্যাচ শুরুর অনেক আগে। মাঠজুড়ে ছিল উৎসবের আবহ। তবে তাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়ে খেলার শুরুর অপেক্ষা বাড়তেই থাকে বৃষ্টিভেজা মাঠে। অনেক অপেক্ষার পর শেষ সময়ে গিয়ে ন্যূনতম ৫ ওভারের ম্যাচ নির্ধারিত হয়।
উইকেটের মন্থর ও টার্নিং চরিত্র ফুটে উঠে প্রথম ওভার থেকেই। সাঞ্জু স্যামসন যদিও একটি চার মারতে পারেন প্রথম ওভারে। তবে ওভারের শেষ বলেই আভিশেক শার্মাকে বিদায় করেন ১৭ বছর বয়সী বাঁহাতি স্পিনার চার্লি হারা-হিঞ্জ।
এই নিয়ে এ বছর পাঁচবার ‘গোল্ডেন ডাক’ পেলেন আভিশেক। এক পঞ্জিকাবর্ষে যা যৌথভাবে সর্বোচ্চ। এছাড়াও এবছর আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে শূন্যতে ফিরলেন তিনি সাতবার, স্বীকৃত টি-টোয়েন্টিতে ১০ বার। এই দুটিও রেকর্ড।
স্যামসন আউট হয়ে যান পরের ওভারে। ইশান কিষান নেমেও কিছু রিভার্স সুইপ ও সুইচ হিটের চেষ্টা করলেও সুবিধে করতে পারেননি।
রান তুলতে ধুঁকেছেন শ্রেয়াসও। শেষ ওভারে জীবন পাওয়ার পর একটি বাউন্ডারি মারতে পারেন তিনি। তবে আউট হয়ে যান ইনিংস শেষের আগে (১২ বলে ১৬)।
উইকেট যদিও ব্যাটিংয়ের জন্য কঠিন। তবে লক্ষ্য স্রেফ ৩৩ বলে জাপানের সামনে হাতছানি ছিল ইতিহাস গড়ার। কিন্তু সুযোগটি তারা নিতে পারেননি।
প্রথম ওভারে কিষানের থ্রোয়ে রান আউট হন ওপেনার লাচলান ইয়ামতো-লাকে। বল হাতে দুই ওভার দারুণ অফ স্পিন করা ইব্রাহিম তাকাহাসি ব্যাটিংয়ে নেমে প্রথম বলে স্লগ সুইপে চার মারলেও আউট হয়ে যান পরের বলে।
জাপান বড় শট খেলতে না পারলেও লড়াই চালিয়ে যায়। শেষ ওভারে প্রয়োজন পড়ে ৮ রানের। আকসারের প্রথম বলে রান হয়নি, দ্বিতীয় বল থেকে আসে সিঙ্গল। তৃতীয় বলটি হয় ওয়াইড।
পরের ডেলিভারিতে আবার রিভার্স সুইপ করার চেষ্টা করেন বাঁহাতি ব্যাটার শিরাই-পাটমোরে। বল তার লেগ স্টাম্পের বাইরে দিয়ে চলে যায়। ওয়াইডের সঙ্কেত দেন জাপানি আম্পায়ার ক্রিস থুর্গাতে। সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ জানাস বোলার আকসার। লেগ আম্পায়ার ক্রিস ব্রাউনের সঙ্গে কথা বলেন অধিনায়ক শ্রেয়াস। ব্রাউন গিয়ে মূল আম্পায়ারের সঙ্গে কথা বলার পর তুলে নেওয়া হয় সেই ওয়াইড।
মূলত ব্যাটার আগেই স্টান্স পরিবর্তন করে বাঁহাতি থেকে ডানহাতি হয়ে যাওয়ায় বলটি তার অফ স্টাস্পের একটু বাইরে দিয়ে গেছে বলে ধরে নেওয়া নয়। এজন্যই দেওয়া হয়নি ওয়াইড।
পরের তিন বলে তিনটি সিঙ্গলের বেশি নিতে পারেননি জাপানের দুই ব্যাটসম্যান। কোনোরকমে জিতে স্বস্তিতে মাঠ ছাড়ে ভারতীয় দল।
১৬ রান করেই ম্যান অব দা ম্যাচ হন ভারতীয় অধিনাক শ্রেয়াস।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
ভারত: ৫ ওভারে ৩২/৪ (স্যামসন ৯, আভিশেক ০, কিষান ৩, শ্রেয়াস ১৬, তিলাক ১*, দুবে ০*; হারা-হিঞ্জ ২-০-১৭-২, তাকাহাশি ২-০-১৩-১, ইটো-ডেভিস ১-০-২-১)।
জাপান: ৫ ওভারে ৩০/৩ (কেডোওয়াকি-ফ্লেমিং ১২, ইমামোতো-লাকে ১, তাকাহাশি ৪, ইটো-ডেভিস ৯*, শিরাই ২*; আকসার ২-০-৭-০, ওয়াশিংটন ২-০-১৩-২, বিষ্ণই ১-০-১০-০)।
