রাজস্ব আদায়ে ধীরগতি, এনবিআরের সিদ্ধান্ত বদলে চাপে ব্যবসায়ীরা
ছবিটি এআইয়ের সহায়তায় তৈরি
দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ঘাড়ে ফের বড় লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪৭ শতাংশ বাড়িয়ে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণে শুরু থেকেই কঠোর অবস্থানে সংস্থাটি। কর ফাঁকি রোধ, বকেয়া কর আদায়, কর জাল বাড়ানোসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে এনবিআর। তবে বাজেট পাশ হওয়ার পর ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্ন পদ্ধতি থেসে সরে এসে ফের প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন, প্যাকেজ ভ্যাট চালু করাসহ এনবিআরের একাধিক সিদ্ধান্তে বিচলিত খাত সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, এনবিআরের নানামুখী উদ্যোগের পরও রাজস্ব আদায় সন্তোষজনক নয়। এ কারণে প্রায় তিন মাসের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রাজস্ব আদায়ের তথ্য অফিশিয়ালি প্রকাশ করেনি এনবিআর। এ বিষয়ে এনবিআরের দায়িত্বশীল কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের এক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, আয়কর আইনের পরিবর্তন ও ভ্যাট রিটার্ন জমার নিয়ম পরিবর্তনের কারণে সমন্বয় করতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। এখানে গোপন করার কিছু নেই।
তবে জানা গেছে, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও দেশে চলমান জ্বালানি সংকটে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। যার প্রভাব পড়েছে ব্যক্তি আয় ও রাজস্ব আদায়ে।
এছাড়া আগে কর দিলে আর্থিক প্রণোদনার ঘোষণা থাকলেও সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত মাত্র সাড়ে ছয় লাখের কিছু কম রিটার্ন দাখিল হয়েছে। গত অর্থবছর পর্যন্ত জরিমানা ছাড়া আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার নির্ধারিত তারিখ ছিল ৩০ নভেম্বর। তবে কয়েক দফা বাড়িয়ে তা ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। গত কর বছরে সবশেষ করবর্ষে রিটার্ন জমা দিয়েছিলেন ৪৯ লাখ ৫৮ হাজার করদাতা। এনবিআরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে টিআইএনধারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩১ লাখ।
ফের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন, উদ্বেগ ব্যবসায়ীদের
ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও জটিলতা কমাতে গত বাজেটে প্রতি মাসের পরিবর্তে তিন মাস পরপর ভ্যাট রিটার্ন জমা ও ভ্যাট পরিশোধের সুযোগ দেয় সরকার। তবে নতুন ব্যবস্থা চালুর পর প্রথম দুই মাসে ভ্যাট আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করছে এনবিআর।
অর্থাৎ তিন মাস পরপর ভ্যাট পরিশোধের পরিবর্তে আগের মতো প্রতি মাসেই ভ্যাট পরিশোধের নিয়ম ফিরিয়ে আনা হতে পারে। সম্প্রতি এনবিআরের ভ্যাট নীতি শাখা অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করতে চায় সরকার।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘তিন মাস পরপর ভ্যাট রিটার্ন দেওয়ার পদ্ধতি উঠিয়ে দেওয়া আমাদের জন্য ভালো সংবাদ না। প্রতি মাসে মাসে কি ভ্যাট রিটার্ন দিব না ব্যবসা করবো? অনলাইনে দেওয়ার জন্য বলা হয়, কিন্তু অনলাইন তো আমরা বুঝি না। অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন দিতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রস্তুত নন। তিন মাস পরপর না হলে কাউকে ধরে বলা যায় যে একটু করে দাও। অনলাইনে দিলেও অফলাইনে কাগজপত্র জমা দেওয়া লাগে। এটা খুবই টেকনিক্যাল কাজ।’
গুলিস্তানের পোশাক ব্যবসায়ী তুহিন ফিরোজী বলেন, ‘প্রতি মাসে রিটার্ন দেওয়াটা একটু কঠিন। কাজের সময় থেকে আলাদা সময় বের করে ভ্যাট অফিসে যাওয়া লাগে। এটা ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য কঠিন। তিন মাস পরপর দেওয়ার সুযোগ থাকলে তাতে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য সুবিধা হয়, প্রতি মাসে টাকা দেওয়ার চাপ থাকে না।’
দেশে বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধিত বা বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বরধারী (বিআইএন) ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮ লাখের বেশি। এর মধ্যে প্রতি মাসে প্রায় ৫ লাখ রিটার্ন জমা পড়ে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই ও আগস্টের সাময়িক হিসাবে দেখা গেছে, আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ভ্যাট আদায় প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, গত জুলাইয়ে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৯ হাজার ৩০১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১১ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। আবার আগস্টের সাময়িক হিসাবে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৮ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা। আগের বছরের আগস্টে এর পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৮১ কোটি টাকা। এছাড়া গত জুনের তুলনায় জুলাইয়ে ভ্যাট রিটার্ন জমার সংখ্যাও কমেছে। জুনে ৩ লাখ ২৮ হাজার ভ্যাট রিটার্ন জমা পড়লেও জুলাইয়ে তা কমে ৩ লাখ ৬ হাজারে নেমেছে।
এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সেপ্টেম্বরের পর এটা রিভিউ হবে। তিন মাস পরপর রিটার্ন জমার সুযোগ বহাল রেখে প্রতি মাসে ভ্যাটের অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করা হতে পারে। এতে ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমবে।
এদিকে খুচরা দোকানে ফের প্যাকেজ ভ্যাট বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে এনবিআরের। চলতি অর্থবছরের বাজেটে প্যাকেজ ভ্যাট বসানো নিয়ে জল্পনা-কল্পনা থাকলে সিদ্ধান্ত আসেনি। তবে প্রান্তিক পর্যায়ে ভ্যাটের আওতা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
এনবিআরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতি মাসে ইউনিয়ন পর্যায়ের দোকানপাট ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ৫০০ টাকা, উপজেলা পর্যায়ে ১ হাজার টাকা এবং জেলা সদর ও জেলা পৌর শহর এলাকায় ২ হাজার টাকা নির্ধারিত ভ্যাট আরোপ করা হতে পারে। মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমেও এই ভ্যাট দেওয়া যাবে। এতে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ভ্যাটের আওতায় আসছেন।
আরও জানা গেছে, এরই মধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় দোকান বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করছে ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তারা। তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসেই কোন ব্যবসায়ীদের ওপর ভ্যাট আরোপ হবে, তা ঠিক করা হবে।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘এ ধরনের সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ীদের জন্য কষ্টের। এখন ব্যবসা-বাণিজ্য অনেক কমেছে। কয়েক বছর যাবৎ ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। দোকানে গিয়ে দেখবেন কোনো বেচাকেনা নেই। এমন পরিস্থিতিতে যদি একটার পর একটা সিদ্ধান্ত আসে। ব্যবসায়ী আয়কর দেন, ভ্যাট দেন অন্যান্য খরচ তো দিচ্ছেনই। আবার প্যাকেজ ভ্যাটের কথা শোনা যাচ্ছে। এটা কী হচ্ছে বুঝি না। এতে সরকার কীভাবে আগাবে সেটাও বুঝি না। মানুষ চরম অসন্তুষ্ট হয়ে পড়ছে। এনবিআরের দুদিন পরপর সিদ্ধান্তের পরিবর্তন ব্যবসা-বাণিজ্যে সুফল বয়ে আনবে না।’
আইন অনুযায়ী, ব্যবসার বার্ষিক বিক্রয় বা লেনদেন ৫০ লাখ টাকার বেশি হলে ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। এই ধরনের নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সাধারণত ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট প্রযোজ্য হয়। কিন্তু ৫০ লাখ টাকার নিচে বিক্রি বা লেনদেন হয়, এমন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক নয়।
আর এখন ন্যূনতম ভ্যাটের বিধান চালুর মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ের দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতায় আনতে চায় এনবিআর।
এ বিষয়ে করবিদ স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, ‘উদ্যোগ ভালো। এ জন্য সচেতনতা তৈরি করতে হবে যেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ভীত না হন।’
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকারের এসব সিদ্ধান্তে গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্থ হয় কী না সেটা দেখতে হবে। দেখা গেলো প্যাকেজ ভ্যাটের অজুহাতে বিক্রেতা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। এখানে নজরদারিটা কীভাবে হবে, ক্রেতাকে কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া যাবে, এসব জিনিস ভেবে সিদ্ধান্তগুলো নিতে হবে।’
এসএম/এমএমএআর
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) আয়োজিত দেশের অন্যতম বৃহৎ ও জনপ্রিয় করপোরেট ফুটবল টুর্নামেন্ট ‘বিজিএমইএ কাপ-২০২৬’ এর ট্রফি উন্মোচন…