
দেশের আকাশসীমার ওপর দিয়ে বিদেশি উড়োজাহাজ চলাচলের ফি বা ‘ওভারফ্লাই ফি’ থেকে সরকারের রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে।
বিগত তিন বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রত্যেক বছরের প্রথম পাঁচ মাসে বিমানবন্দরটির আকাশসীমা ব্যবহারের ফি বাবদ আয় ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছর এই আয় গত দুই বছরকে ছাড়িয়ে গেছে।
সম্প্রতি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালকের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এভিয়েশন খাতের কেউ কেউ বলছেন, নতুন রেডার ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল-এটিসি সিস্টেম স্থাপন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন রুটে ফ্লাইট বৃদ্ধি পাওয়া এবং বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারকারী বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর সংখ্যা বাড়ার কারণেই মূলত ওভারফ্লাই ফি থেকে রাজস্ব সংগ্রহ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তবে কেউ বলছেন, শুধু নতুন রেডার সিস্টেমের নজরদারির কারণে আয় বেড়েছে—এই দাবিটি আরও ব্যাখ্যার দরকার আছে। একজন বিশেষজ্ঞ ডলারের দাম বৃদ্ধিসহ আরো কিছু কারণ তুলে ধরেছেন।
কোন বছর কত আয়
নথি অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসের (জানুয়ারি-মে) ওভারফ্লাই ফি বাবদ আয়ে ক্রমাগত প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ওভারফ্লাই ফি বাবদ রাজস্ব আদায় হয়েছিল প্রায় ২৬৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা।
পরের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের একই সময়ে এই আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৩২১ কোটি ৪১ লাখ টাকায়।
আর ২৭ কোটি টাকার বেশি বেড়ে ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে এই আয় দাঁড়ায় প্রায় ৩৪৮ কোটি ৯২ লাখ টাকায়।
প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ওভারফ্লাই ফি থেকে আয় হয়েছিল ৫৩ কোটি ৫ লাখ টাকা, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বেড়ে দাঁড়ায় ৬৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকায়।
আর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এই আয় ৮০ কোটি ১৬ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। একইভাবে ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও মে মাসেও আয়ের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আয় হয়েছে ৪৭ কোটি ৪৩ লাখ ৯৭ হাজার ৮০ টাকা। ২০২৫ সালে ৫৮ কোটি ২৯ লাখ ৭৯ হাজার ১১৩ টাকা এবং ২০২৬ সালে ৬৯ কোটি ৫৮ লাখ ২৬ হাজার ২২৬ টাকা রাজস্ব অর্জিত হয়।
২০২৪ সালের মার্চ মাসে আয়ের পরিমাণ ছিল ৫৬ কোটি ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০০ টাকা, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে বেড়ে ৫৮ কোটি ২৯ লাখ ৭৮ হাজার ৮৭০ টাকা হয়। ২০২৬ সালের মার্চে এই আয় বেড়ে হয় ৬২ কোটি ১৭ লাখ ৮০ হাজার ১০৮ টাকা।
এ ছাড়া মে মাসের হিসাবে ২০২৪ সালে ৫৫ কোটি ২১ লাখ ১৮ হাজার ৫০০ টাকার রাজস্ব ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮ কোটি ২২ লাখ ৪৩ হাজার ৭৮১ টাকায়। আর ২০২৬ সালে তা আরও বেড়ে ৭০ কোটি ৪৭ লাখ ৫২ হাজার ৫২০ টাকায় পৌঁছায়।
অন্যদিকে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ওভারফ্লাই ফি বাবদ সর্বমোট ৮০৫ কোটি ১ লাখ ৬০ হাজার ৩৬৫ টাকা ২০ রাজস্ব অর্জিত হয়েছে।
এর মধ্যে প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৫) অর্জিত রাজস্বের পরিমাণ ছিল ৩৮৮ কোটি ১০ লাখ ১৫ হাজার ৪৫১ টাকা। পরবর্তী ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন ২০২৬) এই আয়ের পরিমাণ আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১৬ কোটি ৯১ লাখ ৪৪ হাজার ৯১৪ টাকায়।
কী কারণে রাজস্ব বাড়ছে
২০২১ সালের এপ্রিলে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সিএনএস-এটিএম (কমিউনিকেশন, নেভিগেশন অ্যান্ড সার্ভিল্যান্স-এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) ব্যবস্থাসহ রেডার স্থাপন নামে একটি প্রকল্প অনুমোদন দেয় সরকার।
নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অত্যাধুনিক এই রেডার সিস্টেম স্থাপনের কাজ শেষ হয়। এরপর থেকে এই সিস্টেমের অনানুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। গত ২০ এপ্রিল এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সাবেক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম।
ওভারফ্লাই থেকে আয় বাড়ার পেছনে এই রেডার সিস্টেমের ভূমিকা আছে বলে মনে করেন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মাসওয়ারী তুলনামূলক হিসেবে ওভারফ্লাই থেকে আয় বেড়েছে। এর পেছনে মূল কারণ হচ্ছে নতুন রেডার সিস্টেম। এই সিস্টেম স্থাপনের কারণেই মূলত এই আয় বেড়েছে। আগের তুলনায় আকাশসীমায় নজরদারি বাড়ানো সম্ভব হয়েছে, যে কারণে আয়ও বেড়েছে। আগে আমরা এই আয় থেকে বঞ্চিত হতাম।”
বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট (এটিএম) দেখভালকারী সংস্থা বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।
সংস্থাটির মুখপাত্র মুহাম্মাদ কাউছার মাহমুদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নতুন রেডার সিস্টেম বসায় আকাশসীমা নজরদারি বেড়েছে, ফলে ওভারফ্লাইয়ের ক্ষেত্রে আগে যে আয় থেকে আমরা বঞ্ছিত হতাম, এখন সেখানে আয় বেড়েছে সরকারের।
“এ ছাড়া বেশকিছু নতুন এয়ারলাইন্স যেমন-ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স, ফিটস এয়ার, রিয়াদ এয়ারসহ বেশ কয়েকটি এয়ারলাইন্স এখানে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছে। সবমিলিয়ে আয় বেড়েছে।”
‘আয় আরও বাড়ানো সম্ভব’
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ওভারফ্লাই থেকে আয় বাড়া অবশ্যই ইতিবাচক।
“এতদিন তো আমরা যে রেডার সিস্টেম ইউজ করছিলাম, ওটা অনেক পুরনো আমলের মেনুয়াল রাডার সিস্টেম ছিল। এখন তো থ্যালিস-এর যে নতুন রেডার সিস্টেম ইউজ করা হচ্ছে, এটা সর্বাধুনিক। এবং এর ফলে আমাদের নজরদারি অনেক দূর বাড়ানো সম্ভব।
“তবে এখানে নানা রকম সীমাবদ্ধতার কারণে এই রেডারের যে ক্ষমতা, আমাদের সীমানা যতখানি কাভার করা যাবে, সেটা পারছি না। এখানে আমাদের এখনো পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর আধিপত্য থেকে গেছে।”
এজন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর পাশপাশি আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা আইকাও-এর সংশ্লিষ্টতা বাড়ানোর কথাও বলেন তিনি।
“এটা বাড়ানোর জন্যে যে জিনিসটা দরকার, সেটা ত্রিপক্ষীয় সংশ্লিষ্ট দেশগুলো প্লাস আইকাও-এর সংশ্লিষ্টতা লাগবে এবং তাদের অনুমোদন লাগবে। সেগুলো এখনো আমরা অর্জন করতে পারিনি। যার ফলে আমাদের দেশের মধ্যে যে আকাশসীমা আছে, সেটার সম্পূর্ণ রেডারের যে সুফল সেটা পাচ্ছি না। সেটা যদি পেতাম তাহলে আমাদের এই আয় আরও আরও অনেক গুণ বেড়ে যেতে পারত।”
তিনি বলেন, “আয় বেড়েছে সেটা তো পজিটিভ সাইন। আরও বাড়াতে এই ব্যাপারে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের উচিত সরকারের সাথে সমন্বয় করে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া; যাতে আমাদের আকাশসীমা আমরা সম্পূর্ণ তদারকি করতে পারি।”
অন্য আর কোনো কারণ আছে?
তবে, আরেক এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার এ টি এম নজরুল ইসলাম মনে করেন, শুধু নতুন রেডার সিস্টেমের নজরদারির কারণে আয় বেড়েছে—এই দাবিটি আরও ব্যাখ্যার দরকার আছে।
কারণ কোনো বাণিজ্যিক এয়ারলাইন্স ফ্লাইট পরিকল্পনা ছাড়া আকাশসীমা ব্যবহার করে না, তাই আয় বাড়ার পেছনে অন্যান্য বাস্তবসম্মত কারণ থাকতে পারে।
ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়া বা বিনিময় হারের পরিবর্তনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেছেন, “আমার প্রথম সন্দেহ হচ্ছে বা প্রথম ধারণা হচ্ছে ‘বিকজ অব দ্য ডলার বিডিটির কারেন্সির’ বিনিময় হার অনেক বেড়ে গেছে…আগে ৫০০ ডলারে যে টাকাটা ছিল, এখন ৫০০ ডলারের টাকা তো অনেক বেশি… ‘সো দ্যাট কুড বি ওয়ান অব দ্য রিজন’।”
এ ছাড়া আকাশসীমায় ট্রাফিক বা উড়োজাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, “‘সেকেন্ড রিজন ইট কুড বি দ্য নাম্বার অব এয়ারক্রাফট মে বি ইনক্রিজড’… হয়তোবা তারা ওভারফ্লাইয়ের রেটটা চার্জটা বাড়িয়েছে কী না সেটা আমি জানি না…বা অনেকগুলো ট্রাফিক হয়তো এখন বেড়েছে, এটার জন্যও হতে পারে।”
ডিজিটাল সিস্টেমে অটোমেটিক রিপোর্ট জেনারেট হওয়া ও ম্যানুয়াল ভুলের সুযোগ বন্ধ হওয়া প্রসঙ্গে তার মন্তব্য, “আর এখন যে সিস্টেমটা করেছে, এই সিস্টেমটা এটিএস-এএনএস সিস্টেম যেটা আপগ্রেড হইছে, এটার সুবিধা হল যে এটা রিপোর্ট জেনারেট হয়ে যায়…আগে যারা দেখতেন ফিজিক্যালি, তারা হয়তো অমিট করতেন, ভুল হত, এরকম ওই জায়গাগুলো আর সুযোগ নাই এখন।”
পূর্বে কোনো রাজস্ব ‘মিস বা লিকেজ’ হওয়ার একটি দূরবর্তী সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে নজরুল ইসলাম বলেন, “যেটা খুবই রিমোট সম্ভাবনা, খুবই রিমোট…হয়ত বা কোনো কোনো এয়ারক্রাফট মিস হয়ে গেছে, যারা রেভিনিউ জেনারেট করতে পারে নাই, সেটা হয়তো আমাদেরই লোকের ভুল…কিন্তু নরমালি একটা এয়ারক্রাফট যখন যায়, একটা দেশের ওপর দিয়ে একটা নির্দিষ্ট রুট ছাড়া তো যেতে পারবে না…ফ্লাইট প্ল্যান ছাড়া তো কোনো এয়ারস্পেসে যাওয়ার কথা না।”
