র্যাবে থাকা অবস্থায় ২০১০ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বরগুনার পাথরঘাটায় এবং সুন্দরবনে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা তুলে ধরে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য দেন সাব্বির রহমান ওসমানী।
গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে শতাধিক মানুষকে গুম করে হত্যার ঘটনায় তিনটি অভিযোগ এনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছিল প্রসিকিউশন। এরপর ১৪ জানুয়ারি অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। জিয়াউল আহসান সর্বশেষ টেলিযোগাযোগ নজরদারির জাতীয় সংস্থা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মহাপরিচালক ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের আগস্টের মাঝামাঝি তিনি গ্রেফতার হন।
জবানবন্দি মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী বলেন, ২০০৯ সালের অক্টোবরে র্যাব-৮-এ বরিশালে উপ-অধিনায়ক হিসেবে যোগদান করি। তখন র্যাবের ডাইরেক্টর ইন্টেলিজেন্স ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসান স্যার। ২০১০ সালের জানুয়ারির দিকে একদিন রাত্রিকালীন অফিস চলাকালে জিয়াউল আহসান তার সরকারি গাড়ি এবং মাইক্রোবাস নিয়ে ব্যাটালিয়ন সদরে উপস্থিত হন। তিনি সরাসরি অধিনায়কের অফিসে প্রবেশ করেন। কিছুক্ষণ পর আমাকে আমার অধিনায়ক জানান যে, লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসান স্যার আমাকে ডাকছেন। আমি অধিনায়কের অফিসে উপস্থিত হলে জিয়া স্যার কুশল বিনিময় করে জানান যে, তিনি একটি কাজে বের হবেন। আমার অধিনায়ক এবং আমাকেও তার সঙ্গে যেতে হবে। আমি তখন কোনো অপারেশন টিম রেডি করতে হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রয়োজন নেই’। এর পরপরই আমরা জিয়া স্যারের গাড়িতে অধিনায়কসহ উঠে বসি।’
তিনি বলেন, ‘জিয়া স্যারের গাড়ি চলা শুরু করলে আমাদের পেছন পেছন ঢাকা র্যাবের (ইন্ট উইং) থেকে আসা মাইক্রোবাসটিও ফলো করতে থাকে। আনুমানিক দুই ঘণ্টা ৩০ মিনিট গাড়ি চলার পর আমরা পাথরঘাটার চরদুয়ানী ঘাটে গিয়ে পৌঁছাই। সেখানে পূর্ব থেকেই র্যাবের ইন্ট উইংয়ের র্যাব-৮-এ সংযুক্ত র্যাব সদস্যরা একটি ট্রলার প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। প্রথমে মাইক্রোবাস থেকে ঢাকা থেকে আসা ইন্ট উইংয়ের সদস্যরা নেমে ট্রলারে উঠতে থাকেন। সে সময় একজন ব্যক্তিকেও হাত-বাঁধা এবং মাথায় কালো টুপি পরা অবস্থায় ট্রলারে উঠিয়ে নিতে দেখি। হাত-বাঁধা লোকটিকে ট্রলারের মাছ সংরক্ষণের খোলের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখা হয়।’
‘এরপর জিয়া স্যার, আমার অধিনায়ক এবং আমি ট্রলারের সুকানি যেখানে বসে, সেখানে উঠে বসি। জিয়া স্যার সুকানিকে চরদুয়ানী খাল থেকে বের হয়ে মোহনার দিকে যেতে বলেন। আনুমানিক তিন ঘণ্টা ট্রলার চালানোর পর জিয়া স্যার আমাকে ট্রলারের গতি কমিয়ে পানির গভীরতা মাপতে বলেন। আমি ট্রলারের ব্রিজ থেকে নেমে লগি দিয়ে পানির গভীরতা মেপে জিয়া স্যারকে বলতে থাকি। পানির গভীরতা এবং জোয়ার-ভাটার হিসাব করে জিয়া স্যার বোটে অবস্থানরত ইন্ট উইংয়ের সদস্যদের খোলের ভেতর থেকে হাত-বাঁধা লোকটিকে বের করে আনতে বলেন।’
সাব্বির রহমান ওসমানী বলেন, ‘হাত-বাঁধা লোকটিকে বোটের বাইরে আনার সঙ্গে সঙ্গে ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের চারজন সদস্য তাকে ঘিরে ফেলেন। প্রথম সদস্য হাত-বাঁধা ব্যক্তির গলা ও পা বরাবর দুটি সিমেন্টভর্তি বস্তা বেঁধে ফেলেন। দ্বিতীয় র্যাব সদস্য ধৃত ব্যক্তির মাথা ও কান বরাবর একটি ছোট বালিশ ঠেকিয়ে পিস্তল দিয়ে এক রাউন্ড ফায়ার করেন। ফায়ারের পর তৃতীয় র্যাব সদস্য ওই গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির পেট কেটে ফেলেন। চতুর্থ র্যাব সদস্য গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির কাটা পেটের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে পেট কাটার সঠিকতা নিশ্চিত করেন।’
‘এরপর তিনি জিয়া স্যারকে সবকিছু ঠিক আছে মর্মে সিগন্যাল দিলে জিয়া স্যার সুকানিকে ট্রলারের ইঞ্জিনের শব্দ বৃদ্ধির জন্য আরপিএম বাড়িয়ে গতি কমিয়ে দিতে বলেন। এ সময় জিয়া স্যার আমাকে পুনরায় পানির গভীরতা মেপে তাকে বলতে বলেন। উল্লেখ্য, এই পুরো ঘটনাটি ট্রলারের ডান পাশে সংঘটিত হচ্ছিল এবং আমি ট্রলারের বাম পাশে অবস্থান করে জিয়া স্যারের নির্দেশে পানি মাপছিলাম।’
তিনি বলেন, ‘সর্বশেষ পানির গভীরতা মেপে জিয়া স্যারকে জানানো হলে তিনি ট্রলারের গতি কমিয়ে দিতে বলেন এবং ইন্ট উইংয়ের ওই চারজন র্যাব সদস্যকে গুলিবিদ্ধ দেহটি সিমেন্টভর্তি বস্তাসহ পানিতে ফেলে দিতে বলেন। র্যাব সদস্যরা তার আদেশ পালন শেষে আমরা ট্রলারের মুখ ঘুরিয়ে চরদুয়ানীর উদ্দেশ্যে ফেরতি যাত্রা শুরু করি।’
মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী আরও বলেন, পরবর্তীতে চরদুয়ানীতে পৌঁছে একইভাবে একটি জিপ ও একটি মাইক্রোবাসযোগে বরিশালের উদ্দেশ্যে রওনা করি। পথে পরিবেশটা অস্বাভাবিক রকমের নীরব ছিল। জিয়া স্যার পরিবেশটা স্বাভাবিক করার জন্য নিজে থেকেই বলে ওঠেন, ‘এরা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। এদের না থাকাই ভালো। এভাবেই এদেরকে গলফ করতে হবে।’ এই প্রথম আমি এই ধরনের অভিযানকে গলফ অভিযান বলে জানলাম। এরপরও পরিবেশটা স্বাভাবিক না হওয়ায় জিয়া স্যার বলেন, ‘এত মন খারাপ কিংবা দুশ্চিন্তা করার কিছু নাই, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় এই বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত আছেন।’
সাব্বির রহমান ওসমানী বলেন, ‘বরিশালে পৌঁছানোর পর অধিনায়ক এবং আমাকে ব্যাটালিয়ন সদরে নামিয়ে দিয়ে জিয়া স্যার তার গন্তব্যে চলে যান। ব্যাটালিয়নে আমি আমার অধিনায়ককে কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিষয়ে প্রশ্ন করে জানতে চাই, ‘স্যার এটা কী হলো, কেন হলো, আমরা কেন এর সঙ্গী হলাম?’ উত্তরে অধিনায়ক আমাকে বলেন, ‘জিয়ার মুখ থেকে সবকিছুই শুনেছো, আমার এখানে কী করার ছিল। তবে আমি বিষয়টি নিয়ে সাধ্যমতো র্যাব হেডকোয়ার্টারে কথা বলবো।’
২০১০ সালের মে মাসের দিকে একই রকম আরেকটি ঘটনার বর্ণনা দেন ওসমানী। সেটি ছিল চারজনকে হত্যার ঘটনা।
ওসমানী বলেন, ‘এই ঘটনার পরবর্তী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে হঠাৎই গোয়েন্দাসূত্র মারফত সংবাদ পাই যে, শরণখোলা রেঞ্জের বলেশ্বর নদীতে মুখ ঢাকা, পেটকাটা এবং শরীরে সিমেন্টের বস্তা বাঁধা অবস্থায় একটি মরদেহ ভেসে উঠেছে। খবরটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার অধিনায়ককে বিষয়টি জানালে অধিনায়ক আমাকে বিষয়টি দ্রুত জিয়া স্যারকে জানাতে বলেন। কেননা অধিনায়ক এবং আমার উভয়েরই সন্দেহ হচ্ছিল যে, ভেসে ওঠা মরদেহটি বিগত দিনের গলফ অপারেশনের ভিকটিমদের মধ্যে কেউ একজন হতে পারে।’
‘আমি তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি জিয়া স্যারকে মোবাইল ফোনে জানালে তিনি আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেন। পরবর্তীতে আমি গোয়েন্দা মারফত আরও তথ্য সংগ্রহের প্রচেষ্টা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য অধিনায়ককে অবহিত করে জিয়া স্যারকে জানানোর জন্য ফোন দিলে তিনি জানান যে, তিনি এরই মধ্যে বিস্তারিত তথ্য পেয়েছেন। তখন আমি আলোচ্য ঘটনাটি ওই দিনের অপস রিপোর্টে উল্লেখ করবো কি না জানতে চাইলে জিয়া স্যার বলেন, ‘আমি তো জানলাম, প্রয়োজন নেই’। তবে তিনি এ ব্যাপারে ফলোআপ অব্যাহত রাখতে বলেন।’
তিনি বলেন, ‘ঘটনাটির ফলোআপ আমি একটা সময় পর্যন্ত রেখেছিলাম এবং প্রতিটি প্রাপ্ত তথ্য আমার অধিনায়ককে অবহিত করেছিলাম। এই ঘটনার আনুমানিক দুই-তিন মাস পর আমি গোয়েন্দা তথ্য মারফত জানতে পারি যে, পেটকাটা মরদেহটির ডিএনএ বিজিবির গোয়েন্দা সদস্যদের মাধ্যমে পরীক্ষা করে ব্যক্তিটিকে প্রাক্তন বিজিবি সদস্য নজরুল বলে শনাক্ত করেন।’
যে ট্রলারে করে নিয়ে ভিকটিমদের হত্যা করা হতো, সেই ট্রলারের মাঝি প্রসঙ্গে ওসমানী বলেন, ‘২০১১ সালের জুনে হঠাৎ করেই জিয়া স্যার একদিন ফোন করে তার গলফ কাজে নিয়োগপ্রাপ্ত মাঝিদের মধ্যে অন্যতম আলকাছ মাঝির ব্যাপারে আমার কাছে জানতে চান। আমি উত্তরে এই মাঝির ব্যাপারে কোনো কিছুই আমার জানার কথা নয় বলে তাকে জানাই। আলকাছ মাঝিকে নিয়ন্ত্রণ, পরিচালন, বেতন-ভাতা প্রদান যাবতীয় বিষয় র্যাব-৮-এ সংযুক্ত থাকা ইন্ট উইংয়ের সদস্যরা দেখভাল করেন বলে স্মরণ করিয়ে দিই।’
‘তিনি কিছুটা বিরক্ত হন। তারপর বলতে থাকেন, ‘আলকাছ মাঝি গলফ অপারেশন সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য চরদুয়ানী বাজারে বলে বেড়াচ্ছে। যা র্যাবের জন্য নিরাপত্তাঝুঁকি হয়ে দেখা দিয়েছে।’ এ কথা বলে জিয়া স্যার আমাকে আলকাছ মাঝিকে ‘এলিমিনেট’ করার নির্দেশ দেন। বিষয়টি আমি শোনার পর আমার শারীরিক অসুস্থতার অজুহাত দিয়ে বর্ণিত দায়িত্ব পালনে অব্যাহতি চেয়ে কাকুতি-মিনতি করতে থাকি। ঘটনার এই পর্যায়ে তিনি কী মনে করে বললেন, ‘থাক, লাগবে না’। জিয়া স্যার ফোন রেখে দেওয়ার পরপরই আমি ঘটনাটি আমার অধিনায়ককে অবহিত করি।’
‘উল্লেখ্য যে, জিয়া স্যারের গলফ অপারেশন পরিচালনার সময় যেসব মাঝি বোট চালিয়ে যেতেন, তাদের মধ্যে আলকাছ মাঝি ছিলেন অন্যতম। যে কয়বার জিয়া স্যারের সঙ্গে আমি গলফ অভিযানে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম, সেই কয়বারের মধ্যে অধিকাংশ সময় আমি আলকাছকে মাঝি হিসেবে দেখেছিলাম।’
তিনি বলেন, ‘এই ঘটনার পরবর্তী আনুমানিক সপ্তাহ খানেক পরে হঠাৎই আমার অধিনায়ক আমাকে তার অফিসে দ্রুত আসতে বলেন। আমি তার অফিসে পৌঁছালে তিনি তার সামনে বসা ব্যক্তিদের আলকাছের পরিবার বলে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন। ওই সময় আমার অধিনায়ক আলকাছের পরিবারকে তাদের র্যাব-৮-এ আসার কারণ জানতে চাইলে আলকাছের স্ত্রী জানান যে, চার-পাঁচ দিন আগে আলকাছকে মোবাইলে ফোন দিয়ে জিয়া স্যারের কথা বলে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। আলকাছ বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে তার স্ত্রীকে জিয়া স্যার ডেকে পাঠিয়েছেন মর্মে জানিয়ে বের হয়ে যান।’
‘পরবর্তীতে আলকাছের সঙ্গে আর যোগাযোগ হচ্ছে না। তিনি কোথাও তাকে খুঁজে পাচ্ছেন না। তিনি তার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন আলকাছকে খোঁজার। কিন্তু পাননি। বিষয়টি শোনার পর আলকাছের পরিণতি সম্পর্কে আমার এবং আমার অধিনায়কের বুঝতে কোনো অসুবিধা হলো না।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরবর্তীতে অধিনায়ক আলকাছকে খোঁজার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন মর্মে আলকাছের স্ত্রীকে নিশ্চিত করেন। একই সঙ্গে আমার অধিনায়ক, যেহেতু আলকাছ ইন্ট উইংয়ের সঙ্গে কাজ করতেন, তাই তার পরিবারকে আলকাছের নিখোঁজের বিষয়টি র্যাব সদরদপ্তরেও জানানোর পরামর্শ দেন। সবশেষে তাদের কিছুটা আর্থিক সহায়তা করে বিদায় দেওয়া হয়।’
শুধু চরদুয়ানীতেই নয়, সুন্দরবনেও এ রকম কার্যক্রম চালানোর কথা উল্লেখ করে ওসমানী বলেন, ‘জিয়াউল আহসান স্যারের পরিকল্পনায় এবং নির্দেশনায় তিনটি সুন্দরবনকেন্দ্রিক তথাকথিত এনকাউন্টার অভিযান পরিচালনা প্রত্যক্ষ করি। আনুমানিক ২০১১ সালের নভেম্বরে পশ্চিম সুন্দরবনের নিশানখালী খালসংলগ্ন বনে তৎকালীন সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় বনদস্যু বাহিনী রাজুর গোপন আস্তানায় তথাকথিত একটি এনকাউন্টার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। জিয়া স্যারের পরিকল্পনা এবং নির্দেশে এই অপারেশনটি র্যাব, কোস্টগার্ড ও বন বিভাগসহ যৌথ অভিযান হিসেবে পরিচালনা করা হয়েছিল। যেখানে জিয়া স্যারের নির্দেশে র্যাব-৮-কে অংশগ্রহণ করতে হয়েছিল।’
‘উল্লেখ্য যে, সুন্দরবনের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব র্যাব-৬-এর ওপর বর্তালেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে জিয়া স্যার সুন্দরবনকেন্দ্রিক তার সব ধরনের অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে র্যাব-৮-কে ব্যবহার করতেন।’
তিনি বলেন, ‘নিশানখালী অভিযান পরিচালনার আগের দিন রাতে ইন্ট উইংয়ের একদল সদস্য নিশানখালীর উদ্দেশে পূর্বেই রওনা দিয়ে চলে যান। মূল অভিযান পরিচালনার দিন ভোর রাতে মূল আভিযানিক দল নিশানখালীর উদ্দেশে রওনা করে নিশানখালী পৌঁছে এলাকাটি ঘিরে ফেলার প্রস্তুতিকালে হঠাৎই বনের ভেতর থেকে হুইসেলের শব্দ পাওয়া যায়। মূলত হুইসেলটি ছিল অগ্রগামী ইন্ট সদস্যদের একটি সিগন্যাল।’
‘সিগন্যাল শোনামাত্রই জিয়া স্যার মূল আভিযানিক দলকে ঘিরে থাকা বন লক্ষ্য করে ফায়ার ওপেন করার নির্দেশ দেন। বেশ কিছুটা সময় ধরে বন লক্ষ্য করে ফায়ার করার পর ফায়ার থামানো হয়। ফায়ারের পরবর্তীতে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে তল্লাশি অভিযান পরিচালনাকালে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদ এবং দুটি মৃতদেহ উদ্ধার দেখানো হয়।’
‘পরবর্তীতে মামলার প্রক্রিয়াকালে ব্যাটালিয়ন সদরকে জানানো হয় যে, ঘটনাস্থলে দুটি মৃতদেহ পাওয়া গেলেও মামলা দায়েরকালে ছয়টি মৃতদেহ দেখানো হচ্ছে। বিষয়টি থানা থেকে আমাদের জানানো হয়। তথ্যটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার অধিনায়ককে বিষয়টি অবহিত করি। তিনি আমাকে ব্যাটালিয়ন এফএস (ফিল্ড সিকিউরিটি) পাঠিয়ে বিষয়টি অনুসন্ধানের নির্দেশ দেন।’
মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী বলেন, ‘পরবর্তীতে জানা যায় যে, শেষোক্ত চারটি মৃতদেহ ইন্ট উইংয়ের অগ্রগামী দল কর্তৃক পূর্বেই ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে জিয়া স্যারের নির্দেশে গুলি করে হত্যা করে মূল অভিযানের সঙ্গে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে।এই অভিযানে র্যাব সদরদপ্তর থেকে জিয়া স্যার এবং তার উইংয়ের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্য অংশগ্রহণ করেন। পাশাপাশি র্যাব সদরদপ্তরের লিগ্যাল ও মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার সোহাইল এবং তার সঙ্গে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সদস্যরা এই অভিযানে উপস্থিত ছিলেন।’
২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতেও সুন্দরবনে আরেকটি অভিযান চালানো হয়। সে অভিযানের বিষয়ে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, ‘২০১২ সালে কটকা ফরেস্ট স্টেশন থেকে দুই কিলোমিটার দক্ষিণে জিয়া স্যারের পরিকল্পনা এবং নির্দেশনায় র্যাব-৮ ও র্যাব-৬ যৌথভাবে একটি অভিযান পরিচালনা করে। মূল অভিযান পরিচালনার আগের দিন রাতে পাথরঘাটাস্থ চরদুয়ানীতে পৌঁছানোর পর আগে থেকেই প্রস্তুত থাকা ট্রলারে ইন্ট উইংয়ের সদস্যরা উঠে পড়েন। উল্লেখ্য যে, ওই সময় মাথায় টুপি পরানো ও হাত-বাঁধা অবস্থায় পাঁচজন ব্যক্তিকে ট্রলারের খোলের ভেতরে ঢোকানো হয়। সবশেষে আমি এবং জিয়া স্যার ট্রলারের সুকানির ব্রিজে গিয়ে উঠি।’
‘ট্রলার মোহনার উদ্দেশে যথারীতি চলতে শুরু করে। মোহনার কাছাকাছি যাওয়ার পর জিয়া স্যারের নির্দেশে ট্রলারের খোলের ভেতর থেকে হাত-বাঁধা ব্যক্তিদের একে একে বের করে নিয়ে এসে যথারীতি সিমেন্টের বস্তা বেঁধে মাথায় গুলি করে, পেট কেটে সিমেন্টের বস্তাসহ পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। এভাবে মোট চারজন ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। এরপর আমরা ট্রলার ঘুরিয়ে মূল অভিযান পরিচালনা এলাকার দিকে রওনা করি। ভোর রাতে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই র্যাব-৬ ও র্যাব-৮-এর আভিযানিক দলটি পৌঁছে গিয়েছিল। জিয়া স্যারের ট্রলারটি পৌঁছামাত্রই জিয়া স্যারের নির্দেশে ফায়ার শুরু হয়। কিছু সময় ফায়ার পরিচালনার পর এলাকাটি ঘিরে রেখে স্থানীয় থানা পুলিশ আসার অপেক্ষায় ছিলাম।’
তিনি বলেন, ‘ওই সময় জিয়া স্যার ট্রলারের খোলের ভেতর থেকে হাত-বাঁধা অবস্থায় পঞ্চম ব্যক্তিকে বের করে আনান। পরে দুজন ইন্টা উইংয়ের সদস্যের সাহায্যে ওই হাত বাঁধা ব্যক্তিকে ট্রলার থেকে নামিয়ে বনের ভেতরে নিয়ে যান। জিয়া স্যারসহ ওই ব্যক্তিরা বনের ভেতরে প্রবেশের মুহূর্তকাল পরেই বনের ভেতর থেকে এক রাউন্ড ফায়ারের শব্দ আসে। এরপর জিয়া স্যার এবং সঙ্গে থাকা দুই ইন্ট উইং সদস্য বন থেকে বের হয়ে এসে ট্রলারে ওঠেন। পরবর্তীতে স্থানীয় পুলিশের উপস্থিতিতে বন তল্লাশি করে কিছুসংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের পাশাপাশি চারটি মৃতদেহ উদ্ধার দেখানো হয়। উল্লেখ্য যে, মৃতদেহগুলোর মধ্যে তিনটি মৃতদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হলেও চতুর্থ মৃতদেহটি অজ্ঞাত হিসেবে রয়ে যায়। আমার ধারণা, সর্বশেষে হাত-বাঁধা যে ব্যক্তিকে বনের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, এটিই সেই ব্যক্তির লাশ।’
পরবর্তীতে ২০১২ সালের মার্চে জিয়া স্যারের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় সুন্দরবনের ভোলা নদীসংলগ্ন মরা ভোলা এলাকায় একটি ত্রিমাত্রিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল জানিয়ে মেজর ওসমানী বলেন, ‘অভিযান পরিচালনার আগের রাতে ইন্ট উইংয়ের সদস্যদের একটি দল আগেই মরা ভোলার উদ্দেশে রওনা দিয়ে যায়। অভিযান পরিচালনার দিন ভোর রাতে মূল আভিযানিক দল মরা ভোলার উদ্দেশ্যে রওনা করে। পথিমধ্যে র্যাবের হেলিকপ্টার থেকে বনদস্যুদের গোপন আস্তানার তথ্য প্রাপ্তি এবং বিগত রাতে ইন্ট উইংয়ের সদস্যদের যে অগ্রগামী দলটি মরা ভোলার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল, তাদের তথ্য একত্র করে তথ্যের সঠিকতা নিশ্চিত করে মূল অভিযানস্থল চিহ্নিত করে এলাকা ঘিরে ফেলার সময় বনের ভেতর থেকে দুই-তিন রাউন্ড ফায়ারের শব্দ শোনা যায়।’
‘এই শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই জিয়া স্যারের নির্দেশে মূল আভিযানিক দল বন লক্ষ্য করে ফায়ার শুরু করে। আনুমানিক ৩০ মিনিট ফায়ারের পর ফায়ার থেমে গেলে স্থানীয় থানা পুলিশের মাধ্যমে বন তল্লাশি করে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অস্ত্র, গোলাবারুদ ও পাঁচটি মৃতদেহ উদ্ধার দেখানো হয়।’
‘উল্লেখ্য যে, এই অভিযানে র্যাব সদরদপ্তরের তৎকালীন এডিজি (অপস) কর্নেল মুজিব, ডাইরেক্টর লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের কমান্ডার সোহাইল, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকরা অংশগ্রহণ করেন। উপস্থিত ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকরা সোহাইল স্যারের আমন্ত্রণে র্যাব-৮ বরিশালে এসে উপস্থিত হতেন। পরবর্তীতে তাদের বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে পৃথক ট্রলারে করে মূল আভিযানিক দলের একদম শেষের দিকে রাখা হতো। ফায়ারিং শেষে তল্লাশি অভিযান পরিচালনাকালে জিয়া স্যার এবং সোহাইল স্যার সাংবাদিকদের নিয়ে ঘটনাস্থল ঘুরে দেখতেন।’
তিরি বলেন, ‘বর্ণিত তিনটি এনকাউন্টার অভিযান আলাদাভাবে উল্লেখ করার কারণ হিসেবে আমার কাছে মনে হয়েছে, এই অভিযানগুলোর সবগুলোই ছিল সাজানো। এটার পেছনে আমার যুক্তি ছিল, প্রতিটি অভিযান পরিচালনার পূর্বেই ইন্ট উইংয়ের একটি দল অভিযানস্থলে চলে যেত। যেটা যাওয়ার কথা নয়। বনের ভেতর থেকে বনদস্যুদের ফায়ার এলে সেটি আসার কথা একনলা বা দোনলা বন্দুক থেকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমরা কখনো হুইসেলের শব্দ পেয়েছি। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অটোমেটিক অস্ত্র ফায়ারের শব্দ পেয়েছি। এই ধরনের অটোমেটিক অস্ত্র কোনো অবস্থাতেই কোনো দস্যু বাহিনীর কাছে ছিল না।’
‘ঘটনার সময় ধারণকৃত বিভিন্ন সাংবাদিকদের আলোকচিত্র এবং ভিডিও ফুটেজ (নিশানখালী, কটকা ও মরা ভোলা) দেখার পর আমার মনে হয়েছে, মূল আভিযানিক দল যখন অভিযানস্থলে গোলাগুলিতে ব্যস্ত, সে সময় র্যাব সদরদপ্তর থেকে আগত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং তাদের সঙ্গীয় সদস্যরা কোনো ধরনের অস্ত্র, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, বুলেটপ্রুফ হেলমেট ছাড়াই সাধারণ পোশাকে ঘটনাস্থলে চলাফেরা করছেন, যা স্টেজড অপারেশন ব্যতীত কোনোভাবেই নিরাপত্তার ঝুঁকিকে কম্প্রোমাইজ না করে অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব নয়।’
র্যাবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা বর্ণনায় ওসমানী বলেন, র্যাবের দায়িত্ব পালনকালে আমার জানামতে জিয়া স্যার আনুমানিক ১৫-২০ বার বরিশাল অঞ্চল ব্যবহার করে গলফ অপারেশন পরিচালনা করেছেন। র্যাবের দায়িত্ব পালনকালে র্যাবের উপরোল্লিখিত কর্মকাণ্ডগুলো মানসিকভাবে মেনে নিতে না পারলেও ইউনিফর্মধারী বাহিনীর আদেশ পালনের প্রচলিত নীতি অনুসরণ করে শুনতে বা প্রতিপালনে বাধ্য থাকতাম। মেজর পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা হিসেবে আমি সর্বোচ্চ আমার অধিনায়কের কাছে আমার অনুভূতির কথা ব্যক্ত করতে পারতাম। অধিনায়ক সবসময় আমাকে শুধু বলতেন, ‘জিয়াকে কে নিয়ন্ত্রণ করবে?’
তিনি বলেন, ‘যেহেতু আমার এই মানসিক যন্ত্রণার কোনো প্রতিকার আমার কাছে ছিল না, বিধায় আমি র্যাবে অবস্থানকালীন আমার চাকরির ১৮ বছর পূর্ণ হলে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের জন্য দরখাস্ত করি। প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত হয়ে ২০১৩ সালের আগস্টে আমার অবসরপূর্ব নিজবাহিনীতে ফেরতের আদেশ আসে। সেই মোতাবেক আমি আমার নিজবাহিনীতে ফেরত এসে সেনাবাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী ন্যূনতম ছয় মাস অবস্থান করে ২০১৪ সালের মার্চে এলপিআরে যাই।’
এফএইচ/বিএ
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।
