
ঢাকা আইনজীবী সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল বাশারকে বুধবার রাতে পল্লবীর ১২ নং সেকশনে হঠাৎ মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করে কিছু লোক। পরে ঢাকার পল্লবী থানার একটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এ দিন দুপুরে আবুল বাশারকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন পল্লবী থানার এসআই সালাহউদ্দিন আল-মামুন। পরে শুনানি নিয়ে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলম জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বলে তথ্য প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই সাইফুল ইসলামের।
অ্যাডভোকেট আবুল বাশার আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবী হিসেবে পরিচিত। ঠিক কারা কী কারণে তাকে মারধর করে তা এখনো পরিষ্কার করে বলেনি পুলিশ।
তবে রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, আবুল বাশার কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক কার্যক্রমে যুক্ত। তাই পল্লবীর স্থানীয়রা তাকে চিহ্নিত করে পুলিশে সোপর্দ করেছে।
কিন্তু আবুল বাশারের দাবি, তিনি পল্লবী ১২ নং সেকশন এলাকায় অনেকদিন ধরে বাস করেন। সম্প্রতি তার সঙ্গে এলাকার কিছু মাদকসেবীর বাকবিতণ্ডা হয়েছিল। তারাই মব তৈরি করে তাকে মারধর করেছে।
শুনানিতে যা হল
অ্যাডভোকেট বাশারকে দুপুরে আদালতে হাজির করা হয়। তাকে রাখা হয় ঢাকার সিএমএম আদালতের হাজতখানায়। দুপুর ২টার দিকে জামিন বিষয়ে শুনানি হয়। বাশারের আইনজীবীরা তার উপস্থিতিতে শুনানি করতে আদালতে আবেদন করেন।
বিকাল পৌনে ৪টার দিকে বাশারকে এজলাসে তোলা হয়। এ সময় আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা উপস্থিতিতে পূর্ণ হয়ে যায় এজলাস কক্ষ। আইনজীবীরা সেলফি তোলা, ভিডিওতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এভাবে চলতে থাকে বেশ কিছু সময়।
পরে আদালতের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। এজলাস কক্ষে নিয়োজিত করা হয় কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে। এরপর এজলাস কক্ষে আসেন ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউকর ওমর ফারুক ফারুকী। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, বিএনপিপন্থি আইনজীবীরাও এজলাস কক্ষে আসেন।
এক পর্যায়ে অতিরিক্ত ভিড়, কোলাহল হলে প্রসিকিউটর ফারুকী আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “মামলার শুনানি হওয়ার পরিবেশ নাই। পরিবেশ হবে; এরপর মামলার শুনানি শুরু হবে।”
যারা ওকালতনামা দিয়েছেন তাদের ছাড়া বাকিদের বেরিয়ে যেতেন বলেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী।
সে সময় আওয়ামীপন্থি আইনজীবী হিসেবে পরিচিত সাইফুল ইসলাম সোহাগ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীকে বলেন, “আদালতের পরিবেশ শান্ত থাকবে।”
পরে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের শান্ত থাকতে বলেন তিনি। তারপরও ওকালতনামা ছাড়া আইনজীবীদের বের করে দেওয়া হয়। পরে আওয়ামীপন্থি সব আইনজীবী এজলাস ত্যাগ করেন।
এরপর বিকেল সাড়ে ৪টায় বিচারক এজলাসে উঠে আসামিরপক্ষে কোনো আইনজীবী আছেন কি না জানতে চাওয়া হয়। পরে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা বাশার আদালতকে বলেন, তিনি নিজেই শুনানি করবেন। ওকালতনামা জমা দিয়ে শুনানি শুরু করেন তিনি।
শুনানিতে যা বললেন বাশার
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে অ্যাডভোকেট বাশার বলেন, “গতকাল (বুধবার) রাত সাড়ে ১০টার দিকে পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকায় বাসায় ফিরছিলাম। আমার ২২ মাসের একটা বাচ্চা আছে। তার জন্য দুধ কিনতে একটা ফার্মেসিতে যাই। পকেটে টাকা না থাকায় বিকাশ থেকে টাকা তুলতে পাশের একটি দোকানে যাচ্ছিলাম। ৩/৪ জন আমার পথরোধ করে। তাদের সাথে মাদক নিয়ে বাকবিতণ্ডা হয়েছিল। তারা আমার গায়ে হাত তোলে, মারধর করে, মব সৃষ্টি করে। ওই এলাকায় আমি অনেক বছর ধরে বসবাস করি। স্থানীয় লোকজন আমাকে উদ্ধার করে। পরে ৯৯৯ এ ফোন করে।”
২০১৬ সালে আইনজীবী হন তথ্য দিয়ে বাশার বলেন, “কারো সাথে কখনো বেয়াদবি করিনি। নিয়মিত কোর্ট করি। আমি আপনার (বিচারক) কাছে ন্যায়বিচার চাই।”
রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য
শুনানিতে মহানগর পাবলিক প্রসিকিউকর ওমর ফারুক ফারুকী মামলার বিষয়ে তুলে ধরে বলেন, “সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক স্লোগান দেওয়া হয়। সরকার উৎখাতের মিছিল করে। পলাতক ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে নিয়েও স্লোগান দেয়। তারা সন্ত্রাসী কায়দার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় লোকজন তাকে (বাশার) চিহ্নিত করে। সে মিছিলে ছিল। তারাই তাকে চিহ্নিত করে আটক করে।
“কয়েকদিন যাবৎ দেশের শান্তিপূর্ণ আবহকে নষ্ট করতে স্লোগান দিচ্ছে। কয়েক জায়গায় বোমা বর্ষণ করছে। গুলশানের মত জায়গায়ও তার স্লোগান, ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে।
“এখানে (আদালতে) অনেকে সাদা শার্ট পড়ে এসেছিল মব সৃষ্টি করতে। মব সৃষ্টির পাঁয়তারা করছিল। দেশবাসীকে তা দেখানোর চেষ্টা করেছিল। এ আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তা পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেবেন। এ পর্যায়ে জামিনের বিরোধিতা করছি। জামিন দিলে এ ধরণের অবস্থা চলতে থাকবে। দেশের শান্তি বিঘ্নিত হবে।”
জবাবে বাশার বলেন, “বর্তমান যুগ তো তথ্য প্রযুক্তিতে এগোনো। মামলার ঘটনার দিন থেকে গতকাল পর্যন্ত আমি কোনো মিছিলে গিয়েছিলাম কি না তার ভিডিও, স্ক্রিনশট, লোকেশন চেক করলেই তো হয়। আমার কাছে কোনো ধরণের কিছু পায়নি।”
পরে প্রসিকিউটর ফারুকী বলেন, “পুলিশ চিহ্নিতের আগে জনগণ তাকে চিহ্নিত করে পুলিশে দিয়েছে। তার জামিনের বিরোধিতা করছি।”
পরে আদালত জামিন আবেদন নাকচ করে বাশারকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়।
মামলার বিবরণে বলা হয়, গত ৩১ জুলাই ভোর সাড়ে ৬টার দিকে পল্লবীর মেট্রোরেল এলাকায় সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রসহ অপপ্রচার চালাতে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা মিছিল করে। পুলিশ সেখানে গিয়ে কয়েকজনকে আটক করলেও বাকিরা পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় ওইদিন পল্লবী থানার এসআই সোহান মোল্লা এ মামলা করেন।