শরীর শুধু নৃত্য পরিবেশনের একটি মাধ্যম নয়। মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, অনুভূতি ও সামাজিক ইতিহাসও শরীরের ভেতর নানানভাবে জমা থাকে। কখনো সেই স্মৃতি প্রকাশ পায় অঙ্গভঙ্গিতে, কখনো চলনে, আবার কখনো নীরবতার মধ্য দিয়ে। শরীরের ভেতরে জমে থাকা এমন স্মৃতি ও অভিজ্ঞতাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে শিল্পের ভাষায় প্রকাশের লক্ষ্য নিয়ে ঢাকায় শুরু হচ্ছে বিশেষ নারীবাদী নৃত্যনাট্য কর্মশালা ‘রি-মেম্বারিং মেমোরিজ, রিক্লেইমিং বডিজ’।
সাধনা ও নৃত্যশিল্পী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের পরিচালনায় এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহযোগিতায় আয়োজিত এই কর্মশালার উদ্বোধন হবে বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর)। আট দিনের এই আয়োজন চলবে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত বনানীর চারুতায় অনুষ্ঠিত হবে কর্মশালাটি।
‘রি-মেম্বারিং’ ধারণাটিকে এখানে শুধু পুরোনো স্মৃতি মনে করার অর্থে দেখা হচ্ছে না। বরং সময়ের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতাগুলোকে আবার একত্র করা এবং নীরব করে দেওয়া স্মৃতিকে শরীরের কাছে ফিরিয়ে আনার একটি সৃজনশীল প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্যক্তিগত জীবনের নানা ঘটনা, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামষ্টিক ইতিহাসের যে সম্পর্ক রয়েছে, কর্মশালায় সেটিও নতুন করে অনুসন্ধান করা হবে।
আয়োজকদের ভাবনায়, মানুষের শরীর একটি জীবন্ত মহাফেজখানার মতো। ব্যক্তিগত স্মৃতির পাশাপাশি সেখানে সমাজ, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের নানান স্তরও জমা থাকে। ফলে শরীরকে কেবল নৃত্য পরিবেশনের মাধ্যম হিসেবে দেখার পরিবর্তে তার ভেতরে জমে থাকা স্মৃতি ও অভিজ্ঞতাকে বোঝার চেষ্টা করা হবে এই আয়োজনে। একই সঙ্গে সেই ইতিহাসকে প্রশ্ন করা, প্রচলিত ধারণাগুলোকে নতুনভাবে দেখা এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে সৃজনশীল প্রকাশের মাধ্যমে সামনে নিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হবে অংশগ্রহণকারীদের জন্য।
কর্মশালাটিতে মেন্টর হিসেবে থাকছেন নৃত্যশিল্পী, নৃত্যপরিচালক ও গবেষক লুবনা মারিয়াম, পারফর্মার ও শরীরী-চর্চাবিদ সোহিনী দাস হার্টম্যান, থিয়েটার নির্মাতা, পরিচালক ও শিল্পশিক্ষক রেমন্ড ক্যাল্ডওয়েল এবং গবেষক ও লেখক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ। তাদের দিকনির্দেশনায় অংশগ্রহণকারীরা শরীরী অনুশীলনের পাশাপাশি নিজেদের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিকে কীভাবে নৃত্যের ভাষায় রূপ দেওয়া যায়, সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবেন। সমালোচনামূলক চিন্তা এবং শরীরী অনুশীলনের মধ্যে একটি সম্পর্ক তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে কর্মশালায়।
এই আয়োজনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নারীবাদকে কোনো একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞা বা ছাঁচের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখা। বরং মানুষের ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা, জীবনকথা, দৃষ্টিভঙ্গি ও অনুভূতির জন্য একটি উন্মুক্ত পরিসর তৈরি করাই কর্মশালাটির অন্যতম উদ্দেশ্য। ফলে এখানে নারীবাদকে শুধু একটি মতাদর্শ হিসেবে নয়, বরং ব্যক্তি ও সমাজের অভিজ্ঞতাকে বোঝার এবং প্রকাশ করার একটি বহুমাত্রিক ক্ষেত্র হিসেবে দেখার চেষ্টা থাকবে।
নৃত্যনাট্যকে শুধু বিনোদন বা মঞ্চ পরিবেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের স্মৃতি, সামাজিক ইতিহাস ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করার যে ধারাবাহিক প্রয়াস, এই কর্মশালা তারই অংশ। নৃত্যের শরীরী ভাষার মধ্য দিয়ে এমন কিছু অভিজ্ঞতা ও গল্প সামনে আনার চেষ্টা করা হবে, যা হয়তো প্রচলিত ভাষায় সহজে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের সৃজনপ্রক্রিয়া ও সেখানে তৈরি হওয়া ভাবনার প্রতিফলন দেখা যাবে ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার আলোকিতে অনুষ্ঠিত ‘ওয়াও উৎসব’-এ। ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহযোগিতায় এই উৎসবের প্রযোজনা করছে সাধনা। কর্মশালার অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হওয়া শরীরী ভাষা, ভাবনা ও সৃজনশীল অনুসন্ধান সেখানে মঞ্চের মাধ্যমে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হবে।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, ‘রি-মেম্বারিং মেমোরিজ, রিক্লেইমিং বডিজ’ কর্মশালার মধ্য দিয়ে স্মৃতি, শরীর, নারীজীবন ও ইতিহাসকে একসঙ্গে দেখার নতুন একটি পরিসর তৈরি হবে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত স্মৃতি কীভাবে বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত এবং সেই অভিজ্ঞতা কীভাবে শিল্পের ভাষায় প্রকাশ করা যায়, সেই প্রশ্নও উঠে আসবে এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে।
এমএমএফ
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।
