
নন্দিত আলোকচিত্রী মোহাম্মদ রকিবুল হাসান, একাধারে একজন প্রামাণ্যচিত্রী, চলচ্চিত্রকার, ভিজ্যুয়াল শিল্পী ও সাংবাদিক। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি এম আর হাসান নামে পরিচিত। মানবিক গল্প, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং পরিবেশগত সচেতনতার মধ্যে সেতু রচনার মধ্যদিয়ে তিনি সক্রিয় তার সাধনায়। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, শ্রম অধিকার, জনস্বাস্থ্য এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর শক্তিশালী দৃশ্যগল্প তৈরি করে তিনি কেড়েছেন আন্তর্জাতিক মনোযোগ, অর্জন করেছেন খ্যাতি। আলোকচিত্রের ২০০ বছর ও বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস উপলক্ষে তিনি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন জাগো নিউজকে।
একনজরে এম আর হাসান:
থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশন, আল জাজিরা, জুমা প্রেস, ইন্টার প্রেস সার্ভিস, লা মন্ড এবং দ্য ডেইলি স্টারসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বেশ কিছু গণমাধ্যমের জন্য কাজ করেছেন এম আর হাসান। এছাড়া ওয়াটারএইড, ইউএন উইমেন, ব্রিটিশ রেড ক্রস, এফএও, বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতো সংস্থাগুলোর সাথে মানব মর্যাদা ও সামাজিক প্রভাবের ওপর আলোকপাত করে বানিয়েছেন প্রামাণ্যচিত্র, প্রচারণামূলক ভিজ্যুয়াল ও আলোকচিত্র প্রবন্ধ।
হাসান নিউ ইয়র্কের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার অব ফটোগ্রাফিতে পড়েছেন, ফালমাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফটোগ্রাফিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সার্টিফিকেট, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন শিল্পইতিহাস ও দর্শন, আঁতেনিও দে ম্যানিলা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফটোসাংবাদিকতায় পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে নিয়েছেন ফিল্ম ও ভিডিও প্রোডাকশনের উপর বিশেষ প্রশিক্ষণ।
হাসানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিগুলোর মধ্যে রয়েছে লুসি অ্যাওয়ার্ড, ওয়ান ওয়ার্ল্ড মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড, হিউম্যান রাইটস প্রেস অ্যাওয়ার্ড, অ্যালার্ড ফটোগ্রাফি প্রাইজ, পিএক্স৩ প্রি দে লা ফটোগ্রাফি এবং প্যারিসে অনুষ্ঠিত কোল প্রাইজ প্রদর্শনীর সাথে সম্পর্কিত স্বীকৃতি। তার প্রশংসিত কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘দ্য টেস্ট অব হানি’, ‘ফরগেট-মি-নট’ এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প ‘দ্য ব্লু ফিগ’, যা বিশ্বব্যাপী প্রদর্শিত হয়েছে। হাসান বাংলাদেশের ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা, গণমাধ্যম ও যোগাযোগ (জেএমসি) বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপক (অ্যাডজাঙ্কট)।
জাগো নিউজ: আপনি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, সংঘাত এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ, তথ্যচিত্র বানাচ্ছেন। এগুলোকে পেশাগত জীবনের মূল বিষয় হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনে প্রেরণা কী ছিল? সময়ের সঙ্গে কি তাতে কোনো পরিবর্তন এসেছে?
এম আর হাসান: মানবতা ব্যাপারটা সবসময়ই আমার বিশ্বাসের কেন্দ্রে ছিল। তবে মানবতা বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। আমাদের জীবন গভীরভাবে জড়িয়ে আছে পরিবেশের সঙ্গে, অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গে, আমরা যে বাতাসে শ্বাস নিই, যে পানির ওপর নির্ভর করি এবং পৃথিবীতে প্রাণ টিকিয়ে রাখা সূক্ষ্ম প্রাকৃতিক ব্যবস্থাগুলোর সঙ্গে। আমার কাছে আমাদের অস্তিত্ব একটি সম্মিলিত বিষয়। মানুষের ভালো থাকা তার চারপাশের পৃথিবীর ভালো থাকার থেকে আলাদা করে দেখা যায় না।
বছরের পর বছর আমি বেশ কয়েকটি উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে কাজ করেছি। পাশাপাশি নিজের দেশ বাংলাদেশেও ব্যাপকভাবে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। সেসব জায়গায় যাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, বিশেষ করে গ্রামীণ মানুষ, তাদের কারণে জীবন সম্পর্কে আমার অনেক নতুন নতুন উপলব্ধি এসেছে। বাংলাদেশের গ্রামের মানুষ তাদের চাওয়া-পাওয়ার ক্ষেত্রে অসাধারণ রকমের সরল এবং বেঁচে থাকার সংগ্রামে অসম্ভব পরিশ্রমী। তাদের অনেকেই আগামীকাল কী হবে, সে বিষয়ে সামান্য নিশ্চয়তা নিয়েই দিন পার করে। তাদের স্বপ্নও খুব একটা বড় না। তারা বিলাসবহুল গাড়ি চালানো কিংবা বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার স্বপ্ন দেখে না। তাদের চাওয়াগুলো বরং অসাধারণভাবে সাধারণ। টেবিলে পরিবারের সবার জন্য যথেষ্ট ভাত থাকবে, সন্তানদের মর্যাদার সঙ্গে বড় করতে পারবে, শান্তিতে প্রার্থনা করতে পারবে, পরিবারকে ভালোবাসতে পারবে এবং স্রেফ বেঁচে থাকতে পারবে।
আমি এমন এক পরিবারে বড় হয়েছি, যেখানে প্রতিদিন টেলিভিশনে খবর দেখা এবং সংবাদপত্র পড়া ছিল স্বাভাবিক দিনযাপনের অংশ। পরিবারের সবাই খবরের কাগজ পড়তো। কাগজের পাতার মধ্যদিয়ে বৃহৎ পৃথিবী আমাদের ঘরে ঢুকতো— সংঘাত, বৈষম্য, দুর্যোগ, অবিচার আর মানুষের দুর্ভোগে ভরা এক পৃথিবী। বাংলাদেশের খবরগুলো যখন পড়তাম, দেখতাম একই রকম সংগ্রাম আমাদের কাছের মানুষেরাও করছে। ছোটবেলা থেকেই বুঝতে শুরু করেছিলাম, মানুষ জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে, বিভিন্নভাবে কষ্ট পাচ্ছে। সেসব গল্প আমার মনে গেঁথে গিয়েছিল। আমাকে ভাবাতো, ‘আমি তাদের জন্য কী করতে পারি?’ কয়েক বছর পর চলচ্চিত্র নির্মাণের ওপর পড়াশোনা করতে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পর সেই প্রশ্নের একটি উত্তর খুঁজে পাই। ফটোগ্রাফি ও চলচ্চিত্র আমাকে এমন একটি ভাষা দিল, যার মাধ্যমে এমন মানুষের জীবন নিয়ে কথা বলা সম্ভব, যাদের কথা হয়তো অন্যভাবে কখনো দেখা বা শোনা যেত না। বুঝতে পারলাম, ছবি, প্রামাণ্যচিত্র এবং পরে ভিজ্যুয়াল আর্টের মাধ্যমে মানুষের গল্পগুলো সীমানা পেরিয়ে আরও দূরে পৌঁছে দিতে পারি— যেখান থেকে গল্পগুলোর জন্ম।
আমি কখনো ভাবিনি, একটি ছবি বা চলচ্চিত্র পুরো পৃথিবী বদলে দিতে পারে। তবে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম, এটা হয়তো অন্তত একজন মানুষের জীবনে কিছুটা হলেও পরিবর্তন আনতে পারে। হয়তো কাউকে কোনো বিষয় আরও নিরন্তর ভাবে দেখতে, আরও মনোযোগ দিয়ে শুনতে, কোনো অবিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে কিংবা নিজের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি জীবনের মানুষের মর্যাদা উপলব্ধি করতে সাহায্য করতে পারে।
আমার কাজ যদি একজন মানুষের জীবনও ভালো কিছু করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে, সেই সামান্য পরিবর্তনও আমার কাছে অনেক বড় অর্জন।
যুদ্ধবিরোধী অ্যাকটিভিস্ট ডেভিড বার্গেস ও উইল সন্ডার্স সিডনি অপেরা হাউসের পালে প্রতিবাদী স্লোগান ‘নো ওয়ার’ লিখেছিলেন। ছবিটি ২০০৩ সালে অ্যানালগ ফিল্ম ক্যামেরায় ধারণ করেন মোহাম্মদ রাকিবুল হাসান। সৌজন্যে
জাগো নিউজ: আপনার দীর্ঘমেয়াদি কাজগুলো, যেমন ‘দ্য ব্লু ফিগ’ বা ‘ওয়েভ’ এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আপনার কাজগুলো অনেক দিন ধরে করছেন। একটি গল্পকে একবার তুলে ধরার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রামাণ্যচিত্র বানানো কেন বেশি শক্তিশালী মনে করেন?
হাসান: ‘দ্য ব্লু ফিগ’ একটি দীর্ঘমেয়াদি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত আলোকচিত্র প্রকল্প। এর সূত্রপাত আমার আগের প্রকল্প ‘সল্ট’ থেকে। ২০০৯ সালে সাতক্ষীরার সুন্দরবনসংলগ্ন ম্যানগ্রোভ অঞ্চলে আমি ‘সল্ট’ শুরু করি। এই দুটি প্রকল্পই আমার চলমান নৃতাত্ত্বিক ভিজ্যুয়াল গবেষণার অংশ। বছরের পর বছর বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের যে প্রভাব আমি দেখেছি, তার সাক্ষ্য হিসেবে এই গবেষণা নিয়ে ‘একজিসটেন্স’ নামে একটি বই লিখতে চেষ্টা করছি।
‘সল্ট’-এ আমি সরাসরি ও প্রামাণ্যধর্মী পদ্ধতি অনুসরণ করেছি। মূলত ধ্রুপদি সাদাকালো আলোকচিত্রের মাধ্যমে লবণাক্ততা, পরিবেশের ক্ষয় এবং মানুষের জীবিকার পরিবর্তনগুলো নথিবদ্ধ করেছি। ‘দ্য ব্লু ফিগ’-এ এসে ধীরে ধীরে আমার ভিজ্যুয়াল ভাষা আরও ধারণানির্ভর ও শিল্পভিত্তিক হয়ে ওঠে। শুধু কী ঘটছে, তা নথিবদ্ধ করার পরিবর্তে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি শিকার মানুষদের সঙ্গে কাজ শুরু করি। ছবির বানানোর প্রক্রিয়াতেও তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ দিই, যাতে জলবায়ু সংকটের ব্যাপ্তি, অনিশ্চয়তা এবং জরুরি পরিস্থিতিটা আরও শক্তিশালীভাবে তুলে ধরা যায়।
আমার সাম্প্রতিক ছবিগুলোর একটিতে একটি দ্বীপের পুরো গ্রামের মানুষ অংশ নিয়েছে। আগামী কয়েক দশকের মধ্যে পানির উচ্চতা বাড়তে থাকলে তাদের বসতভিটা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ছবিটির পেছনে যে প্রশ্নটি রয়েছে, তা অত্যন্ত সরল, কিন্তু একই সঙ্গে গভীর বেদনাদায়ক— ‘তাদের জমিটাই যদি হারিয়ে যায়, তাহলে তারা যাবে কোথায়?’

সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ঘিরে থাকা প্রত্যন্ত দ্বীপগুলোতে জোয়ারের পানি বাড়তে থাকায় বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো নিজেদের জিনিসপত্র নিয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী শতাব্দীর মধ্যে এই দৃশ্য বাস্তবে রূপ নিতে পারে এমন ভবিষ্যৎ কল্পনায় জলবায়ু সংকটের একটি অনুমাননির্ভর চিত্র ‘দ্য গ্রেট ক্লাইমেট এক্সোডাস’, যার শিকড় বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান বাস্তবতায় প্রোথিত। ছবির মানুষগুলো বাস্তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবন অঞ্চলের ভঙ্গুর দ্বীপগুলোতে নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ ও বাস্তুচ্যুতির শিকার হয়েছেন। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী দেশগুলোর একটি হলেও এ ঘটনার জন্য দায়ী নয়। ছবিটি ২০২৬ সালে বাংলাদেশের সাতক্ষীরার সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে ধারণ করেন হাসান।
দীর্ঘমেয়াদি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের চর্চা আমাকে বারবার ফিরে যেতে, পর্যবেক্ষণ করতে এবং এমন পরিবর্তনগুলো বুঝতে সাহায্য করে, যা একবার ঘুরে ফিরে এলে কখনই ধরা পড়ে না। রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট হোক কিংবা সুন্দরবনের জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী— সময় আমার কাজের একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে।
সুন্দরবন শুধু লাখো মানুষের আবাসস্থল বা বহু প্রজাতির প্রাণীর আশ্রয়স্থলই নয়; এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি কার্বনভাণ্ডার এবং বাংলাদেশের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থারও অংশ। মানুষের কর্মকাণ্ড, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি কিংবা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সুন্দরবন হারিয়ে গেলে আমরা শুধু একটি সুন্দর জায়গা হারাব না, হারাব আমাদের সম্মিলিত অস্তিত্বের একটি অংশ।
জাগো নিউজ: আপনার কাজের মধ্যে সাংবাদিকতা, প্রামাণ্য আলোকচিত্র, চারুকলা ও চলচ্চিত্র— এই চার ক্ষেত্রের মেলবন্ধন দেখা যায়। কোনো ক্ষেত্রের সঙ্গে আপস না করে তথ্যের নির্ভুলতা ও শৈল্পিক প্রকাশের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখেন?
হাসান: গত এক দশকে আমি তথ্য ও সত্যের সঙ্গে শিল্পের বিভিন্ন শাখাকে ক্রমশ আরও বেশি মেলানোর চেষ্টা করেছি। আমি বিশ্বাস করি, সত্যের ভিত্তি হলো তথ্য। তবে সেই তথ্যকে তার অর্থ ও সত্যতা নষ্ট না করেও শিল্পের মাধ্যমে ব্যাখ্যা, পুনর্গঠন এবং রূপান্তর করা সম্ভব। এই ভাবনার ক্ষেত্রে আন্দ্রেয়াস গুরস্কির মতো শিল্পীরা আমাকে প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে তাঁর ‘রাইন টু’ (১৯৯৯) কাজটি— যেখানে বাস্তবতা, স্মৃতি ও শৈল্পিক হস্তক্ষেপ একত্র হয়ে ভূদৃশ্যকে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।

চার জেলে পরিবারের সদস্যরা ঘরের অবশিষ্ট খাবার-দাবার নিয়ে টেবিলে বসেছেন। তারা বাংলাদেশের সুন্দরবনসংলগ্ন একটি দ্বীপের বাসিন্দা, যেখানে প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে তাদের জীবন কাটে। নদীর ভাঙনে প্রতিনিয়ত ভূমি ক্ষয় হচ্ছে, প্রতিবছরই ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানছে, আর বারবার বসতভিটা বদলাতে হচ্ছে তাদের। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন ও করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাব তাদের অবশিষ্ট স্বস্তিটুকুও ক্রমে কেড়ে নিচ্ছে। বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ বাংলাদেশ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সরাসরি শিকার। ছবিটি ২০২২ সালে বাংলাদেশের সাতক্ষীরায় ধারণ করেন হাসান।
আমি একজন ফটোসাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করি। তখন ঘটনাগুলো যেভাবে ঘটত, সেভাবেই সেগুলো নথিবদ্ধ করতাম। এই চর্চা এখনো আমার কাজের মূল ভিত্তি। তবে ভিজ্যুয়াল আর্ট ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে আমি আরও ব্যাখ্যামূলক পদ্ধতি নিয়ে কাজ করি। ‘দ্য টেস্ট অব হানি’ চলচ্চিত্রে ফাবিহা মনিরের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার সময় আমরা নিয়মিত ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা পুনর্নির্মাণ করেছি, যাতে মানুষের আরও গভীর ও বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা যায়।
আমার কাজ ক্রমশ ইকোসেন্ট্রিজম বা প্রকৃতিকেন্দ্রিক চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে, যেখানে বিশ্বাস করা হয়, মানুষের অস্তিত্বকে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা সম্ভব নয়। অতিমাত্রার শিল্পায়ন, লাগামহীন ভোগ, প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষয় এবং পরিবেশগত সংকটের এই সময়ে আমি মনে করি, মানবজাতির টিকে থাকা পুরো বাস্তুতন্ত্রের টিকে থাকার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।
সুন্দরবনের জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার মানুষগুলো নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মানবিক অভিঘাতের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে তারা লবণাক্ত পানিতে দাঁড়িয়ে পরিবেশগত সংকটের বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা, চরম আবহাওয়া, ভূমি হারানো, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এবং নিরাপদ পানির সংকট মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে ক্রমেই হুমকির মুখে ফেলছে। এর মধ্যে নারী ও শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। আয়োজন করা এই ছবিতে বাস্তবেই জলবায়ু সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের ব্যবহার করা হয়েছে, যারা নিজেদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে এই সংকটকে তুলে ধরেছেন। ছবিটি ২০২৪ সালে বাংলাদেশের সাতক্ষীরার সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে ধারণ করেন মোহাম্মদ রাকিবুল হাসান।
একজন শিল্পী হিসেবে আমার চ্যালেঞ্জ হলো এই সত্যগুলোকে এমন শিল্পকর্মে রূপ দেওয়া, যা মানুষকে আকৃষ্ট করবে এবং ভাবাবে। কখনো কখনো এর জন্য পুনঃঅভিনয়, পুনর্নির্মাণ কিংবা কল্পনার আশ্রয় নিই, যাতে আরও গভীর কোনো বাস্তবতাকে সামনে আনা যায়। শুধু তথ্য সবসময় দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। তাই বাস্তবতার ওপর অবাস্তবতার কিছু উপাদান যুক্ত করে এমন একটি আবেগ ও দৃশ্যগত অভিজ্ঞতা তৈরি করতে চাই, যা মানুষকে আরও কাছে টেনে নেবে। মানুষ যদি না দেখে, তাহলে সচেতনতা তৈরি শুরু হবে কীভাবে?
জাগো নিউজ: আপনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, উন্নয়ন সংস্থা এবং স্বাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছেন। ভিন্ন ভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ও দর্শকের জন্য কাজ করার সময় নিজের সম্পাদকীয় স্বর কীভাবে ধরে রাখেন?
হাসান: আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, উন্নয়ন সংস্থা এবং স্বাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমি শিখেছি, প্রতিটি প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব ভাষা, উদ্দেশ্য ও দর্শক রয়েছে। কিন্তু একজন গল্পকথক হিসেবে আমার দায়িত্ব একই থাকে, ‘যাদের জীবন আমি ছবি বা চলচ্চিত্রে তুলে ধরছি, তাদের প্রতি সত্যনিষ্ঠ থাকা।’
গণমাধ্যমের জন্য কাজ করার সময় পদ্ধতিটা সাধারণত সাংবাদিকতানির্ভর। সেখানে তথ্য, নির্ভুলতা, প্রেক্ষাপট এবং সম্পাদকীয় স্বাধীনতাই সবার আগে আসে। জাতিসংঘের সংস্থা বা উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু যোগাযোগের লক্ষ্য থাকতে পারে। তারপরও আমি শুধু সুন্দর ছবি তৈরি করে থেমে থাকতে চাই না; এমন ছবি তৈরি করতে চাই, যার প্রভাব আছে। আমি খুঁজি মানুষের গল্প— এই মানুষটি কে, তার সংগ্রাম কী, তার গল্প কী এবং তার অভিজ্ঞতা সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের বাইরেও আমাদের কী বলে?
আমার স্বাধীন শিল্পচর্চা আমাকে আরও বেশি স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেয়। সেখানে আমি প্রামাণ্যচিত্র, ধারণানির্ভর পদ্ধতি, পুনঃঅভিনয়, স্মৃতি এবং রূপক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারি। তারপরও এর ভিত্তি বাস্তবতা কিংবা তথ্যনির্ভর পদ্ধতির ওপরই প্রতিষ্ঠিত থাকে।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের সহিংসতা থেকে পালিয়ে নিজেদের সহায়-সম্বল নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। দূরে জ্বলতে থাকা গ্রামগুলো থেকে ধোঁয়া উঠছে, যা দশকের অন্যতম বৃহৎ মানবিক সংকটের এক মর্মস্পর্শী পটভূমি হয়ে আছে। ছবিটি ২০১৭ সালে বাংলাদেশের টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে ধারণ করেন মোহাম্মদ রাকিবুল হাসান।
আমার মনে হয়, নিজের সম্পাদকীয় স্বর ধরে রাখার অর্থ সব জায়গায় একই ধরনের ভিজ্যুয়াল স্টাইল ব্যবহার করা নয়। বরং এর অর্থ হলো একই মূল্যবোধ ধরে রাখা। সম্ভব হলে আমি ছবি তোলার আগে মানুষের কথা শুনি। তাদের সঙ্গে সময় কাটাই, তাদের মর্যাদাকে সম্মান করি এবং তাদের কষ্টকে কখনই প্রদর্শনীর বস্তুতে পরিণত করতে চাই না। এই ক্ষেত্রটিতে দীর্ঘদিন কাজ করতে করতে আমি এটাই শিখেছি।
শেষ পর্যন্ত ছবিটি আন্তর্জাতিক কোনো সংবাদপত্রে প্রকাশিত হোক, জাতিসংঘের কোনো প্রকাশনায় জায়গা পাক, কোনো গ্যালারিতে প্রদর্শিত হোক কিংবা বইয়ের পাতায় ছাপা হোক— আমি চাই, মানুষ যেন আমার কাজের মূল উদ্বেগগুলো চিনতে পারে, মানবতা, পরিবেশ এবং সত্য।
জাগো নিউজ: ফটোগ্রাফি পুরস্কার, ডকুমেন্টারি ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এবং প্রদর্শনীর মাধ্যমে আপনার কাজ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। স্বীকৃতি কি আপনার কাজের ধরন বা দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন এনেছে, নাকি যে পথে এগুচ্ছিলেন, সেই পথকে আরও দৃঢ় করেছে?
হাসান: স্বীকৃতি কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। যখন আমার কাজ পুরস্কার পায়, আন্তর্জাতিকভাবে প্রদর্শিত হয়, বা চলচ্চিত্র উৎসবের মাধ্যমে দর্শকদের কাছে পৌঁছায়, তখন আমার ভালো লাগে। বছরের পর বছর ধরে, ‘দ্য ব্লু ফিগ’ ‘আই অ্যাম রোহিঙ্গা’, ‘সল্ট’, এবং ‘দ্য টেস্ট অব হানি’র মতো কাজগুলো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রদর্শনী, ফটোগ্রাফি পুরস্কার এবং চলচ্চিত্র উৎসব ঘুরেছে। কিন্তু আমি মনে করি না যে, স্বীকৃতি মৌলিকভাবে আমার কাজের দিক পরিবর্তন করেছে।

২০১৭ সালে কক্সবাজারের একটি শরণার্থী শিবিরে পৌঁছে বিশ্রাম নিচ্ছেন রোহিঙ্গা নারী ও শিশুরা। ক্লান্ত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এসব মানুষ মিয়ানমারের জাতিগত সহিংসতা থেকে পালিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে নিরাপত্তার আশ্রয় খুঁজেছেন। তাদের পেছনে গড়ে ওঠা অস্থায়ী শিবিরটি তখন নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা হাজারো মানুষের ভিড়ে ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছিল। ছবিটি ২০১৭ সালে বাংলাদেশের উখিয়া, টেকনাফে ধারণ করেন মোহাম্মদ রাকিবুল হাসান।
বরং, এগুলো আমাকে আত্মবিশ্বাস দেয় যে, আমি যে গল্পগুলি বছরের পর বছর ধরে করার জন্য বেছে নিয়েছি, সেগুলি কমিউনিটি এবং উৎসের বাইরেও অর্থবহ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত কোণ থেকে একটি গল্প যখন লন্ডন, নিউইয়র্ক, ইতালি বা অন্য কোথাও কারও সাথে সংযুক্ত হয়, তখন আমার মনে হয়, কাজটি ভৌগলিক সীমানা অতিক্রম করেছে।
পুরস্কার দায়িত্বও বাড়িয়ে দেয়। স্বীকৃতি দৃশ্যমানতা তৈরি করে, এবং দৃশ্যমানতা আমাকে মানুষ, জলবায়ু পরিবর্তন, স্থানচ্যুতি, অসমতা এবং মানুষের মর্যাদা সম্পর্কে কথা বলার আরো সুযোগ করে দেয়। কিন্তু আমি কখনই পুরস্কারের জন্য কাজ করতে চাই না। তাহলে যাদের ছবি তুলি তাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক বদলে দেবে।
আমার মনোযোগ এখনও সেইসব প্রশ্নের দিকেই যেগুলো আমার মধ্যে কৌতূহল জাগায়, সহানুভূতির জন্ম দেয় এবং একই সঙ্গে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি করে। স্বীকৃতি আমাকে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দেয় বটে, তবে প্রেরণাটা একই, পর্যবেক্ষণ, বোঝাপড়া এবং গল্পগুলো বলা, কাজের ভেতরে এগুলো থাকা উচিত বলে আমি বিশ্বাস করি।
জাগো নিউজ: আপনি ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফি/ফিল্মমেকিং এবং ফটোসাংবাদিকতা পড়ান। আপনার কী মনে হয়, বাংলাদেশের ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলারদের নতুন প্রজন্মের এমন কী শেখা উচিত, যা আগের প্রজন্ম হয়তো শেখার সুযোগ পায়নি?
হাসান: আমি ২০০৭ সাল থেকে ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফি ও ফটোসাংবাদিকতার ওপর কর্মশালা পরিচালনা করে আসছি। সম্প্রতি ডকুমেন্টারি ফিল্মমেকিংও পড়াচ্ছি। বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক ইনস্টিটিউট এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আমি বহু কর্মশালা করিয়েছি। আমি নতুন প্রজন্মকে প্রথমেই বোঝাতে চাই, ফটোগ্রাফি এখন আর শুধু কারিগরিভাবে ভালো ছবি তোলার বিষয় নয়। ক্যামেরা ক্রমেই আরও বুদ্ধিমান হয়ে উঠছে, আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন এমন সব অবাস্তব ছবি তৈরি করতে সক্ষম, যা দেখলে বাস্তব বলেই মনে হয়। কিন্তু প্রযুক্তি সহজে যে বিষয়গুলোকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না, সেগুলো হলো কৌতূহল, সহমর্মিতা, নৈতিকতা, গবেষণা এবং যাদের গল্প আপনি বলছেন, তাদের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক।
সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলজুড়ে পানির সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততার কারণে নদী, পুকুর ও কৃষিজমির পানি দূষিত হয়ে পড়ছে। ভঙ্গুর দ্বীপগুলোর অনেক পরিবার বাধ্য হচ্ছে অন্যত্র চলে যেতে। যারা থেকে যাচ্ছে, তাদের প্রতিনিয়ত মোকাবিলা করতে হচ্ছে গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের। দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চয়তার কারণে পরিবারগুলোর ওপর আর্থিক ও সামাজিক চাপ কমাতে বাল্যবিবাহের প্রবণতাও বাড়ছে। মেয়েদের পাশাপাশি ছেলেদেরও অল্প বয়সে বিয়ের ঘটনা ক্রমেই সাধারণ হয়ে উঠছে। ছবিটি ২০২৬ সালে বাংলাদেশের সাতক্ষীরায় ধারণ করেন মোহাম্মদ রাকিবুল হাসান।
আগের প্রজন্মের ইন্টারডিসিপ্লিনারি চর্চা নিয়ে কাজ করার সুযোগ তুলনামূলক কম ছিল। এখন একজন ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলারকে ফটোগ্রাফি, চলচ্চিত্র নির্মাণ, শব্দ, লেখালেখি, সাংবাদিকতা, ভিজ্যুয়াল আর্ট, গবেষণা, ইতিহাস এবং নতুন প্রযুক্তি— সবকিছু সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে। একই সঙ্গে বাস্তবতাকে নথিবদ্ধ করা এবং শিল্পের মাধ্যমে সেটিকে ব্যাখ্যা করার মধ্যকার সীমারেখাটিও বুঝতে হবে। দুটোই গুরুত্বপূর্ণ, তবে দুটির নৈতিক দায়বদ্ধতা এক নয়।
আমি শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশকে গভীরভাবে দেখতেও উৎসাহিত করি। গুরুত্বপূর্ণ গল্প আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে— জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, বৈষম্য, জেন্ডার, নগরায়ণের পরিবর্তন এবং হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমি তাদের বলি— ক্যামেরা চালাতে শেখো, কিন্তু এরপর কিছুক্ষণের জন্য ক্যামেরার কথা ভুলে যাও। মানুষের কথা শুনতে শেখো। একটি অর্থবহ গল্পের শুরু হয় মানুষকে বোঝার মধ্যদিয়ে, সঙ্গে সঙ্গে তাদের ছবি তুলে ফেলার মধ্যদিয়ে নয়।
জাগো নিউজ: ড্রোন, এআই, কম্পিউটেশনাল ফটোগ্রাফি এবং নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রযুক্তি ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিং বদলে দিচ্ছে। এসব পরিবর্তনের কোনগুলো আপনাকে সবচেয়ে বেশি উৎসাহিত করে, আর ডকুমেন্টারি চর্চার ক্ষেত্রে কোনগুলো নিয়ে আপনার সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ?
হাসান: প্রযুক্তি আমাকে উৎসাহিত করে, কারণ এটি ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিংয়ের ভাষাকে ক্রমাগত বিস্তৃত করে যাচ্ছে। ড্রোন এমন সব দৃষ্টিকোণ আমাদের সামনে এনে দিয়েছে, যা একসময় বিশাল খরচ ছাড়া কল্পনাই করা যেত না। অন্যদিকে, কম্পিউটেশনাল ফটোগ্রাফি ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের গল্পও প্রায় মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। সৃজনশীল মাধ্যম হিসেবে এআই নিয়েও আমি ভীষণ আগ্রহী। বিশেষ করে কনসেপচুয়াল ও ইন্টারডিসিপ্লিনারি শিল্পচর্চায়, যেখানে কল্পনা, পুনর্নির্মাণ, স্মৃতি ও বাস্তবতা একে অন্যের সঙ্গে মিশে যেতে পারে।

মোহাম্মদ রাকিবুল হাসানের ‘দ্য ব্লু ফিগ’-এর প্রদর্শনী হয় স্পেনের বাস্ক কান্ট্রির গেতসো শহরে আয়োজিত গেতসোফোটো ইন্টারন্যাশনাল ইমেজ ফেস্টিভ্যাল ২০২৬-এ। উৎসবের ২০তম আসরের অংশ হিসেবে বড় পরিসরের এই আউটডোর ইনস্টলেশনের মাধ্যমে কাজটি জনপরিসরে প্রদর্শিত হয়। উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয় ২৮ মে থেকে ২১ জুন ২০২৬।
ফিলিপ টলেদানোর ‘অ্যানাদার আমেরিকা’ এ ক্ষেত্রে একটি চমৎকার উদাহরণ। তিনি এআই-নির্মিত ছবি ব্যবহার করে ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকের আমেরিকার একটি বিকল্প ইতিহাস নির্মাণ করেছে। ইচ্ছাকৃতভাবে বাস্তবতা ও কল্পনার সীমারেখা অস্পষ্ট করে তিনি ফটোগ্রাফিকে প্রমাণ হিসেবে দেখার আমাদের যে প্রচলিত ধারণা, সেটাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিষয়টি আমাকে আকর্ষণ করে, কারণ এখানে এআই শুধু আকর্ষণীয় ছবি তৈরির মাধ্যম নয়; এটি নিজেই শিল্পকর্মের বক্তব্যের একটি অংশ হয়ে উঠতে পারে।
তবে একই সঙ্গে ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফি ও ফটোসাংবাদিকতায় স্বচ্ছতা ছাড়া এআই ব্যবহারের বিষয়টিই আমাকে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন করে। ডকুমেন্টারি চর্চা মূলত বিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল। দর্শক যদি দেখা কোনো ঘটনা আর কৃত্রিমভাবে তৈরি একটি ছবির মধ্যে পার্থক্য করতে না পারে, তাহলে তার বিশ্বাস সহজেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এ কারণেই সামাজিক মাধ্যমে এআই-নির্মিত কনটেন্ট আলাদাভাবে চিহ্নিত করার উদ্যোগকে আমি ইতিবাচক হিসেবে দেখি। এতে মানুষের অবিশ্বাস কিছুটা হলেও কমতে পারে।
প্রযুক্তির কাজ হওয়া উচিত আমাদের দৃষ্টিকে আরও বিস্তৃত করা, আমাদের দায়িত্বকে প্রতিস্থাপন করা নয়। আমার শিল্পচর্চায় এআই, পুনর্নির্মাণ বা পুনঃঅভিনয়ের মতো পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আমার আপত্তি নেই, যদি সেগুলো যথাযথ প্রেক্ষাপট ও ব্যাখ্যাসহ উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু ফটোসাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তথ্যের সততা ও সত্যনিষ্ঠতার সঙ্গে কোনো আপস করা যায় না। প্রযুক্তির হাতিয়ার ক্রমাগত বদলাবে; কিন্তু আমাদের নৈতিকতাকে তার চেয়েও দ্রুত বিকশিত হতে হবে।
জাগো নিউজ: কয়েক দশক পর মানুষ যখন আপনার সমগ্র জীবনের কাজের দিকে তাকাবে, তখন বাংলাদেশ সম্পর্কে তারা কী ধারণা করবে বলে আশা করেন? আর আপনার ছবি ও সিনেমার কী ধরনের উত্তরাধিকার রেখে যেতে চান?
হাসান: তারা কিছু ছবি ও চলচ্চিত্র দেখুক, এ রকম চাই না। আমি চাই তারা বাংলাদেশের একটি দৃশ্যমান স্মৃতি দেখতে পাক, এই দেশের মানুষ, তাদের সংগ্রাম, পরিবর্তন, পরিবেশ এবং অসাধারণ ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতার একটি ভিজ্যুয়াল দলিল দেখুক।
‘সল্ট’ ও ‘দ্য ব্লু ফিগ’-এর মতো প্রকল্পের মাধ্যমে আমি বহু বছর ধরে সুন্দরবনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে ছবি তুলেছি। রোহিঙ্গা সংকট, নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত মানুষ, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বেঁচে থাকা মানুষ, ২০২৪ সালের মুনসুন রেভুলেশন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং এমন অসংখ্য সাধারণ মানুষের জীবন নথিবদ্ধ করেছি, যাদের গল্প হয়তো কখনই বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠবে না। উদাহরণ হিসেবে ‘দ্য টেস্ট অব হানি’র কথা বলা যায়। সেখানে আমরা সুন্দরবনের একজন বাঘ-বিধবার জীবনের ছোট্ট একাংশ ক্যামেরায় ধারণ করেছি এবং তার ব্যক্তিগত গল্পকে মানুষ, জলবায়ু ও প্রকৃতির বৃহত্তর সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত করেছি।

মোহাম্মদ রাকিবুল হাসান নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘ম্যানজুর আলম বেগ: দ্য ম্যান হু টট বাংলাদেশ হাউ টু সি (২০২৬)’-এর পোস্টার। পোস্টারের ছবিটি তুলেছেন এমডি মঈন উদ্দিন, ১৯৯৭ সালে।
এ বছর আমি ‘মনজুরুল আলম বেগ: দ্য ম্যান হু টট বাংলাদেশ হাউ টু সি’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্রও বানিয়েছি। বাংলাদেশের আলোকচিত্র ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস নির্মাণে যেসব মানুষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তাদের স্মৃতি হারিয়ে যাওয়ার আগেই সংরক্ষণ করার দায়িত্বটিও আমি গভীরভাবে অনুভব করি। এই চলচ্চিত্রটি সেই দায়িত্ববোধেরই আরেকটি প্রকাশ।
আমার নিজস্ব শিল্পচর্চার পাশাপাশি বেসরকারি ও অলাভজনক সংস্থার জন্য প্রায় একশ মানবিক ও উন্নয়নবিষয়ক চলচ্চিত্র বানিয়েছি। শুধু বাংলাদেশ নয়, পানামা, নেপাল, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়াতেও কাজ করার সুযোগ হয়েছে আমার। এসব অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে আমি কাছ থেকে দেখেছি— দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি, দুর্যোগ, বৈষম্য ও পরিবেশগত পরিবর্তনের মুখে সাধারণ মানুষ কীভাবে নিজেদের জীবন সামলে নেয় এবং ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করে।
শেষ পর্যন্ত আমি চাই, আমার আর্কাইভ এক ধরনের ‘দৃশ্যমান সাক্ষ্য’ হয়ে উঠুক। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন বুঝতে পারে— বাংলাদেশ কেমন ছিল, আমরা কী হারাচ্ছিলাম, কীসের জন্য লড়ছিলাম এবং কীভাবে মানুষ মর্যাদা নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করে গেছে। আমার মৃত্যুর পর যদি আমার ছবি ও চলচ্চিত্রগুলো থাকে, তাহলে আমি চাই সেগুলো একটি সহজ কথাই বলুক— ‘আমি এখানে ছিলাম, আমি দেখেছি, আর এই গল্পগুলো আমি পরম যত্নে সংরক্ষণের চেষ্টা করেছি।’
জাগো নিউজ: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আপনার শিল্পচর্চা প্রচলিত ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফির গণ্ডি ছাড়িয়ে ডিজিটাল ইমেজ তৈরি, স্টেজড ফটোগ্রাফি, অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন এবং বিভিন্ন ধরনের ভিজ্যুয়াল পদ্ধতির সমন্বয়ের দিকে বিস্তৃত হয়েছে। ডকুমেন্টারির সত্য ও নির্মিত চিত্রের সম্পর্ককে আপনি কীভাবে দেখেন? সমকালীন ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিংয়ে এসব পদ্ধতির ভূমিকা কী?
হাসান: একটি ছবি কীভাবে তৈরি করা যায়, তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতি আমার সবসময়ই আগ্রহ ছিল। প্রায় ২০০৫ সালের দিকে আমি একটু ভিন্নভাবে কাজ শুরু করি। কাগজে কিছু একটা আঁকতাম, সেটার ছবি তুলতাম, এরপর ফটোশপে ছবিটাকে নানাভাবে পরিবর্তন করতাম। আমার শিল্পচর্চায় এটিই ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল। পরে ইন্টারনেট থেকে বিভিন্ন শহরের ছবি সংগ্রহ করে সেগুলো প্রিন্ট করতাম এবং হাতে তৈরি কোলাজ বানাতাম। এরপর কোলাজটির তিনটি অংশের ছবি তুলে সবশেষে ডিজিটালি সেগুলো জোড়া লাগিয়ে একটি কাল্পনিক শহরের দৃশ্য তৈরি করি। সেই সময় নিজের কাজের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াটিকে আমার কাছে নতুন মনে হয়েছিল।
‘হিউম্যান কলোনি’, আনুমানিক ২০২১ — মোহাম্মদ রাকিবুল হাসান
ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন শহরের ছবি ব্যবহার করে নির্মিত একটি কাল্পনিক নগরদৃশ্য। ছবিগুলো প্রিন্ট করে কেটে হাতে তৈরি কোলাজের মাধ্যমে একটি কল্পিত শহুরে পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। এরপর কোলাজটির তিনটি অংশের আলাদা ছবি তুলে সেগুলো ডিজিটালি জুড়ে একটি একক প্যানোরামিক ছবি তৈরি করা হয়েছে। অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন, অ্যানালগ কোলাজ, ফটোগ্রাফি ও ডিজিটাল পুনর্নির্মাণের সমন্বয়ে নির্মিত ‘হিউম্যান কলোনি’ সমকালীন নগরজীবনের ঘনত্ব ও দৃশ্যগত পুনরাবৃত্তি নিয়ে অনুসন্ধান করে। একই সঙ্গে বাস্তব শহরগুলোর ভৌগোলিক সীমানা এবং একটি কল্পিত মানববসতির মধ্যকার সীমারেখাকেও অস্পষ্ট করে দেয়।
এরপর থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা আমার ভিজ্যুয়াল ভাষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। কখনো পুরো ছবিটিই ফটোশপে তৈরি করি, কখনো চিত্রকর্ম বা অন্য কোনো ভিজ্যুয়াল ধারার উপাদান নিজের কাজে ব্যবহার করি, আবার কখনো বাস্তব মানুষকে পরিকল্পিত ও নির্মিত কোনো পরিস্থিতির মধ্যে রেখে ছবি তুলি। তবে আমার কনসেপচুয়াল ডকুমেন্টারি কাজের ক্ষেত্রে মূল ঘটনা এবং তার অন্তর্নিহিত বাস্তব সত্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে।
আমার কাছে ডকুমেন্টারি সত্যের অর্থ সবকিছু হুবহু যেভাবে ঘটেছে, সেভাবেই ক্যামেরায় ধারণ করতে হবে, এমন নয়। নির্মিত চিত্র, পুনঃঅভিনয়, অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন কিংবা রূপকের ব্যবহার কখনো কখনো এমন বাস্তবতাও তুলে ধরতে পারে, যা একটি সরাসরি তোলা ছবি দিয়ে সম্ভব নয়। এখানে মূল দায়িত্ব হলো ব্যবহৃত পদ্ধতি সম্পর্কে স্বচ্ছ থাকা এবং দর্শককে বিভ্রান্ত না করা।

রেনে মাগ্রিতের ‘ল্য ব্লাঁ-সিং’ (১৯৬৫) থেকে অনুপ্রাণিত এই নির্মিত আলোকচিত্রটি ‘দি ওডিসি অব লিটল মারমেইডস’ (আনুমানিক ২০২৩)-এর জগতের প্রেক্ষাপটে অরণ্যের মধ্য দিয়ে চলমান এক আরোহীর পরাবাস্তব খণ্ডায়নকে নতুনভাবে কল্পনা করে। কক্সবাজারের এক তরুণী সার্ফার তার উজ্জ্বল লাল সার্ফবোর্ডটি নিয়ে গাছের সারির ভেতর দিয়ে এগিয়ে যায়, যেখানে তার অবয়বটি খণ্ডিত উল্লম্ব তলের মাঝে আবির্ভূত ও অদৃশ্য হতে থাকে। এই শিল্পকর্মটি সেই অনিশ্চিত পরিসরকে প্রতিফলিত করে, যেখানে এই মেয়েরা ঐতিহ্য ও স্বাধীনতা, সামাজিক বাধা ও ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার মাঝে বিচরণ করে, যখন তারা সমুদ্র ও নিজেদের ভবিষ্যৎকে নিজেদের করে নেয়।
মার্ক রথকো, গেরহার্ড রিখটার, টমাস ডিমান্ড, সিন্ডি শেরম্যান এবং রেনে ম্যাগ্রিতের মতো শিল্পীরা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন। তাদের শিল্পচর্চা পরস্পরের থেকে অনেকটাই আলাদা। তবে তাদের মধ্যে যে বিষয়টি আমাকে আকর্ষণ করে, তা হলো নতুন ভিজ্যুয়াল ভাষা আবিষ্কারের আকাঙ্ক্ষা। আমিও সেই স্বাধীনতাটুকু চাই। পরীক্ষা-নিরীক্ষা আমাকে পুনরাবৃত্তি ও একঘেয়েমির বাইরে নিয়ে যায়। এর মাধ্যমে তথ্য, স্মৃতি, কল্পনা ও শিল্প একে অপরের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ পায়— তবে গল্পের সত্য সবসময়ই থাকে কেন্দ্রে।
জাগো নিউজ: শিক্ষাজীবনে আপনার পড়াশোনা ছিল ফটোসাংবাদিকতা, ফটোগ্রাফি, ডকুমেন্টারি ফিল্মমেকিং, শিল্পের ইতিহাস ও দর্শন, সাংবাদিকতা এবং ট্রান্সমিডিয়া স্টোরিটেলিং নিয়ে। ইন্টারডিসিপ্লিনারি আন্তর্জাতিক শিক্ষাজীবন আপনার ভিজ্যুয়াল ভাষাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে? আপনার কি মনে হয়, তুলনামূলকভাবে প্রচলিত ধারায় শিক্ষিত আলোকচিত্রীদের চেয়ে আপনি ডকুমেন্টারি স্টোরিটেলিংকে ভিন্নভাবে দেখেন?
হাসান: আমার শিক্ষাজীবন একটা সরলরেখা ধরে এগোয়নি। সম্ভবত সে কারণেই আমার ভিজ্যুয়াল ভাষাও সরলরেখায় এগোয় না। অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপাইন, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে আমি চলচ্চিত্র নির্মাণ, ফটোসাংবাদিকতা, ফটোগ্রাফি, শিল্পের ইতিহাস, দর্শন ও ট্রান্সমিডিয়া নিয়ে পড়াশোনা করেছি। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই আমাকে ভিন্ন কিছু দিয়েছে। তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, কয়েকজন শিক্ষক পড়া শেষ হওয়ার বহু বছর পরও আমার সঙ্গে আছে।
‘ল্য ব্লাঁ-সিং’, ১৯৬৫ রেনে মাগ্রিতের চিত্রকর্ম (পাবলিক ডোমেইন ছবি)
সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে জন বাকমাস্টার আমাকে প্রথম ডকুমেন্টারি ফিল্মমেকিং শেখান। তার ক্লাস আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। সেই সময়ের অনেক শিক্ষা এখনো আমার সঙ্গে রয়েছে। পরে তিনি আত্মহত্যা করে। কিন্তু শিক্ষক হিসেবে তিনি কখনই সত্যিকার অর্থে আমাকে ছেড়ে যায়নি। তিনি আমাকে যা শিখিয়েছে, তার কিছু অংশ আজও আমার চলচ্চিত্রের মধ্যদিয়ে এবং আমি এখন অন্যদের যা শেখাই, তার মধ্য দিয়ে বেঁচে আছে।
এশিয়ান সেন্টার ফর জার্নালিজম (এসিএফজে), আতেনেও দে ম্যানিলা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফটোসাংবাদিক ও অধ্যাপক জিমি এ. ডোমিঙ্গো আমাকে শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ফটোসাংবাদিকতাকে বুঝতে শিখিয়েছে। অধ্যাপক ইসাবেল কেনি আমাকে প্রায় নিজের সন্তানের মতো দেখত। তিনি আমার ভিজ্যুয়াল ভাষা সম্পর্কে বোঝাপড়াকে আরও বিস্তৃত করে দেয়। অক্সফোর্ডে গর্ডন রেভলি আমাকে শিল্পের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, যা আমার সৃজনশীল যাত্রায় একটি বড় বাঁক হয়ে ওঠে। হঠাৎ করেই বুঝতে শুরু করি, ফটোগ্রাফির সঙ্গে শত শত বছরের চিত্রকলা, দর্শন, উপস্থাপনা ও চিন্তার এক গভীর সংলাপ রয়েছে।

অ্যান্ড্রু ওয়াইথের ‘ক্রিস্টিনাস ওয়ার্ল্ড’ (১৯৪৮) থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে, ‘দ্য ওডিসি অব লিটল মারমেইডস’ (আনুমানিক ২০২৩) সিরিজের এই নির্মিত আলোকচিত্রটি কক্সবাজারের এক তরুণী সার্ফারের জীবনের মধ্যদিয়ে এর আইকনিক চরিত্রটিকে নতুনভাবে কল্পনা করে। দূরের কোনো খামারবাড়ির দিকে তাকানোর পরিবর্তে, সে বিশাল বঙ্গোপসাগরের দিকে মুখ করে আছে; তার শরীর ভেজা বালির সঙ্গে লেপ্টে আছে এবং তার মাথার ওপরে প্রসারিত আকাশ। সমুদ্র এখানে একাধারে গন্তব্য এবং সম্ভাবনা হয়ে ওঠে; এমন একটি পরিসর যেখানে সে সামাজিক প্রত্যাশার মুখোমুখি হয়, স্বাধীনতার সন্ধান করে এবং নিজের সম্প্রদায়ের মেয়েদের জন্য নির্ধারিত সীমানার বাইরে এক ভবিষ্যৎ কল্পনা করে। সমুদ্রের দিকে তার এই যাত্রা অসহায়ত্বকে দৃঢ়সংকল্পে রূপান্তরিত করে, যা এই সিরিজের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সহনশীলতারই প্রতিধ্বনি।
ফ্যালমাউথ ইউনিভার্সিটিতে আমার কোর্স লিডার জেসি আলেকজান্ডার আমাকে ফটোগ্রাফির নতুন নতুন ধারা ও পদ্ধতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় এবং প্রচলিত ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফির সীমার বাইরে গিয়ে ভাবতে উৎসাহিত করে। পরে নিউইয়র্কের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার অব ফটোগ্রাফিতে (আইসিপি) অ্যালান ফ্রেম ও ড্যারিন মিকি শুধু কীভাবে ছবি তুলব এবং ছবি বুঝব, তা নয়— কীভাবে অন্যদের ফটোগ্রাফি শেখাব, সেই ভাবনাকেও প্রভাবিত করেছে।
তাই হ্যাঁ, এই ইন্টারডিসিপ্লিনারি শিক্ষা আমাকে গভীরভাবে বদলে দিয়েছে। এখন আমি ডকুমেন্টারিকে শুধু ক্যামেরার সামনে যা আছে, তা রেকর্ড করার মাধ্যম হিসেবে দেখি না। সাংবাদিকতা আমাকে তথ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিখিয়েছে; চলচ্চিত্র নির্মাণ শিখিয়েছে সময় ও আবেগের গুরুত্ব; শিল্পের ইতিহাস দিয়েছে প্রেক্ষাপট; দর্শন শিখিয়েছে প্রশ্ন করতে; আর সমকালীন ফটোগ্রাফি আমাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্বাধীনতা দিয়েছে। কোনো গল্প বলার সময় আমি এসব অভিজ্ঞতাকেই সঙ্গে নিয়ে এগোই। ফটোগ্রাফির প্রায় দুইশ বছরের ইতিহাসও আসলে ক্রমাগত পরিবর্তন, আবিষ্কার এবং নতুন করে দেখার ইতিহাস। সেই দীর্ঘ যাত্রার উত্তরাধিকার বহন করেই আমি আমার কাজের মধ্যে বাস্তবতা, স্মৃতি, কল্পনা ও নতুন প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে একসঙ্গে অনুসন্ধান করতে চাই।
আরএমডি