• সোম. সেপ্টে. 14th, 2026

দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মনিরপেক্ষতা কেন দুর্বল হচ্ছে: মীরা নন্দার সাক্ষাৎকার

Bytrendnews

সেপ্টে. 14, 2026


‘পোস্ট কলোনিয়াল থিওরি অ্যান্ড দ্য মেকিং অব হিন্দু ন্যাশনালিজম’ (২০২৫) গ্রন্থের লেখক, দার্শনিক ও বিজ্ঞান-ইতিহাসবিদ ড. মীরা নন্দার সঙ্গে আলাপচারিতা।

দ্য ডেইলি স্টার: আপনি যুক্তি দিয়েছেন, ভারতীয় উপমহাদেশে বামপন্থীদের পোস্ট-কলোনিয়াল (উত্তর-উপনিবেশবাদ) সংক্রান্ত সমালোচনার ধরন দেখে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছেন হিন্দুত্ববাদী ডানপন্থীরা। এখন দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মের রাজনীতিকে বৈধতা দিতে প্রায় একই ধরনের ‘ডিকলোনিয়াল’ বা ‘উপনিবেশবাদ-মুক্ত’ ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে। আদর্শগতভাবে বিপরীত দুই পক্ষ কীভাবে একই ভাষায় কথা বলতে শুরু করল?

মীরা নন্দা: আমার বইয়ের মূল বক্তব্যই হলো—পোস্ট-কলোনিয়াল (উত্তর-উপনিবেশবাদ) ও ডিকলোনিয়াল (উপনিবেশবাদ-মুক্ত) তত্ত্বের মধ্যে এমন কিছু বিষয় আছে, যা বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাদী ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদীদের জন্য খুব সহজেই ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠেছে।

আমার অনেক সমালোচক পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের সঙ্গে হিন্দুত্ববাদীদের ‘ভারতীয় মনকে উপনিবেশমুক্ত করার’ আহ্বানের যে স্পষ্ট মিল রয়েছে, তা এড়িয়ে যান। তারা দাবি করেন—হিন্দুত্ববাদীরা পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের ‘মুক্তিকামী’ লক্ষ্যকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে বা বিকৃত করছে।

আমার মতে, বিষয়টিকে এভাবে ব্যাখ্যা করা আসলে বাস্তবতাকে ইচ্ছা করে এড়িয়ে যাওয়া।

কারণ পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের ‘মুক্তিকামী’ ভাষার আড়ালে এমন কিছু চিন্তা রয়েছে, যার মধ্যে প্রতিক্রিয়াশীলতা ও নিজস্ব সংস্কৃতিকে শ্রেষ্ঠ বা বিশেষ মনে করার প্রবণতা স্পষ্ট দেখা যায়।

হিন্দুত্ববাদীরা সেই চিন্তা বা কাঠামোকে ভুলভাবে ব্যবহার করছে না। বরং ওই চিন্তার অনেকটাই তাদের নিজেদের বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে যায়।

পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের মৌলিক ধারণাগুলোর সঙ্গে হিন্দুত্ববাদী সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের দীর্ঘদিনের কিছু বিশ্বাসের বেশ মিল রয়েছে। অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে এই মিল স্পষ্ট।

প্রথমত, পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের মূল কথা হলো, রাজনৈতিকভাবে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হলেও মানুষের চিন্তা ও মানসিকতায় ঔপনিবেশিকতার প্রভাব রয়ে গেছে। এটাকেই বলা হয় ‘মানসিক ঔপনিবেশিকতা’।

এই তত্ত্বের মতে, স্বাধীনতার পর ভারত যেসব ধারণার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছে—যেমন ধর্মনিরপেক্ষতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ব্যক্তি অধিকার, মার্ক্সবাদী সমাজতন্ত্র, বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ এবং উন্নয়নবাদ—এসব মূলত ইউরোপে গড়ে উঠেছে।

ভারতীয় অভিজাতরা এসব ধারণাকে সবার জন্য প্রযোজ্য ও সার্বজনীন মনে করে গ্রহণ করেছেন। এর ফলে ভারত নিজের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে আধুনিকতার নিজস্ব পথ তৈরি করতে পারেনি। বরং ইউরোপীয় চিন্তার কাঠামোর মধ্যেই আটকে গেছে।

এই ধারণার সঙ্গে সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদীদের বক্তব্যের মিল রয়েছে। গান্ধী, বিবেকানন্দ থেকে নরেন্দ্র মোদি পর্যন্ত অনেকেই বলে এসেছেন, ভারতের পথ নির্ধারণ করতে হবে তার নিজস্ব ‘আত্মা’ ও ‘আধ্যাত্মিকতার’ ভিত্তিতে।

দ্বিতীয়ত, পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো, ভারত বা বৃহত্তর প্রাচ্যকে ইউরোপে তৈরি কিছু নির্দিষ্ট ধারণা দিয়ে বিচার করা ঠিক নয়। যেমন ব্যক্তিস্বাধীনতা, মার্ক্সের শ্রেণিসংগ্রামের ধারণা বা আধুনিক বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ দিয়ে ভারতীয় সমাজ ও জ্ঞানকে বিচার করলে তা ‘জ্ঞানমূলক সহিংসতা’ বা ‘জ্ঞানমূলক অবিচার’ তৈরি করতে পারে।

এই চিন্তার পেছনে এডওয়ার্ড সাঈদ, মিশেল ফুকোসহ উত্তর-গঠনবাদী চিন্তাবিদদের প্রভাব রয়েছে। তাদের মতে, আমরা যাকে বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞান বলে মনে করি, সেটিও অনেক সময় ক্ষমতা ও প্রচলিত চিন্তা কাঠামোর দ্বারা প্রভাবিত হয়।

তাই ভারতকে বোঝার ক্ষেত্রে শুধু ইউরোপীয় জ্ঞান ও ধারণাকে মানদণ্ড হিসেবে না দেখে ভারতের নিজস্ব ধারণা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থাৎ ইউরোপীয় জ্ঞানকে একমাত্র বা সর্বজনীন মানদণ্ড হিসেবে দেখা যাবে না।

মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারও শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার সময় অনেক ক্ষেত্রে ‘ঐতিহ্যগত জ্ঞানব্যবস্থা’কে গুরুত্ব দিয়েছে। এর মধ্যে হিন্দু দর্শন ও ঐতিহ্য থেকে আসা বিভিন্ন ধারণাও রয়েছে।

তৃতীয়ত, পোস্ট-কলোনিয়াল চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো ‘সাবঅলটার্ন’ বা সমাজের নিচের স্তরের মানুষের কণ্ঠস্বর সামনে নিয়ে আসা। ঔপনিবেশিক শাসক এবং পরে ঔপনিবেশিক চিন্তায় প্রভাবিত অভিজাতদের কারণে যাদের মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি উপেক্ষিত হয়েছে, তাদের নিজেদের দৃষ্টিতে সমাজ ও ইতিহাসকে বোঝার চেষ্টা করা হয়।

এটিকেই পোস্ট-কলোনিয়াল প্রকল্পের একটি ‘মুক্তিকামী’ দিক হিসেবে দেখা হয়।

কিন্তু এই ধারণার সমালোচকদের মতে, সাবঅলটার্ন মানুষের চিন্তা ও চেতনা প্রচলিত ক্ষমতা ও ধর্মীয় ধারণা থেকে পুরোপুরি স্বাধীন নয়। তাদের চিন্তাও সমাজের প্রভাবশালী ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মতাদর্শ দ্বারা গড়ে ওঠে।

এই কারণে সাবঅলটার্নদের চেতনা অনুসরণ করলে অনেক সময় তা হিন্দুধর্ম, এমনকি হিন্দুত্ববাদের কাছেও গিয়ে পৌঁছাতে পারে। বাবরি মসজিদ ধ্বংস এবং বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় নিম্নবর্গের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণকে এর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

তাই সাবঅলটার্নদের চিন্তাকে ইউরোপকেন্দ্রিক জ্ঞানের বিকল্প হিসেবে সরাসরি মহিমান্বিত করলেই তা ‘মুক্তিকামী’ হয়ে যায় না। বরং সেই চিন্তার ভেতরেও প্রচলিত ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষমতাকাঠামোর প্রভাব থাকতে পারে।

ডেইলি স্টার: দক্ষিণ এশিয়ায় একদিকে নতুন প্রযুক্তি আসছে, অর্থনীতি বড় হচ্ছে; অন্যদিকে ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও কুসংস্কারও বাড়ছে। আধুনিকায়ন কেন সমাজকে আরও ধর্মনিরপেক্ষ ও যুক্তিবাদী করে তুলতে পারেনি?

মীরা নন্দা: আধুনিক প্রযুক্তি ও পুঁজিবাদী অর্থনীতি গ্রহণ করা হয়েছে, কিন্তু আধুনিকতার সঙ্গে যুক্ত সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে ‘পাশ্চাত্য’ ও ‘ঔপনিবেশিক’ বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এই দ্বৈত অবস্থানই আজকের সংকট তৈরি করেছে। ফলে অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও বিশ্বায়ন যত বেড়েছে, কুসংস্কার, ধর্মীয় উগ্রতা ও দেশজতাবাদও তত শক্তিশালী হয়েছে।

সম্প্রতি ভারতে এর একটি ভালো উদাহরণ দেখেছি। সেটি হলো তথাকথিত ‘প্রতিক্রিয়াশীল আধুনিকতা’। ভারতে জনপ্রিয় হওয়া প্রথম দিকের এআইভিত্তিক অ্যাপগুলোর প্রায় সবই জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়ে! জ্যোতিষীরাই বড় পরিসরে এআই ব্যবহার করে ব্যবসা করছেন। এর কারণ, এসব প্রাচীন কুসংস্কারের চাহিদা অনেক। এমনকি এসব অ্যাপের কোড লেখা সফটওয়্যার প্রকৌশলীরা নিজেরাই জ্যোতিষের ভক্ত হলেও আমি অবাক হবো না।

পোস্ট-কলোনিয়াল তত্ত্বের ‘মুক্তিকামী’ ভাষার আড়ালে এমন কিছু চিন্তা রয়েছে, যার মধ্যে প্রতিক্রিয়াশীলতা ও নিজস্ব সংস্কৃতিকে শ্রেষ্ঠ বা বিশেষ মনে করার প্রবণতা স্পষ্ট দেখা যায়। হিন্দুত্ববাদীরা সেই মূল চিন্তা বা কাঠামোকে ভুলভাবে ব্যবহার করছে না। বরং ওই চিন্তার অনেকটাই তাদের নিজেদের বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে যায়।

মীরা নন্দা

এই ‘প্রতিক্রিয়াশীল আধুনিকতা’র শুরু উনিশ শতকের শেষ দিকে, স্বাধীনতা আন্দোলনের শুরুর সময়েই। সে সময়ের ইসলামি সংস্কার আন্দোলন নিয়ে আমি খুব বেশি পড়িনি। তবে বিবেকানন্দ ও দয়ানন্দ সরস্বতীর মতো হিন্দু চিন্তাবিদেরা এ ধরনের চিন্তার পক্ষে ছিলেন।

বিবেকানন্দ এমন একটি ভারত চেয়েছিলেন, যার ‘পেশি হবে ইস্পাতের মতো শক্ত’, কিন্তু আত্মা হবে যোগীর মতো। অর্থাৎ ভারত প্রযুক্তিতে উন্নত হবে, কিন্তু তার ‘আধ্যাত্মিক আত্মা’ অক্ষুণ্ণ থাকবে।

গান্ধী অবশ্য নিজের অবস্থানে আরও ধারাবাহিক ছিলেন। আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যে শক্তি ও পৌরুষের ধারণা যুক্ত হয়, তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। একইসঙ্গে তিনি আধুনিক জীবনব্যবস্থারও বিরোধিতা করেছিলেন—যেখানে নারী-পুরুষ স্বাধীন ব্যক্তি হিসেবে নিজেদের সিদ্ধান্ত নেবে, শহরে বাস করবে এবং সংসদীয় নির্বাচনে অংশ নেবে।

তাহলে তারা এই দুই বিপরীত ধারণাকে কীভাবে একসঙ্গে মেলালেন?

মূলত তারা আধুনিক প্রযুক্তি ও শিল্পকে পুরো মানবজাতির সম্পদ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু যে আধুনিক বিজ্ঞান এসব প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি করেছে, তাকে নতুন জ্ঞান হিসেবে স্বীকার করেননি। তাদের দাবি ছিল, আধুনিক বিজ্ঞান আসলে সেই জ্ঞানই নতুন করে আবিষ্কার করেছে, যা প্রাচীন আর্য ঋষিরা বেদ ও অন্যান্য ধর্মীয় গ্রন্থে আগেই জানতেন।

তাই রেলপথ, টেলিগ্রাফ, বিদ্যুৎসহ আধুনিক প্রযুক্তির বিভিন্ন সুবিধা তারা গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের বস্তুবাদী ও যুক্তিবাদী চিন্তাকে তারা ইউরোপের নৈতিক অবক্ষয়ের লক্ষণ হিসেবে দেখেছিলেন।

অর্থাৎ, আধুনিক প্রযুক্তিকে তারা সবার জন্য গ্রহণযোগ্য ও কল্যাণকর বলে মনে করলেও, আধুনিক বিজ্ঞানকে হিন্দু ‘আধ্যাত্মিকতা’ ও রহস্যবাদের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছিলেন।

এর ফল ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমে আধুনিক বিজ্ঞানের বিকাশের সঙ্গে এনলাইটেনমেন্ট বা জ্ঞানযুগের সূচনা হয়। এই আন্দোলন মধ্যযুগীয় সমাজের ধর্মীয় বিশ্বাস ও কর্তৃত্বকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

কিন্তু ভারতে তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। কারণ আধুনিক বিজ্ঞানকে সরাসরি ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সংঘাতে না এনে ‘বৈদিক’ আধ্যাত্মিকতা ও রহস্যবাদের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

স্বাধীনতার পরের প্রথম কয়েক দশকে নেহরুর নেতৃত্বে ‘বৈজ্ঞানিক মানসিকতা’ ও যুক্তিনির্ভর চিন্তা গড়ে তোলার কিছু চেষ্টা হয়েছিল। এর মাধ্যমে হিন্দুধর্মের প্রচলিত কিছু ধর্মীয় ও অধিবিদ্যাগত ধারণাকে প্রশ্ন করার সুযোগ তৈরি হতে পারত।

কিন্তু এসব উদ্যোগ খুব বেশি দূর এগোয়নি।

বরং ১৯৮০-এর দশক থেকে আধুনিক বিজ্ঞানকেই ‘ইউরোকেন্দ্রিক’ এবং ‘জ্ঞানমূলক সহিংসতার’ উৎস হিসেবে সমালোচনা করা শুরু হয়।

ফলে যা ঘটেছে তা হলো—প্রযুক্তির আধুনিকায়ন হয়েছে, কিন্তু মানুষের চিন্তা ও সমাজের ঐতিহ্যনির্ভর মানসিকতার তেমন পরিবর্তন হয়নি।



Source link

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।