
দেড় লাখ ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) আর নির্বাচনে ব্যবহার না করার সিদ্ধান্তের পর সেগুলোর সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণই এখন নির্বাচন কমিশনের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রায় ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা এসব যন্ত্রের কোনগুলো পুনর্ব্যবহার, বিক্রি কিংবা ধ্বংস করা যাবে, তা নির্ধারণে কমিশন এখন তালিকা তৈরি ও কারিগরি মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ইভিএমগুলো কোথায় কতটি রয়েছে, কোনগুলোর কী অবস্থা, কতগুলো এখনো ব্যবহারযোগ্য—এসব তথ্য হালনাগাদ করতে সংশ্লিষ্ট কমিটিকে নির্দেশনা দিয়েছে এএমএম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন।
তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার প্রয়োজনে যেসব যন্ত্র সংরক্ষণ করা দরকার, সেগুলো রেখে বাকিগুলোর ভবিষ্যৎ দ্রুত নিষ্পত্তি করাই এখন কমিশনের লক্ষ্য।
তবে সব ইভিএম ধ্বংস করে ফেলার সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। সরকার ও কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে পুনর্ব্যবহার, বিক্রি কিংবা ধ্বংসের উপায় ঠিক করতে চায় ইসি।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “ইভিএম এখন আমাদের কাছে বার্ডেন; এটার কোনো ব্যবহারও নেই এবং লাখো ইভিএম মেয়াদোত্তীর্ণও হয়ে গেছে। দ্রুত এর ডিসপোজাল করা হবে।”
তিনি জানান, ইভিএমের বর্তমান অবস্থা ও অবস্থান নির্ধারণে একটি কমিটি করা হয়েছে। একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে যন্ত্রগুলোর তালিকা তৈরি করা হবে। এরপর প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে নিষ্পত্তির বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ইভিএমগুলো বিভিন্ন স্থানে সংরক্ষণ করতে গিয়ে ভাড়াসহ নানা ব্যয় বহন করতে হচ্ছে নির্বাচন কমিশনকে। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় অনেক যন্ত্র অকেজো হয়ে পড়েছে।
ফলে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ে কেনা এসব সরঞ্জামের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পাশাপাশি সংরক্ষণের ব্যয় কমানোও এখন কমিশনের বিবেচনায় রয়েছে।
গত ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানায়, দেড় লাখ অব্যবহৃত ইভিএম দেশের ৪১ জেলায় পড়ে রয়েছে।
এসব যন্ত্রের মালিকানা ও নিষ্পত্তির দায়িত্ব নিয়ে স্পষ্ট কাঠামো না থাকায় সেগুলো ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। সংরক্ষণের জায়গার ভাড়াও দিতে হচ্ছে নির্বাচন কমিশনকে।
কোথায় রয়েছে দেড় লাখ ইভিএম
নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেড় লাখ ইভিএমের মধ্যে প্রায় ৮৬ হাজার রয়েছে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিতে (বিএমটিএফ)। প্রায় ৬২ হাজার যন্ত্র রয়েছে মাঠপর্যায়ে। আর প্রায় ১ হাজার ২০০ ইভিএম রাখা হয়েছে নির্বাচন কমিশন ভবনে।
যন্ত্রগুলোর একটি বড় অংশ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকেজো হয়ে পড়েছে। তবে কতগুলো মেরামত করে ব্যবহার করা সম্ভব, কতগুলো অন্য কাজে লাগানো যাবে এবং কতগুলো একেবারেই অচল—সেই পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে বর্তমান তালিকা ও কারিগরি মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গত ১২ অক্টোবর প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে কমিশন সভায় ইভিএমের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির বিষয়ে আলোচনা হয়।
সভা শেষে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, আগের কমিটির সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
“ইভিএম নিয়ে অনেক ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন চায়, যত দ্রুত সম্ভব ইভিএমগুলো নিষ্পত্তি করা হোক। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্থার তদন্ত এবং অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়ার জন্য যেসব আলামত সংরক্ষণ করা প্রয়োজন, সেগুলো রেখে দেওয়া হবে। এরপর অবশিষ্ট ইভিএমগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অর্থাৎ, ইভিএমের দায় থেকে মুক্তি পেতে চাইলেও তদন্তসংশ্লিষ্ট যন্ত্রগুলো যাচাই-বাছাই ছাড়া সরিয়ে ফেলার সুযোগ নেই। নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় দুদকের তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট মামলার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।
বিক্রি, পুনর্ব্যবহার নাকি ধ্বংস?
ইভিএমের চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি।
নির্বাচন কমিশনার মাছউদের ভাষ্য, নিষ্পত্তি মানেই সব যন্ত্র ধ্বংস করে ফেলা নয়। সরকার চাইলে কোনো অংশ অন্য কাজে ব্যবহার করতে পারে। বিক্রি করে অর্থ পাওয়া সম্ভব কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।
তিনি বলেন, “সরকারের সাথে, দুদকের সাথে আমাদের আলোচনার দরকার পড়তে পারে-এগুলো কীভাবে নিষ্পত্তি করা যায়। এটা দিয়ে কোনো কাজ হবে না। অধিকাংশ আছে মেশিন টূলস ফ্যাক্টরিতে, কিছু আছে বাইরে- সবাই ভাড়া চাচ্ছে।
“এত ভাড়া দিতে গেলে তো বিরাট মুশকিল। তাই আমরা চাচ্ছি-অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল এটাকে যদি ডিসপোজাল করতে দিতে পারি। তাহলে আমরা এ লায়াবিলিটি থেকে আপাতত বেঁচে যাই।”
ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো যন্ত্রের অংশ পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব হলে তা কাজে লাগানোর সুযোগ খতিয়ে দেখা হবে। যন্ত্র বিক্রির সম্ভাবনাও যাচাই করা হবে। আর যেগুলো মেরামত বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহারের উপযোগী নয়, সেগুলো ধ্বংস করার বিষয়টি বিবেচনায় থাকবে।
মাছউদ বলেন, ইভিএমের সর্বশেষ তথ্য নিয়ে প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিশেষজ্ঞ কমিটির সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে দুদকের সঙ্গে আলোচনা এবং মামলাসংশ্লিষ্ট আলামত সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
“আমরা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে চাই। প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে,” বলেন তিনি।
তবে ইভিএমগুলো বিক্রি বা পুনর্ব্যবহার করে কত টাকা পাওয়া যেতে পারে, কিংবা সেগুলোর নিষ্পত্তিতে কত ব্যয় হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো ধারণা দেয়নি ইসি।
‘কারিগরি যাচাই ছাড়া নিষ্পত্তি নয়’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আব্দুর রাজ্জাক মনে করেন, ইভিএম নিষ্পত্তির আগে যন্ত্রগুলোর কারিগরি সক্ষমতা ও বিকল্প ব্যবহার যাচাই করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ইভিএম একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র, যাতে সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থা রয়েছে। ভবিষ্যতে সরকার ও নির্বাচন কমিশন যদি এ প্রযুক্তি আর ব্যবহার না করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে যন্ত্রগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে, তা কারিগরি বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে ঠিক করা উচিত, যাতে রাষ্ট্রের ক্ষতি কমানো যায়।
অধ্যাপক রাজ্জাকের মতে, দেশে কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এসব যন্ত্রের অন্য কোনো ব্যবহার রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। যন্ত্রের কোনো অংশ বিক্রি বা পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব হলে তা থেকে কিছু অর্থও পাওয়া যেতে পারে।
এ জন্য একটি কারিগরি কমিটি গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। কমিটি যন্ত্রগুলোর অবস্থা পর্যালোচনা করে কোনগুলো ব্যবহারযোগ্য, কোনগুলো মেরামত করা সম্ভব এবং কোনগুলো আর কাজে লাগানো যাবে না, তা নির্ধারণ করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইভিএম নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে শুধু সংরক্ষণের ব্যয় কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করলেই হবে না। যন্ত্রগুলোর মধ্যে থাকা ইলেকট্রনিক উপাদান কীভাবে পরিবেশসম্মত উপায়ে ব্যবস্থাপনা করা হবে, তাও গুরুত্বপূর্ণ।
টিআইবিও অব্যবহৃত ইভিএমের ক্ষেত্রে পরিবেশসম্মত ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। সংস্থাটির মতে, যথাযথ নিয়ম অনুসরণ না করে এসব যন্ত্র পুড়িয়ে ফেললে বায়ু, পানি ও মাটিদূষণসহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
দেড় দশকের ইভিএম-অধ্যায়
বাংলাদেশে ইভিএম ব্যবহারের শুরু হয় ২০১০ সালে। তৎকালীন নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তৈরি ইভিএম দিয়ে একটি সিটি করপোরেশনের একটি ওয়ার্ডে ভোট নেয়। তবে সে সময় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়নি।
পরে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন আগের ইভিএমে ত্রুটি পাওয়ার কথা জানায়। এরপর কয়েক বছর এ প্রযুক্তি নিয়ে বড় পরিসরে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের সময়ে ইভিএম ব্যবহারের উদ্যোগ নতুন করে গতি পায়। দেড় লাখ ইভিএম কেনার জন্য ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করা হয়।
বিপুল অর্থ ব্যয়ে যন্ত্র কেনা হলেও ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে মাত্র ছয়টি আসনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও এ যন্ত্র ব্যবহার করে কমিশন।
ইভিএমের আয়ুষ্কাল ১০ বছর ধরা হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পাঁচ বছরের মধ্যেই অনেক যন্ত্র অকেজো হয়ে পড়ে।
কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অন্তত ১৫০টি আসনে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছিল। শেষ পর্যন্ত সে পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দায়িত্ব নেওয়া বর্তমান নির্বাচন কমিশনও আর কোনো নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করেনি। বরং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনসংক্রান্ত আইন থেকে ইভিএম ব্যবহারের বিধান বাদ দেওয়া হয়েছে।
ফলে নির্বাচনে এসব যন্ত্র ব্যবহারের ভবিষ্যৎ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এখন সেগুলোর সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায় ইসির জন্য হয়ে উঠেছে মাথাব্যথার কারণ।



