
বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আলোচনায় আমরা সাধারণত রাষ্ট্র সংস্কার, সাংবিধানিক ভারসাম্য, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, জবাবদিহি আর নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার কথাই বেশি শুনি। কিন্তু এই বন্দোবস্তের একটা মৌলিক দিক প্রায়ই অন্তরালে থেকে যায়। রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের পেছনে অর্থ একটি বড় নিয়ামক, আর ওই অর্থের উৎস ও ব্যবহারের ওপরই নির্ভর করে রাজনীতিতে কারা আসার সুযোগ পাবেন, কারা নেতৃত্বে বসবেন এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে কার স্বার্থ প্রাধান্য পাবে।
নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বলতে আমি এমন এক রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার কথা বুঝি, যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কোনো ব্যক্তি, পরিবার, দলীয় গোষ্ঠী, আমলা বা ধনী ব্যবসায়ী শ্রেণির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। ক্ষমতা অর্জন, প্রয়োগ ও হস্তান্তরের নিয়মগুলো হবে স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও জবাবদিহিমূলক। নাগরিকের অধিকার কেবল সংবিধানের পাতায় বন্দী না থেকে বাস্তব রাজনীতিতেও প্রতিফলিত হবে। একই সঙ্গে নাগরিককে সেবার জন্য রাষ্ট্রের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে না, বরং রাষ্ট্র নিজেই সেবা নিয়ে নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে। এই লক্ষ্য অর্জনে সংবিধান ও নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কার যেমন দরকার, তেমনি রাজনৈতিক অর্থায়নের গলদপূর্ণ কাঠামোটি বদলে ফেলা তার চেয়েও বেশি জরুরি।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মুশতাক এইচ খান তার ‘পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট অ্যান্ড অ্যানালিসিস অব ইনস্টিটিউশনস’ গবেষণায় এ বিষয়ে একটি কার্যকর তাত্ত্বিক কাঠামো উপস্থাপন করেছেন। তার রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তত্ত্ব অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নীতি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করে সমাজের বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর সংগঠিত ক্ষমতা, স্বার্থ এবং তাদের দরকষাকষির শক্তির ওপর। কেবল আইনের সুন্দর ভাষা দিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা বিচার করা যায় না। কাগজে-কলমে সমান অধিকারের কথা লেখা থাকলেও বাস্তবে সবার প্রভাব সমান হয় না। যেসব গোষ্ঠীর আর্থিক ও সাংগঠনিক ক্ষমতা বেশি, তারা আইন ও নীতির প্রয়োগকে নিজেদের সুবিধামতো ঘুরিয়ে নিতে পারে। ‘ইনস্টিটিউশনস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ অধ্যায়েও তিনি দেখিয়েছেন, উন্নয়নকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে শুধু আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকালেই চলবে না, ক্ষমতার বাস্তব বণ্টনকেও বুঝতে হবে। মুশতাক এইচ খানের এই দুটি গবেষণার আলোকেই রাজনৈতিক অর্থায়নকে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রধান বিষয় হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
রাজনীতির অর্থায়ন মূলত এই ক্ষমতা বণ্টনেরই একটি মৌলিক ক্ষেত্র। দল চালানো, কর্মী সামলানো, প্রচার চালানো, নির্বাচনি এলাকায় প্রভাব ধরে রাখা কিংবা জনমত তৈরি করা, সবকিছুতেই অর্থের প্রয়োজন। টাকাপয়সার প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করে গণতান্ত্রিক রাজনীতি চালানো অসম্ভব। আসল সংকট তৈরি হয় তখন, যখন এই অর্থের উৎস থাকে অস্বচ্ছ, অনুদানের বিনিময়ে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার লেনদেন চলে এবং আর্থিক সামর্থ্যই রাজনীতি করার প্রধান যোগ্যতা হয়ে ওঠে। তখন নাগরিকের রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ খাতা-কলমে সমান মনে হলেও বাস্তব ময়দানে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রটি চরম অসম হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যয়ের তথ্য এই আশঙ্কার বাস্তব প্রমাণ দেয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০২৬ সালের নির্বাচনি পর্যবেক্ষণে ৩০০টি আসনের মধ্য থেকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ৭০টি আসন নমুনা হিসেবে গ্রহণ করে। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব আসনে প্রার্থীদের গড় নির্বাচনি ব্যয় ছিল প্রায় ১ কোটি ১৯ লাখ টাকা, অথচ সরকারের অনুমোদিত গড় ব্যয়সীমা ছিল মাত্র ৪৪ লাখ ২৫ হাজার টাকার মতো। শতকরা প্রায় ৬৮.৬ ভাগ প্রার্থী নির্ধারিত ব্যয়সীমা ছাপিয়ে গেছেন। আর যারা সীমা অতিক্রম করেছেন, তাদের গড় ব্যয় ছিল প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এই নমুনা দিয়ে হয়তো সব প্রার্থীর পূর্ণাঙ্গ চিত্র একবারে আঁকা যাবে না, তবে আমাদের নির্বাচনি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও যাচাইয়ের সক্ষমতা নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন তুলে দেয়।
একই প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ফেইসবুকে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের বিজ্ঞাপন ব্যয়ের একটি চিত্র উঠে এসেছে। দেখা গেছে, কেবল ফেইসবুক প্রচারণাতেই বিএনপি ও তাদের প্রার্থীদের ব্যয় ছিল প্রায় ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৭ হাজার টাকা, জামায়াতে ইসলামী ও তাদের প্রার্থীদের প্রায় ১ কোটি ৩৫ লাখ ১৮ হাজার টাকা এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থীরা খরচ করেছেন প্রায় ১০ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। এটিও পুরো ডিজিটাল প্রচারের সামগ্রিক চিত্র নয়। তবু সনাতন নির্বাচনি ব্যয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমের অর্থায়নেও যে স্বচ্ছতা আনা জরুরি, তা পরিষ্কার বোঝা যায়।
আমার মতে, কোটি টাকার এই উচ্চ ব্যয়ের রাজনীতি সাধারণ ও যোগ্য মানুষের প্রতিনিধিত্বের পথ বন্ধ করে দেয়। সমাজে এমন অনেক সৎ, দেশপ্রেমিক ও জনসম্পৃক্ত মানুষ আছেন, যাদের নির্বাচনি খরচের ভার বহন করার অর্থনৈতিক সামর্থ্য নেই। অর্থের অভাবে তারা রাজনীতিতে আসতে না পারলে রাজনীতির ময়দানটি ধীরে ধীরে কেবল ধনাঢ্য শ্রেণির শক্তঘাঁটিতে পরিণত হবে। এমনকি দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রেও টাকা থাকার বিষয়টাই অলিখিত প্রধান যোগ্যতা হয়ে দাঁড়াবে। পরিণতিতে, জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় জনগণের চেতনার চেয়ে আর্থিক শক্তির দাপটই প্রধান হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে একটি অলিখিত স্তর আছে। ব্যবসা ও রাজনীতির সম্পর্ক সরকারের নীতি নির্ধারণেও প্রভাব রাখে। ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক অভিজাতদের এই অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা নীতি প্রণয়নকে নিজেদের অনুকূলে নিয়ে যায়। অনেক সময় এই ব্যবস্থার ফলে বড় ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা এক ধরনের ‘নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা’ পেলেও নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বার্থ একবারে উপেক্ষিত থেকে যায়। ফলে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের জন্য যেসব মৌলিক সংস্কার দরকার, তা আর আলোর মুখ দেখে না।
নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের জন্য তাই কয়েকটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি। দল ও প্রার্থীর নিয়মিত আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করতে হবে। ব্যবসায়িক অনুদান, নগদ সাহায্য বা যে কোনো সুবিধাপ্রাপ্তির তথ্য স্বাধীনভাবে নিরীক্ষাযোগ্য হতে হবে। বড় অনুদানকারীদের পরিচয়, খরচের খাত এবং ডিজিটাল প্রচারের ব্যয়ের তথ্য সহজে অনলাইনে খোঁজা যায়, এমন উন্মুক্ত ডেটাবেজে রাখতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে হিসাব জমা নেওয়ার আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের বাইরে গিয়ে তথ্য যাচাই, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং অনিয়মের কার্যকর তদন্তের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। দল পরিচালনায় বড় ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সাধারণ মানুষের ছোট ছোট অনুদান ও সদস্যচাঁদাকে উৎসাহিত করতে হবে। পাশাপাশি যোগ্যতার ভিত্তিতে দলগুলোকে সীমিত সরকারি সহায়তা ও গণমাধ্যমে সমান প্রচারের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
যারা আজ নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের দাবি তুলছেন, তাদের নিজেদের দলীয় সংস্কৃতি ও অর্থায়নের ক্ষেত্রেও এই একই স্বচ্ছতা ও নীতি মেনে চলতে হবে। রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার পাশাপাশি নিজেদের সংগঠনের অর্থের হিসাবও দলের কর্মী ও সাধারণ মানুষের সামনে উন্মুক্ত করতে হবে। এই দাবিটা তরুণ নেতৃত্বের কাছে আরও বেশি, কারণ তারাই নতুন পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়েছে এবং পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বদলে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
অবশ্য প্রচলিত রাজনৈতিক অর্থনীতি ও ক্ষমতাকাঠামোর মধ্যে এই পরিবর্তন আনা মোটেও সহজ হবে না। প্রচলিত পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর রাজনীতি, নেতৃত্বের কেন্দ্রীকরণ এবং অর্থায়নের অস্বচ্ছতা পরিবর্তনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। একই সঙ্গে জনসমর্থন অর্জন, নেতৃত্বের বিকাশ ও ক্ষমতার চর্চার জন্য যে আর্থিক সক্ষমতা দরকার তা তরুণ নেতৃত্বকে পথভ্রষ্টও করতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত এই এই লড়াই তাদেরকেই করতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন সুযোগ এসেছে রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার। ওই পরিবর্তন কতটা গভীর হবে, তা শুধু নতুন আইন, নতুন দল কিংবা নতুন নেতৃত্ব দিয়ে বোঝা যাবে না। রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের নিয়ম কতটা বদলেছে তা দিয়ে বোঝা যাবে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন কতটা সম্ভব। অর্থের প্রবাহ যদি রাজনীতির প্রবেশদ্বার নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে ক্ষমতার পুরোনো সম্পর্ক নতুন নাম ও নতুন মুখ নিয়ে ফিরে আসতে পারে। নতুন বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার জন্য তাই রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামোর পাশাপাশি রাজনীতির অর্থনৈতিক ভিত্তিকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
সাজ্জাদ সাব্বির: এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। ই-মেইল: sajjadsabbir24@gmail.com