
ভারতের ইতিহাসে ঘটে গেল এক অভূতপূর্ব ঘটনা। কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের নেতা নয়; তরুণ-যুবাদের সমাজ-সংস্কারবাদী আন্দোলনের জন্য সদ্য প্রতিষ্ঠিত এক সংগঠনের নেতাকে উড়োজাহাজ থেকে গ্রেপ্তার করে নজির সৃষ্টি করেছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিজেপি সরকার।
বলা হচ্ছে, গত মে মাসে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে শুরু করা ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণার প্ল্যাটফর্ম ‘ককরোচ জনতা পাটি’ বা সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের কথা।
আরও বলা হচ্ছে, দেশটির ভোটার তালিকায় কারচুপির অভিযোগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি নিয়ে দিল্লির ‘যন্তর মন্তর’ এলাকায় ছাত্র-জনতার পূর্ব নির্ধারিত শান্তিপূর্ণ সমাবেশের কথা।
ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাই থেকে উড়োজাহাজে দিল্লি এসে গ্রেপ্তার হন এই নেতা। দিল্লিতে অবতরণের পরপরই উড়োজাহাজের ভেতর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেসময় তার গায়ে ছিল মহাত্মা গান্ধির লাঠি হাতে হেঁটে চলার ‘ছাপ’ দেওয়া টিশার্ট।
মুম্বাই বিমানবন্দরে অভিজিৎ সাংবাদিকদের বলেন, সরকার তরুণ-যুবাদের এত ভয় পেয়েছে যে জম্মু-কাশ্মীর থেকে সেনা সরিয়ে নিয়ে দিল্লিতে মোতায়েন করেছে। মাওবাদী-প্রবণ এলাকা থেকে আধা সামরিক বাহিনী সরিয়ে দিল্লিতে আনা হয়েছে।
‘এমন কী জরুরি ঘটনা ঘটল যে, সরকার ট্রেন বন্ধ করে দিলো। মেট্রো বন্ধ করে দিলো। ইন্টারনেট বন্ধ করে দিলো,’ প্রশ্ন করেন আরশোলাদের প্রধান মুখ অভিজিৎ।
দিল্লিতে নামার পর উড়োজাহাজের ভেতর দাঁড়িয়ে এই আরশোলা নেতা অভিযোগ করলেন—এমন স্বৈরাচারী ঘটনা ১৯৭০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতে জারি করা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির জরুরি অবস্থার সময়েও ঘটেনি।
উড়োজাহাজের ভেতর ধারণ করা এক ভিডিওতে অভিজিৎকে বলতে শোনা যায়, ‘তোমাদেরকে ডরাই না। নিয়ে যাও। গ্রেপ্তার করো।’
সে সময় উড়োজাহাজের ভেতরে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান শোনা যায়।
আজ ১০ অক্টোবর শুধু ভারতীয় নয়, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও শিরোনাম হয়েছে ভারত সরকার বনাম আরশোলাদের লড়াইয়ের ‘খবর’। বলা হয়েছে, দিল্লির দরজা বন্ধ। সরকার বলছে, জননিরাপত্তার কথা। বিরোধীরা বলেছে, সরকারের মনে ভয় ঢুকেছে।
সংবাদমাধ্যমগুলো আরও জানাচ্ছে—চেনা চেহারা হারিয়েছে দিল্লি। চেনা চেহারা হারিয়েছে ভারতবর্ষ।
প্রতিবেদনগুলোয় বলা হচ্ছে—দিল্লি যেন এক ‘দুর্গ’। পথে পথে পুলিশি বাধা ও তল্লাশি। এখানে-সেখানে সমাবেশকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তি। এ ছাড়াও, দেশজুড়ে চলছে ব্যাপক ধরপাকড়।
পুলিশের এমন অতি-সতর্ক অবস্থা ও মারমুখী ব্যবস্থা দেখে কেউ কেউ নরেন্দ্র মোদিকে কটাক্ষ করে বলছেন, ‘আপনার ৫৬ ইঞ্চি বুকের ছাতি শুকিয়ে ৬ ইঞ্চি হয়ে গেল নাকি?’ কেউ বা বলছেন, ‘পরের উইকেট জ্ঞানেশ বাবুই’!
ভিডিও প্রতিবেদনগুলোয় দেখানো হচ্ছে, দিল্লি নামার সঙ্গে সঙ্গে উড়োজাহাজে বসা অবস্থাতেই ‘আরশোলা’ নেতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাসহ অন্যান্যদের গ্রেপ্তারের দৃশ্য।
আরও দেখানো হচ্ছে—দিল্লির যন্তর মন্তরে হাজারো পুলিশ। পথে পথে ব্যারিকেড। সরকারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে যারাই সেখানে যাচ্ছেন, তাদেরকে টেনে-হিঁচড়ে তোলা হচ্ছে পুলিশের গাড়িতে।
বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশের খ্যাতি নিয়ে চলা ভারতে সরকারবিরোধী শান্তিপূর্ণ সমাবেশেও দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের মতোই আচরণ করছে বিজেপি সরকার। পরাধীনতা থেকে মুক্তি পাওয়ার ৮০ বছর পর ভূ-ভারতে উঠেছে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতার’ আওয়াজ।
আন্দোলনের ‘সিজন টু’?
গত জুলাইয়ে বিশ্ববাসী দেখেছিল, দিল্লির রাজপথে তরুণ শিক্ষার্থীদের কাছে নিজেকে ‘অবতার’ দাবি করা নরেন্দ্র মোদি কতই না নাজেহাল হয়েছিলেন। ব্যঙ্গ-রসিকতা যেন ছাড়িয়েছিল ভব্যতার সীমা। ব্যানার-ফেস্টুনে মোদির নানান অবয়বের ব্যঙ্গাত্মক ছবি এঁকে বিক্ষোভকারীরা যেন ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল ‘বিশ্বগুরু’ হওয়ার স্বপ্ন দেখা নিজ দেশের প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদা।
সেসময় আরশোলাদের দাবি ছিল—তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। কারণ, এক জাতীয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস।
ধর্মেন্দ্রকে অপসারণের সেই দাবি গণদাবিতে পরিণত হলে ‘পতন’ হয় নরেন্দ্র মোদির অহংকারের। জয়ী হয় শিক্ষার্থী-জনতা।
এবার যেন শুরু হলো আরশোলাদের সরকারবিরোধী আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্ব বা ‘সিজন টু’।
এবার তাদের দাবি—দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। কেননা, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এই ব্যক্তি ‘সংবিধান লঙ্ঘন’ করেছেন।
বিরোধীদের অভিযোগ—বিজেপিকে জেতাতে জ্ঞানেশ কুমারের ‘একক’ নির্দেশে সারা দেশের ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম কেটে ফেলা হয়েছে। বলা বাহুল্য, এত সংখ্যক মানুষ জাপানে নেই।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে—মূলত ‘তেলাপোকা’ ঠেকাতে দেশটির রাজধানী দিল্লিকে কার্যত ‘লালকিল্লা’ বা দুর্গ বানিয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পুলিশ। শুধু তাই নয়, পুরো ভারতকে তারা ‘কাশ্মীর’ বানিয়েছে ফেলেছে। অর্থাৎ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দিয়ে দিল্লির চারপাশ যেমন ঘিরে ফেলা হয়েছে, তেমনি ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের মতো পুরো দেশে চলছে ব্যাপক ধরপাকড়।
গত ৯ অক্টোবর অর্থাৎ, তেলাপোকাদের দিল্লি সমাবেশের আগের দিন বিরোধী কংগ্রেস দলের অন্যতম মুখপাত্র সালমান সজ ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডেকে বলেন, ‘বিজেপি চেয়েছিল কাশ্মীরকে ভারত বানাতে। কিন্তু, তারা পুরো ভারতকে “কাশ্মীর” বানিয়ে ছেড়েছে।’ অর্থাৎ, তারা কাশ্মীরে প্রচুর সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করেছে। এখন ভারতজুড়ে বিপুল সংখ্যক পুলিশ নামিয়েছে।
তিনি মনে করেন, এটি ভারতের গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর।
শান্তিপূর্ণ সমাবেশে বাধা দেওয়ার বিরোধিতা করে সালমান আরও বলেন, বিজেপি সরকার যা করছে তা একসময় ব্রিটিশরা করতো। বিজেপি তরুণদের দিল্লিগামী ট্রেন থেকে নামিয়ে দিচ্ছে। দিল্লির ভেতরে বেশ কয়েকটি মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দিয়েছে।
সংবাদ বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, আরশোলাদের গতবারের সাফল্য ভারতের আমজনতা এতটাই উজ্জীবিত যে এবার ‘সিজন টু’ ঘোষণার দিন থেকেই সবার চোখ দিল্লির যন্তর মন্তরে!
আজ দুপুরের পূর্ব নির্ধারিত সমাবেশের আগেই সরকার ‘সিলগালা’ করে দেয় যন্তর মন্তর যাওয়ার সব পথ। এতে আরও বেগ পায় বিক্ষোভ-সমাবেশ। আরও বেশি মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে—কী ঘটতে যাচ্ছে ভারতে? টিকে যাবে কি বিজেপি-আরএসএসের একচ্ছত্র আধিপত্য? গণতান্ত্রিক দেশটিতে আর কতদিন চলবে মোদি-শাহের ‘রাজতন্ত্র’? ইত্যাদি, ইত্যাদি।
‘স্যার’ থেকে ‘সার্কাস’?
শুরুতে এর নাম ছিল এসআইআর বা ‘স্যার’। পরে তা থেকে জন্ম নেয় ‘সার্কাস’।
ভারতের নির্বাচন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ভোটার তালিকা সংশোধন করা একটি নিয়মিত কাজ। মৃত বা স্থানান্তরিত ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনা সব গণতান্ত্রিক দেশেই হয়ে থাকে।
কিন্তু, ভারতে ভোটার তালিকার এই সংশোধনী নিয়ে নাখোশ খোদ ভোটাররাই। বিশেষ করে, গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের আগে দেখা গেল—ভোটার তালিকায় একই পরিবারে বাবা-মায়ের নাম আছে তো সন্তানদের নাম নেই। কোনো কোনো পরিবারে দেখা গেল, সন্তানদের নাম আছে তো মা-বাবার নাম নেই।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধি ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদন তৈরি করেন। এমনকি, তালিকায় ভুয়া ভোটারের বিষয়টিও তিনি জাতির সামনে সবিস্তারে তুলে ধরেন। এরপর ধারাবাহিকভাবে অন্যান্য বিরোধী নেতাও জ্ঞানেশ কুমারের নির্দেশে তৈরি ভোটার তালিকা নিয়ে প্রতিবাদ করতে থাকেন।
ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় পশ্চিমবঙ্গে আত্মহত্যার ঘটনা দেশটির সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে।
ছবি: রয়টার্স
“>