
বিশ্বের মানুষের আইনের অধিকার নিয়ে সারা জীবনের লড়াইয়ের স্বীকৃতিতে ২০২৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন দক্ষিণ আফ্রিকার ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিশিষ্ট মানবাধিকার আইনজীবী ও আইনজ্ঞ নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই।
আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠায় তার লড়াই মানবতার পক্ষে এবং যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, যুদ্ধকালীন যৌনহিংসা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে।
আন্তর্জাতিক আইনের পরিধি ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি, যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার ও শান্তি রক্ষায় আজীবন অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নরওয়ের নোবেল কমিটি তাকে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত করেছে।
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও সংঘাত বাড়তে থাকার মধ্যে আন্তর্জাতিক আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা যে কতটা জরুরি—নাভি পিল্লাইয়ের কাজ সেটিই প্রমাণ করেছে।
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি শুক্রবার এই পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়ার সময় জানায়, যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যার জন্য দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করার ক্ষেত্রে পিল্লাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
কে এই নাভি পিল্লাই?
ভারতীয় বংশোদ্ভূত নভি পিল্লাইয়ের পরিবার তামিল, তবে তিনি জন্মেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে। ১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পারিবারিক নাম ছিল নাভানেথেম নাইডু।
দক্ষিণ আফ্রিকার বাতাসে তখনও ছিল বর্ণবিদ্বেষের বিষ। সমাজের সব শ্রেণিতে বৈষম্য আর চরম নিপীড়ন। সামাজিক অসামঞ্জস্যের বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখতে তাই আইনকেই হাতিয়ার করেন পিল্লাই। পেশায় আইনজীবী পিল্লাই, গরিব, পিছিয়ে পড়া, শোষিত মানুষের সামাজিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে অগ্রণী ভূমিকা নেন।
আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে বৈষম্য ও বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাওয়া পিল্লাই একসময় বর্ণবিদ্বেষবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের কিংবদন্তি নেতা তথা দেশটির প্রয়াত সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলার আইনজীবীর ভূমিকাও পালন করেছিলেন।
তবে কেতবল নেলসনই নয়, আরও অনেক প্রতিবাদী কন্ঠধ্বনি আন্তর্জাতিক বিশ্বে পৌঁছেছে কাঠগড়ায় পিল্লাইয়ের সওয়ালের ওপর ভর করে।
ডারবানের বাসিন্দা পিল্লাই দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্ট, রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল এবং আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতেও বিচারকের দায়িত্ব সামলেছেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার হিসেবেও কাজ করেছেন। ভারতে মহাত্মা গান্ধীর কর্মভূমি নাটাল প্রদেশের নাটাল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পিল্লাই ১৯৬৭ সালে প্রথম নারী হিসেবে সেখানে একটি ল’ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনিই ছিলেন ওই প্রদেশের প্রথম নারী আইনজীবী।
পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষার জন্য হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমিয়ে ১৯৮৮ সালে তিনি ডক্টর অফ জুনিডিক্যাল সায়েন্স ডিগ্রি অর্জন করেন।
যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান কমিশনের চেয়ারপার্সন হিসেবে কাজ করেছেন। এখন আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতের বিচারকের দায়িত্বে রয়েছেন নাভি পিল্লাই। আপাতত মায়ানমারের বিরুদ্ধে ওঠা গণহত্যার বিচারে তিনি ব্যস্ত।
১৯৯৫ সালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী বিচারক হিসেবে নিযুক্ত হন। শিগগিরই তার কাজের পরিধি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়ে। সে বছরই, তিনি রুয়ান্ডায় গণহত্যার জন্য দায়ীদের বিচার করার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল ফর রুয়ান্ডা’-এর একজন বিচারক হিসেবে নির্বাচিত হন।
যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ল’স্কুলের প্রাক্তন পিল্লাই ১৯৯৫-২০০৩ সাল পর্যন্ত রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে বিচারক থাকাকালীন এক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিলেন। ধর্ষণ ও যুদ্ধকালীন যৌন সহিংসতাকে ‘গণহত্যার শামিল’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন তিনি।
১৯৯৮ সালের ওই ঐতিহাসিক রায়ে তার ব্যাপক প্রভাবে আন্তর্জাতিক আদালতে প্রথম প্রমাণিত হয় যে, যুদ্ধকালের পরিকল্পিত ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা কেবল যুদ্ধাপরাধ বা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধই নয়, বরং এটি ‘গণহত্যা’র শামিল।
এই রায়েল পর পিল্লাই বলেছিলেন, “অনাদিকাল থেকে ধর্ষণকে যুদ্ধের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখা হত। এখন থেকে এটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।”
আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে পিল্লাইয়ের ওই রায় নারী অধিকার রক্ষায় সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত। মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের মামলারও বিচারক ছিলেন পিল্লাই।
নোবেল কমিটি বলেছে, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সংঘাতের অহিংস সমাধানের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনের শাসন অপরিহার্য। শান্তির জন্য ন্যায়বিচার প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে বিচারক ও আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো নানা চাপের মুখে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে সাহস, দূরদৃষ্টি ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন নাভি পিল্লাই।
কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় নেতাদের জবাবদিহির আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। একইসঙ্গে সহিংসতা ও সংঘাতের শিকার মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন। ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার প্রতি তার অঙ্গীকার আরও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়তে আগ্রহী মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা বলে জানিয়েছে নোবেল কমিটি।
আইসিসি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিচারিক সংস্থায় পিল্লাইয়ের অবদান উল্লেখ করে নোবেল কমিটি বলেছে, “আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রতিষ্ঠান, বিচারকদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা এবং আক্রমণের এই যুগে আমাদের এমন সাহস, দৃঢ় সংকল্প এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ প্রয়োজন।”