
‘‘ইলিশ ধরে এখন আর সংসার চালাতে পারছি না। ঋণের বোঝা বহন করছি বছরের পর বছর। অনেক আশা নিয়ে প্রতিবছর ইলিশ মৌসুমের অপেক্ষায় থাকি। কিন্তু বারবার সে আশা ভঙ্গ হয়। এ বছরও ইলিশের দেখা নেই। তাই লোকসান নিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে।’’
মেঘনা নদীর তীরে দ্বীপ ঢালচরে মাছঘাটের অনেক আওয়াজের মধ্য থেকে মৎস্যজীবী রুহুল আমীন (৪৫) এ কথাগুলো বলেন। তার কথায় সায় দেন আরো কয়েকজন জেলে।
বাংলাদেশের সমুদ্র মোহনার দ্বীপ ঢালচর ভোলা জেলা সদর থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে এবং রাজধানী ঢাকা থেকে ৩৪৭ কিলোমিটার দূরে। মেঘনা নদীর ঢেউ এসে ধাক্কা খায় দ্বীপের মাছ ঘাটে। ভোরের সূর্য কেবল উঠেছে। নদীর ঢেউয়ের সাথে দল বেঁধে উড়ে বেড়াচ্ছে গাঙচিল। মাছ ঘাটে একের পর এক নৌকা ঘাটে ভিড়ছে। ঘাটে মৎস্যজীবীদের ভিড় বাড়তে থাকে। কিন্তু ঘাটে আসা অধিকাংশ নৌকায় ইলিশ নেই!
মাছ ঘাটের চায়ের দোকান, হোটেল, নৌকা সারাইখানাসহ অন্যান্য সব দোকানে ভিড়। যে ইলিশকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই ঘাট, সেখানেই ইলিশের অভাব। ভঙ্গুর ঢালচর ইলিশ ঘাটটি ছোট হচ্ছে নদীর ভাঙ্গনে। তবুও এ ঘাট মৎস্যজীবীদের ভরসা। দ্বীপ ঢালচর সারা বছর ঘুমায়। কিন্তু ইলিশ মৌসুমে দ্বীপটি জেগে ওঠে। প্রতিবছর ইলিশ মৌসুমে হাজার হাজার মৎস্যজীবীর ভিড় জমে এখানে। তাদের মনে আশা জাগে।
শুধু ঢালচর দ্বীপ নয়, বাংলাদেশের উপকূলজুড়ে এমন অনেক মাছ ঘাট মৎস্যজীবীদের আশা জাগায়। এসব ঘাটে প্রায় ১০ লাখ মৎস্যজীবী ইলিশ আহরণের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু ইলিশে এখন আর ভরসা খুঁজে পাচ্ছেন না মৎস্যজীবীরা। এই ১০ লাখ মৎস্যজীবীর একজন রুহুল আমীন। মৎস্যজীবীদের এই হতাশা এবং লোকসানের মধ্যেই প্রায় চার মাসব্যাপী ইলিশ মৌসুম শেষ হয়েছে গত ৭ অক্টোবর। ইলিশের প্রজনন মৌসুমে ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশ ধরা, মজুত করা, পরিবহন এবং বাজারজাত নিষিদ্ধ করেছে সরকার। ইলিশের জন্য মৎস্যজীবীদের আবার পরের বছর অবধি অপেক্ষা করতে হবে।
‘মাছধরায় জীবিকা চলে না’
ঢালচর মাছ ঘাটের ভিড় এবং আওয়াজের মধ্যেই রুহুল আমীন তার আক্ষেপ প্রকাশ করতে থাকেন। ‘‘নৌকা ও জাল নিয়ে মাছ ধরতে যাওয়ার জন্য প্রতি বছর ঋণ নিতে বাধ্য হই। ইলিশ মৌসুমে অনেক আশা নিয়ে জাল ফেলি। কিন্তু ইলিশের পরিমাণ এতই কম, মাছ ধরার খরচই ওঠে না। ঋণ পরিশোধ করবো কীভাবে? সংসার চালাবো কীভাবে? হয়তো বংশ পরম্পরায় পাওয়া মাছধরা পেশাটি এখন ছেড়ে দিতে হবে। ঋণের বোঝা আর বহন করতে পারছি না।’’
ইলিশ মৌসুমের শেষ দিকে এসেও রুহুল আমীনসহ আরো বহু মৎস্যজীবী মাছ ধরার খরচই উঠাতে পারেননি। লোকসানেই তাদের মৌসুম অতিবাহিত হবে। বাংলাদেশে প্রায় দুই দশক একনাগাড়ে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির পর হুট করেই গত তিন বছর ধরে ইলিশের উৎপাদন ক্রমাগত কমছে। একইসঙ্গে ইলিশের ওজনও কমছে। এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে গবেষকদের।
‘‘একই জাল, একই নৌকা, একই নদী। আগে যেখানে জাল ফেলে ইলিশ পেতাম, সেখানে জাল ফেলে এখন আর ইলিশ পাই না।’’ বলছিলেন বাংলাদেশের উপকূলের কুয়াকাটার মৎস্যজীবী আবদুর রবসহ আরো কয়েকজন মৎস্যজীবী। তারা জানান, সময় বদলের সাথে সাথে তারা সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে নতুন নতুন সংকটের মুখে পড়ছেন। বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বাগেরহাট, লক্ষ্মীপুরসহ উপকূলের অধিকাংশ এলাকার মৎস্যজীবীরা তাদের পেশায় সংকট মোকাবিলা করছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে তাদের জীবন ও জীবিকায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাদের মাছ ধরার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। আরেকদল মৎস্যজীবী মনে করেন, শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, মাছ ধরার ক্ষেত্রে বছরের বিভিন্ন সময়ে সরকারি নিষেধাজ্ঞা এবং মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কারণ তাদের পেশায় বাধা সৃষ্টি করছে।
ইলিশ বাজারে ওঠে; কিন্তু তা সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে
বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রের রেকর্ড অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে বাংলাদেশে ইলিশ আহরণের পরিমাণ বাড়তে থাকে। ওই বছর বাংলাদেশের জলসীমায় ইলিশ আহরণ হয়েছিল ৪ লাখ ৯৬ হাজার টন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ইলিশ আহরণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ লাখ ১৭ হাজার টন। এরপর একটানা ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত ইলিশ আহরণের গ্রাফ ছিল উর্ধ্বমূখী। ওই বছর ইলিশ আহরণ হয় ৫ লাখ ৭১ হাজার টন। কিন্তু পরের বছর, অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে হঠাৎ করে আহরণের পরিমান নেমে আসে ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ হয় ৫ লাখ টনেরও কম। চলতি বছর জুলাই-আগস্টে ইলিশ আহরণ আগের বছরের তূলনায় ৩০-৪০ শতাংশ কমেছে বলে সূত্রগুলো বলছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রে ইলিশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংকট তৈরি হয়েছে। ইলিশ আহরণের পরিমাণ কমছে, মৎস্যজীবীরাও নতুন নতুন সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। ভবিষ্যতে সমুদ্রের বিপদ আরো বাড়বে বলে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন। ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যাজ অবজারভড ইন দ্য বে অব বেঙ্গল’ শীর্ষক গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রের বিপদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অপর একটি সমীক্ষা সমুদ্রে মৎস্যজীবীদের উপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কথা বলছে।
ইলিশের পরিবেশ অনুপস্থিত
মৎস্যজীবীদের পর্যবেক্ষণ বলছে, উপকূলের তাপমাত্রা বদলেছে। বৃষ্টির সময় বদলেছে। বর্ষাকালের ধরণ বদলেছে। নদীতে মিঠা পানি আসার সময় বদলে যাচ্ছে। উপকূলে লবণাক্ততার মাত্রা বদলাচ্ছে। এমনকি সমুদ্রের পরিবেশও বদলে যাচ্ছে। আর এসব পরিবর্তন একসঙ্গে ইলিশের চলাচল এবং প্রজননের সময়কেও প্রভাবিত করে। পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, স্রোত, জোয়ার-ভাটা, পানির ঘনত্ব, অক্সিজেনের পরিমাণ, বৃষ্টিপাত, ইলিশের পরিবেশ তৈরির জন্য অনেক কিছু মিলতে হয়। তাহলে ইলিশ চলাচলের সঠিক পরিবেশ পায়। কিন্তু ইলিশের সে পরিবেশ অনেকটাই নষ্ট হয়েছে।
মৎস্যজীবীদের এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে ইলিশ বিশেষজ্ঞরাও অনেকাংশে একমত পোষণ করেন। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) সাবেক পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, ‘‘অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে আসার সময় ইলিশের জন্য পানির স্রোত ও গভীরতা, উভয়ই প্রয়োজন হয়। নদীতে ইলিশের চলাচলের জন্য অন্তত ১০ মিটার গভীর পানির প্রয়োজন। কিন্তু তারা তা পাচ্ছে না।’’
কিছু এলাকায় নদীর গভীরতা কমে মাত্র ১৮-২০ ফুটে নেমে এসেছে, যা ইলিশের প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় ৭৫-৮০ ফুটের তুলনায় খুবই কম; এছাড়া চাঁদপুর থেকে মনপুরা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ডুবোচর বা বালুচর জলপথকে আটকে দিয়েছে, ফলে নৌচলাচলের জন্য কেবল সরু পথ অবশিষ্ট রয়েছে। ইলিশ স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কেটে সমুদ্র থেকে অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে আসে; কিন্তু নদীর নাব্য কমে যাওয়া এবং পানির প্রবাহ হ্রাস পাওয়ায় তাদের এই অভিবাসন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশে পদ্মা নদীর ইলিশ সবচেয়ে স্বাদের বলে পরিচিত। কিন্তু পদ্মায় এখন ইলিশ আসছে না। পদ্মার নাব্য কমে যাওয়াটাও ইলিশের সংখ্যার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এসব কারণে গত দুই দশক ধরে বাংলাদেশে ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকা ইলিশের উৎপাদন এখন কমছে। এতে এই জনপ্রিয় মাছটির অস্তিত্ব ও সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে এর প্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আনিসুর রহমান দীর্ঘ সময় ধরে ইলিশ নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি ইলিশ আহরণ কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘ইলিশের সংখ্যা বা মজুদ নিয়ে আমি সত্যিই উদ্বিগ্ন।’’
‘‘পানির স্তর কমে যাওয়া, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং পানির গুণাগুণ পরিবর্তনের ফলে মাছের খাদ্যশৃঙ্খল ব্যাহত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অত্যধিক তাপ ও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়ায় এই ভারসাম্য আরও নষ্ট হচ্ছে।’’ যোগ করেন আনিসুর রহমান।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) ফিশারিজ টেকনোলজি বিভাগের প্রফেসর ড. মো. সাজেদুল হকের অভিমত, ‘‘আগে ইলিশ পাওয়া গেছে বেশি, এখন কম পাওয়া যাচ্ছে। এটি একটি গ্লোবাল প্রবলেম। জলবায়ু উষ্ণতা বা বৈশ্বিক জলবায়ু উষ্ণতার কারণেই এমনটি হচ্ছে।’’
অনেক আশা নিয়ে জেলেরা ইলিশ মৌসুমের জন্য অপেক্ষা করে; প্রস্তুতি নেয়
‘‘ইলিশ যদি উপযুক্ত পরিবেশ না পায় সেখানে থাকবে না বা ডিম দেবে না। পানির লবণাক্ততা, খাবার প্লাংকটন বা পানির তাপমাত্রা, এই বিষয়গুলো ইলিশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। লবণ বেশি হলে ইলিশ ডিম দেবে না বা ডিম ফুটবে না, ডিম মারা যাবে। খাবার না পেলে বড় হবে না। তাপমাত্রা ঠিকঠাক না থাকলে বাচ্চা ফুটবে না। ডিম ফার্টিলাইজ হবে না। এই যে বিষয়গুলো, এর সঙ্গে ইলিশের জীবনচক্র সরাসরি জড়িত।’’ যোগ করেন সাজেদুল।
একজন জেলের কাছে জলবায়ু পরিবর্তন গবেষণার ব্যাখ্যা নয়, এটা তার কাছে কঠিন বাস্তবতা এবং জীবনজীবিকার প্রশ্ন, টিকে থাকার লড়াই। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব জেলেদের জীবনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে।
মানবসৃষ্ট কারণ
জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের সৃষ্ট কারণগুলো ইলিশের বংশবৃদ্ধিকে ঝুঁকিতে ফেলছে। স্থানীয় জেলে, ট্রলার মালিক ও আড়তদারেরা অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ মাছ শিকারে অভ্যস্ত। সাগরে অবৈধ ট্রলিং বোটের সংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে। ট্রলিং মূলত একটি অপেক্ষাকৃত বড় সাইজের কাঠের তৈরি বোট, যা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ইঞ্জিনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই বোটে অবৈধ বেহুন্দি জাল বেঁধে সেই ইঞ্জিনের মাধ্যমে সাগরে ফেলে টানা কয়েক ঘণ্টা ধরে মাছ ধরা হয়। ট্রলিংয়ের বেহুন্দি জালে বড় মাছের সঙ্গে ছোট আকারের সব ধরনের মাছের পোনা ও জাটকা ধরা পড়ে। এতে ধ্বংস হচ্ছে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের মূল প্রজননক্ষেত্র।
বাংলাদেশের উপকূলে ইলিশের অভয়াশ্রমের ভেতরে অবস্থিত তিনটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র। পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রামনাবাদ চ্যানেলের তীরে পটুয়াখালী বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং বিশখালী নদীর তীরে তালতলীতে অবস্থিত বরিশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এগুলো থেকে সৃষ্ট দূষণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। কয়লাভিত্তিক এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বর্জ্য ও উষ্ণ পানি নদীতে ফেলে। এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পর আমরা ইলিশের সংখ্যা কমে যেতে দেখেছি। পটুয়াখালী জেলার রামনাবাদ নদী এবং বরগুনা জেলার পায়রা নদীতে জেলেরা আগের মত ইলিশ পাচ্ছে না। অনেক জেলে অন্য পেশায় ফিরছে।
সমুদ্রে জেলেদের বিপদ বেড়েছে
জেলেরা বলেছেন, গভীর সমুদ্রে মাছ আছে। কিন্তু ইলিশ অগভীর পানির দিকে আসছে না। কেননা, অগভীর পানিতে তার টিকে থাকার পরিবেশ নেই। অগভীর পানিতে ইলিশ না আসায় ক্ষুদ্র জেলেরা অনেক বেশি সংকটাপন্ন। অনেকে ইতিমধ্যে পেশা ছেড়ে দিয়েছে। যারা এখনো এই পেশায় টিকে আছে, তাদেরকে গভীর সমুদ্রে ইলিশ ধরতে যেতে হচ্ছে। আর সেখানেই তাদের বিপদ বাড়ছে।
বহুমুখী প্রাকৃতিক বিপদে প্রতিবছর অনেক মৎস্যজীবী নিখোঁজ হয়। সমুদ্র আগের চেয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। বিপদের মাত্রা বাড়ছে। ভোলা জেলার চরফ্যাসনের মৎস্যজীবী নুরুদ্দিন বলেন, ‘‘ছোটবেলা থেকে সমুদ্রে মাছ ধরতে যাচ্ছি। আগে ভয় ছিল না, কিন্তু এখন সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া আমাদের জন্য ভয়ের। জলবায়ু পরিবর্তন কিনা বলতে পারবো না, সমুদ্রে আগের চেয়ে বেশি ঢেউ হয়। আমরা যথাসময়ে সিগন্যাল না পেয়ে দুর্ঘটনার মুখোমুখি হই। আমি নিজেও কয়েকবার দুর্ঘটনায় পড়েছি। আমি সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে ফিরেছি।’’
‘‘রেজিলিয়েন্ট বাংলাদেশ: ফিশারমেন কোপ উইথ রাফ সীস’’ শীর্ষক সমীক্ষা বলছে, শত শত বছর ধরে জেলেদের ঐতিহ্যবাহী নৌকাগুলো বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। কিন্তু এখন আর তা নেই। জেলেরা ক্রমবর্ধমানভাবে আরও শক্তিশালী ঝড় এবং উত্তাল সমুদ্রের মুখোমুখি হচ্ছেন। প্রতিবার মাছ ধরতে সমুদ্রে যাওয়ার সময়, তারা নিজেদের জীবন নিয়ে জুয়া খেলেন।
মৎস্যজীবীদের বিপদ বাড়লেও সমুদ্রে মাছ কমছে। এই প্রভাব মৎস্যজীবীদের জীবন জীবিকায় প্রভাব ফেলছে। সংকটের মধ্যেও মৎস্যজীবীরা মাছ ধরে টিকে থাকার লড়াই করছে। ‘‘ডুইন্ডলিং কোস্টাল ফিশারিজ বায়োডাইভারসিটি অব বাংলাদেশ: দ্য কজ অ্যান্ড ইফেকটস’’ শীর্ষক গবেষণা বলছে, উপকূলীয় মাছের মজুত অতিরিক্ত আহরিত হচ্ছে এবং অনেক মাছের মজুত হ্রাস পাচ্ছে। দেশের মৎস্য খাতে সামুদ্রিক অংশের অবদান প্রতি বছর কমছে। আইইউসিএন (প্রকৃতি সংরক্ষণ আন্তর্জাতিক সংস্থা) দ্বারা মূল্যায়িত উপকূলীয় মাছের প্রায় ২৮% এখন ‘বিপন্ন প্রজাতি’র আইইউসিএন রেড লিস্টের অধীনে রয়েছে।
হতাশ জেলেরা ট্রলার ঘাটে নোঙ্গর করে রেখেছে
বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, ‘‘মৎস্যজীবীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ট্রলার ডুবিতে নিখোঁজ হয়। সমুদ্র আগের চেয়ে বিক্ষুব্ধ হয়েছে। আবহাওয়া খারাপ হয়েছে। অনেক স্থানে পলি জমেছে। অনেক জেলে সিগন্যালও ঠিকভাবে পায় না। এসব কারণে নিখোঁজ জেলেদের সংখ্যা বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি জেলে অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে উদ্ধারযান থাকা দরকার। নিখোঁজ জেলেদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।’’
ইলিশ রক্ষায় উদ্যোগ
ইলিশ রক্ষায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। ১৯৮৫ সালের মৎস্য সংরক্ষণ ও সুরক্ষা আইনের অধীনে বাংলাদেশে ইলিশ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বাংলাদেশে ২০০৩-২০০৪ সাল থেকেই জাটকা রক্ষার কর্মসূচি শুরু করা হয়। তখন থেকেই ধীরে ধীরে ইলিশের উৎপাদন বাড়ছিল। মার্চ-এপ্রিল দু’মাস জাটকা সংরক্ষণ কার্যক্রম চলে। এই সময়ে দেশের নির্দিষ্ট অভয়াশ্রমগুলোতে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ থাকে। ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ৫৮দিন সামুদ্রিক জলসীমায় ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে। ২০০৮ সাল থেকে প্রথম ১১ দিন মা ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার পরের বছর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা ২২দিন করা হয়। এ বছর অক্টোবরের ৮ তারিখ থেকে ২৯ তারিখ অবধি মা ইলিশ সংরক্ষণের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। দুই দশক ধরে ইলিশের আহরণের গ্রাফ ছিল উর্ধ্বমুখী। কিন্তু এখন কেন আবার ইলিশ আহরণের গ্রাফ নিম্নমুখী, তা নিয়ে গবেষণা চলছে।
মৎস্য অধিদপ্তর এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ডফিশ-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ইলিশ আহরণের প্রায় ৭০% থেকে ৮৬%-ই বাংলাদেশে হয়ে থাকে। ভারতে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা ও গুজরাট অঞ্চলে—আহরিত হয় প্রায় ১০% থেকে ১৫% ইলিশ। মিয়ানমারের অবদান মোট আহরণের প্রায় ৩% থেকে ১০%। বাকি ইলিশ পাকিস্তান, ইরান, ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার উপকূলীয় নদী ও সমুদ্র থেকে আহরণ করা হয়। কিন্তু সর্বোচ্চ ইলিশ আহরণকারী দেশে ইলিশ আহরণের নিম্নমুখী গ্রাফ সংশ্লিষ্টদের অবাক করে। গবেষকেরা বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করছেন এবং সঠিক কারণ এবং উত্তরণের পথ খুঁজছেন। কিন্তু ইতোমধ্যে লোকসানে মৎস্যজীবী, মাছ ব্যবসায়ীরা। আর একইসঙ্গে সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে ইলিশ।
দ্বীপ ঢালচর মাছ ঘাটে ইলিশ মৌসুমের শেষ কয়েকটা দিন কাটাচ্ছে অসংখ্য মৎস্যজীবী। তাদের মধ্যে রুহুল আমীন একজন। তিনি হয়তো আরো কয়েকবার অন্য মৎস্যজীবীদের সাথে সমুদ্রে ইলিশ ধরতে যাবেন। কিন্তু ভিড় এবং অনেক পরিশ্রমের মধ্যে তার ভাবনা জাগছে, পরিবারের জন্য কয়েক মাসের উপার্জন কী তিনি নিয়ে যেতে পারবেন? জানেন না রুহুল আমীন। জানেন না আরো অনেক জেলে।
জেলেদের জন্য একটা অনিশ্চিত সময়ের মধ্য দিয়ে এবছর বাংলাদেশে ইলিশ মৌসুম শেষ হলো। মাছ ঘাটের অনেক মানুষের আওয়াজ মিলিয়ে যায় বাতাসে। এর মধ্যে আছে মৎস্যজীবীদের অস্পষ্ট কষ্টের শব্দগুলো; আছে রুহুল আমীন, নুরুদ্দিনসহ অনেক জেলের দীর্ঘশ্বাস!