• বুধ. অক্টো. 7th, 2026

এনসিটিতে ১৫ বছরে ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ, আর কী করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড?

Bytrendnews

অক্টো. 7, 2026


শ্রমিক সংগঠনগুলোর আন্দোলনের মধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি করতে যাচ্ছে সরকার।

মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নতুন করে এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া অনেকদূর এগিয়ে গেলেও শেষ সময়ে স্থগিত হয়ে যায়।

ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার কয়েক মাসের মাথায় চুক্তিটি হতে যাচ্ছে।

এ চুক্তির আওতায় কত টাকা বিনিয়োগ করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড বা কত বছর তারা টার্মিনালটি পরিচালনা করবে, এসব বিষয়ে জনপরিসরে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যে চুক্তি হতে যাচ্ছে, তার আওতায় কোম্পানিটি ১৫ বছর টার্মিনালটি পরিচালনা করবে। এ সময়ে সবমিলিয়ে তারা ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে।

ঢাকায় ইনভেস্ট বাংলাদেশ অডিটোরিয়ামে বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় এনসিটির কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

সে অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী ও সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ইসা কাজিম উপস্থিত থাকবেন।

এর আগে ১ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে এনসিটির দায়িত্ব আন্তর্জাতিক অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার খসড়া চুক্তি অনুমোদন করার কথা বলা হয়। তবে সে বিজ্ঞপ্তিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের নাম ছিল না।

এদিকে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বুধবার সন্ধ্যায় বন্দর এলাকায় মশাল মিছিল করেছে চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ।

এটিকে ‘কালো চুক্তি’ আখ্যা দিয়ে এর বিরোধিতায় বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় চট্টগ্রামে বন্দর ভবনের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দিয়েছে তারা।

আন্দোলনকারীদের দাবি, জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এই চুক্তির শর্ত, পরিচালনার অধিকার, আর্থিক দায় এবং শ্রমিকদের অধিকার সম্পর্কে জনগণকে স্পষ্টভাবে অবহিত না করে স্বাক্ষরের আয়োজন গভীর উদ্বেগের বিষয়।

তবে চুক্তির ইতিবাচক দিক তুলে ধরে নৌ পরিবহন সচিব জাকারিয়া বলেন, “চুক্তির আওতায় বার্ষিক একটি নুন্যতম ট্যারিফ নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই পরিমাণ ট্যারিফ দিতেই হবে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে। এর নিচে হতে পারবে না।

“বছরে নূন্যতম ১২ লাখ ৩০ হাজার কন্টেইনার হ্যান্ডলিং এর পর আরও বেশি সংখ্যক কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হলে সংখ্যার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে ট্যারিফের হার বাড়বে।”

নূন্যতম ট্যারিফ কত এবং কোন ধাপে কত ট্যারিফ নির্ধারণ করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “চুক্তির কিছু বিষয়ে শর্ত আছে। সেই শর্তের অধীনে কিছু তথ্য উভয়পক্ষ প্রকাশ করতে পারবে না। তাই এ বিষয়ে কিছু বলতে পারছি না।”

বর্তমানে এনসিটি পরিচালনার কাজ আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় পিছিয়ে আছে দাবি করে তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিতে আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে সেখানে জাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম ও কন্টেইনার হ্যান্ডলিং এর সময় বর্তমানের তুলনায় অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ডিপি ওয়ার্ল্ড।


Image

চট্টগ্রামে বন্দর শ্রমিকদের বিক্ষোভ।

“এতে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং অনেক বেড়ে যাবে। এখন বেশি সময় লাগে বলে ব্যবসায়ীদের বেশি খরচ হয়। যা পরবর্তীতে ভোক্তার ঘাড়ে চাপে। কম সময়ে পণ্য হ্যান্ডলিং হলে ব্যবসায়ীদের খরচ কমবে। ভোক্তা তথা সাধারণ জনগণও লাভবান হবে।”

ডিপি ওয়ার্ল্ডে অধীনে এনসিটি পরিচালনার ক্ষেত্রে বর্তমান যে শ্রমিকরা কাজ করছেন তারাই থাকবেন জানিয়ে সচিব জাকারিয়া বলেন, “এখন ঠিকাদারের মাধ্যমে শ্রমিক নিয়োগ হয়। রেজিস্টার্ড এসব শ্রমিকের তালিকা রয়েছে। ডিপি ওয়ার্ল্ড তাদের নিয়েই কাজ করবে। কোনো শ্রমিকের কাজ হারানোর ভয় নেই।”

বিদেশি অপারেটরকে টার্মিনালের দায়িত্ব দেওয়া হলে জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে বলে আন্দোলনকারীরা দীর্ঘদিন ধরে আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছে।

এ বিষয়ে নৌ পরিবহন সচিব জাকারিয়া বলেন, “পিসিটি (পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল) এখনো সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল (আরএসজিটিআই) পরিচালনা করছে। এছাড়া লালদিয়াতেও বিদেশি বিনিয়োগ চূড়ান্ত হয়েছে। কোথাও তো নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়নি। তারা কীভাবে এটা চিন্তা করেন, জানি না।”

এনসিটিতে স্ক্যানিং মেশিন পরিচালনা ও বিনিয়োগ বিষয়ে জানতে চাইলে ‘কনসেশন’ চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, “পিসিটিতে বিদেশি অপারেটর আরএসজিটিআই আধুনিক স্ক্যানিং মেশিন বসিয়েছে। কাস্টমসের পক্ষে স্ক্যানিং পরিচালনা কঠিন।

“এনসিটিতে দ্রুত হ্যান্ডলিং করার জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ড নতুন আধুনিক স্ক্যানিং মেশিন বসাবে। এছাড়া প্রয়োজন হলে বিদ্যমান ক্রেনগুলো বদলাবে। টার্মিনাল আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতি হালনাগাদ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগ করবে ৯ কোটি ডলার। সরকারকে চুক্তির অগ্রিম পেমেন্ট হিসেবে দিবে ৫ কোটি ডলার। সবমিলিয়ে তারা ১৫ কোটি ডলার বা ১৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে।”

বিশ্বব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) এ প্রকল্পে লেনদেন বিষয়ক পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছে।

এ চুক্তির পর এনসিটি পরিচালিত হবে ‘ল্যান্ডলর্ড মডেলে’। অর্থাৎ টার্মিনালের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ বন্দরের হাতে থাকবে। তবে টার্মিনাল পরিচালনা করবে বিদেশি অপারেটর।

চুক্তির ১৫ বছরে যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের ব্যয় এবং সব ধরণের আর্থিক দায় ডিপি ওয়ার্ল্ড বহন করার শর্ত রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল কেউ মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বন্দরের টাকায় গড়া টার্মিনাল চালাবে বিদেশিরা

চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি কন্টেইনার টার্মিনালের মধ্যে সবচেয়ে বড় এনসিটি। এ টার্মিনালের পাঁচটি জেটির মধ্যে চারটিতে কন্টেইনারবাহী বড় জাহাজ এবং অন্যটিতে অভ্যন্তরীণ নৌপথে চলাচলকারী ছোট জাহাজ ভেড়ানো হয়।

বন্দরের টার্মিনালগুলোতে যত কন্টেইনার ওঠা-নামা করে সেগুলোর মধ্যে এককভাবে সবচেয়ে বেশি হয় এনসিটিতে।

বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়ে ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে এখানকার পাঁচটি জেটি নির্মাণ কাজ শেষ হয়। নির্মাণ কাজে বন্দরের খরচ হয়েছিল ৪৬৯ কোটি টাকা।

এর দুই বছর পর এনসিটির জন্য যন্ত্রপাতি কিনতে বিনিয়োগ করার শর্তে পরিচালনার জন্য বিদেশি অপারেটর নিয়োগে দরপত্রও আহ্বান করা হয়েছিল। তখন বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানি আগ্রহীও ছিল। পরে সেই দরপত্র বাতিল করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

এরপর টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য ২০১২ সালে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এরপর দরপত্র সংশোধন করে কয়েকটি কোম্পানিকে অন্তর্ভুক্ত করার পর মামলা হলে টার্মিনাল পরিচালনা ঝুলে যায়।


Image

চট্টগ্রাম বন্দরের পিসিটিতে যুক্ত হয়েছে নতুন চারটি গ্যান্ট্রি ক্রেন। ফাইল ছবি

নানা আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০১৫ সালের ২৫ জুন এনসিটির ৪ ও ৫ নম্বর জেটি পরিচালনায় বন্দরের সঙ্গে চুক্তি করে সাইফ পাওয়ার টেক এবং এর দুই অংশীদার কোম্পানি।

সে বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর এনসিটির ২ ও ৩ নম্বর জেটি পরিচালনায় বন্দরের সঙ্গে চুক্তি করে দেশি কোম্পানি সাইফ পাওয়ার টেক।

দরপত্রের মাধ্যমে দুই বছরের জন্য কোম্পানিটি এনসিটি পরিচালনার ওই দায়িত্ব পেয়েছিল। ২০১৫ সালের ১৭ অক্টোবর এনসিটিতে কন্টেইনার ওঠানামার কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।

পরে এনসিটি পরিচালনায় আর দরপত্র ডাকা হয়নি। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) প্রতিবার ছয় মাসের জন্য এনসিটির টার্মিনালগুলো পরিচালনা করে আসছিল সাইফ পাওয়ার টেক।

টানা ১১ বার সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত এনসিটি পরিচালনা করে কোম্পানিটি। এরপর দ্বাদশতম বারের মত আরও ছয় মাসের জন্য তাদের এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এরপর থেকে এখন পর্যন্ত এনসিটি বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেডের (সিডিডিএল) মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। বিদেশি অপারেটরের কাছে হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত তারা এই টার্মিনাল পরিচালনা করবে।

শুরু থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এনসিটি পরিচালনায় কী-গ্যান্ট্রি ক্রেন ও রাবার টায়ারড গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কিনতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ খরচ করেছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা।

গত অর্থবছরে এনসিটি দিয়ে প্রায় ১৩ লাখ ৮৫ হাজার একক কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়; যা চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ।

চট্টগ্রাম বন্দরের অন্য তিনটি টার্মিনালের মধ্যে জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) ও চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) দেশি অপারেটররা পরিচালনা করছে।

এরমধ্যে সিসিটিতে অপারেটর হিসেবে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনালকে (আরএসজিটিআই) দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া করতে জন্য গত সপ্তাহে মন্ত্রণালয় থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যানকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা হয়।

আর পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) আগে থেকেই পরিচালনা করছে সৌদি আরবের কোম্পানি আরএসজিটিআই।

আরও পড়ুন:

পুরানো খবর:


এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি বৃহস্পতিবার, ‘কালো চুক্তি’ বলছে আন্দোলনকারীরা



Source link

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।