[ad_1]
সরকারের অনুমতি পেলে পুলিশ ‘ক্রসফায়ার’ করতে পিছপা হবে না বলে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির যে মন্তব্য করেছেন তার নিন্দা ও উদ্বেগ জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন।
আইজিপির এমন বক্তব্য অবিলম্বে প্রত্যাহার, নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা ও তার অপসারণেরও দাবি উঠেছে।
পুরান ঢাকায় সোমবার দুপুরে ‘কমিউনিটি ইসলামিক ব্যাংক সিস্টেম’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গিয়ে আইজিপি বলেন, “আমাদের দায়িত্ব, আইন-সংবিধান অনুযায়ী যখন যেখানে যা প্রয়োগ করা দরকার, সেইটাই আমরা করব। যেখানে ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাও করে, আমরা সেইটা করব।”
বিএনপির সর্বশেষ নির্বাচনী ইশতেহারে ক্রসফায়ারকে ‘বিচার বহির্ভূত নির্মম হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করে অতীতে ঘটনা ঘটনাগুলোর বিচার করার অঙ্গীকার করা হয়। ফলে সরকারের ৯ মাসেই ‘ক্রসফায়ার’ প্রসঙ্গে আইজিপির এমন বক্তব্যে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
এর আগে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রায় দেড় দশক ‘ক্রসফায়ারের’ মত বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি গুম-গুপ্তহত্যার মত নৃশংস সব পন্থা অবলম্বন করে দেশে-বিদেশে সমালোচিত হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তৎকালীন র্যাবের কিছু কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞাও আসে যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে।
এ দিন এক বিবৃতিতে আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ সংক্রান্ত বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
তিনি বলেন, “দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব পুলিশের। পুলিশ নাগরিকদের সেবক, শাসক নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান ব্যক্তি হয়ে এমন বক্তব্যে তিনি তার চাকরিবিধি লঙ্ঘন করেছেন।
“দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির মধ্যে আইজিপির এমন বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য ও অনভিপ্রেত। তার বক্তব্য দেশে ভয়ের সংস্কৃতিতে ফিরিয়ে আনার ইঙ্গিত দেয়। রাষ্ট্রকে আবারও নতুন সংকটের দিকে নিয়ে যাওয়ার চক্রান্তের নকশা।”
বিকালে এক গণসংযোগ কর্মসূচিতে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ আইজিপির এমন বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “আইজিপি ফকির, এই গুণ্ডা ফকির, আজ বলছে, সরকার যদি অনুমতি দেয় তারা নাকি মানুষকে গুলি করবে। এই যে গুণ্ডা আইজিপি, যে ক্রসফায়ার করে গুলি দিয়ে মানুষ মেরে ফেলতে চাচ্ছে, তারা হচ্ছে ডিবি হারুনের বংশধর। এই আইজিপি ফকির হচ্ছে বেনজিরের বংশধর, তারা হচ্ছে বিপ্লবের বংশধর। তাদের পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে পুলিশকে আবার কলঙ্কিত করা হচ্ছে।”
আইজিপির বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। দলের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এক বিবৃতিতে বলেন, “সরকারের অনুমোদন থাকলেই কোনো নাগরিককে বিচার বহির্ভূতভাবে হত্যার বৈধতা তৈরি হয় না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার অবশ্যই সংবিধান, আইন ও মানবাধিকারের সীমার মধ্যে থাকতে হবে।”
সরকারের কাছে আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা দাবি করেন এবি পাটির দুই শীর্ষ নেতা।
পৃথক এক বিবৃতিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, “ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ আলী হোসেন ফকির ক্রসফায়ার নিয়ে যা বলেছেন তা উদ্বেগজনক। তার এই বক্তব্য পতিত ফ্যাসিস্ট আমলের পুলিশের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, আলী হোসেন ফকির হালকা মেজাজে এই মন্তব্য করেছেন। যদিও এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে হালকা মেজাজে মন্তব্য করা যায় না।”
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্মমহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন বিবৃতিতে বলেন, “আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের ক্রসফায়ার সংক্রান্ত বক্তব্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি মোকাবিলায় কার্যকর কৌশল তুলে ধরার পরিবর্তে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কথা বলা পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও ফ্যাসিবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।
“সরকার অনুমোদন দিলেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বৈধ হয়ে যায় না। অপরাধ দমনে পুলিশকে কঠোর হতে হবে, তবে সেই কঠোরতা অবশ্যই আইনের সীমার মধ্যে থাকতে হবে। আমরা আইজিপির বক্তব্যের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করছি।’’
আইজিপির বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে এক বিবৃতিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলছে, পুলিশ মহাপরিদর্শকের এই বক্তব্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা মোকাবিলার পরিবর্তে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে অপরাধ দমনের গ্রহণযোগ্য হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠার বিপজ্জনক বার্তা দেয়।
আলী হোসেন ফকিরের বক্তব্যকে সংবিধান ও আইনের শাসনের প্রতি চরম অবজ্ঞার প্রকাশ বলেও বর্ণনা করেছে টিআইবি। অবিলম্বে আইজিপির বক্তব্য প্রত্যাহার এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে সরকার ঘোষিত অবস্থানের পরিপন্থি ঘোষণার জন্য আলী হোসেন ফকিরের জবাবদিহি নিশ্চিতেরও দাবি তুলেছে সংস্থাটি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিজেদের ব্যর্থতার ঢাল হিসেবে পুলিশপ্রধান কি ঘৃণিত ক্রসফায়ারকে ব্যবহার করতে চাইছেন? সরকারের অনুমতির শর্ত জুড়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দেওয়ার পথ খোঁজা কি একই সঙ্গে আইনসম্মতভাবে অপরাধ দমনে ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি নয়? পুলিশের দায়িত্ব পেশাদার তদন্ত, অপরাধী শনাক্ত এবং গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে বিচারের মুখোমুখি করা।
“এর বিকল্প হিসেবে ক্রসফায়ারকে সামনে আনা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সমাধান হতে পারে না, বরং পেশাগত দেউলিয়াত্বের দৃষ্টান্ত। আইজিপি একই বক্তব্যে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের কথা বলেছেন, আবার সরকারের অনুমতি পেলে ক্রসফায়ার করার কথাও বলেছেন- এই দুই অবস্থান সাংঘর্ষিক। কোনো সরকারের অনুমতি বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধ করতে পারে না। সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত আইনের আশ্রয়লাভ এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নির্বাহী সিদ্ধান্তে বাতিল করা যায় না। অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, বিচারপ্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে কাউকে হত্যার এখতিয়ার পুলিশের নেই।”
পুলিশপ্রধানের এমন ‘বেপরোয়া ও অপরিণামদর্শী’ বক্তব্য মাঠপর্যায়ে বেআইনি বলপ্রয়োগের প্রচ্ছন্ন ছাড়পত্র হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে বলেও মত দেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অর্থ না পেয়ে পুলিশের সমালোচনা করার যে অভিযোগ আইজিপি করেছেন সে প্রসঙ্গে টিআইবি বলছে, “কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। ঢালাও অভিযোগ মুক্ত গণমাধ্যমের নজরদারি ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং স্বাধীন সাংবাদিকতা নিরুৎসাহিত করার ঝুঁকি তৈরি করে।”
আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা গ্রহণ, প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়াসহ বক্তব্য প্রত্যাহার ও তার প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি। জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব থেকে অপসারণেরও দাবি তুলেছে সংস্থাটি।
পৃথক বিবৃতিতে বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত একজন কর্মকর্তার কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য শুধু অগ্রহণযোগ্যই নয়, বরং আইনের শাসন, সাংবিধানিক অধিকার ও মানবাধিকারের মূল নীতির পরিপন্থি। কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলেও তাকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করার অধিকার রাষ্ট্র বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেই।
আসক মনে করে, পুলিশের দায়িত্ব আইন অনুযায়ী অপরাধ প্রতিরোধ, অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং তাঁদের বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় আনা। আইন প্রয়োগের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সম্ভাবনা প্রকাশ করা দায়িত্বশীল আইন প্রয়োগের দৃষ্টান্ত হতে পারে না। এ ধরনের বক্তব্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারত্ব, জবাবদিহি এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়।
আসক সরকারের কাছে আইজিপির বক্তব্যের বিষয়ে অবিলম্বে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কোনো ধরনের অনুমোদন বা প্রশ্রয় দেওয়া হবে না মর্মে দ্ব্যর্থহীন অবস্থান ঘোষণা করার দাবি তুলেছে।
আইজিপির বক্তব্যে গভীর উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
এইচআরএসএস সরকারের কাছে আইজিপির বক্তব্যের বিষয়ে স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ব্যাখ্যা দাবি করে বলছে, “সরকার কি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে অনুমোদনযোগ্য মনে করে, নাকি এটি আইজিপির ব্যক্তিগত বক্তব্য তা অবিলম্বে পরিষ্কার করতে হবে।”
পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আইন বর্হি ভূত হত্যাকাণ্ড থেকে বিরত রাখার বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার অঙ্গীকার প্রত্যাশা করছে এইচআরএসএস।
২০২৪ সালে আন্দোলনের সময় নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর গুলি করার যথার্থতা প্রমাণের জন্য আইজিপি ক্রসফায়ারের প্রসঙ্গটিকে সামনে এনেছেন কী না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছন মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন।
এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “আন্দোলনে গুলি করার যথার্থতা প্রমাণের জন্য তখনকার পুলিশও বলেছিল, নিজেদের আত্মরক্ষা এবং জান-মাল রক্ষার স্বার্থেই তাদের গুলি করতে হচ্ছে। এখনকার আইজিপিও সেই প্রসঙ্গগুলোরই অবতারণা করছেন।”
[ad_2]
Source link