[ad_1]
বয়স যে জনপ্রিয়তা কিংবা নতুন কিছু শুরু করার পথে বাধা নয়, তার উদাহরণ হয়ে উঠেছেন কয়েকজন বয়স্ক নারী। সামাজিক মাধ্যম টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে তাদের ভিডিও দেখছেন লাখ লাখ তরুণ-তরুণী।
ফ্যাশন, রান্না, সাজসজ্জা, প্রেম কিংবা ঘর সামলানোর নানা বিষয় নিয়ে তৈরি ভিডিও তাদের এনে দিচ্ছে পরিচিতি, আয় এবং জীবনের নতুন আনন্দ। আর এ নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি।
৯৬ বছর বয়সী লিলিয়ান ড্রোনিয়াক সামাজিক মাধ্যমে ‘গ্র্যান্ডমা ড্রোনিয়াক’ নামে পরিচিত। গত জুনে এক অভিযোগ তুলে আলোচনায় আসেন তিনি। তার দাবি, অবসরপ্রাপ্তদের জন্য যে আবাসন ব্যবস্থায় তিনি থাকেন, সেখানকার কর্তৃপক্ষ তাকে বের করে চিচ্ছে।
কেন? কারণ, এই বুড়ি নিত্যদিন পার্টির আয়োজন করে।
আবাসন কর্তৃপক্ষ অবশ্য স্বীকারও করেছে যে তারা সত্যিই তাকে বের করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত ড্রোনিয়াকের সঙ্গে এক সমঝোতায় পৌঁছায় তারা।
এর ফলে পার্টির আয়োজন তিনি ঠিকই চালিয়ে যেতে পারছেন। তবে, এক শর্তে। অতিথিরা সেখানে মদ্যপান করতে পারবেন না।
টিকটকে তার অনুসারীর সংখ্যা দেড় কোটি। সামাজিক মাধ্যমে নিজের ব্যক্তিত্ব ও জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসাও গড়ে তুলেছেন তিনি। সেখান থেকে পাওয়া আয় দিয়ে মাসে ১২ হাজার ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। অবসর আবাসনের খরচ মেটানোর পাশাপাশি তিনি আয়ের একটি অংশ জমা করেন নাতিপুতিদের কলেজে পড়ার খরচের জন্য।
যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের এই বাসিন্দা একা নন। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় বয়স্ক নারীরা সামাজিক মাধ্যমে তুমুল জনপ্রিয়তা পাচ্ছেন। তাদের অনেকের অনুসারীর বয়স এতটাই কম যে তারা চাইলে সেই অনুসারীদের নাতি-নাতনির বয়সী বলা চলে।
‘বুড়িয়ে যাওয়া এতটা খারাপও নয়’
ড্রোনিয়াক বিবিসিকে বলেন, “আমি সব সময় জানতাম, আমার মধ্যে বিখ্যাত হওয়ার মতো কিছু একটা আছে। তবে ভাবিনি, ৯০ পেরোনোর পর এটা ঘটবে।”
২০২০ সালে তার নাতি তাকে ভিডিও পোস্ট করতে সাহায্য করতে শুরু করেন। শুরুতে মূলত একঘেয়েমি কাটানোর জন্যই তাদের এই উদ্যোগ।
ড্রোনিয়াক মনে করেন, বয়স বাড়লেও জীবন থেমে যায় না, তরুণদের কাছে সেই বার্তা পৌঁছে দিতে পারাই তার জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ।
তিনি বলেন, “তারা মনে করে, বয়স্ক মানুষ শুধু বসে বসে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকেন। কিন্তু আমি দেখাচ্ছি, বুড়িয়ে যাওয়া এতটা খারাপ নয়। আমরা বয়সকে গ্রহণ করি, এখনো আনন্দ করতে পারি। আমিও এখনো পার্টি করি, মাঝেমধ্যে বাইরে যাই।”
তার নাতি স্পনসর করা ভিডিও সম্পাদনা করেন। এসব ভিডিওতে খাবার ও সৌন্দর্যচর্চার বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করেন ড্রোনিয়াক। আয় দিয়ে আবাসনের খরচ মেটানোর পাশাপাশি পরিবারের ছোটদের ভবিষ্যতের জন্যও অর্থ জমাচ্ছেন তিনি।
বাইরে গেলে ভক্তরা তাকে চিনে ফেলেন। তবে আবাসন এলাকায় তার পরিচিতি নিয়ে বাসিন্দাদের মধ্যে তেমন আগ্রহ নেই বলে জানান তিনি।
“ওরা বিষয়টা ঠিক বোঝে না, টিকটক ঘাঁটে না তো, তাই।”
‘ব্র্যান্ড নিয়ে আমি খুব বেছে চলি’
আটলান্টিকের অন্য পাশে যুক্তরাজ্যের কার্ডিফে রয়েছেন ৮২ বছর বয়সী ভিভ ট্রুরান। প্রাণবন্ত ও রসিক স্বভাবের এই নারী স্বামী হারানোর পর ইনস্টাগ্রামে ভিডিও পোস্ট করতে শুরু করেন। তার এক প্রতিবেশী পরামর্শ দিয়েছিলেন, তিনি যেন কালারফুল ড্রেস পরে ভিডিও করেন।
এখন নিজের শোবার ঘরকে স্টুডিও বানিয়ে প্রতিদিন দুটি ভিডিও তৈরি করেন তিনি। সেখানে নিজের পোশাক, ২২ জোড়া চশমা এবং স্কার্ফে ভরা দুটি শেলফের সংগ্রহ তুলে ধরেন।
ট্রুরান বলেন, “সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি আমার সকালের ভিডিও তৈরি না করা পর্যন্ত নিচতলায় নামিই না। এ ব্যাপারে আমার নীতি খুব শক্ত।”
অনুসারী ও ভিডিও দেখার সংখ্যা হিসাব রাখতে একটি নোটবুকও ব্যবহার করেন তিনি। এরইমধ্যে পাঁচখানা নোটবুক পূর্ণ হয়েছে তার।

বারবারা কোস্টেলো বলেন, অনেকেই তাকে এমন মা বা দাদি হিসেবে দেখেন, যাকে তারা নিজেদের জীবনে পাননি। ছবি: বারবারা কোস্টেলো
রাস্তাঘাটে অপরিচিত মানুষেরা প্রায়ই তাকে থামিয়ে কথা বলেন। তাদের মধ্যে অনেকেই বিশ থেকে ত্রিশ বছর বয়সী নারী। তারা ট্রুরানকে জানান, বয়স বেড়ে যাওয়া নিয়ে তারা ভীত। তাদের সেই ভয় কাটাতে সাহায্য করেন তিনি।
ব্র্যান্ডগুলোরও নজর কেড়েছেন ট্রুরান। বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে অর্থের বিনিময়ে কাজ করার প্রস্তাব গ্রহণ করাকে তিনি বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেন। তবে সব প্রস্তাবে সাড়া দেন না।
মাসে দু-একটি স্পনসর করা পোস্ট তৈরি করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় ব্র্যান্ড ও এজ ইউকে-র মতো দাতব্য সংগঠনকে অগ্রাধিকার দেন। সম্প্রতি ইনোসেন্ট ড্রিংকসের সঙ্গে যৌথভাবে এজ ইউকের একটি প্রচারাভিযানে কাজ করেছেন তিনি। ওই কাজের জন্য কয়েক হাজার পাউন্ড পেয়েছেন।
ট্রুরান বলেন, “বড় কিছু প্রস্তাবও আমি ফিরিয়ে দিয়েছি, কারণ সেগুলো আমার পছন্দের সঙ্গে যায় না। কার সঙ্গে কাজ করব, সে ব্যাপারে আমি খুব বেছে চলি। ব্র্যান্ডটিকে আমার সত্যিই ভালো লাগতে হবে।”
‘বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে বার্তা পেলে কেঁদে ফেলি’
ব্র্যান্ডগুলোর কাছে বয়স্ক কনটেন্ট নির্মাতারা কেন আকর্ষণীয় হয়ে উঠছেন, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইনফ্লুয়েন্সার বিপণন সংস্থা উই আর সোশালের নেওমি বার্কার।
তার মতে, এসব নির্মাতার অনুসারীদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং তাদের প্রতি অনুসারীদের আনুগত্যও অনেক বেশি। এসব অনুসারীর কেনাকাটার সামর্থ্যও তুলনামূলক বেশি। ফলে ব্র্যান্ডগুলোর কাছে এই নির্মাতাদের মূল্য অনেক বেশি।
৮৩ বছর বয়সী গ্রেস জেরামিতার ভিডিও দেখেন লাখ লাখ অনুসারী। কয়েক দশক ধরে রান্না করে আসা বিভিন্ন খাবারের রেসিপি তুলে ধরেন তিনি। সামাজিক মাধ্যমে তিনি নোন্না গ্রেসি নামে পরিচিত।
১৮ বছর বয়সে ইতালি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান জেরামিতা। দুই মেয়েকে বড় করতে একসঙ্গে একাধিক চাকরি করেছেন তিনি। এখন আগের যে কোনো চাকরির চেয়ে বেশি আয় করছেন।
ছয় বছর আগে তার নাতি ম্যাথিউ রান্নার ভিডিও তৈরির প্রস্তাব দেন। তবে সামাজিক মাধ্যম সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকায় এবং ইংরেজিতে ভালোভাবে কথা বলতে না পারায় প্রথমে রাজি হননি জেরামিতা। পরে তার ভিডিওগুলো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, “বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ আমাকে বার্তা পাঠালে আমি সব সময় কেঁদে ফেলি।”
তার ভিডিওতে শুধু খাবার রান্নার বিষয়ই থাকে না। পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে বসে খাওয়ার ঐতিহ্য ধরে রাখাও তার লক্ষ্য।
জেরামিতা বলেন, পরিবারের সবাইকে খাবার টেবিলে একত্র করার ঐতিহ্য পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে চান তিনি।
অনুসারীদের কাছে ভার্চুয়াল দাদি
উই আর সোশালের বার্কার মনে করেন, অনিশ্চিত সময়ে টিকটকের বয়স্ক নারীরা মানুষকে স্বস্তি দেন। তাদের সহজ, আন্তরিক ও পারিবারিক আবহের ভিডিও অনেক অনুসারীর কাছে ভার্চুয়াল দাদির মতো হয়ে ওঠে।
৭৭ বছর বয়সী বারবারা কোস্টেলোর ক্ষেত্রেও বিষয়টি সত্য। সাবেক এই শিক্ষক এখন ‘ব্রাঞ্চ উইথ ব্যাবস’ নামের অ্যাকাউন্টে রান্না, ঘর পরিষ্কার এবং সংসার সামলানোর নানা কৌশল নিয়ে ভিডিও তৈরি করেন।
তার অনুসারীদের অনেকে বলেন, কোস্টেলোর ভিডিও দেখে তাদের নিজের মা কিংবা দাদির কথা মনে পড়ে। কেউ কেউ তাকে এমন একজন মা হিসেবে দেখেন, যাকে তারা নিজেদের জীবনে পাননি।
কোস্টেলো বলেন, “সম্প্রতি এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী একটি রেস্তোরাঁয় আমার কাছে এসে জানায়, একা থাকতে শুরু করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বছর পার করতে আমার রান্নার বই তাকে সাহায্য করেছে। কথাটা শুনে আমি খুব খুশি হয়েছিলাম।”
বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করেন কোস্টেলোও। তবে নিজের নাম কোনো পণ্যের সঙ্গে যুক্ত করার আগে বিষয়টি নিয়ে সতর্কভাবে ভাবেন তিনি।
তার কাছে কনটেন্ট নির্মাতা হিসেবে কাজ করার সবচেয়ে ভালো দিক হলো, বইয়ের প্রচার অনুষ্ঠানে সাবেক শিক্ষার্থীদের সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে আসতে দেখা।
কোস্টেলো বলেন, “এ যেন একটা পূর্ণাঙ্গ বৃত্ত। আমার জীবন এখন এমন হয়ে উঠেছে, তা আমি সত্যিই বিশ্বাস করতে পারি না।”
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের আনন্দ কমে আসে, এমন ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছেন এই নারীরা। সামাজিক মাধ্যমের জনপ্রিয়তা তাদের শুধু পরিচিতি ও আয়ের সুযোগই দিচ্ছে না, নতুন করে মানুষের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে নেওয়ার পথও খুলে দিচ্ছে।
[ad_2]
Source link