[ad_1]
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় নিজের দোকান থেকে অপহৃত এক ব্যবসায়ীকে টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ।
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) সদস্য পরিচয়ে অপহরণকারী চক্রটি ওই ব্যবসায়ীকে হাতকড়া পরিয়ে তার দোকান থেকে নিয়ে যায়। পরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রেখে ব্যবসায়ীর পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করে।
পুলিশ বলছে, এই অপহরণকারী চক্রের ‘নেতৃত্বে’ আছেন সাবেক র্যাব সদস্য সুমন মুন্সি। বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচ বছর আগে তিনি সেনাবাহিনী থেকে চাকুরিচ্যুত হন।
সুমন মুন্সি অতীতে কক্সবাজারের উখিয়ায় র্যাবে কর্মরত ছিলেন, এ তথ্য দিয়ে পুলিশ জানায়, সেসময় স্থানীয় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কিছু ব্যক্তির সাথে তার সখ্য হয়। কারাগারে থাকার সময় যেসব অপরাধীদের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে তাদের নিয়ে তিনি ‘ভুয়া এসআরবি’ দল গঠন করেন।
চক্রটি কক্সবাজার, উখিয়া, টেকনাফ, কুতুবদিয়া, চকরিয়া, বান্দরবান এবং চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি জায়গায় অপহরণ ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে সক্রিয় বলে পুলিশের দাবি।
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পুঁইছড়ির প্রেমবাজার এলাকা থেকে ১৭ অক্টোবর অপহৃত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসানকে বুধবার সকালে উদ্ধারের পর বৃহস্পতিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ।
যেভাবে অপহৃত হন হাসান
সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, ঘটনার দিন রাত সাড়ে ৮টায় নিজের মালিকানাধীন মেসার্স আব্দুল্লাহ এন্টারপ্রাইজ নামের হার্ডওয়্যারের দোকানে ছিলেন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসান।
সেসময় হঠাৎ করে চারজন লোক আসে। যাদের পরনে এসআরবি লেখা কালো কটি, মুখে মাস্ক ও মাথায় ক্যাপ ছিল। তারা এসে ব্যবসায়ী হাসানকে বলে, ‘আমরা এসআরবি থেকে এসেছি। আপনার নামে মামলা আছে। আপনাকে যেতে হবে’। এতে তিনি হতম্ভব হয়ে পড়েন। তাকে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে নিয়ে চলে যায় ওই চার ব্যক্তি।
ওই ঘটনা ধারণা করা একটি সিসি টিভি ক্যামেরার ভিডিও সংগ্রহ করে পুলিশ।
পুলিশ সুপার জানান, ব্যবসায়ী হাসানকে নিয়ে যাওয়ার দুই ঘণ্টা পর থেকে তার স্ত্রী ও দোকানের ম্যানেজারকে ফোন দিয়ে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। ২০ লাখ টাকা না দিলে তাকে মেরে ফেলা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয় ফোনে।
জানতে পেরে যেসব নম্বর থেকে ফোন করা হয়েছিল সেগুলো পরীক্ষা করে পুলিশ দেখতে পায় সবগুলো ভিওআইপি নম্বর।
ভিওআইপি নম্বর হওয়ায় সেগুলোর অবস্থান শনাক্ত করতে পারছিল না পুলিশ। পরে ঘটনাস্থল থেকে শুরু করে কক্সবাজার পর্যন্ত বেশ কয়েকটি সিসি টিভি ক্যামেরার ভিডিও পর্যালোচনা করা হয়।
পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, “এসআরবি পরিচয়দানকারী চার ব্যক্তি একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে ব্যবসায়ী হাসানের দোকানে আসে। তাকে নিয়ে ওই সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে কিছুটা পথ গিয়ে একটা মাইক্রোবাসে ওঠে। এসব ফুটেজ দেখে ঘটনায় জড়িত কয়েকজনকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয় পুলিশ।”
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসান ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, “কয়েকটি গাড়ি পরিবর্তন করে আমাকে নিয়ে একটি বাড়িতে রাখা হয়। আমার পেটে অস্ত্র ধরে বলে, কোনো কথা বললে মেরে ফেলব।
“চোখ বন্ধ ছিল। হাত বন্ধ ছিল। যেদিন নিয়ে যায় সেদিন বলেছে, তোর বাড়িতে ফোন কর। আমাকে অনেক মারছে। আমি ম্যানেজারকে ফোন করে বলি, তোমার ভাবির কাছে ফোন নিয়ে যাও। টাকা জোগাড় কর।”

সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের সুপার মো. মাসুদ আলম। এসময় উপস্থিত ছিলেন উদ্ধার হওয়া ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসান।
শারীরিক নির্যাতনের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন হাসান।
তিনি বলেন, দুইদিন পর রাতে তাকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে আরেকটা বাড়িতে নিয়ে যায় অপহরণকারীরা। সেখানেও চোখ-হাত বেঁধে রাখা হয়। পায়ে বাঁধা হয় শিকল। পাঁচ দিনে একবার খেতে দিয়েছে তাকে।
হাসান বলেন, চোখ ও হাত-পা বেঁধে মুখে কাপড় গুঁজে তাকে বেদম মারধর করা হয়।
যেভাবে উদ্ধার
সিসি টিভি ভিডিওতে অপহরণকারীদের শনাক্তের পর কক্সবাজার থেকে উখিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে মঙ্গলবার প্রথম জয়নাল উদ্দিন জুনু নামের একজনকে আটক করে পুলিশ।
পুলিশ কর্মকর্তা মাসুদ আলম বলেন, এরপর ফাঁদ পেতে এই ঘটনার হোতা সুমন মুন্সিসহ অন্যদের ধরা হয় কক্সবাজার থেকে। তারা একটা প্রাইভেট কারে ছিল।
অপহরণের কাজে ব্যবহৃত সেই প্রাইভেট কারটি জব্দ করার পাশাপাশি কালো রঙের এসআরবি লেখা পাঁচটি কটি, এসআরবির দুটি ভুয়া পরিচয়পত্র ও একটি হাতকড়া উদ্ধার করেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তারদের মধ্যে সুমন মুন্সির বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলা। অন্যরা হলেন- কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার মিজানুর রহমান, উখিয়া উপজেলার জয়নাল উদ্দিন, চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার মো. আব্বাস উদ্দিন, টেকনাফে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা মো. ছলিম ওরফে সেলিম এবং কক্সবাজার সদর উপজেলার দেলোয়ার হোসেন।
পুলিশ সুপার বলেন, গ্রেপ্তার হওয়াদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, অপহৃত ব্যবসায়ী হাসান টেকনাফের লেদায় ২৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আছেন।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাইরে থেকে গিয়ে অভিযান পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণ তুলে ধরে তিনি বলেন, আটক হওয়াদের টেকনাফে নিয়ে যান তারা। তাদেরকে দিয়ে ক্যাম্পে যারা অবস্থান করছিল ব্যবসায়ী হাসানের সঙ্গে তাদেরকে ফোন করানো হয়।
পুলিশ কর্মকর্তা মাসুদ আলম বলেন, “তাদের দিয়ে ফোনে বলাই যে, মুক্তিপণের টাকা সব পেয়েছি এবং ভিকটিমকে এখন ফেরত দিতে চাই, তোমরা তাকে বের করে নিয়ে আস। আমরা গেইটে অবস্থান করছি। নিয়ে আসার পরে হাসানকে আমাদের (পুলিশের) মাইক্রোতে উঠানো হয়। তখন তার মুখ-চোখ বাঁধা ছিল।”
তিনি বলেন, হাসানকে তুলে নেওয়ার পরে তার চোখ বাঁধা হয়। তারপর থেকে আর খোলেনি। হাত পিছনে বাঁধা ছিল।
অপহৃতদের রাখে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে
আটক অপহরণকারী চক্রটি ‘সক্রিয় এবং দুর্ধর্ষ’ একটি গ্রুপ, এ কথা জানিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, “অপহরণ করে নিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রাখে। তারা মনে করে যে, ওখান থেকে তো পুলিশ বা কেউ গিয়ে নিয়ে আসতে পারবে না। সেটা তাদের জন্য সেইফ জায়গা।”
র্যাবের সাবেক সদস্য সুমন মুন্সি বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িত থাকার কারণে ২০২১ সালে তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয় এবং এরপর সে দুয়েকবার জেলেও যায় বলে জানান তিনি।
মাসুদ আলম বলেন, “জেলে যাওয়ার পরে অপহরণকারী গ্রুপের সাথে তার সখ্যতা হয়। সেখান থেকে তাদের একটা বড় চক্র তৈরি হয়। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর স্থায়ী বাসিন্দা হলেও সুমন মুন্সি থাকেন কক্সবাজারে। তার নেতৃত্বাধীন চক্রটি কক্সাবাজার থেকে পরিচালিত হয়।”
অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের সাথে চক্রটি জড়িত, এ তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, সুমন মুন্সির বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা আছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে কেউ অভিযানে আসলে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন পুলিশ সুপার।
অভিযানে আসা লোকদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া ও স্থানীয় থানা পুলিশের সাহায্য নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
[ad_2]
Source link