[ad_1]
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো যখন নির্বাচনী ইশতেহার চূড়ান্ত করছে, তখন তরুণ ভোটাররা তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে সোচ্চার।
তারা বলছেন, দলগুলোর প্রতিশ্রুতির কেন্দ্রে থাকতে হবে নাগরিকদের নিরাপত্তা, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। একই সঙ্গে চাঁদাবাজি বন্ধ, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়েও স্পষ্ট অঙ্গীকার চাইছেন তারা।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী এবং তরুণ পেশাজীবীদের সঙ্গে কথা বলেছে দ্য ডেইলি স্টার। তাদের কথায় উঠে এসেছে আগামীর বাংলাদেশ নিয়ে প্রত্যাশা ও উদ্বেগের চিত্র।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী ভোটার সংখ্যা ৫ কোটি ৫৬ লাখ, যা মোট ভোটারের ৪৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
বেশির ভাগ তরুণের কাছেই এই মুহূর্তে প্রধান প্রত্যাশা জীবনের নিরাপত্তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী এবং রাঙামাটির ভোটার রূপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে মানুষ একধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
রূপাইয়া বলেন, 'আমার প্রত্যাশা হলো আগামীতে যেই সরকার ক্ষমতায় আসুক, উনি যাতে এই সব মব ভায়োলেন্সের (গণপিটুনি) কালচার বন্ধ করেন। নারী-পুরুষ এবং যেকোনো তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সামাজিক মর্যাদা এবং মানবিক মর্যাদা যাতে অক্ষুণ্ন থাকে।'
পার্বত্য এলাকার ভীতিকর পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে আমরা পাহাড়ে যে হত্যাযজ্ঞ আর কথায় কথায় যেভাবে আমাদের বাড়িঘর পুড়তে দেখেছি, লুটতরাজ দেখেছি, তা যাতে আর না দেখতে হয়।'
ভিন্নমত দমনের সংস্কৃতির অবসান চেয়ে তিনি আরও বলেন, 'যেকোনো বিরোধী মত প্রকাশকারীও যাতে নিরাপদে নিজের মত প্রকাশ করার পর স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন।'
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী অন্বেষা চক্রবর্তী বলেন, 'সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজন সদস্য হিসেবে আমি আশা করি নতুন সরকার আমাদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেবে।'
বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত সজল কুণ্ডু বলেন, 'পুলিশকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। নতুন সরকারের কাছে আমার প্রত্যাশা, নিরাপত্তার চাদরে পুরো দেশকে আগলে রাখা। চাঁদাবাজি বন্ধ করা, লোকাল পাতি মাস্তানদের দৌরাত্ম্য এবং অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধ করা।'
তরুণ ভোটাররা কেবল অপরাধীর গ্রেপ্তারই চান না, তারা চান বিচারব্যবস্থা যেন ভয়ভীতি ও দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করে। তবে বিচারহীনতা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নিয়ে শঙ্কাও প্রকাশ করেছেন অনেকে।
ভোলা জেলার লালমোহন ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী তামান্না বলেন, 'যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তাদের নিরাপত্তা এবং মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।'
তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, 'যারা প্রকাশ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, তারা এখন প্রতিহিংসার ভয়ে আছেন। যদি বিএনপি পরবর্তী সরকার হয়, তবে তারা আমাদের খুঁজে বের করবে এবং হত্যা করবে। কারণ আমরা প্রকাশ্যে তাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেছি।'
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশের কারণেও তারা ভয়ের মধ্যে আছেন বলে জানান তিনি।
শরিফ ওসমান হাদির উদাহরণ টেনে তামান্না বলেন, দেশের জন্য নিঃস্বার্থভাবে লড়াই করা সত্ত্বেও তিনি এখনো ন্যায়বিচার পাননি।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাইমুন নোমান বলেন, 'আমি এমন একটি সরকার দেখতে চাই, যেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ও নিরপেক্ষ অবস্থান থাকবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করবে।'
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আয়শা তোফায়েল বলেন, 'একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি কর্মসংস্থানের সুযোগ, শিক্ষার মান এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে চিন্তিত। রাজনৈতিক নেতাদের উচিত সুষ্ঠু নিয়োগ প্রক্রিয়া, ডিজিটাল শিক্ষা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার দিকে নজর দেওয়া।'
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) এমবিএ শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার রিপা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর তার আস্থা কম, কারণ 'স্বার্থহীন লিডারশিপের' অভাব রয়েছে।
তিনি বলেন, 'সব থেকে অবহেলিত শ্রমিকদের বেতন ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করতে হবে। আমদানি কম করে দেশেই অনেক সুযোগ বা অ্যাসেট কাজে লাগিয়ে জিডিপিতে ফোকাস করা উচিত।'
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী বেনজির আহম্মেদ শাওন চান একটি 'সামাজিক উন্নয়নমুখী' সরকার। তিনি বলেন, 'সে সকল প্রকল্পই তারা গ্রহণ করবে, যেগুলো সমাজ থেকে বৈষম্য দূর করে, শিক্ষার বাণিজ্যিকিকরণ কমাবে। অর্থনৈতিক মন্দা নিরসনে তারা শৈল্পিক পরিসরে ভালো পরিবর্তন আনবে, যা কিনা বেকারত্ব কমাতে সাহায্য করবে।'
বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জিসদান জুলকারনাইন বলেন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন রোধ করা এবং প্রশাসনকে শক্ত ও নাগরিকমুখী করা জরুরি।
পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, মূলধারার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে তারা বাধার মুখে পড়ছেন।
দারুন্নাজাত সিদ্দীকিয়া কামিল মাদ্রাসার ফাজিল দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান বলেন, 'মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে আইসিটি ও ডিজিটাল শিক্ষার ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে।
তিনি আরও বলেন, 'দেশ যখন ডিজিটালাইজেশনের দিকে যাচ্ছে, তখন আমাদের জন্য এই সেক্টরে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। এর ফলে চাকরির বাজারে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে আমাদের নিচু চোখে দেখা হয়।'
লালমোহন ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী তামান্নাও পাঠ্যক্রম সংস্কারের দাবি জানিয়ে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে এটি 'নামমাত্র শিক্ষা' হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বাধ্যতামূলক আইসিটি শিক্ষার দাবি জানান।
ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে তরুণদের পছন্দ ও মানদণ্ড ভিন্ন। ঢাকা কলেজের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী এবং প্রথমবার ভোটার মো. নাঈম হাওলাদার বলেন, 'ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমি আসলে প্রতীক দেখে নয়, যোগ্য নেতৃত্বের গুণাবলী ও সৎ মানসিকতা থাকবে এমন ব্যক্তিকে প্রাধান্য দিব।'
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রিফাত নূর বলেন, 'দীর্ঘদিন ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতার পর দেশের একটি শক্তিশালী বিকল্প দরকার।'
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বেনজির আহম্মেদ শাওন বলেন, তিনি যে দলটিকে ভোট দিতে চান, তার আসনে ওই দলের কোনো প্রার্থী না থাকায় তিনি এবার ভোট দিচ্ছেন না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের শিক্ষার্থী মো. সজীব হোসেন বলেন, আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনই জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে আমাদের প্রধানতম প্রত্যাশা।
জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি প্রস্তাবিত গণভোট নিয়ে তরুণদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা রয়েছে। মো. সজীব হোসেন বলেন, 'ভবিষ্যতে অন্য কোনো রাজনৈতিক দল যেন সহজেই ফ্যাসিস্ট না হয়ে উঠতে পারে, তার একটা সীমারেখা টেনে দেওয়ার চেষ্টা করা।'
তবে তিনি বর্তমান সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন, 'সরকার জনগণকে সচেতন না করে ঢালাওভাবে হ্যাঁ-ভোটের পক্ষে প্রচারণা করছে, যেটা মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর করার কথা।'
বিপরীত মত দিয়ে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বেনজির আহম্মেদ শাওন বলেন, 'আমি মনে করি আসন্ন গণভোটে 'হ্যাঁ' জয়যুক্ত হলে তা স্বাধীনতার দলিলকে সমুন্নত রাখে না। যে ধরনের সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, তা সংসদীয় সভায় ভোটের মাধ্যমে সংবিধানে সংযুক্ত করা যেতে পারে।'
ব্যাংক কর্মকর্তা সজল কুন্ডুও গণভোটের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, 'বিগত গণভোটে জনগণের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। এবারের গণভোটে প্রতিটা এজেন্ডার বিপক্ষে হ্যাঁ বা না ভোটের ব্যবস্থা থাকা উচিত ছিল।'
[ad_2]
Source link