[ad_1]
খাবার খাওয়াতে গেলেই হাতে তুলে দিতে হয় মোবাইল। পড়তে বসলেও মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন, রাতে ঘুমাতে যেতে চায় না, আবার মোবাইল সরিয়ে নিলে রেগে যায় কিংবা কান্নাকাটি শুরু করে। অনেক শিশুর ক্ষেত্রে এমন আচরণ এখন অভিভাবকদের জন্য উদ্বেগের কারণ। পড়ালেখা, বিনোদন কিংবা অবসর কাটানো সবকিছুতেই ডিজিটাল পর্দার ওপর নির্ভরতা বাড়ছে শিশুদের। এর প্রভাব পড়ছে তাদের ঘুম, শারীরিক সক্রিয়তা ও মানসিক সুস্থতায়।
ঢাকার স্কুলপড়ুয়া শিশুদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি পাঁচ শিশুর চারজন প্রতিদিন দুই ঘণ্টারও বেশি সময় মোবাইল ফোন, টেলিভিশন, ট্যাবলেট, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন ডিজিটাল পর্দায় সময় কাটায়। তাদের গড় স্ক্রিন ব্যবহারের সময় দিনে প্রায় ৪ দশমিক ৬ ঘণ্টা। বেশি সময় স্ক্রিন ব্যবহার করা শিশুদের মধ্যে ঘুমের ঘাটতি, চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা ও মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত জটিলতাও বেশি দেখা গেছে। তবে, আচরণগত সমস্যার ক্ষেত্রে বেশি ও কম স্ক্রিন ব্যবহারকারী শিশুদের মধ্যে পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য পাওয়া যায়নি।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) গবেষণায় উঠে আসা এসব তথ্য শিশুদের ডিজিটাল অভ্যাস নিয়ে নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে।
গবেষকদের মতে, প্রযুক্তির ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে, শিশুদের বয়স, প্রয়োজন ও বিকাশের কথা বিবেচনায় রেখে স্ক্রিন ব্যবহারের সময় ও ধরন নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
ঢাকার শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহারের সময় দিনে ৪ ঘণ্টার বেশি
২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ঢাকার ছয়টি স্কুলের দ্বিতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৪২০ শিশুকে নিয়ে গবেষণাটি পরিচালনা করেন আইসিডিডিআর,বির শাহরিয়া হাফিজ কাকনসহ একদল গবেষক। তিনটি বাংলা মাধ্যম ও তিনটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষার্থীদের তথ্য সংগ্রহ করে তাদের স্ক্রিন ব্যবহারের সময়, ঘুম, শারীরিক উপসর্গ ও মানসিক সুস্থতা মূল্যায়ন করা হয়।
গবেষণার ফলাফল ২০২৬ সালে মে মাসে জেএমআইআর হিউম্যান ফ্যাক্টরস সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। গবেষণাটির শিরোনাম ‘হাই স্ক্রিন এক্সপোজার অ্যান্ড ইটস অ্যাসোসিয়েশন উইথ ফিজিক্যাল অ্যান্ড মেন্টাল ওয়েল-বিয়িং অ্যামং স্কুল-গোয়িং চিলড্রেন অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্টস ইন বাংলাদেশ: ক্রস-সেকশনাল স্টাডি’।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহসীন আলম বলেন, “শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহার কমাতে শুধু মোবাইল কেড়ে নেওয়া বা বকাঝকা করা যথেষ্ট নয়। কেন শিশু দীর্ঘ সময় পর্দায় থাকতে চাইছে, তার বিকল্প বিনোদন ও খেলাধুলার সুযোগ আছে কি না এবং পরিবারের বড়রা নিজেরা কীভাবে ডিভাইস ব্যবহার করছেন এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।”
গবেষণায় অংশ নেওয়া ৪২০ শিশুর মধ্যে ৩৫০ জন, অর্থাৎ ৮৩ দশমিক ৩ শতাংশ দিনে দুই ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিন ব্যবহার করত। তাদের গড় স্ক্রিন টাইম ছিল ৪ দশমিক ৬ ঘণ্টা। অন্যদিকে, ৭০ শিশু দিনে দুই ঘণ্টার কম সময় স্ক্রিন ব্যবহার করত। গবেষণায় শিশুদের নিজেদের বক্তব্যের পাশাপাশি অভিভাবকদের তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
শুধু সময়ের হিসাব নয়, গবেষকেরা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়নে স্বীকৃত প্রশ্নমালা ব্যবহার করেন। এর মধ্যে ছিল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ওয়েল-বিয়িং অ্যাসেসমেন্ট এবং স্ট্রেংথস অ্যান্ড ডিফিকাল্টিজ কুয়েশ্চনিয়ার। ঘুমের মান যাচাইয়েও নির্দিষ্ট মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
আচরণগত সমস্যা, উদ্বেগ ও অতিচঞ্চলতা
গবেষণায় দেখা যায়, অংশগ্রহণকারী শিশুদের ৩১ শতাংশের অন্তত একটি মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা ছিল। প্রায় ৯ দশমিক ৮ শতাংশ শিশুর একাধিক মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা পাওয়া যায়। এসব সমস্যার মধ্যে ছিল নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত ভয়, সাধারণ উদ্বেগ, বিষণ্নতা, অতিচঞ্চলতা ও আচরণগত জটিলতা।
অন্তত একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা থাকা ১৩০ শিশুর মধ্যে ১১৩ জনই দিনে দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহারকারী দলের। একাধিক মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা থাকা ৪১ শিশুর মধ্যে ৩৮ জনও ছিলেন এ দলে। বেশি স্ক্রিন ব্যবহারকারী শিশুদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার হার তুলনামূলক বেশি ছিল। তবে, গবেষণায় এই সম্পর্কের পরিসংখ্যানগত তাৎপর্য ছিল সীমান্তবর্তী পর্যায়ে। গবেষণায় ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ শিশুর আচরণগত সমস্যা এবং ২৮ দশমিক ৮ শতাংশের সমবয়সীদের সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা পাওয়া যায়।
ঘুম কমছে, বাড়ছে শারীরিক সমস্যাও
শিশুদের ঘুমের ওপর স্ক্রিন ব্যবহারের সম্পর্কও গবেষণায় উঠে এসেছে। দিনে দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহারকারী শিশুরা গড়ে ৭ দশমিক ৩ ঘণ্টা ঘুমাত। তুলনায় কম স্ক্রিন ব্যবহারকারী শিশুদের গড় ঘুমের সময় ছিল ৯ ঘণ্টা। দুই দলের ঘুমের সময়ের পার্থক্য ছিল পরিসংখ্যানগতভাবে বেশি।
গ্রাফিক্স: আইসিডিডিআর,বি
গবেষণায় অংশ নেওয়া ৪২০ শিশুর মধ্যে ১৫০ জন, অর্থাৎ ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশের চোখের সমস্যার কথা উঠে আসে। চোখের সমস্যা থাকা শিশুদের ৯৬ শতাংশই বেশি স্ক্রিন ব্যবহারকারী দলের। এ দলের শিশুদের মধ্যে চোখের সমস্যার হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল।
এ ছাড়া, ৩৩৬ শিশু অর্থাৎ ৮০ শতাংশ মাথাব্যথার কথা জানিয়েছে। তাদের মধ্যে ২৭৯ জন ছিল বেশি স্ক্রিন ব্যবহারকারী দলের। শিশুদের ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশের বদহজম, ৮১ দশমিক ২ শতাংশের পেটব্যথা, ৪৫ দশমিক ৭ শতাংশের ঘাড়ব্যথা এবং ৩১ দশমিক ৯ শতাংশের পিঠব্যথার তথ্যও পাওয়া যায়।
আইসিডিডিআর,বির গবেষণার প্রধান গবেষক ও অ্যাসিস্ট্যান্ট সায়েন্টিস্ট ডা. শাহরিয়া হাফিজ কাকন বলেন, “শিশুদের আচরণ ও দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন দেখা দিলে অভিভাবকদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। দেরিতে ঘুমানো, খিটখিটে মেজাজ, মনোযোগ কমে যাওয়া, মাথাব্যথা কিংবা বাইরে খেলাধুলায় অনীহা দেখা দিলে শিশুর স্ক্রিন ব্যবহারের সময় ও ধরন খেয়াল করা প্রয়োজন। এসব লক্ষণের পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে; তাই সমস্যাগুলো দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।”
ওজনের ক্ষেত্রেও পার্থক্য পাওয়া গেছে। গবেষণায় ১০ দশমিক ১ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজনের এবং ৩ দশমিক ৮ শতাংশ স্থূলতায় আক্রান্ত ছিল। বেশি স্ক্রিন ব্যবহারকারী শিশুদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। গবেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় বসে থাকা ও শারীরিক কার্যক্রম কমে যাওয়া এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। তবে, ওজনের ওপর খাদ্যাভ্যাস, ঘুম ও অন্যান্য জীবনযাপনসংক্রান্ত বিষয়ও প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্য গবেষণাতেও আচরণগত সমস্যার সম্পর্ক
শুধু বাংলাদেশ নয়, আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে আচরণগত ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ২০২২ সালে জেএএমএ সাইকিয়াট্রি সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-বিশ্লেষণে ৮৭টি গবেষণার ১ লাখ ৫৯ হাজার ৪২৫ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটিতে দেখা যায়, বেশি স্ক্রিন টাইমের অভ্যস্ত শিশুরা আগ্রাসী আচরণ, মনোযোগের সমস্যা, অতিচঞ্চলতা, উদ্বেগ ও বিষণ্নতায় ভুগছে।
বাংলাদেশি শিশুদের ওপর পরিচালিত আরেকটি গবেষণার ফল ২০২৪ সালে বিজেপিসাইক ওপেন সাময়িকীর একটি কংগ্রেস-সংকলনে প্রকাশিত হয়। সেখানে ঢাকার ছয়টি স্কুলের ৪২০ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৫৬ শতাংশ শিশু অভিভাবকের সরাসরি তত্ত্বাবধান বা নজরদারি ছাড়াই ডিজিটাল পর্দা ব্যবহার করত। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের দৈনিক গড় স্ক্রিন টাইম ছিল ৫ দশমিক ৫ ঘণ্টা; বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে তা ৩ দশমিক ৭ ঘণ্টা।
ওই গবেষণায় অভিভাবকের তত্ত্বাবধান ছাড়া স্ক্রিন ব্যবহারকারী শিশুদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য ও আচরণগত সমস্যার বিভিন্ন সূচক বেশি পাওয়া যায়।
কী বলছেন গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা
আইসিডিডিআর,বি গবেষণার প্রধান গবেষক ও অ্যাসিস্ট্যান্ট সায়েন্টিস্ট ডা. শাহরিয়া হাফিজ কাকন বলেন, “শিশুদের আচরণ ও দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন দেখা দিলে অভিভাবকদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। দেরিতে ঘুমানো, খিটখিটে মেজাজ, মনোযোগ কমে যাওয়া, মাথাব্যথা কিংবা বাইরে খেলাধুলায় অনীহা দেখা দিলে শিশুর স্ক্রিন ব্যবহারের সময় ও ধরন খেয়াল করা প্রয়োজন। এসব লক্ষণের পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে; তাই সমস্যাগুলো দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।”
শিশুদের চোখের সুরক্ষায় তিনি ‘২০-২০-২০’ নিয়ম অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন। এ নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন ব্যবহারের পর অন্তত ২০ সেকেন্ড ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।
আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, “প্রযুক্তি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। শিশুদের সুস্থতার জন্য স্ক্রিন ব্যবহারে সীমা নির্ধারণ জরুরি। অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের খেলাধুলা, পর্যাপ্ত ঘুম, শারীরিক পরিশ্রম এবং ডিভাইসমুক্ত পারিবারিক সময় নিশ্চিত করা।”
তিনি বলেন, “শিশুদের ডিজিটাল অভ্যাস নিয়ে আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসের নির্দেশনাতেও একক কোনো সময়সীমার বদলে শিশুর বয়স, বিকাশ ও পারিবারিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে গণমাধ্যম ব্যবহারের পরিকল্পনা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে পর্যাপ্ত ঘুম ও শারীরিক কার্যক্রম নিশ্চিত করা, ঘুমানোর সময় শোবার ঘরে ডিভাইস না রাখা এবং ঘুমের আগে স্ক্রিন ব্যবহার এড়িয়ে চলার পরামর্শ রয়েছে।”
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহসীন আলম বলেন, “শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহার কমাতে শুধু মোবাইল কেড়ে নেওয়া বা বকাঝকা করা যথেষ্ট নয়। কেন শিশু দীর্ঘ সময় পর্দায় থাকতে চাইছে, তার বিকল্প বিনোদন ও খেলাধুলার সুযোগ আছে কি না এবং পরিবারের বড়রা নিজেরা কীভাবে ডিভাইস ব্যবহার করছেন এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।”
তিনি বলেন, “পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, বাইরে খেলাধুলার সুযোগ তৈরি, ঘুমের নির্দিষ্ট সময় বজায় রাখা এবং পড়ালেখার সময় বিনোদনমূলক স্ক্রিন ব্যবহার সীমিত করা যেতে পারে। বয়স উপযোগী ও মানসম্মত ডিজিটাল কনটেন্ট বেছে নেওয়া এবং শিশু কী দেখছে, তা নিয়ে তার সঙ্গে আলোচনা করাও গুরুত্বপূর্ণ।”
অধ্যাপক ডা. মোহসীন আলম বলেন, “শিশুদের হাতে প্রযুক্তি তুলে দেওয়ার পাশাপাশি সেই প্রযুক্তি ব্যবহারের স্বাস্থ্যকর অভ্যাস শেখানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, ডিজিটাল পর্দা শিশুদের শেখার সুযোগ তৈরি করলেও তার ব্যবহার যেন ঘুম, খেলাধুলা, সামাজিক যোগাযোগ ও স্বাভাবিক বিকাশের জায়গা দখল না করে সেদিকে নজর রাখতে হবে।”
[ad_2]
Source link