[ad_1]
দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় জামায়াতে ইসলামীর বিতর্কিত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম জামিন শুনানিতে বিচারক বলেছেন, তাকে জামিন দিলে সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
বিচারক বলেছেন, আসামি একজন বয়স্ক মানুষ, তাই আপসঅযোগ্য ধারার মামলায় বাদী ‘আপসনামা’ দিয়েছেন। আর যিনি মারা গেছেন, তিনি অল্প বয়স্ক নারী।
বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলাম এসব কথা বলেন।
এর আগেও আদালতে ‘আপসনামা’ দিয়ে এমপি নজরুলের জামিনে আপত্তি না থাকার বলেছেন মামলার বাদী মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ। তখনও আদালত তার জামিন আবেদন নাকচ করে দেন।
সোমবার এমপি নজরুল আবার জামিন চেয়ে আবেদন করেন। আদালত শুনানির জন্য দিন রাখেন বুধবার।
একই দিন মামলার আরেক আসামি ওবায়দুরের রহমানও জামিন আবেদন করেন। মঙ্গলবার শুনানির দিন থাকলেও তা পিছিয়ে বুধবার রাখা হয়।
এদিন নজরুল ইসলামের পক্ষে আইনজীবী মিজানুর রহমান ও মাহাবুবুর রহমান শুনানি করেন। তবে ওবায়দুর রহমানের আইনজীবী আদালতে যাননি।
আইনজীবী মিজানুর রহমান বলেন, “আপসের শর্তে নজরুল ইসলামের জামিন প্রার্থনা করছি। আবেদনের সাথে আপসনামার ফটোকপি জমা দিয়েছি। বাদী আদালতে উপস্থিত আছে।”
এসময় সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহর কাছে বিচারক জানতে চান, “আপস করেছেন?”
জবাবে মাসুম বিল্লাহ বলেন “হ্যা।”
ভুক্তভোগী কি হয় বিচারক জানতে চাইলে মাসুম বিল্লাহ বলেন, “মেয়ে।”
এরপর আইনজীবী মিজানুর রহমান বলেন, “গত ৩০ সেপ্টেম্বর নজরুল ইসলাম ও মাকছুদা ইসলামের আপসের শর্তে জামিন আবেদন করেছিলাম। বয়স্ক বিবেচনায় মাকছুদা ইসলামকে জামিন দেন আদালত। নজরুল ইসলাম মাকছুদার ইসলামের স্বামী। বয়সে নজরুল ইসলাম তার চেয়ে ১২/১৩ বছরের বড়।
“বাদী আসামির আত্মীয়, আপস করেছি। জামিন দেন। মামলায় যা হওয়ার হবে।”
জামিনের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন-অর-রশীদ বলেন, “আসামি একজন সংসদ সদস্য। কয়েক মাস আগে আসামির সাথে ভিকটিমের একটা ভিডিও ভাইরাল হয়। এরপর ভিকটিমকে স্ত্রী দাবি করেন। পরে তাদের বিয়ের রেজিস্ট্রি হয়। ন্যাম ভবনে স্ত্রী পরিচয়ে নিয়ে যান।
“তবে বাসায় নিয়ে তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দেননি। তাকে বারান্দায় ঘুমাতে দিতেন। ৩০৬ ধারার মামলা। আপস করা বেআইনি এবং আপসনামা দাখিল করাও বেআইনি। আর আদালত তা গ্রহণ করতেও বাধ্য না।”
তিনি বলেন, “বাদী মাত্র সংবাদদাতা। এর পরের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। মামলার তদন্ত শেষ হলে জানা যাবে, এটা হত্যা না আত্মহত্যা। অনেক মামলায় দেখা গেছে, এমন মামলা পরে হত্যা মামলা হয়েছে।
“আর মামলার আপস হয়েছে। একপক্ষ মাসুম বিল্লাহ এবং অপর পক্ষ আব্দুল হামিদ মোড়ল। আব্দুল হামিদ মোড়ল কে? কোন পক্ষ?”
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, “আসামির জামিন নামঞ্জুর করবেন এবং তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেন যেন আব্দুল হামিদ মোড়ল আটক করে এবং জিজ্ঞাসাবাদ করে। আব্দুল হামিদ মোড়লও মামলার আসামি হবে। মরিয়মের বাবাকেও জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেবেন।”
এরপর নজরুল ইসলামের আইনজীবী মিজানুর রহমান বলেন, “আমরা তো আপস করেছি জামিনের বিষয়ে, মামলার বিষয়ে আপস করিনি। আসামি অনেকদিন যাবত কারাগারে রয়েছেন।”
তখন প্রসিকিউটর হারুন বলেন, “বাদী সংবাদদাতা। তিনি আদালতে এসে বলতে পারেন না, জামিনে আপত্তি নাই। এটা অস্বাভাবিক মৃত্যু। মামলার তদন্ত হবে। আসামি ধরা রাষ্ট্রের দায়িত্ব আর বিচারের দায়িত্ব আদালতের।
“এ পর্যায়ে এসে বাদীর আপস করার সুযোগ নেই। একটা মানুষ মারা গেছে। বাদী মামলা করে আবার এসেছে জামিন করাতে। বাদীও মামলার আসামি হবে।”
দুইপক্ষের শুনানি নিয়ে বিচারক বলেন, “আসামি শুধু বয়স্ক, এজন্য বা আপসঅযোগ্য ধারার মামলায় আপসনামা দিয়েছে। কিন্তু ভিকটিম একজন অতি অল্প বয়স্ক মেয়ে মানুষ। তিনি বিভিন্ন চিঠিতে নোট লিখে গিয়েছেন। আসামির হেফাজতে থাকাবস্থায় ভিকটিম আত্মহত্যা করেছেন। আসামি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসবাসরত অবস্থায় ভিকটিমের মৃত্যু হয়েছে।
“আসামি জামিনে গেলে সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে। সমাজে ন্যায়বিচার সম্পর্কে বিরূপ ধারণা হতে পারে। আসামির হাজতবাস বেশি নয়। এ পর্যায়ে তার জামিন নামঞ্জুর করা হল।”
আদালত থেকে বের হওয়ার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মাসুম বিল্লাহ বলেন, “আত্মীয়তার সম্পর্ক রাখতে আপস করা হয়েছে। কোনো চাপাচাপিতে না। ন্যায়বিচার অবশ্যই। তবে ওবায়দুরকে মূল আসামি করা দরকার ছিল।”
গত ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সংসদ ভবনের উল্টো দিকের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর রাতে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে হেফাজতে নেয় পুলিশ।
রাতেই আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ। মামলায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, তার স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম ও মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়।
পরদিন শেরেবাংলা নগর থানার এসআই মো. শামসুজ্জোহা সরকারের আবেদনে গাজী নজরুল ইসলামকে চার দিন ও মাকছুদা ইসলামের একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। সেদিন রাতেই মামলার তদন্তভার গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
নজরুল ইসলামের সঙ্গে প্রথম দফায় মাকছুদা ইসলামের ২১ সেপ্টেম্বর এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়। রিমান্ড শেষে পরদিন তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। আর দুই দফায় আট দিনের রিমান্ড শেষে ২৮ সেপ্টেম্বর নজরুল ইসলামকে কারাগারে পাঠানো হয়।
৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহর আদালতে নজরুল ইসলাম ও মাকছুদা ইসলামের জামিন চেয়ে আবেদন করেন তাদের আইনজীবী মাহাবুবুর রহমান। মরিয়মের বাবার সাথে আসামিদের আপোসের কথা জানান তিনি। তারা জামিন পেলে বাদীপক্ষের আপত্তি নেই বলেও জানানো হয়।
পরে আদালত মাকছুদা ইসলামকে জামিন দেন। তবে নজরুল ইসলামের জামিন নামঞ্জুর করেন।
গ্রেপ্তারের পর ২৩ সেপ্টেম্বর ওবায়দুর রহমানকে কারাগারে পাঠানো হয়। ২৮ সেপ্টেম্বর তার পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করা হয়। ১ অক্টোবর তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়। রিমান্ড শেষে সোমবার তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
ওইদিন তার আইনজীবী গোলাম সাবের চৌধুরী জামিন চেয়ে আবেদন করেছিলেন। তবে বুধবার শুনানিতে আসেননি এই আইনজীবী।
[ad_2]
Source link