[ad_1]
‘জেন্ট্রিফিকেশন’—যাকে বাংলায় সহজ কথায় ‘অভিজাতকরণ’ বা ‘ভদ্রলোকীকরণ’ বলা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার শ্রমিকশ্রেণিকে বিতাড়ন ও আর্থিক নিপীড়নের ক্ষেত্রে জেন্ট্রিফিকেশন একটি উল্লেখযোগ্য হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। তাই এটি বললে অত্যুক্তি হবে না যে, স্বল্প আয়ের ফুটপাতের ‘ব্যবসায়ীদের’ জন্য বিকল্প ও টেকসই রোজগারের ব্যবস্থা না করে ‘হকার উচ্ছেদ’ বা ‘রিকশা উচ্ছেদের’ নামে সরকারের নানা সময়ে ঢাকাকে বাঁচানোর অভিযানগুলো মূলত শ্রমিকশ্রেণি উচ্ছেদ করে ঢাকাকে ‘ভদ্রলোকীকরণ’ করার প্রচেষ্টামাত্র।
ধারণা করা যায়, ৩০ সেপ্টেম্বর মিরপুরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযান চালানোর সময় যে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়, সেটি মূলত এই অপরিকল্পিত ও টেকসই বিকল্প ব্যবস্থা না থাকার কারণে হয়েছে।
এই ‘ভদ্রলোকীকরণ’ ধারণাটি প্রাথমিকভাবে সমাজবিজ্ঞানে বহুল ব্যবহৃত একটি পরিভাষা। ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী রুথ গ্লাস ১৯৬০-এর দশকের প্রথমার্ধে প্রথম এই পরিভাষাটি ব্যবহার করেন। নির্দিষ্টভাবে বললে, ১৯৬৪ সালে ইউসিএল-এর ‘সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজ’ কর্তৃক প্রকাশিত ‘লন্ডন: অ্যাস্পেক্টস অফ চেঞ্জ’ গ্রন্থে রুথ গ্লাস সর্বপ্রথম ‘জেন্ট্রিফিকেশন’ ধারণাটি প্রবর্তন করেন। দ্রুতই এই ধারণা অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে শুরু হয়। এই ধারণা এখন হিউম্যান জিওগ্রাফি ও আরবান স্টাডিজে বহুল পরিচিত। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, মানুষের শ্রেণিগত জনসংখ্যার পরিবর্তন, অর্থাৎ যে প্রক্রিয়ায় মধ্যবিত্তশ্রেণি নিম্ন-আয়ের শ্রমিকশ্রেণিকে তাদের সহজাত আবাসান ও কর্মসংস্থান থেকে উৎখাত করে, সেটাই মূলত জেন্ট্রিফিকেশন। ১৯৬০ বা ৭০-এর দশকে ‘বেবি বুমারস’ প্রজন্মের হাতে যখন কাঁচা টাকা আসে, তখন তারা বাড়ি কেনা শুরু করে। তার ফলশ্রুতিতে তখন লন্ডন শহরে এই পরিবর্তন শুরু হয়। এই বেবি বুমারস প্রজন্ম মূলত এই প্রক্রিয়াকে নেতৃত্ব দেয়। ওই সময়ে লন্ডনের বহু শ্রমিকশ্রেণি-অধ্যুষিত এলাকা উচ্চ ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি দ্বারা দখল হয়ে যায়।
এটি শুধু লন্ডনের চিত্র নয়, ইউরোপের অন্যান্য বড় শহরগুলো, যেমন: প্যারিস, প্রাগ ও বার্সেলোনায় এটি ব্যাপকভাবে ঘটেছে। বর্তমানে আমি যে শহরে আছি, অর্থাৎ বার্লিনেও এই ভদ্রলোকীকরণ ব্যাপক মাত্রায় পৌঁছেছে। প্রাথমিকভাবে এই ভদ্রলোকীকরণ ধারণাটি পশ্চিমা দেশগুলোতে, বিশেষ করে ইউরোপে প্রচলিত ছিল। ধীরে ধীরে এই ধারণা সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে আমেরিকা মহাদেশে, বিশেষভাবে বললে যুক্তরাষ্ট্রে এই ধারণা ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোতে এই ভদ্রলোকীকরণের প্রবণতা ধরতে বহু গবেষণা হয়েছে। সম্প্রতি উল্লেখযোগ্য একটি গবেষণা হয় মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের নেতৃত্বে। এই গবেষকদল ১৯৭০ থেকে ২০২০—এই পঞ্চাশ বছরে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে জেন্ট্রিফিকেশনের প্রবণতা বোঝার জন্য এই বিশাল গবেষণা পরিচালনা করেন। এই গবেষণা শেষে গবেষকরা কয়েকটি সিদ্ধান্তে উপনীত হন। প্রথমত, এই গবেষকদল দেখতে পান যে, ওই পঞ্চাশ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোর প্রায় ১৫ শতাংশ এলাকায় অভিজাতকরণের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। দ্বিতীয়ত, এই গবেষকরা ৪০ বছরের জেন্ট্রিফিকেশনের শহর ও এলাকার একটি তালিকা করেন। সেখানে তারা দেখান যে, ১৯৭০-এর দশক থেকে ২০১০-এর দশক পর্যন্ত মোটামুটি ১,৫৬১টি এলাকায় জেন্ট্রিফিকেশনের ঘটনা পরিলক্ষিত হয়েছে। ১৯৭০ সালে জেন্ট্রিফাইড মহল্লার সংখ্যা যেখানে ছিল ২৪৬টি, ২০১০-এর দশকে সেটি বেড়ে ১,৮০৭টিতে দাঁড়ায়। এই শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জেন্ট্রিফিকেশনের শিকার হওয়া প্রথম তিনটি শহর হলো: ন্যাশভিল (টেনেসি) ও ওয়াশিংটন ডিসি। তৃতীয়ত, তারা ১৯৮০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে জেন্ট্রিফিকেশনের শিকার হওয়া কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর এলাকার তালিকা করেন। তারা দেখতে পান যে, ওই ৪০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রায় ৫২৩টি কৃষ্ণাঙ্গ-প্রধান এলাকা এই জেন্ট্রিফিকেশনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৫৫টি এলাকায় সম্পূর্ণ ‘জাতিগত উচ্ছেদ’ ঘটেছে।
এই ভদ্রলোকীকরণের সমস্যা হলো—কোনো এলাকায় এই জেন্ট্রিফিকেশন প্রক্রিয়া শুরু হলে তা দ্রুতগতিতে চলতে থাকে। যতক্ষণ না নির্দিষ্ট ওই শ্রমজীবী বা আদিবাসী সম্প্রদায়কে ‘উচ্ছেদ’ করতে সক্ষম হয়, ততক্ষণ এটি চলতে থাকে। এটি শুধুমাত্র ‘গ্লোবাল নর্থ’-এ নয়, ‘গ্লোবাল সাউথ’-এও এখন এটি একটি জনপ্রিয় ধারণা। চীন, জাপান ও ইন্দোনেশিয়ায় এই ধরনের অনেক গবেষণা হয়েছে। জনসংখ্যার বিচারে বিশ্বের অন্যতম বড় শহর ঢাকা জেন্ট্রিফিকেশন গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু না হলেও এই প্রেক্ষাপটে ঢাকা শহরকেও আনা যায়। তবে, ঢাকার জেন্ট্রিফিকেশন প্রচেষ্টা অনেক পুরোনো হলেও সেটি হয়েছে নীরবেই—আমাদের চেতনার অগোচরে। এ বিষয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত দুটি গবেষণার উল্লেখ করা যেতে পারে। ২০২১ সালের জুন মাসে ‘জার্নাল অব দ্য এশিয়াটিক সোসাইটি’-তে প্রকাশিত ‘আনফোল্ডিং জেন্ট্রিফিকেশন ইন ঢাকা সিটি’ শিরোনামের একটি গবেষণায় গবেষক মিরপুর ও মোহাম্মদপুর অঞ্চলে জেন্ট্রিফিকেশনের প্রবণতা দেখতে পান। গবেষণায় অসাধারণভাবে দেখিয়েছেন ধীরে ধীরে শহরের কেন্দ্রে বসবাসকারী মধ্যবিত্তরা কীভাবে শহরের এই নতুন প্রান্তিক এলাকায় শ্রমিকশ্রেণিকে ‘উৎখাত’ করে সেখানে একধরনের ভদ্রলোকীকরণ করেন। ‘ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ জার্নাল অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি’ (আইআরজেট) গবেষণা জার্নালে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত একটি গবেষণায় আরেকজন গবেষক ঢাকায় জেন্ট্রিফিকেশনের পেছনের বেশ কিছু কারণ উল্লেখ করেন। ‘জেন্ট্রিফিকেশন অ্যান্ড দ্য অ্যাবসেন্স অব ইনক্লুশনারি জোনিং ইন ঢাকা: হু গেটস বিহাইন্ড’ শিরোনামের ওই গবেষণাপত্রে তিনি মূল তিনটি জেন্ট্রিফায়ার বা জেন্ট্রিফিকেশনের কারণ উল্লেখ করেন: ঢাকায় ব্যাপক আবাসিক উন্নয়ন, সরকারের নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনা নীতি এবং সম্পত্তির মূল্য বৃদ্ধি। এখন প্রশ্ন হলো, ঢাকার হকার উচ্ছেদের ক্ষেত্রে এই জেন্ট্রিফিকেশনের সম্পর্ক কী?
ঢাকার জেন্ট্রিফিকেশন নিয়ে করা গবেষণাগুলো খুব বড় দৃষ্টিকোণ থেকে করা, ফলে সেখানে হকার উচ্ছেদের মতো বিষয়গুলোকে বিবেচনায় রাখা হয়নি। অথচ এটি ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেন্ট্রিফায়ার; কারণ জেন্ট্রিফিকেশনের গবেষণায় দেখানো হয় যে, আর্থিক সক্ষমতা হলো জেন্ট্রিফিকেশনের অন্যতম শক্তিশালী প্রভাবক। আর্থিক সক্ষমতার জোরেই মধ্যবিত্তরা শ্রমিকশ্রেণি বা নিম্নবিত্তের মানুষদের উৎখাত করে জেন্ট্রিফিকেশন সম্পন্ন করে। ঢাকার মতো বড় শহরে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে নিম্নমধ্যবিত্তদের একটি বড় অংশ হকারি করে জীবন নির্বাহ করে। ফলে, তাদের এই অপ্রচলিত ব্যবসা পদ্ধতি এই শহরে তাদের টিকে থাকার সম্বল। পুঁজিবাদী শহুরে কাঠামোয় টিকে থাকার একমাত্র মাধ্যম যেহেতু অর্থ, সেখানে তাদের আর্থিকভাবে পঙ্গু করতে পারলে এই শহর থেকে এই শ্রমিকশ্রেণিকে চিরতরে বিতাড়িত করা অত্যন্ত সহজ হয়।
মধ্যবিত্ত এই শ্রেণিকে ততদিন সহ্য করে, যতদিন তাদের ক্রয়ক্ষমতা ফুটপাত থেকে শপিংমল পর্যন্ত না পৌঁছায়। একবার সেই আর্থিক সক্ষমতা হলে তারা আর এই শ্রমিকশ্রেণিকে চায় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সরকারি চাকরি করা মধ্যবিত্ত শ্রেণির আর্থিক উল্লম্ফন। একবার চাকরি পেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ের সেই ‘প্রিয়’ হকার ‘মামাদের’ আর পছন্দ হয় না তাদের। আপাতদৃষ্টিতে জনস্বার্থে মনে হলেও সরকার এই মধ্যবিত্তদের খুশি করতেই মূলত এই ধরনের উচ্ছেদ অভিযান চালায়। সরকার কখনও নতুন নীতি তৈরির মাধ্যমে, আবার কখনও বা সরাসরি উচ্ছেদ অভিযানের মাধ্যমে এটি করে থাকে।
কার্ল মার্ক্স ১৮৬৭ সালে তার ‘দাস ক্যাপিটাল’-এর প্রথম খণ্ডে ‘দ্য প্রসেস অব ক্যাপিটালিস্ট প্রোডাকশন’ অধ্যায়ে প্রায় একই কথা বলেন। সেখানে তিনি মূলত জেন্ট্রিফিকেশনের একটি অনন্য সংজ্ঞা প্রদান করেন। কার্ল মার্ক্স উল্লেখ করেন, “সম্পদ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শহরগুলো উন্নত হতে শুরু করে। যেমন- অনুন্নত এলাকাগুলো ভেঙে ফেলা হয়, ব্যাংক, গুদাম ইত্যাদির জন্য প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়, বাণিজ্যিক যান চলাচল ও বিলাসবহুল গাড়ির জন্য রাস্তা প্রশস্ত করা এবং ট্রামওয়ে চালু করা হয়; যা দরিদ্রদের আরও খারাপ ও জনাকীর্ণ গোপন স্থানে তাড়িয়ে দেয়।” একটু গভীরভাবে আপনার চারপাশ পর্যবেক্ষণ করলে কার্ল মার্ক্সের এই বক্তব্যের বাস্তবায়ন দেখতে পাবেন। জেন্ট্রিফিকেশন মূলত শুরু হয় মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের মাধ্যমে। আপনার বন্ধুমহল ও পরিচিতদের মধ্যে তারাই এই হকার উচ্ছেদে তুষ্ট, যাদের আর্থিক মাপকাঠি মধ্যবিত্তের বা উচ্চমধ্যবিত্তের ঘরে। এই লেখার উদ্দেশ্য এটি নয় যে ফুটপাতে হকারদের স্থায়ী করা; বরং এই লেখার উপজীব্য হলো—যে শ্রমিকশ্রেণিকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে, তাদের প্রকৃত পুনর্বাসন করে একটি টেকসই ও সাম্যাবস্থা তৈরি করা, যার ফলে এই শহর যেন সবার শহর হয়ে ওঠে। শ্রমিকরা একটি শহরের প্রাণ, তাদের ঘামে গড়ে ওঠে শহুরে সভ্যতা।
এম. টি. ইসলাম: শিক্ষক ও গবেষক। ই-মেইল: toriqul38@gmail.com
[ad_2]
Source link