প্রিন্ট এর তারিখঃ অক্টোবর ১, ২০২৬, ১২:৫৬ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ অক্টোবর ১, ২০২৬, ৫:৩১ পূর্বাহ্ন
চিকিৎসা পেশায় স্বচ্ছতার সময় কি আসেনি?
[ad_1]
চিকিৎসা পেশায় স্বচ্ছতার সময় কি আসেনি?
ডা. বিএম আতিকুজ্জামান
একজন রোগী যখন চিকিৎসকের কাছে যান, তিনি শুধু একটি প্রেসক্রিপশন চান না—তিনি চিকিৎসকের বিচারবুদ্ধির ওপর আস্থা রাখেন। চিকিৎসক যখন বলেন, ‘এই পরীক্ষাটি করুন’, ‘এই হাসপাতালে যান’ বা ‘এই ওষুধটি নিন’, রোগী সাধারণত বিশ্বাস করেন, সিদ্ধান্তটি তাঁর চিকিৎসার প্রয়োজনেই নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু যদি সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে চিকিৎসকের ব্যক্তিগত আর্থিক লাভ জড়িয়ে যায়, তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়—চিকিৎসকের সিদ্ধান্তটি কি পুরোপুরি রোগীর স্বার্থে, নাকি সেখানে অন্য কোনো স্বার্থও কাজ করছে? চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটিই ‘স্বার্থের সংঘাত’।
বাংলাদেশে কি এ বিষয়ে কোনো নিয়ম নেই? আছে। তাই আমাদের আলোচনার শুরুটা সঠিক তথ্য দিয়ে হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অধিকাংশ চিকিৎসক প্রতিদিন বিপুল চাপের মধ্যে রোগীর সেবা দেন। তাঁদের সম্মান রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় সম্ভবত ভুল ঢেকে রাখা নয়; বরং এমন একটি স্বচ্ছ পেশাগত ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে ভালো চিকিৎসকের সততা নিজেই দৃশ্যমান হয়। জনআস্থা দাবি করে পাওয়া যায় না—স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার এবং পেশাগত আচরণের মাধ্যমে তা অর্জন করতে হয়।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) পেশাগত আচরণ, শিষ্টাচার ও নৈতিকতার বিধিমালা নিবন্ধিত চিকিৎসকদের জন্য পেশাগত আচরণের মানদণ্ড নির্ধারণ করে। এই বিধিমালা লঙ্ঘন করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থারও সুযোগ রয়েছে।
ওষুধ কোম্পানির বিপণন নিয়েও বাংলাদেশে নিয়ম আছে। জাতীয় ওষুধনীতি ২০১৬-তে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদিত ওষুধ বিপণন-সংক্রান্ত আচরণবিধি অনুসরণ করতে হবে এবং ওষুধের অনৈতিক বিপণন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
অতএব সমস্যাটিকে ‘বাংলাদেশে কোনো নিয়ম নেই’ বলে দেখলে বিষয়টি অতিরঞ্জিত হবে। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—বিদ্যমান নিয়ম কতটা স্পষ্ট, কতটা আধুনিক, কতটা দৃশ্যমান এবং কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে?
রেফারেলের জন্য কমিশন কেন সমস্যার?
ধরা যাক, একজন রোগীর সিটি স্ক্যান প্রয়োজন। শহরে পাঁচটি ভালো রোগনির্ণয়কেন্দ্র আছে। চিকিৎসক যদি মান, দক্ষতা, খরচ বা রোগীর সুবিধা বিবেচনা করে একটি প্রতিষ্ঠান বেছে দেন—এটি স্বাভাবিক চিকিৎসা সিদ্ধান্ত।
কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠান যদি রোগী পাঠানোর বিনিময়ে চিকিৎসককে অর্থ দেয়, তাহলে পরিস্থিতি বদলে যায়।
বাংলাদেশে রেফারেল কমিশন নিয়ে বহু বছর ধরে সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ ও অনুসন্ধান প্রকাশিত হয়েছে। ২০২২ সালের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় হাসপাতাল ও রোগনির্ণয়কেন্দ্রে রোগী পাঠানোর বিনিময়ে কমিশন দেওয়ার অভিযোগ উঠে আসে। এটিকে পুরো দেশের প্রতিটি চিকিৎসকের আচরণের প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়; তবে সমস্যাটি যে নীতিগতভাবে গুরুত্বের দাবি রাখে, তার একটি উদাহরণ এটি।
এই জায়গায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সব চিকিৎসককে সন্দেহ করা নয়; বরং এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে সৎ চিকিৎসককে সন্দেহ করার কারণই কমে যায়।
ওষুধ কোম্পানি কি চিকিৎসকদের সঙ্গে কাজ করবে না?
অবশ্যই করবে।
ওষুধশিল্প নতুন ওষুধ তৈরি করে, চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণা করে এবং চিকিৎসকদের কাছে নতুন বৈজ্ঞানিক তথ্য পৌঁছে দিতে ভূমিকা রাখে। চিকিৎসকদেরও নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে নিয়মিত জানতে হয়।
সমস্যা সহযোগিতায় নয়; সমস্যা হলো অস্বচ্ছ প্রভাবে।
বাংলাদেশে ওষুধের প্রচার ও বিপণন নিয়ে ২০১৫ সালের একটি গবেষণায় আগ্রাসী প্রচারপদ্ধতি এবং চিকিৎসক-ওষুধ কোম্পানির সম্পর্ক নিয়ে নৈতিক উদ্বেগের কথা উঠে এসেছিল। গবেষণাটি পুরোনো এবং গুণগত প্রকৃতির—তাই এর ভিত্তিতে বর্তমান পুরো ওষুধশিল্প সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু স্বচ্ছতা কেন গুরুত্বপূর্ণ, সেটি বোঝাতে গবেষণাটি এখনো প্রাসঙ্গিক।
সুতরাং বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে পৃষ্ঠপোষকতা, গবেষণায় সহায়তা বা বৈধ শিক্ষামূলক সহযোগিতা বন্ধ করার পরিবর্তে সেগুলোকে স্বচ্ছ করা বেশি কার্যকর হতে পারে।
স্বচ্ছতা মানেই নিষেধাজ্ঞা নয়
ধরা যাক, একটি ওষুধ কোম্পানি একজন চিকিৎসকের বৈধ গবেষণা প্রকল্পে অর্থ দিয়েছে। অথবা তাঁকে একটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য সম্মানী দিয়েছে।
এটি নিজে থেকেই অনৈতিক নয়।
কিন্তু রোগী ও প্রতিষ্ঠান যেন জানতে পারে—চিকিৎসকের কোনো প্রাসঙ্গিক আর্থিক সম্পর্ক আছে কি না।
একটি সহজ নীতি হতে পারে—
‘সম্পর্ক থাকতে পারে, কিন্তু গোপন সম্পর্ক নয়।’
এতে ওষুধশিল্পও সম্মানের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা করতে পারবে এবং চিকিৎসকের স্বাধীন চিকিৎসাগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও সুরক্ষিত থাকবে।
একই সঙ্গে চিকিৎসকের নিরাপত্তাও জরুরি
নৈতিকতা ও জবাবদিহির আলোচনা যেন চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত না হয়।
২০২৬ সালেও বাংলাদেশে চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনা নিয়ে চিকিৎসকেরা নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবি জানিয়েছেন। ২২ আগস্ট চট্টগ্রামে চিকিৎসকেরা সাম্প্রতিক হামলার প্রতিবাদে নিরাপত্তা ও কার্যকর জাতীয় নীতির দাবি জানান।
২০২৫ সালে স্বাস্থ্যকর্মী ও রোগী—উভয় পক্ষের সুরক্ষার জন্য পৃথক অধ্যাদেশের খসড়া নিয়েও আলোচনা হয়েছিল।
এখানেও ভারসাম্য প্রয়োজন।
রোগীর অভিযোগ করার অধিকার থাকবে। চিকিৎসকেরও নিরাপদে কাজ করার অধিকার থাকবে।
কোনো অভিযোগ উঠলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচার, জনতার বিচার বা শারীরিক আক্রমণ নয়—প্রয়োজন দ্রুত, স্বাধীন ও বিশেষজ্ঞভিত্তিক তদন্ত।
একটি নতুন পেশাগত অঙ্গীকার দরকার
বাংলাদেশের চিকিৎসকদের সামনে তাই একটি সুযোগ আছে।
আমরা সমাজকে বলতে পারি—
আমরা রোগী পাঠানোর বিনিময়ে গোপন কমিশন নেব না।
আমরা ওষুধ নির্বাচন করব বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী।
আমাদের কোনো প্রাসঙ্গিক আর্থিক সম্পর্ক থাকলে তা প্রকাশ করব।
আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলে নিরপেক্ষ তদন্ত মেনে নেব।
বিনিময়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছেও চিকিৎসকদের যৌক্তিক প্রত্যাশা থাকবে—
চিকিৎসককে নিরাপদ কর্মস্থল দিতে হবে।
অভিযোগের তদন্ত হতে হবে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে।
প্রমাণের আগে কাউকে অপরাধী বানানো যাবে না।
এবং পেশাগত সিদ্ধান্তকে অযাচিত রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক বা অন্য কোনো চাপ থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে।
এই দুই পক্ষের পারস্পরিক প্রতিশ্রুতিই হতে পারে একটি নতুন পেশাগত অঙ্গীকার।
সাতটি বাস্তব সংস্কার প্রস্তাব
১. বিএমডিসি, চিকিৎসক সমাজ, রোগী প্রতিনিধি, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং ওষুধশিল্পের অংশগ্রহণে একটি আধুনিক জাতীয় স্বার্থের সংঘাত নীতিমালা তৈরি করা।
২. রোগী পাঠানোর বিনিময়ে ব্যক্তিগত রেফারেল কমিশন বা গোপন আর্থিক সুবিধা নেওয়া নিষিদ্ধ করার বিষয়টি আরও স্পষ্ট, দৃশ্যমান ও প্রয়োগযোগ্য কাঠামোয় আনা।
৩. ওষুধ কোম্পানি থেকে চিকিৎসক বা চিকিৎসা-প্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য পৃষ্ঠপোষকতা, পরামর্শক সম্মানী ও শিক্ষামূলক অর্থায়নের ক্ষেত্রে একটি মানসম্মত আর্থিক সম্পর্ক প্রকাশব্যবস্থা চালু করা।
৪. শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে চিকিৎসাবিষয়ক শিক্ষা কার্যক্রম চলতে পারে, তবে বৈজ্ঞানিক বিষয়বস্তু ও বক্তা নির্বাচনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার নীতি থাকতে হবে।
৫. রোগীর অভিযোগ গ্রহণের জন্য সহজ ব্যবস্থা এবং গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনা, নির্দিষ্ট সময়সীমা ও আপিলের সুযোগ রাখা।
৬. হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর নিরাপত্তার জন্য বাস্তবসম্মত সহিংসতা প্রতিরোধ নীতি চালু করা।
৭. রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে চিকিৎসকদের জন্য একটি শক্তিশালী জাতীয় পেশাগত প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা—যার প্রধান লক্ষ্য হবে নৈতিকতা, চিকিৎসাশিক্ষা, রোগীর নিরাপত্তা, চিকিৎসকের নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করা।
চিকিৎসা পেশার মর্যাদা শুধু আইন দিয়ে তৈরি হয় না। আবার শুধু চিকিৎসকদের ভালো মানুষ হওয়ার আহ্বান জানিয়েও সমস্যার সমাধান হবে না।
প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে সৎ থাকা সহজ, অসৎ হওয়া কঠিন এবং সব পক্ষের জন্য নিয়ম পরিষ্কার।
বাংলাদেশের অধিকাংশ চিকিৎসক প্রতিদিন বিপুল চাপের মধ্যে রোগীর সেবা দেন। তাঁদের সম্মান রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় সম্ভবত ভুল ঢেকে রাখা নয়; বরং এমন একটি স্বচ্ছ পেশাগত ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে ভালো চিকিৎসকের সততা নিজেই দৃশ্যমান হয়। জনআস্থা দাবি করে পাওয়া যায় না—স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার এবং পেশাগত আচরণের মাধ্যমে তা অর্জন করতে হয়।
লেখক: কনসালট্যান্ট গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট, অরল্যান্ডো হেলথ, ফ্লোরিডা শিক্ষক, গবেষক, লেখক ও স্বাস্থ্যসেবা প্রশাসক।
এইচআর/এএসএম
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।
“ঘুমানোর সময় কোথায়?”—ব্যস্ত মানুষদের মুখে কথাটি প্রায়ই শোনা যায়। কেউ রাত জেগে কাজ করেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটান, কেউ আবার চার-পাঁচ ঘণ্টা...