[ad_1]
অর্থায়নের অনিশ্চয়তা এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে দূরত্ব বাংলাদেশের ফ্যাক্টচেকারদের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে বলে উঠে এসেছে ফ্যাক্টফেস্ট ২০২৬-এর সমাপনী গোলটেবিল আলোচনায়।
গত ২৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বর দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনের সমাপনী আলোচনায় ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক, অর্থায়নের সংকট এবং এই খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন সংশ্লিষ্টরা।
সুইডিশ ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন এজেন্সির (সিডা) সহায়তায় ‘মিডিয়া সেফটি ইন দ্য ডিজিটাল এজ’ প্রকল্পের আওতায় ফোয়ো মিডিয়া ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় সম্মেলনটির আয়োজন করে ডিজিটালি রাইট।
ডিজিটালি রাইটের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সম্মেলনে ফ্যাক্টচেকার, সাংবাদিক, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষার্থীসহ প্রায় ১০০ জন অংশ নেন। রাজনৈতিক অপতথ্য, ধর্মীয় উগ্রবাদ, জেন্ডারভিত্তিক অপতথ্য, তথ্যযুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অনুসন্ধান, জনআস্থা ও ফ্যাক্টচেকিংয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে ১৩টি সেশনে আলোচনা হয়।
সমাপনী গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা ফ্যাক্টচেকারদের বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন। তাদের মতে, পক্ষপাতের কোনো ধারণা যাতে তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হয়। এ কারণে প্রচলিত বিজ্ঞাপন বা গণমাধ্যমের সঙ্গে অংশীদারত্বের পথ ফ্যাক্টচেকারদের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ফ্যাক্টওয়াচের সহকারী সম্পাদক শুভাশীষ দাস রায় দীপ বলেন, সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমলেও বাংলাদেশে তা বেড়েছে।
তার মতে, অর্থায়ন কমে যাওয়ার চাপ সামলে নিতে গবেষণা, সংবাদমাধ্যম ও মিডিয়া লিটারেসি বিষয়ক প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন সেবার মাধ্যমে আয়ের উৎস বহুমুখী করা যেতে পারে।
রিউমর স্ক্যানারের সহপ্রতিষ্ঠাতা মো. ছাকিউজ্জামান বলেন, আর্থিক চাপের প্রভাব ইতোমধ্যে তাদের প্রতিষ্ঠানে পড়েছে।
তিনি বলেন, “আর্থিক কারণে কিছু কর্মীকে লে-অফ করতে হয়েছে আমাদের। কয়েক বছর ধরে গড়ে তোলা ফ্যাক্টচেকারদের ছেড়ে দিতে হয়েছে।”
ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বেসরকারি খাতের সহায়তা, মিডিয়া লিটারেসি প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও অন্যান্য সেবাসহ বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থায়নের কথা বিবেচনা করার আহ্বান জানান।
ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান ও মূলধারার সংবাদমাধ্যম কীভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারে, সেটিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
আলোচনায় বলা হয়, কিছু সংবাদমাধ্যম ফ্যাক্টচেকিংকে তাদের নিয়মিত কাজের অংশ করে নিচ্ছে। আবার কিছু সংবাদমাধ্যম নিজেদের তথ্য যাচাইয়ের বিষয়ে ফ্যাক্টচেকারদের কাছে যেতে আগ্রহী নয়।
দ্য ডেইলি স্টারের ডিজিটাল গ্রোথ এডিটর আজাদ বেগ বলেন, যেসব সংবাদমাধ্যম ফ্যাক্টচেকিংয়ের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছে, তারা নিজেদের দলে ফ্যাক্টচেকার যুক্ত করছে এবং প্রকাশের আগে প্রতিবেদন পর্যালোচনা করিয়ে নিচ্ছে।
দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো ভুল এড়াতে ক্রমেই ফ্যাক্টচেকারদের পরামর্শ নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের (এমআরডিআই) আদনান আজিজ ফ্যাক্টচেকারদের ‘সংবাদমাধ্যমের বন্ধু’ হওয়ার এবং বৈরী পরিবেশ তৈরি না করে ভুল চিহ্নিত করার আহ্বান জানান।
রিউমর স্ক্যানারের মো. ছাকিউজ্জামান বলেন, তারা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করলেও সেই চেষ্টা ফলপ্রসূ হয়নি।
ঢাকা স্ট্রিমের সালেহ ফুয়াদ বলেন, ফ্যাক্টচেকিং নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর সচেতনতা বাড়ছে। তবে তার মতে, যাচাই হতে হবে দুই দিকেই। অর্থাৎ ফ্যাক্টচেকারদের নিজেদের কাজও পরীক্ষার জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত।
সমাপনী গোলটেবিল আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়েও উদ্বেগ জানান।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে মানহানি, ‘হেয় করা’ ও ‘বুলিং’কে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা এবং এসবের জন্য জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে।
অংশগ্রহণকারীরা সতর্ক করে বলেন, এই আইনের আওতায় ফ্যাক্টচেককে মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। ক্ষতিকর অপতথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো এবং জনস্বার্থে তা নিয়ে প্রতিবেদন করার মধ্যে আইনটি যদি পার্থক্য না করে, তাহলে স্বাধীন ফ্যাক্টচেকাররাও এর লক্ষ্য হতে পারেন।
সম্মেলনের আলোচনায় ফ্যাক্টচেকিংয়ের পরিধি নিয়েও আলোচনা হয়।
মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের ফ্যাক্টচেকিং কমিউনিটিকে শক্তিশালী করা এবং বিদ্যমান ও উদীয়মান চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনার একটি মঞ্চ তৈরি করতেই ফ্যাক্টফেস্টের আয়োজন করা হয়েছে।
উদ্বোধনী বক্তব্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডিশ রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সময়ে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
বিশ্বাসযোগ্য তথ্য মানুষের নাগালে রাখতে সাংবাদিক, সুশীল সমাজ ও ফ্যাক্টচেকারদের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি তথ্যব্যবস্থার মধ্যে জোট ও নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।
দুই দিনের আলোচনায় উঠে আসে, আলাদা আলাদা ভুয়া দাবি খণ্ডন করাই এখন আর যথেষ্ট নয়। পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে এক সেশনে ফ্যাক্টচেকাররা বিকৃত কনটেন্ট, ভুয়া অ্যাকাউন্ট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি উপাদান, ডক্সিং ও লক্ষ্যভিত্তিক হয়রানিসহ বিভিন্ন কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন।
তারা বলেন, গবেষকদের এমন বৃহত্তর বয়ান ও কৌশল শনাক্ত করতে হবে, যেগুলো আলাদা আলাদা দাবিকে একসূত্রে গেঁথে রাখে।
ধর্মীয় উগ্রবাদ বিষয়ক সেশনে উগ্রবাদী প্রতীক এবং ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে ঘিরে তৈরি প্রচারণা নিয়ে আলোচনা হয়। এসব নেটওয়ার্ক কীভাবে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উসকে দিতে এবং ব্যক্তিকে নিশানা করতে পারে, সেই বিষয়টিও উঠে আসে।
জেন্ডারভিত্তিক অপতথ্য বিষয়ক সেশনে বক্তারা বলেন, জনপরিসর ও রাজনীতিতে সক্রিয় নারীরা প্রায়ই যৌনতাপূর্ণ বয়ান, নারীবিদ্বেষী স্টেরিওটাইপ ও বিকৃত ছবির মাধ্যমে আক্রমণের শিকার হন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি ভিজ্যুয়ালের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে জনপরিসরে নারীদের অংশগ্রহণের ওপর এর প্রভাব নিয়েও সতর্ক করেন তারা।
আলোচকরা বলেন, রিভার্স ইমেজ সার্চ ও এআই শনাক্তকরণ ব্যবস্থার মতো টুল সাধারণ মানুষের কাছেও ক্রমশ সহজলভ্য হচ্ছে। ফলে ফ্যাক্টচেকারদের আরও গভীর অনুসন্ধানী কাজে যুক্ত হতে হবে। এর মধ্যে ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স এবং সরেজমিনে যাচাইও রয়েছে।
‘ইঞ্জিনিয়ারিং রিয়ালিটি: ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার অ্যান্ড দ্য ফ্র্যাজিলিটি অব ট্রাস্ট ইন ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশনস’ শীর্ষক সেশনে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ড. গ্রেগরি জন সাইমন্স আলোচনা করেন, কীভাবে তথ্য শুধু দর্শকদের জানানোর জন্য নয়, তাদের প্রভাবিত করতেও ব্যবহার করা হয়।
‘মেকিং ট্রুথ ট্রাভেল’ শীর্ষক মূল বক্তব্য দেন ফোয়ো মিডিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক পল রাপাচিওলি।
তিনি বলেন, ফ্যাক্টচেকিং শুধু কোনটি সত্য তা নির্ধারণের বিষয় নয়। যাচাই করা তথ্য এমনভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে, যাতে তা তাদের মনোযোগ ধরে রাখে এবং আস্থা অর্জন করে।
তার মতে, বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট কেন দর্শকদের আকৃষ্ট করে, তা ফ্যাক্টচেকারদের বুঝতে হবে এবং প্রমাণ ও অনুসন্ধানের ফল তুলে ধরার ক্ষেত্রে আরও সৃজনশীল উপায় খুঁজে বের করতে হবে।
রাপাচিওলি বলেন, “সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সত্যকে পৌঁছাতে হবে। আর সত্য যখন পৌঁছায়, তখন তাকে বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে।”
সম্মেলনে ফ্যাক্টচেকিংয়ে ক্যারিয়ার গড়া, এআই-নির্মিত ও ডিপফেক কনটেন্ট শনাক্ত করা এবং ডেটা ব্যবহার করে অপতথ্য অনুসন্ধানের ওপর ব্যবহারিক কর্মশালা হয়।
সমাপনী গোলটেবিলে সাংবাদিক ও ফ্যাক্টচেকারদের সম্ভাব্য সহযোগিতা এবং ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিন্ন ভিন্ন কর্মনীতি নিয়েও আলোচনা হয়।
[ad_2]
Source link