প্রিন্ট এর তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬, ৯:২৯ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬, ২:১৪ অপরাহ্ন
এই যাত্রায় বিএনপি ব্যর্থ হলে যা হবে…
[ad_1]
এই যাত্রায় বিএনপি ব্যর্থ হলে যা হবে…
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতন হয়েছিল যেসব কারণে, তার অন্যতম হচ্ছে সরকারকে দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা এবং দলীয় নেতাকর্মীদের যেকোনো উপায়ে টাকা কামানোর বৈধতা দেওয়া।
অভ্যুত্থানের পরে স্বভাবতই দেশের মানুষের মনে এই প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল যে, এবার অন্তত রাষ্ট্রটি জনগণের হবে। পরিবারতন্ত্রের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে সরকারি দল অন্তত কোথাও নির্লজ্জ দলীয়করণ করবে না; দলীয় নেতাকর্মীদের বেপরোয়া হতে দেবে না; টাকা কামানোর জন্য যা খুশি তাই করার লাইসেন্স দেবে না। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল বা ভিন্নমতের মানুষের প্রতিষ্ঠান দখল করার সুযোগ দেবে না।
শতভাগ গণতান্ত্রিক ও সহনশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি রাতারাতি তৈরি না হলেও অন্তত পরিবর্তনের সূচনা যে হবে—এই বিশ্বাস কোটি কোটি মানুষের মনে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তারা প্রথম চোটেই ধাক্কা খেয়েছে ড. ইউনূসের দেড় বছরের বিশৃঙ্খল শাসনে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্ভবত আরও একশো বছর এই দেড় বছরের সময়কালকে ‘মবের শাসনকাল’ বলে মানুষ মনে রাখবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে, দেশকে একটি ইতিবাচক ধারায় নিয়ে যাওয়ার কী অপার সম্ভাবনা ও সুযোগ এই সরকার মিস করেছে।
এরপর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি যখন দুই তৃতীয়াংশ ভোটারের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এলো, মানুষ আবারও নতুন করে আশায় বুক বাঁধলো যে, নিশ্চয়ই তারেক রহমানের সরকার সত্যিকারের গণতান্ত্রিক, সহনশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মানবিক বাংলাদেশ গড়ায় নেতৃত্ব দেবেন। মানুষের মনে এই প্রত্যাশা তৈরির আরেকটি কারণ, প্রায় দেড় যুগ লন্ডনে বসে তিনি যেভাবে দল পরিচালনা করেছেন; দলের ভার্চুয়াল মিটিংয়ে যেভাবে গণতন্ত্র, মানবিকতা ও পরমতসহিষ্ণুতার কথা বলেছেন; প্রতিশোধ নয় বরং সবাইকে নিয়ে চলার যে প্রত্যয় তিনি প্রকাশ করেছেন; রাজনৈতিক ভিন্নমতের প্রতি তিনি এবং তার সরকার সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাশীল থাকবে বলে যে ঘোষণা দিয়েছেন—তাতে মানুষের মনে এই বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল যে, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে তারেক রহমান নিশ্চয়ই তার বাবার পথেই হাঁটবেন। এরপর তিনি যখন দেশে ফিরলেন এবং সত্যিই বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেন—তখন মার্জিত বক্তব্য, শালীনতা আর সাদাসিধে জীবনযাপন দিয়ে তিনি মানুষকে আরও বেশি আকৃষ্ট করলেন। তার প্রতি মানুষের প্রত্যাশা আরও বাড়লো। কিন্তু তারপর কী হলো?
সরকার গঠনের পরে গত সাত মাসে দল হিসেবে বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠন এবং বিএনপি সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা বেড়েছে না কমেছে? ভোটের আগে এবং ভোটের পরে তাদের ওপর জনমানুষের বিপুল প্রত্যাশার চাপ ছিল, তার কতটুকু পূরণ করতে পেরেছে?
জুলাই অভ্যুত্থানের পরে কয়েকটি শব্দ জনপরিসরে বেশ উচ্চারি হতো। যেমন সংস্কার, নতুন বাংলাদেশ, নতুন বন্দোবস্ত ইত্যাদি। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, যে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংস্কার শব্দটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছিল, তাদের দেড় বছরে কিছু সংস্কার কমিশন গঠন এবং অসংখ্য প্রতিষ্ঠান, রাস্তা, সেতু ও স্থাপনার নাম পরিবর্তন ছাড়া আর কোথায় কী সংস্কার হয়েছে—তা দেশবাসী জানে না। আবার সংস্কার কমিশনগুলো যেসব প্রতিবেদন দিয়েছে, সেগুলো আমলে নিয়ে বাস্তবায়ন শুরু করার দায়িত্ব নির্বাচিত বিএনপি সরকারের ওপর বর্তালেও তারা এসব প্রতিবেদন কতটা আমলে নিচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।
অনির্বাচিত বা বন্দুকের নলের মুখে ক্ষমতা দখলকারী সেনা শাসকদের জনগণের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। কারণ তারা নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে ভোটের জন্য জনগণের কাছে যায় না বা যেতে হয় না। কিন্তু রাজনৈতিক সরকার যেহেতু নির্বাচিত হয় জনগণের ভোটে, ফলে জনগণের কাছে তাদের দায়বদ্ধ থাকতে হয়। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করতে হয়। জনগণের পালস বুঝে এগোতে হয়। কিন্তু গত সাত মাসে তারেক রহমানের সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ঠিক কী কাজ করেছে বা কতটা করতে পেরেছে—সেই প্রশ্নের খুব সন্তোষজনক জবাব আছে বলে মনে হয় না।
সাত মাস সময় হয়তো খুব বেশি নয়। উপরন্তু একটি বিরাট অভ্যুত্থান এবং তারপরে দেড় বছরের বিশৃঙ্খল শাসনের পরে দেশ পরিচালনা করা যেকোনো সরকারের জন্যই কঠিন। সেইসাথে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি, মধ্যপ্রাচ্য সংকট, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও গ্যাস সংকটে জনজীবনে বিপর্যয়, প্রশাসনে নানা মেরুকরণ ও আস্থার সংকটসহ নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিএনপি সরকারকে যাত্রা শুরু করতে হয়েছে। ফলে সাত মাসেই তারা সব সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারবে, সেটিও যৌক্তিক নয় এবং এটি প্রত্যাশা করাও উচিত নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পরিবর্তনের সূচনাটা কি করা গেছে? অন্তত যেসব কারণে সরকার বিতর্কিত হয়, সেই কাজগুলো কি সরকার তথা সরকারি দল এড়াতে পারছে? নিজ দলের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে নাকি অতীতের সরকারগুলোর মতোই এবারও সরকারি দলের নেতাকর্মীরা ভাবছেন, যেভাবেই হোক টাকা কামাতে হবে এবং সেজন্য প্রয়োজনে চাঁদাবাজি, দখল, লুটপাট ও ভাঙচুর চলবে?
গত সাত মাসে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে যেসব ঘটনা ঘটেছে—সেগুলোর পক্ষে সরকার তথা সরকারি দল কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারবে না। বরং কোনো একটি অন্যায়ের সাফাই গাইতে গেলে সেটা হিতে বিপরীত হয়। মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয় না। রাজনীতিবিদদের প্রধান পুঁজিই হলো জনআস্থা ও বিশ্বাস। সেটা শেষ হয়ে গেলে সেই রাজনীতিবিদের আর ‘খাওয়া’ থাকে না।
গত সাত মাসে বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এসেছে, তার মধ্যে রয়েছে চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার, বাস টার্মিনাল, ফুটপাত, বাজার, জলমহাল, বালুমহাল, হাটবাজার, কেব্ল, ইন্টারনেট ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে দখলবাজি ইত্যাদি। এসব নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটেছে গত ২৫ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে রাজধানীর মিরপুরে। সেখানে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা সারা দেশের মানুষকে হতবাক করেছে।
দুর্নীতিবিরোধী সংগঠনটিআইবির একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের একজন সদস্যের পৃষ্ঠপোষকতায় পুলিশের উপস্থিতিতে শত শত মানুষের সামনে অর্ধশত বছর ধরে গরিব–অসহায় মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে ক্ষমতাসীন দল কোন ধরনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে? রক্তক্ষয়ী জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে কর্তৃত্বপরায়ণ চোরতন্ত্রের পতনের প্রেক্ষাপটে ঐতিহাসিক নির্বাচনের জনরায়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত দলের নেতাকর্মীদের এ জাতীয় কর্মকাণ্ড দেশবাসীর কাছে কী বার্তা দিচ্ছে? সাধারণ জনগণের মানসপটে বিগত সময়ের কর্তৃত্ববাদী সরকারের স্বেচ্ছাচারী আচরণ এখনো সতেজ। এ রকম একটি প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা দলীয় নেতা–কর্মীদের উল্লেখযোগ্য অংশের চলমান দখলবাজি ও চাঁদাবাজির পরিণতি ভেবে দেখছেন কি?’
এটা ঠিক যে, অপরাধমুক্ত সমাজ কল্পনা করা গেলেও সেটি বাস্তবসম্মত নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ বা সবচেয়ে কম অপরাধের দেশেও ছোটখাটো অপরাধ হয়। কেননা মানুষ মাত্রই অপরাধপ্রবণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অপরাধের পরে রাষ্ট্র কীভাবে অ্যাক্ট করে। সবচেয়ে বড় অপরাধ যদি হয় খুন ও ধর্ষণ—তাহলে সেই অপরাধের পরপরই রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি অপরাধীকে ধরতে পারে এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য বিচারের মধ্য দিয়ে তার শাস্তি নিশ্চিত ও কার্যকর করতে পারে; যদি সেই বিচারটি দৃশ্যমান হয় এবং মানুষের মনে হয় রাষ্ট্র অপরাধের শাস্তির বিষয়ে যথেষ্ট ভয় উৎপাদন করতে পেরেছে; সেইসাথে রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠার পথগুলো বন্ধ করতে পারে এবং তাদের মধ্যে মানবিক বোধ জাগিয়ে তুলতে পারে—তখনই একটি দেশে বড় বড় অপরাধের সংখ্যা কমে আসতে থাকে। দ্বিতীয়ত, অপরাধের সঙ্গে যদি ক্ষমতাসীন দলের লোকেরাই যুক্ত থাকে, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। তখন অ্যাকশন নিতে হয় আরও দ্রুত এবং আরও কঠোর।
সরকার গঠনের পর থেকে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এসেছে, সে বিষয়ে সরকার তথা সরকারি দলের পদক্ষেপ নিয়ে যথেষ্ট ছিল? কিছু ক্ষেত্রে অভিযুক্তকে দল থেকে বহিষ্কার ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটলেও সব সময় কি সঠিক লোকগুলোকে শাস্তির আওতায় আনা গেছে? আর এসব ব্যবস্থা গ্রহণের পরেও কেন চাঁদাবাজি, লুটপাট ও দখল বন্ধ হচ্ছে না? অপরাধীরা কি সরকার তথা দেশের আইন-কানুন ও বিচারব্যবস্থাকে ভয় পাচ্ছে না? ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় থাকার কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কি তাদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট ব্যবস্থা নিতে পারছে বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও কি দলনিরপেক্ষ ও পক্ষপাতমুক্ত থেকে নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারছে? যদি না পারে সেটি বিএনপি সরকার তথা তারেক রহমানের জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হবে।
মনে রাখতে হবে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী বিশৃঙ্খল বাংলাদেশকে সঠিক পথে নিয়ে যাওয়ার যুদ্ধে বিএনপি যদি হেরে যায়—তাহলে দেশে যে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হবে, সেটি শুধু বিএনপি বা তারেক রহমানকেই নয়, পুরো দেশবাসী এবং রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকেও একটা অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাবে।
সুতরাং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তথা তার সরকারকে এখনই এইসব অপরাধের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং তৃণমূল পর্যন্ত এই বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে যে, দলের লোকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তার শাস্তি হবে দ্বিগুণ। সেইসাথে দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে নানারকম অত্যাচার নির্যাতন ও মামলায় জর্জরিত হয়ে যারা নিঃস্ব হয়েছেন, তাদের সেই ক্ষতিপূরণ চাঁদাবাজি বা দখলবাজির মধ্য দিয়ে নয়, বরং বৈধ কোনো উপায়ে যাতে তাদের স্বাবলম্বী করা যায়—সেই ব্যবস্থা করতে হবে।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক।
এইচআর/জেআইএম
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।
আমাদের চারপাশটা প্রতিদিনই একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে। বদলে যাওয়াই যেন জগতের সবচেয়ে ধ্রুব সত্য। মায়ের মুখে শুনেছি, মাত্র চার দশক আগে আমাদের দেশের অনেক গ্রাম...