[ad_1]
শরতের স্নিগ্ধ বাতাস যখন দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের বুকে বইতে শুরু করে, তখন হান নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলো প্রাণচাঞ্চল্যে মেতে ওঠে। দিনের আলো ফুরিয়ে এলেই সিউলের আকাশ যেন ক্যানভাসে পরিণত হয়, আর সেখানে রঙের তুলি বুলিয়ে দেয় হাজারো আতশবাজি। দক্ষিণ কোরিয়ার জীবনে উৎসব, সংস্কৃতি আর উদযাপনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই আতশবাজি বা ফায়ারওয়ার্কস।
আর এই উদযাপনের সবচেয়ে বড় মঞ্চটির নাম হলো ‘সিউল ইন্টারন্যাশনাল ফায়ারওয়ার্কস ফেস্টিভ্যাল’ বা সিউল আন্তর্জাতিক আতশবাজি উৎসব। প্রতি বছর শরতের এক সন্ধ্যায় সিউলের রাতের আকাশ যে বর্ণিল রূপ ধারণ করে, তা দেখতে শুধু কোরিয়া নয়, সারা বিশ্ব থেকে লাখ লাখ মানুষ ছুটে আসেন। একটি উৎসব কীভাবে একটি জাতির ইতিহাস, কর্পোরেট দায়বদ্ধতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে যেতে পারে, সিউলের এই আতশবাজি উৎসব তারই এক অনবদ্য উদাহরণ।
এ উৎসবের শেকড় খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ২০০০ সালের দিকে। দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম বৃহৎ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ‘হানহওয়া গ্রুপ’ প্রথমবারের মতো এ উৎসবের সূচনা করে। মজার ব্যাপার হলো, হানহওয়া গ্রুপের আদি ব্যবসা ছিল বিস্ফোরক ও বারুদ তৈরি করা। কোম্পানির আগের নামই ছিল ‘কোরিয়া এক্সপ্লোসিভস’। নিজেদের এই বিস্ফোরক তৈরির কারিগরি জ্ঞানকে মানুষের ধ্বংস বা ভয়ের কাজে না লাগিয়ে, বরং মানুষের মনে আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়ার এক অভিনব উদ্যোগ হিসেবে তারা এই আতশবাজি উৎসবের পরিকল্পনা করে।
এটি ছিল তাদের একটি কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সোশ্যাল কন্ট্রিবিউশন প্রজেক্ট। একই সঙ্গে, ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে যৌথভাবে অনুষ্ঠিত হওয়া ফিফা বিশ্বকাপের উন্মাদনাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া এবং সফল একটি আয়োজনের শুভকামনা জানানোও ছিল এ উৎসব শুরুর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সেই যে শুরু হলো, এরপর থেকে হানহওয়া গ্রুপের এ উদ্যোগ দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় পরিচয়ের একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
তবে সিউল আন্তর্জাতিক আতশবাজি উৎসবের এই দীর্ঘ পথচলা সবসময় মসৃণ ছিল না। বিগত দুই যুগেরও বেশি সময়ের ইতিহাসে বেশ কয়েকবার এই উৎসবের আলো নিভে গিয়েছিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা সংকটের কারণে। যেমন, উৎসব শুরুর ঠিক পরের বছর, অর্থাৎ ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে ভয়াবহ নাইন-ইলেভেন (৯/১১) হামলার পর বিশ্বব্যাপী শোক ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে কোরিয়া এ উৎসব বাতিল করে।
এরপর ২০০৬ সালে উত্তর কোরিয়া যখন তাদের প্রথম ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়, তখন কোরীয় উপদ্বীপে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল। সেই ভীতিকর পরিস্থিতিতে আকাশে বারুদের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে উদযাপন করাটা একেবারেই বেমানান ছিল, তাই সেবারও উৎসব স্থগিত করা হয়। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে বিশ্বজুড়ে সোয়াইন ফ্লু বা ‘এইচ১এন১’ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে জনস্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে উৎসবটি বাতিল করা হয়েছিল। এই বিরতিগুলো প্রমাণ করে যে, উৎসবটি কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি সমসাময়িক বিশ্ব পরিস্থিতি এবং কোরীয় নাগরিকদের জাতীয় আবেগের সঙ্গে সংযুক্ত।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ উৎসবের কলেবর ও জাঁকজমক বহুগুণ বেড়েছে। শুরুর দিকে এটি কেবল কোরিয়ানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, দ্রুতই আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, ফ্রান্স, ইতালি এবং চীনের মতো দেশগুলোর বিশ্বমানের পাইরোটেকনিক দলগুলো প্রতি বছর এ উৎসবে অংশ নিতে সিউলে আসে। লেজার লাইট, হৃদয়গ্রাহী মিউজিক এবং প্রযুক্তির নিখুঁত সমন্বয়ে তারা আকাশের বুকে যেন এক জাদুকরী মায়ার সৃষ্টি করে।
প্রতিটি দল তাদের নিজেদের থিম ও সংস্কৃতির আদলে আতশবাজির নকশা করে থাকে। জানা যায়, প্রতিটি অংশগ্রহণকারী দলের জন্য প্রায় ২০ কোটি কোরিয়ান ওন খরচ হয়। আর আনুষঙ্গিক সব মিলিয়ে মূল আয়োজক হানহওয়া গ্রুপ প্রতি বছর প্রায় দেড়শ কোটি ওন বা তার চেয়েও বেশি অর্থ ব্যয় করে এই এক রাতের মায়াবী আয়োজনের পেছনে।
সাম্প্রতিক সময়ের আয়োজনগুলোর দিকে তাকালে উৎসবের আধুনিক ও বিশালাকার রূপটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেমন, গত ৫ সেপ্টেম্বর জাঁকজমকপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে সিউল আন্তর্জাতিক আতশবাজি উৎসবের সর্বশেষ আসর। ইয়েউইদো হানগাং পার্কে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত চলে এ বর্ণাঢ্য আয়োজন। এবারের আসরে দক্ষিণ কোরিয়ার পাশাপাশি অংশ নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের দক্ষ আতশবাজি দল।
ইদানীং কোরিয়ার অন্যতম প্রধান ঐতিহ্যবাহী উৎসব ‘চুসোক’ (কোরিয়ান থ্যাংকসগিভিং বা নবান্ন উৎসব)-এর ছুটির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই উৎসবের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়। ফলে ছুটির আমেজে থাকা লাখ লাখ মানুষ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নদীর তীরে ভিড় জমান। উৎসবকে কেন্দ্র করে এখন মূল প্রদর্শনীর আগে প্রি-ফেস্টিভ্যাল ইভেন্ট বা সাধারণ দর্শকদের জন্য দিনব্যাপী নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়।
সিউল আতশবাজি উৎসবের দিনে হান নদীর দুই তীরের দৃশ্য নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। মূল অনুষ্ঠানস্থল ইয়েউইদো পার্ক, আইকনিক ৬৩ বিল্ডিংয়ের সামনের এলাকা, নদীর উত্তরের ইচোন হানগাং পার্ক এবং নোদেউল দ্বীপে মানুষের তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর এই উৎসব চাক্ষুষ করতে নদীর তীরে ১০ থেকে ১২ লাখ মানুষের সমাগম ঘটে। উৎসব শুরু হওয়ার তিন-চার ঘণ্টা আগে থেকেই মানুষ নদীর তীরে পিকনিক ম্যাট বিছিয়ে জায়গা দখল করে নেন।
কোরিয়ার বিখ্যাত ‘চিম্যাক’ (চিকেন এবং বিয়ার) খেতে খেতে আকাশের দিকে চেয়ে থাকার এই সংস্কৃতি কোরিয়ান তরুণ-তরুণী, পরিবার এবং যুগলদের কাছে বছরের অন্যতম কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। উৎসবের দিন মেট্রো স্টেশনগুলোতে, বিশেষ করে লাইন ৫-এর ইয়েউইনারু বা ইয়েউইদো স্টেশন, লাইন ৯-এর সায়েতগাং স্টেশন এবং লাইন ১-এর ইয়ংসান বা ইচোন স্টেশনগুলোতে মানুষের এমন ঢল নামে যে, অনেক সময় নিরাপত্তার স্বার্থে ট্রেনগুলো নির্দিষ্ট স্টেশনে না থামিয়েই চলে যায়। দর্শকদের তাই আগেভাগেই পায়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
এত বড় একটি আয়োজনের সঙ্গে কোরিয়ার সংস্কৃতি যেমন জড়িয়ে আছে, তেমনি জড়িয়ে আছে কিছু সমালোচনা এবং নাগরিক নিরাপত্তার কঠোর বিষয়গুলোও। একটি বেসরকারি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে এত বড় পরিসরে লোকসমাগম সিউলের মতো ব্যস্ত শহরে যানজট এবং জনদুর্ভোগের সৃষ্টি করে। লাখ লাখ মানুষ উৎসব শেষে যে বিপুল পরিমাণ আবর্জনা নদীর তীরে ফেলে রেখে যায়, তা পরিষ্কার করতে সিটি কর্পোরেশনকে হিমশিম খেতে হয়।
এর পাশাপাশি, আতশবাজির ব্যবহার নিয়ে বর্তমান কোরিয়ায় নিরাপত্তা বিধি ও আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয়টিও এখন গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। একসময় উৎসবের আনন্দে মানুষ হয়তো যেখানে সেখানে আতশবাজি ফোটাতে পছন্দ করত, কিন্তু এখন দেশটিতে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আতশবাজি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর আইন বলবৎ রয়েছে। চাইলেই যে কেউ যেকোনো জায়গা থেকে বড় ধরনের আতশবাজি কিনে যত্রতত্র ব্যবহার করতে পারেন না। আতশবাজির ধরন ও রাসায়নিক উপাদানের ওপর ভিত্তি করে স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে পূর্বানুমতি নেওয়ার নিয়ম রয়েছে।
[ad_2]
Source link