প্রিন্ট এর তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬, ৭:২৯ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬, ১১:৪৮ অপরাহ্ন
বাংলাদেশের চিকিৎসা পেশায় ঐক্য, নৈতিকতা ও জনআস্থার নতুন কাঠামো
[ad_1]
বাংলাদেশের চিকিৎসা পেশায় ঐক্য, নৈতিকতা ও জনআস্থার নতুন কাঠামো
একজন চিকিৎসকের রাজনৈতিক মত থাকতে পারে। তিনি নাগরিক, তাই সেটি তাঁর অধিকার। কিন্তু রোগীর সামনে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি চিকিৎসক। রোগী আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, বামপন্থী কিংবা কোনো রাজনৈতিক মতের মানুষ না-ও হতে পারেন; চিকিৎসকের কাছে তাঁর পরিচয় শুধু রোগী।
একই কথা চিকিৎসকদের পেশাজীবী সংগঠনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাংলাদেশের চিকিৎসকদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু চিকিৎসকদের নিরাপত্তা, পেশাগত মর্যাদা, চিকিৎসা-নৈতিকতা, প্রশিক্ষণ, কর্মপরিবেশ এবং রোগীর অধিকার—এসব বিষয়ে কি আমাদের একটি দলনিরপেক্ষ জাতীয় পেশাজীবী প্ল্যাটফর্ম থাকা উচিত নয়?
এ প্রশ্নটি এখন গুরুত্ব দিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
সমস্যাটি শুধু রাজনীতি নয়
চিকিৎসা পেশার সংকটকে শুধু রাজনৈতিক বিভাজন দিয়ে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। আমাদের নিজেদের ঘরেও কিছু কঠিন প্রশ্ন করতে হবে।
একজন চিকিৎসক কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ লেখার বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা নেবেন কি? কোনো পরীক্ষাগার, রোগনির্ণয় কেন্দ্র বা হাসপাতাল থেকে রোগী পাঠানোর জন্য কমিশন গ্রহণ করবেন কি? বিদেশ ভ্রমণ, দামি উপহার বা অন্য কোনো সুবিধা চিকিৎসকের চিকিৎসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারবে কি?
আমাদের উদ্দেশ্য কাউকে ছোট করা নয়। চিকিৎসকদেরও নয়, রোগীদেরও নয়, সরকার বা সংবাদমাধ্যমকেও নয়। উদ্দেশ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে ভালো চিকিৎসক সম্মানের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন, অসৎ আচরণের জবাবদিহি হবে, রোগী নিরাপদ বোধ করবেন এবং চিকিৎসকের ওপর আস্থা ফিরে আসবে।
এখানে একটি তথ্য পরিষ্কার করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে চিকিৎসকদের জন্য নৈতিক বিধিমালা নেই—এ কথা ঠিক নয়। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) তাদের ‘পেশাগত আচরণ, শিষ্টাচার ও নৈতিকতার বিধিমালা’ প্রকাশ করে এবং চিকিৎসকদের নিবন্ধন ও পেশাগত মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে রয়েছে। ২০২৬ সালেও বিএমডিসির প্রকাশিত নোটিশে চিকিৎসকের নিবন্ধন স্থগিতের উদাহরণ দেখা যায়।
ওষুধ বিপণনের ক্ষেত্রেও নিয়ম নেই—এ কথাও সঠিক নয়। বাংলাদেশের জাতীয় ওষুধনীতি ২০১৬-এ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর অনুমোদিত ‘ঔষধ বিপণন অনুশীলনবিধি’ অনুসরণের কথা রয়েছে। সেই বিধিতে বিক্রয় প্রচারের উদ্দেশ্যে চিকিৎসকদের উপহার বা আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার বিরুদ্ধে বিধান রয়েছে।
২০২৩ সালের ‘ঔষধ ও প্রসাধনী আইন’ও ওষুধের বিজ্ঞাপন ও প্রচারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করেছে। লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন ছাড়া ওষুধের ব্যবহার, স্বাস্থ্য বা চিকিৎসা-সংক্রান্ত দাবি নিয়ে বিজ্ঞাপন বা প্রচারের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান রয়েছে।
তাহলে প্রয়োজনটা কোথায়?
নিয়ম থাকার পাশাপাশি নিয়মটি স্পষ্ট, আধুনিক, প্রয়োগযোগ্য এবং সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হওয়া জরুরি।
একটি পরিষ্কার স্বার্থের সংঘাতবিষয়ক নীতি দরকার
আমার মতে, বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় একটি আধুনিক, জাতীয় ‘স্বার্থের সংঘাত ও স্বচ্ছতাবিষয়ক নীতি’ নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
নীতি খুব সহজ হতে পারে: চিকিৎসকের চিকিৎসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান বিবেচনা হবে রোগীর প্রয়োজন ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ—ব্যক্তিগত আর্থিক লাভ নয়।
ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান চিকিৎসাশিক্ষা বা গবেষণায় সহায়তা করতে পারে। বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে সহযোগিতাও হতে পারে। কিন্তু কোন অর্থ কোথা থেকে এসেছে, কী উদ্দেশ্যে এসেছে এবং চিকিৎসকের ব্যক্তিগত আর্থিক স্বার্থ আছে কি না—এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকা দরকার।
একই নীতি পরীক্ষাগার, রোগনির্ণয়-সংক্রান্ত চিত্রায়ন কেন্দ্র এবং হাসপাতাল থেকে রোগী পাঠানোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া উচিত। রোগী পাঠানোর বিনিময়ে গোপন কমিশন বা অবৈধ আর্থিক সুবিধা থাকলে তা রোগীর আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
চিকিৎসকের নিরাপত্তা এবং রোগীর অধিকার—দুটিই চাই
আরেকটি বড় সমস্যা হলো চিকিৎসাসেবা কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা।
২০২৫ সালে চিকিৎসাকর্মী ও রোগী—দুই পক্ষের সুরক্ষার জন্য আলাদা দুটি অধ্যাদেশের খসড়া নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ হয়েছিল। কিন্তু ২৯ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য সুরক্ষা-সংক্রান্ত পৃথক আইন এখনও আইনে পরিণত হয়নি।
এখানে আমাদের অবস্থান খুব পরিষ্কার হওয়া উচিত।
চিকিৎসকের গায়ে হাত তোলা কোনো অভিযোগের সমাধান হতে পারে না। আবার চিকিৎসকের বিরুদ্ধে যৌক্তিক অভিযোগ করার কার্যকর পথও বন্ধ করা যাবে না।
রোগীর অধিকার থাকতে হবে চিকিৎসার নথি পাওয়ার, ব্যাখ্যা চাওয়ার, দ্বিতীয় মতামত নেওয়ার এবং অবহেলা বা অসদাচরণের অভিযোগ করার। একই সঙ্গে অভিযোগ তদন্তের আগেই চিকিৎসককে জনতার বিচারের মুখে ফেলা, শারীরিক আক্রমণ করা বা হাসপাতাল ভাঙচুর করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এর সমাধান হলো যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া—দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বিশেষজ্ঞভিত্তিক তদন্ত।
বিএমডিসিকে আরও দৃশ্যমান ও কার্যকর করা যায়
বিএমডিসি ইতিমধ্যে একটি আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নিয়ন্ত্রক সংস্থা; তাদের দায়িত্বের মধ্যে চিকিৎসকদের নিবন্ধন এবং পেশাগত মান বজায় রাখা রয়েছে।
ভবিষ্যতের সংস্কারের আলোচনায় তাই নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরির পাশাপাশি বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করার কথাও ভাবা যায়।
একজন রোগী যেন সহজেই জানতে পারেন কোথায় অভিযোগ করবেন। একজন চিকিৎসকও যেন জানেন, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ হলে কে তদন্ত করবে, কত দিনের মধ্যে করবে, বিশেষজ্ঞের পর্যালোচনা কীভাবে হবে এবং আপিলের সুযোগ কোথায়।
ন্যায়বিচার শুধু রোগীর জন্য নয়—চিকিৎসকের জন্যও প্রয়োজন।
আমাদের প্রয়োজন একটি নতুন সামাজিক চুক্তি
চিকিৎসকদের দাবি শুধু ‘আমাদের নিরাপত্তা দিন’—এতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না।
আমাদেরও বলতে হবে:
আমরা স্বচ্ছ থাকব।
আমরা অবৈধ আর্থিক সুবিধা নেব না।
আমরা রোগীর অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাব না।
আমরা ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের প্রভাব থেকে চিকিৎসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে আলাদা রাখব।
আমরা ভুল করলে নিরপেক্ষ তদন্ত মেনে নেব।
আর রাষ্ট্র ও সমাজ নিশ্চিত করবে—চিকিৎসক যেন ভয়, সহিংসতা বা অন্যায্য চাপ ছাড়া চিকিৎসা দিতে পারেন।
এই পারস্পরিক দায়বদ্ধতার ওপরই জনআস্থা তৈরি হয়।
সাতটি বাস্তব প্রস্তাব
বাংলাদেশে চিকিৎসা পেশার ভবিষ্যৎ নিয়ে জাতীয় আলোচনার জন্য আমি সাতটি বিষয় সামনে রাখতে চাই।
এক. রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে একটি দলনিরপেক্ষ জাতীয় চিকিৎসক পেশাজীবী প্ল্যাটফর্ম, যার মূল বিষয় হবে রোগীর সেবা, চিকিৎসকের কল্যাণ, শিক্ষা, নৈতিকতা ও পেশাগত মান।
দুই. বিএমডিসির বিদ্যমান নৈতিক বিধিমালা আধুনিকায়ন করে একটি বিস্তারিত স্বার্থের সংঘাত ও আর্থিক তথ্য প্রকাশবিষয়ক নীতি তৈরি করা।
তিন. রোগী পাঠানোর বিনিময়ে গোপন কমিশন বা অবৈধ আর্থিক সুবিধার বিষয়ে সুস্পষ্ট জাতীয় নীতি এবং প্রয়োজনে কার্যকর আইনি কাঠামো তৈরি করা।
চার. ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা, উপহার, শিক্ষামূলক অর্থায়ন এবং চিকিৎসক-শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক সম্পর্কের জন্য প্রকাশযোগ্য স্বচ্ছতার মানদণ্ড তৈরি করা।
পাঁচ. স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের ওপর সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষা এবং একই সঙ্গে রোগীর জন্য সহজ, স্বাধীন ও সময়সীমাবদ্ধ অভিযোগ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
ছয়. বিএমডিসিতে অভিযোগের স্বচ্ছ ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া—বিশেষজ্ঞের পর্যালোচনা, নির্দিষ্ট সময়সীমা, সিদ্ধান্তের কারণ এবং আপিলের ব্যবস্থা—আরও শক্তিশালী করা।
সাত. চিকিৎসক, রোগী, হাসপাতাল, ওষুধ প্রস্তুতকারী শিল্প, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, আইন বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজকে নিয়ে একটি জাতীয় চিকিৎসা পেশাগত আচরণ সনদ তৈরি করা।
আমাদের উদ্দেশ্য কাউকে ছোট করা নয়। চিকিৎসকদেরও নয়, রোগীদেরও নয়, সরকার বা সংবাদমাধ্যমকেও নয়।
উদ্দেশ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে ভালো চিকিৎসক সম্মানের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন, অসৎ আচরণের জবাবদিহি হবে, রোগী নিরাপদ বোধ করবেন এবং চিকিৎসকের ওপর আস্থা ফিরে আসবে।
রাজনীতি আমাদের মতাদর্শের অংশ হতে পারে। কিন্তু চিকিৎসা পেশার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত রোগী, নৈতিকতা ও পেশাগত মর্যাদা।
সেখান থেকেই হয়তো বাংলাদেশের চিকিৎসা পেশার নতুন যাত্রা শুরু হতে পারে।
লেখক: কনসালট্যান্ট গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট, অরল্যান্ডো হেলথ, ফ্লোরিডা শিক্ষক, গবেষক, লেখক ও স্বাস্থ্যসেবা প্রশাসক।
এইচআর/এএসএম
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।
আজকের বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা কিংবা মফস্বলের সড়কগুলোর দৃশ্যপট সাধারণ মানুষের মনে এক অদ্ভুত ও আতঙ্কজনক স্মৃতি জাগিয়ে তুলছে। গণপরিবহনে হঠাৎ দাউ দাউ...