প্রিন্ট এর তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬, ৩:৩৫ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ৭:২৫ অপরাহ্ন
সন্তান লালন-পালনে যে ভুল করছি, বাবা-মায়ের কাছে ৩ অনুরোধ
[ad_1]
সন্তান লালন-পালনে যে ভুল করছি, বাবা-মায়ের কাছে ৩ অনুরোধ
শায়খ আহমাদুল্লাহ ছবি: সংগৃহীত
শায়খ আহমাদুল্লাহ
আজকের বাচ্চারা সবচেয়ে নির্যাতিত। আমরা শৈশবে গ্রামে কাটিয়েছি। আমরা এদের মতো এত চকলেট চোখে দেখি নাই, এদের মতো এত খাবারও চোখে দেখি নাই। কেউ একটা হাতে মোয়া দিয়েছে, তাতেই খুশি হয়ে গেছি। একটা চকলেট পেয়েছি, তো লাফাতে লাফাতে আনন্দ করেছি। কিন্তু এদের চেয়ে অনেক বেশি সুখে ও শান্তিতে আমরা ছিলাম।
আমার মনে আছে, গ্রামে যখন ছিলাম, আমাদের টিনের একটা ঘর ছিল। আমার মা ভোরে যখন ঘরের দরজা খুলতেন, সেই দরজা বন্ধ হতো রাত ৯টা বা ১০টায়। এর মধ্যে আর দুয়ার বন্ধ হতো না। যতবার খুশি উঠানে যেতাম, পাশের ঘরে যেতাম, বাইরে যেতাম।
অথচ এখন দেখি, আমরা যখন বাসা থেকে বের হই, আমার বাচ্চা চিৎকার-চেঁচামেচি করে বলে সে তার আব্বুর সঙ্গে যাবে। তার মা তাকে টানে, যেতে দেবে না। বাবা-মা দুজন টানাটানি করে তাকে জোর করে আটকে ঘরের দরজাটা মুখের ওপর লাগিয়ে দেয়। এর ফলে তার মধ্যে মানসিক ট্রমা ও স্ট্রেস তৈরি হয়। সে তখন ফিল করে যে, সে একটা জেলখানায় আছে। বারান্দা থেকে দেখে বাবা চলে যাচ্ছে আর সে বন্দি হয়ে আছে।
এই বাচ্চাদের চেয়ে তো আমরা অনেক বেশি সুখে ছিলাম, অনেক রিলাক্সে ছিলাম। শুধু একটা ডিভাইস হাতে তুলে দিলে তো বাচ্চাদের আসলে বেঁচে থাকা হয় না। সেজন্য তাদের জন্য পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা করা, খেলাধুলার ব্যবস্থা করা এবং তাদের পেছনে সময় দেওয়া অনেক বেশি জরুরি বিষয়।
ঢাকা শহরে হয়তো বাচ্চাদের খেলাধুলার জায়গা দেওয়ার সুযোগ আমাদের খুব বেশি নেই। কিন্তু ঘরের ভেতরে তো বাচ্চার সাথে খেলা যায়। বেশিরভাগ পরিবারেই এই জিনিসটা হয় না।
আল্লাহ তাআলা কোরআনে কারীমে বলেছেন, তোমাদের সম্পদ এবং সন্তান উভয়টি আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষাস্বরূপ। আমরা মনে করি, একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দিয়ে দিলেই সন্তান ফেরেশতার মতো মানুষ হয়ে যাবে। বিশেষ করে মাদ্রাসায় দিলে এই ভাবনাটা বেশি কাজ করে। মনে হয় প্রিন্সিপালদের কাছে এমন কোনো ওষুধ আছে যা খাইয়ে দিলেই বাচ্চা হাফেজ, আলেম বা ভালো মানুষ হয়ে যাবে। এই মানসিকতার কারণে বাসাবাড়িতে বাচ্চাদের মানুষ করার ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের বিশেষ কোনো প্রচেষ্টা চোখে পড়ে না।
অথচ আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেছেন, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও। তাই আমাদের অন্যতম ব্যস্ততা হওয়া উচিত পরিবারকে সময় দেওয়া।
আমি নিয়মিত আমার বাচ্চাদের সময় দেওয়ার চেষ্টা করি। কিছুদিন আগে নির্বাচনের পর আমার সন্তানের শিক্ষক মহোদয় যখন আমার বাসায় গেলেন, তখন আমি বাচ্চাদের সাথে ব্যাডমিন্টন খেলছিলাম। আমরা বাসায় সবাই একসাথে এক প্লেটে খাবার খাই। আমাদের বিভিন্ন সাইজের প্লেট আছে, তিনজনের, পাঁচজনের, সাতজনের। এক প্লেটে এবং একই দস্তরখানে বসে আমরা এক সময়ে খাওয়ার চেষ্টা করি।
আমাদের সন্তানদের সময় দেওয়া খুব প্রয়োজন। আমি সাধারণত হোম অফিস করার চেষ্টা করি। খুব জরুরি মিটিং বা অতিথি থাকলে সপ্তাহে একদিন বা দুদিন অফিসে যাই। বাকি দিনগুলোতে বাসা থেকেই কাজ করি। এর একটা মূল কারণ হলো, বাসা থেকে কাজ করলে বাচ্চাদের দেখভাল করা যায়, তাদের মুভমেন্ট লক্ষ্য করা যায় এবং তাদের সাথে সময় কাটানো যায়।
আমরা বাবা-ছেলেরা মিলে একসাথে জামাতে নামাজ পড়ি। নফল রোজা থাকলে সবাই মিলে রোজা রাখি এবং একসাথে ইফতার করি।
আমাদের সন্তানদের যদি আমরা মানুষ করতে চাই, দ্বীনমুখী করতে চাই, তবে তাদেরকে মোবাইল ও ডিজিটাল ডিভাইসের স্ক্রিন থেকে বাঁচানোর কোনো বিকল্প নেই। ডিভাইস থেকে সন্তানকে দূরে রাখতে না পারলে তাকে সঠিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব।
গতকাল একটি প্রোগ্রামে এক নারী তার লিখিত প্রশ্নে জানান, তাঁর বাচ্চা মোবাইল ছাড়া কিছুই বোঝে না। বাচ্চাকে জোর করতে গেলে সে উল্টো মাকে বলে, ‘তোমার প্যারেন্টিং শেখা হয়নি, তাই তুমি আমাকে মোবাইল ছাড়তে বলছ, তোমার প্যারেন্টিংয়ে ত্রুটি আছে।’
আমি তাঁকে বলেছি, সন্তানরা শুনে যা শেখে, তার চেয়ে দেখে শেখে অনেক বেশি। আপনি মুখে বলবেন, ‘বাবা, মোবাইল ধরতে হয় না’, আর নিজে সারাদিন মোবাইল টিপবেন এমনটা হলে সন্তান কখনো আপনার কথা শুনবে না। নিজের মোবাইল টেপা আগে বন্ধ করতে হবে। আপনি ফেসবুকে ডুবে থেকে সন্তানকে বলবেন পড়তে বসো, তখন সে ভাববে সব সুখ বুঝি ওই মোবাইলেই আছে, তাই মা আমাকে বঞ্চিত করে নিজে টিপছে। তখন সে চুরি করে হলেও মোবাইল হাতে নেবে।
আজকের যুগে যেসব বাচ্চা মোবাইলের আসক্তি থেকে বেঁচে আছে, তাদের খুঁজে পাওয়া কঠিন।
বাবা-মায়ের কাছে আমার তিনটি অনুরোধ:
১. সন্তানদের প্রচুর সময় দিন। বাসাবাড়িতে অফিস, আদালত, রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ঢোকাবেন না। এগুলো বাইরে রেখে ঘরে বাচ্চাদের সাথে গল্প করুন, কথা বলুন, একসাথে খেতে বসুন। মোবাইল বন্ধ করে পূর্ণ মনোযোগ তাদের দিন।
২. বাচ্চাদের ডিভাইস থেকে বাঁচাতে নিজের ডিভাইস ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করুন। প্রয়োজনটুকু শেষ করে মোবাইল রেখে দিন। নিজে সারাদিন মোবাইলে ডুবে থাকলে সন্তানকে কোনোভাবেই রক্ষা করতে পারবেন না। আমি বড় বড় মিটিংয়ের মধ্যেও বাচ্চাদের সাথে খেলার সময় হলে মিটিং শেষ করে দিই। কারণ আমার সন্তানদের চেয়ে বড় কোনো মিটিং আমার থাকতে পারে না। সন্তানই আমার সবচেয়ে বড় অ্যাসেট, আমার ভবিষ্যতের বিনিয়োগ।
৩. আজকের বাচ্চারা সবচেয়ে নির্যাতিত। গ্রামে আমরা যেভাবে মুক্ত হাওয়ায় বড় হয়েছি, তারা তা পাচ্ছে না। ফ্ল্যাট বাড়ির চার দেয়ালে তারা নিজেদের বন্দি মনে করে। তাই তাদের পর্যাপ্ত খেলাধুলা, বিনোদন ও মানসিক শান্তির পরিবেশ নিশ্চিত করুন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্পিরিচুয়াল বা আধ্যাত্মিক দিক। আধ্যাত্মিক দিক থেকে আমাদের সন্তানরা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বদনজর বা দুষ্ট জিনের প্রভাব থেকে মুক্ত বাচ্চা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো বাসাবাড়িতে মিউজিক বা গানের চর্চা। আমরা হয়তো ইচ্ছা করে গান শুনি না, কিন্তু ইউটিউবে কোনো ভিডিও চালালে ব্যাকগ্রাউন্ডে গান বাজে। শয়তানের সাথে কানেক্ট হওয়ার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হলো মিউজিক। এটি মানুষকে নিজের অজান্তেই আধ্যাত্মিকভাবে দুর্বল করে দেয়।
এর থেকে বাঁচতে বাসাবাড়িতে কোরআন তেলাওয়াত বাড়াতে হবে, মিউজিক ও প্রাণীর ছবি টাঙানো বন্ধ করতে হবে এবং সুন্নাহ অনুযায়ী ঘর পরিচালনা করতে হবে।
সন্তানদের জন্য আমাদের বারবার দোয়া করতে হবে, যেন তারা আমাদের চক্ষু শীতলকারী হয় এবং মুত্তাকীদের নেতা হতে পারে। সমাজজুড়ে যে কিশোর গ্যাং ও তরুণদের পথভ্রষ্টতা আমরা দেখছি, তা থেকে রক্ষা পেতে ইসলামি শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষক, প্রতিষ্ঠান ও বাবা-মায়ের ত্রিমুখী প্রচেষ্টা এবং আল্লাহর দরবারে দোয়ার মাধ্যমেই আমাদের সন্তানদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তওফিক দান করুন।
সূত্র: শায়খ আহমাদুল্লাহর অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।
দুনিয়া ও আখেরাতে সমৃদ্ধি লাভ করার জন্য পড়ুন নবীজি (সা.) থেকে বর্ণিত এই দোয়াটি...