প্রিন্ট এর তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬, ৩:৫১ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ৮:২৮ অপরাহ্ন
ইমানের পঞ্চম শাখা: তাকদিরে বিশ্বাস
[ad_1]
ইমানের পঞ্চম শাখা: তাকদিরে বিশ্বাস
ইমানের পঞ্চম শাখা: তাকদিরে বিশ্বাস ছবি: পিক্সেলস
তাকদির শব্দের অর্থ নির্ধারণ করা, নির্দিষ্ট করা বা ধার্য করা। ইসলামের পরিভাষায় তাকদির হলো: এই মহাবিশ্বে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতে যা কিছু ঘটেছে, ঘটছে ও ঘটবে—বড় থেকে ছোট, প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয় আল্লাহ তাআলা নির্ধারণ করে রেখেছেন। মানুষের জীবনও এর বাইরে নয়। তার জীবনে ভালো-মন্দ, লাভ-ক্ষতি, সুখ-দুঃখ, উত্থান-পতন সবই আল্লাহর জ্ঞাত ও নির্ধারিত। তাই তাকদিরে বিশ্বাসের অর্থ হলো, জগতের কোনো ঘটনাই আল্লাহর জ্ঞান ও ইচ্ছার বাইরে ঘটে না—এই বিশ্বাস অন্তরে ধারণ করা।
তাকদিরে বিশ্বাসের চারটি শর্ত
ইমাম বায়হাকি (রহ.) তাকদিরে বিশ্বাসের চারটি শর্ত তুলে ধরেছেন:
১. ভালো-মন্দ সবকিছুই আল্লাহর তাকদিরের অন্তর্ভুক্ত
মানুষের জীবনে সুস্থতা, শত্রুর ওপর বিজয়, রিজিকের প্রশস্ততা কিংবা অন্য কোনো আনন্দের বিষয় যেমন আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, তেমনই আঘাত, পরাজয়, সম্পদ হারানো, এমন কি জীবনসংক্রান্ত বিপদও তাঁর নির্ধারণের বাইরে নয়। কোরআন বলেছে, ‘বলুন, সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে।’ (সুরা নিসা: ৭৮)
২. বিপদের সঙ্গে মানুষের কর্মের সম্পর্ক আছে
সবকিছু আল্লাহর তাকদির অনুযায়ী ঘটলেও মানুষ তার কাজের জন্য দায়মুক্ত নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমাদের ওপর যে বিপদ আসে, তা তোমাদের কৃতকর্মের ফল; আর তিনি অনেক কিছু ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা শুরা: ৩০) অর্থাৎ কোনো বিপদ তাকদিরে নির্ধারিত এই বিশ্বাস নিজের ভুলের দায় এড়িয়ে যাওয়ার অজুহাত হতে পারে না।
৩. আল্লাহর নির্ধারণ ও মানুষের কর্ম দুটো পরস্পরবিরোধী নয়
একদিকে সবকিছু আল্লাহর তাকদির অনুযায়ী সংঘটিত হয়, অন্যদিকে মানুষ নিজের কর্মের মাধ্যমে কোনো কোনো বিপদের কারণ হয়। এ দুটির মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। আল্লাহ আগে থেকেই জানেন কী ঘটবে এবং তা তার নির্ধারণের অন্তর্ভুক্ত; আবার মানুষ নিজের কাজের মাধ্যমে তার ফলও ভোগ করে।
৪. তাকদিরে বিশ্বাস মানুষের দায়িত্ববোধ নষ্ট করে না
‘যা হওয়ার ছিল, তাই হয়েছে’ বলে নিজের অন্যায়কে বৈধ মনে করা তাকদিরের সঠিক বিশ্বাস নয়। মানুষকে তার কর্মের হিসাব দিতে হবে। কোরআন বলেছে, ‘মানুষের জন্য তাই রয়েছে, যা সে অর্জন করেছে।’ (সুরা বাকারা: ২৮৬) তাই তাকদিরের প্রতি বিশ্বাসের সঙ্গে নিজের কর্মের জবাবদিহির বিশ্বাসও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
তাকদিরের প্রকারভেদ
তাকদির নিয়ে মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন আসে আল্লাহ যখন মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে রেখেছেন, তখন দোয়া, নেক আমল বা অন্য কোনো কারণে কি সেই তাকদিরে পরিবর্তন আসতে পারে? এ বিষয়ে তাকদিরকে দুই ভাগে বোঝানো হয়; তাকদিরে মুবরাম ও তাকদিরে মুআল্লাক।
তাকদিরে মুবরাম হলো এমন তাকদির, যা অপরিবর্তনীয়। এতে কোনো পরিবর্তন ঘটে না। অন্যদিকে তাকদিরে মুআল্লাক হলো এমন তাকদির, যা বান্দার কিছু কাজ ও দোয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। বান্দা যদি চেষ্টা করে, কাজ চালিয়ে যায় এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করে, তবে তার জীবনে নির্ধারিত কিছু বিষয় পরিবর্তিত হতে পারে।
মানুষের কাজ ও দোয়া তার তাকদিরেরই অংশ
তাকদিরে মুআল্লাক, অর্থাৎ দোয়া, কাজ ও চেষ্টার মাধ্যমে যে তাকদিরের পরিবর্তন হয়, সেটিও আল্লাহর নির্ধারিত ব্যবস্থার অংশ। মানুষ যে দোয়া করবে, চেষ্টা করবে এবং কোন পথ বেছে নেবে, সেটিও আল্লাহ তাআলা জানেন। এ কারণেই দোয়া ও নেক আমলের মাধ্যমে তাকদিরে পরিবর্তন আসার বিষয়টিকেও তাকদিরের বাইরের কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘দোয়া ছাড়া আর কিছুই তাকদির বদলাতে পারে না, আর নেক আমল ছাড়া আর কিছুই হায়াত বাড়াতে পারে না।’ (সুনানে তিরমিজি: ২১৩৯)
এক ব্যক্তি আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে প্রশ্ন করলেন, আমরা ঝাড়ফুঁক করি, ওষুধ ব্যবহার করি এবং বিভিন্ন ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করি। এগুলো কি আল্লাহর নির্ধারিত তাকদিরকে প্রতিহত করতে পারে? রাসুল (সা.) বললেন, ‘এগুলোও আল্লাহর তাকদিরের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুনানে তিরমিজি: ২০৬৫)
অর্থাৎ অসুস্থতা তাকদিরের অংশ হলে চিকিৎসা করাও তাকদিরের অংশ। বিপদ থেকে বাঁচার চেষ্টা, সতর্কতা অবলম্বন কিংবা কোনো উপায় গ্রহণ করা তাকদিরের বিপরীত কিছু নয়। বরং এসবও তাকদির।
হজরত ওমরের (রা.) একটি মন্তব্য বিষয়টি আরও সহজ করে বোঝায়। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা আল্লাহর এক তাকদির থেকে আরেক তাকদিরের দিকেই যাই।’ এরপর তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কারও উট যদি এমন একটি উপত্যকায় নামে, যার একদিকে উর্বর জমি আর অন্যদিকে অনুর্বর জমি, তাহলে সে উটকে উর্বর জমিতে চরালেও তা আল্লাহর তাকদির অনুযায়ী হবে, অনুর্বর জমিতে চরালেও তা আল্লাহর তাকদির অনুযায়ী হবে। (সহিহ বুখারি: ৫৭২৯)
মোদ্দাকথা, তাকদিরে বিশ্বাস যদি সঠিকভাবে হয়, তা মানুষকে কর্মবিমুখ করে না; বরং দোয়া, চেষ্টা, সতর্কতা ও সঠিক উপায় অবলম্বনের শিক্ষাই দেয়।
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।
দুনিয়া ও আখেরাতে সমৃদ্ধি লাভ করার জন্য পড়ুন নবীজি (সা.) থেকে বর্ণিত এই দোয়াটি...